আবু বকর সিদ্দিক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (একাদশ শ্রেণি)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
কয়ানিজপাড়ার ছেলেটি
নীলফামারীর সৈয়দপুর থানার এক কোণে ছোট্ট একটি গ্রাম কয়ানিজ পাড়া। এই গ্রামেরই এক চাষাভুষো পরিবারে ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্ম নেয় আবু বকর সিদ্দিক। বাবা মফিজুল ইসলাম তখন একটি প্রাইভেট চাকরিতে ছিলেন, বেতন সামান্য। মা আরজিনা বাড়ির কাজের পাশাপাশি অন্যের বাসায় কাজ করতেন সংসার চালাতে। সংসারে ছয়জন সদস্য দুই ভাই, দুই বোন, মা-বাবা আর স্বপ্নে ভরা এই ছেলে, আবু বকর।
তার বড় ভাই মোবারক পড়তো কওমি মাদ্রাসায়, আর বোন রুকাইয়া আটম শ্রেণিতে। ছোট বোন রুফাইদা তৃতীয় শ্রেণিতে। সবাই কমবেশি লেখাপড়ায় মনোযোগী হলেও আবু বকর ছিল একটু আলাদা। তার চোখে ছিল অন্য রকম দীপ্তি, যেন পৃথিবীটাকে নতুন করে চিনতে চায় সে।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলে। বইয়ের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হয় রংপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে। শহরে থেকে পড়ার খরচ সামাল দিতে বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হতো। মাসে বারো হাজার টাকা আয়েও চালাতে হতো ছয়জনের সংসার, কলেজের মেস ভাড়া, টিউশন ফি সবই।
তবুও আবু বকরের স্বপ্ন ছিল দৃঢ় একদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, সে বড় কিছু হবে। তার চোখে সে শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের মুক্তির ছবি আঁকতো।
আন্দোলনের আগুনে জন্ম নেয় প্রত্যয়
২০১৮ সালে যখন প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে, মূলত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬% কোটা থাকায় মেধাবীরা তাদের মেধার মূল্যায়ন পেত না। যার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা শহরে স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছাত্রীদের এতে অংশগ্রহণ করে। সরকার প্রথমে মেনে না নিলেও পরবর্তীতে প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের কারণে কোটা বাতিল করে দেয়। ছাত্ররা চেয়েছিল একটি যৌক্তিক সংস্কার কিন্তু সেই সময়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা রাগে ক্ষোভে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তখন সাময়িক ভাবে কোটা বাতিল করলেও এটার ফাঁক রয়ে যায়। যার কারণে আবার দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই। সারাদেশে আবার জ্বলে ওঠে সেই আগুন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের শহর-গ্রাম সবখানে। এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মেধার ন্যায্য স্বীকৃতি আর বৈষম্যের অবসান। আন্দোলনের ঢেউ গিয়ে লাগে সৈয়দপুরেও।
রংপুর শহরে কলেজে পড়ার সুবাদে আবু বকর হয়ে ওঠে আন্দোলনের এক নিবেদিত কর্মী। সে দেখে ঢাকায় ছাত্রদের চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে, রাস্তায় গুলি করে আহত করা হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীকে। তার ভিতর এক চাপা ক্ষোভ জমতে থাকে। বন্ধুরা যখন বলে, এতো ঝুঁকি, তুই যাবি?
আবু বকর তখন বলে, ভাই আমি যদি না যাই, আমার ছোট বোনটা কী করে পড়ালেখা করবে ভবিষ্যতে? আমরা কি চিরকাল এই বৈষম্যের ভেতরেই বাঁচব? ৪ আগস্ট ২০২৪ এই দিনটি ছিল তার জীবনের দিগন্ত-বদলের দিন।
পাঁচমাথা মোড়ে সেই ভয়াল বিকেল
৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর দুইটা। সৈয়দপুর শহরের পাঁচমাথা মোড়। সেদিন সেখানে ছিল উত্তাল জনতার ঢল। ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ, পথচারী, অটো চালক রিক্সা চালক সবাই রাস্তায় নামে ১ দফা দাবির ভিত্তিতে। তখন আন্দোলন শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং দুর্নীতি, অনিয়ম, খাদ্যদ্রব্যের উর্ধ্বগতি, বাকস্বাধীনতা হরণ সকল কিছুর বিরুদ্ধে ছিল। দল-মত, নারী-পুরুষ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলেই রাস্তায় নামে। আবু বকর ও তাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। আবু বকর তখনো প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে মাস্ক, চোখে ছিল সাহস। স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং তার সন্ত্রাসী আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসরা দেশে বিদেশীরা অস্ত্র হাতে নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র যেন তাকে হত্যা করে হলেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। তাইতো তারা ছোট-বড়, শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী কাউকেই বাঁচ-বিচার করে নাই। যাকে সামনে পেয়েছে তারেই আক্রমণ করেছে। পুলিশ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করছিল। সেদিন পুলিশ ছাত্র-জনতা কে ছাত্র ভঙ্গ করার চেষ্টা করে। হঠাৎ করেই গর্জে ওঠে পুলিশের গাড়িবহর। মুহূর্তেই লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, আর শুরু হয় ছররা গুলির তাণ্ডব।
ছুটে পালাতে থাকা জনতার মাঝেই ছিল আবু বকর। সে দৌড়াতে না দৌড়াতেই পুলিশ একের পর এক ছররা গুলি ছুঁড়তে থাকে। ঠিক তখনই একটি ছররা এসে লাগে তার ডান চোখে। আরো কিছু ছোররা গুলি এসে লাগে তার শরীরে। মুহূর্তেই রক্তের বন্যা। চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে। সে মাটিতে পড়ে যায়। ছাত্র-জনতা দৌড়ে এসে চিৎকার করে, এই ছেলেটা চোখে গুলি খাইছে। লোকজন তাকে ঠেলে তোলে সরাসরি নিয়ে যায় সদর হাসপাতালে।
চোখের আলো নিভে যাওয়া ও অনিশ্চিত আগামী
সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা হয়, কিন্তু দ্রুতই বোঝা যায় পরিস্থিতি জটিল। তাই তাকে পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেলে। সেখানে একদিন ভর্তি থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, তার ডান চোখটি বাঁচানো সম্ভব নয়।
এরপর তাকে নেয়া হয় ঢাকার চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে, আগারগাঁও। সেখানে শুরু হয় দীর্ঘ আট মাসের চিকিৎসা। চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়, ছররা গুলি বের করে ফেলা হয়। কিন্তু অপারেশন শেষেও চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন যে, ডান চোখটি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেছে। বাবা-মা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। একমাত্র আশার আলো ছিল ছেলে, এখন সেই আলোতেই অন্ধকার। চিকিৎসার খরচ ১০-১৫ হাজার টাকার ওপরে। তাদের জমি বন্ধক রেখে এই চিকিৎসা চালানো হয়। তবু আবু বকর হার মানে না।
বাম চোখে এখনো কিছু আলো আছে। চিকিৎসকেরা বলেন যে, এই চোখটিকে বাঁচাতে নিয়মিত চেকআপ দরকার। সে তাই এখনো চিকিৎসা নেয়, মাঝে মাঝে চোখে ব্যথা হয়, মাথা ধরে, ভয়ে থাকে যে, এই চোখও হারাবে না তো?
কলেজে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু আগের মতো নয়। এক চোখে ঝাপসা দুনিয়া দেখে। বন্ধুদের হাসি তাকে কষ্ট দেয় না, কিন্তু আয়নায় নিজেকে দেখে কাঁদে সে। তবু বলে যে, চোখ হারিয়েছি ঠিক, কিন্তু যে স্বপ্ন দেখতাম, সেটা এখনো দেখি। আবু বকর সিদ্দিকের গল্প কেবল একজন ছাত্রের চোখ হারানো নয়, এটি একটি পরিবারের সংগ্রাম, একটি সমাজের বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।
প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আবু বকর সিদ্দিক
জন্ম তারিখ : ৫ ডিসেম্বর ২০০৮
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী (একাদশ শ্রেণি)
প্রতিষ্ঠান : রংপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : নীলফামারী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কয়ানিজপাড়া, ইউনিয়ন: সৈয়দপুর পৌরসভা, থানা: সৈয়দপুর, জেলা: নীলফামারী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : বড়ুয়া, ডাকঘর: যাদুর হাট, চাপড়া সরমজানী, নীলফমারী সদর, নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মফিজুল ইসলাম
মায়ের নাম : আরজিনা
পিতার পেশা ও বয়স : চাকুরী, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও অন্যের বাসায় কাজ করে
মাসিক আয় : ১২ হাজার
আয়ের উৎস: চাকুরী থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. মোবারক, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: কওমি মাদ্রাসা, সম্পর্ক: ভাই
২. রুকাইয়া, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী (গার্লস স্কুল), শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: বোন
৩. রুফাইদা, বয়স: ১০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৩য় (সরকারি প্রা: বিদ্যালয়), সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : পাঁচমাথা মোড়, সৈয়দপুর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
নীলফামারীর সৈয়দপুর থানার এক কোণে ছোট্ট একটি গ্রাম কয়ানিজ পাড়া। এই গ্রামেরই এক চাষাভুষো পরিবারে ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্ম নেয় আবু বকর সিদ্দিক। বাবা মফিজুল ইসলাম তখন একটি প্রাইভেট চাকরিতে ছিলেন, বেতন সামান্য। মা আরজিনা বাড়ির কাজের পাশাপাশি অন্যের বাসায় কাজ করতেন সংসার চালাতে। সংসারে ছয়জন সদস্য দুই ভাই, দুই বোন, মা-বাবা আর স্বপ্নে ভরা এই ছেলে, আবু বকর।
তার বড় ভাই মোবারক পড়তো কওমি মাদ্রাসায়, আর বোন রুকাইয়া আটম শ্রেণিতে। ছোট বোন রুফাইদা তৃতীয় শ্রেণিতে। সবাই কমবেশি লেখাপড়ায় মনোযোগী হলেও আবু বকর ছিল একটু আলাদা। তার চোখে ছিল অন্য রকম দীপ্তি, যেন পৃথিবীটাকে নতুন করে চিনতে চায় সে।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলে। বইয়ের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হয় রংপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে। শহরে থেকে পড়ার খরচ সামাল দিতে বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হতো। মাসে বারো হাজার টাকা আয়েও চালাতে হতো ছয়জনের সংসার, কলেজের মেস ভাড়া, টিউশন ফি সবই।
তবুও আবু বকরের স্বপ্ন ছিল দৃঢ় একদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, সে বড় কিছু হবে। তার চোখে সে শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের মুক্তির ছবি আঁকতো।
আন্দোলনের আগুনে জন্ম নেয় প্রত্যয়
২০১৮ সালে যখন প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে, মূলত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬% কোটা থাকায় মেধাবীরা তাদের মেধার মূল্যায়ন পেত না। যার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা শহরে স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছাত্রীদের এতে অংশগ্রহণ করে। সরকার প্রথমে মেনে না নিলেও পরবর্তীতে প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের কারণে কোটা বাতিল করে দেয়। ছাত্ররা চেয়েছিল একটি যৌক্তিক সংস্কার কিন্তু সেই সময়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা রাগে ক্ষোভে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তখন সাময়িক ভাবে কোটা বাতিল করলেও এটার ফাঁক রয়ে যায়। যার কারণে আবার দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই। সারাদেশে আবার জ্বলে ওঠে সেই আগুন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের শহর-গ্রাম সবখানে। এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মেধার ন্যায্য স্বীকৃতি আর বৈষম্যের অবসান। আন্দোলনের ঢেউ গিয়ে লাগে সৈয়দপুরেও।
রংপুর শহরে কলেজে পড়ার সুবাদে আবু বকর হয়ে ওঠে আন্দোলনের এক নিবেদিত কর্মী। সে দেখে ঢাকায় ছাত্রদের চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে, রাস্তায় গুলি করে আহত করা হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীকে। তার ভিতর এক চাপা ক্ষোভ জমতে থাকে। বন্ধুরা যখন বলে, এতো ঝুঁকি, তুই যাবি?
আবু বকর তখন বলে, ভাই আমি যদি না যাই, আমার ছোট বোনটা কী করে পড়ালেখা করবে ভবিষ্যতে? আমরা কি চিরকাল এই বৈষম্যের ভেতরেই বাঁচব? ৪ আগস্ট ২০২৪ এই দিনটি ছিল তার জীবনের দিগন্ত-বদলের দিন।
পাঁচমাথা মোড়ে সেই ভয়াল বিকেল
৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর দুইটা। সৈয়দপুর শহরের পাঁচমাথা মোড়। সেদিন সেখানে ছিল উত্তাল জনতার ঢল। ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ, পথচারী, অটো চালক রিক্সা চালক সবাই রাস্তায় নামে ১ দফা দাবির ভিত্তিতে। তখন আন্দোলন শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং দুর্নীতি, অনিয়ম, খাদ্যদ্রব্যের উর্ধ্বগতি, বাকস্বাধীনতা হরণ সকল কিছুর বিরুদ্ধে ছিল। দল-মত, নারী-পুরুষ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলেই রাস্তায় নামে। আবু বকর ও তাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। আবু বকর তখনো প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে মাস্ক, চোখে ছিল সাহস। স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং তার সন্ত্রাসী আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসরা দেশে বিদেশীরা অস্ত্র হাতে নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র যেন তাকে হত্যা করে হলেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। তাইতো তারা ছোট-বড়, শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী কাউকেই বাঁচ-বিচার করে নাই। যাকে সামনে পেয়েছে তারেই আক্রমণ করেছে। পুলিশ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করছিল। সেদিন পুলিশ ছাত্র-জনতা কে ছাত্র ভঙ্গ করার চেষ্টা করে। হঠাৎ করেই গর্জে ওঠে পুলিশের গাড়িবহর। মুহূর্তেই লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, আর শুরু হয় ছররা গুলির তাণ্ডব।
ছুটে পালাতে থাকা জনতার মাঝেই ছিল আবু বকর। সে দৌড়াতে না দৌড়াতেই পুলিশ একের পর এক ছররা গুলি ছুঁড়তে থাকে। ঠিক তখনই একটি ছররা এসে লাগে তার ডান চোখে। আরো কিছু ছোররা গুলি এসে লাগে তার শরীরে। মুহূর্তেই রক্তের বন্যা। চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে। সে মাটিতে পড়ে যায়। ছাত্র-জনতা দৌড়ে এসে চিৎকার করে, এই ছেলেটা চোখে গুলি খাইছে। লোকজন তাকে ঠেলে তোলে সরাসরি নিয়ে যায় সদর হাসপাতালে।
চোখের আলো নিভে যাওয়া ও অনিশ্চিত আগামী
সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা হয়, কিন্তু দ্রুতই বোঝা যায় পরিস্থিতি জটিল। তাই তাকে পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেলে। সেখানে একদিন ভর্তি থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, তার ডান চোখটি বাঁচানো সম্ভব নয়।
এরপর তাকে নেয়া হয় ঢাকার চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে, আগারগাঁও। সেখানে শুরু হয় দীর্ঘ আট মাসের চিকিৎসা। চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়, ছররা গুলি বের করে ফেলা হয়। কিন্তু অপারেশন শেষেও চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন যে, ডান চোখটি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেছে। বাবা-মা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। একমাত্র আশার আলো ছিল ছেলে, এখন সেই আলোতেই অন্ধকার। চিকিৎসার খরচ ১০-১৫ হাজার টাকার ওপরে। তাদের জমি বন্ধক রেখে এই চিকিৎসা চালানো হয়। তবু আবু বকর হার মানে না।
বাম চোখে এখনো কিছু আলো আছে। চিকিৎসকেরা বলেন যে, এই চোখটিকে বাঁচাতে নিয়মিত চেকআপ দরকার। সে তাই এখনো চিকিৎসা নেয়, মাঝে মাঝে চোখে ব্যথা হয়, মাথা ধরে, ভয়ে থাকে যে, এই চোখও হারাবে না তো?
কলেজে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু আগের মতো নয়। এক চোখে ঝাপসা দুনিয়া দেখে। বন্ধুদের হাসি তাকে কষ্ট দেয় না, কিন্তু আয়নায় নিজেকে দেখে কাঁদে সে। তবু বলে যে, চোখ হারিয়েছি ঠিক, কিন্তু যে স্বপ্ন দেখতাম, সেটা এখনো দেখি। আবু বকর সিদ্দিকের গল্প কেবল একজন ছাত্রের চোখ হারানো নয়, এটি একটি পরিবারের সংগ্রাম, একটি সমাজের বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।
প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আবু বকর সিদ্দিক
জন্ম তারিখ : ৫ ডিসেম্বর ২০০৮
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী (একাদশ শ্রেণি)
প্রতিষ্ঠান : রংপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : নীলফামারী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কয়ানিজপাড়া, ইউনিয়ন: সৈয়দপুর পৌরসভা, থানা: সৈয়দপুর, জেলা: নীলফামারী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : বড়ুয়া, ডাকঘর: যাদুর হাট, চাপড়া সরমজানী, নীলফমারী সদর, নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মফিজুল ইসলাম
মায়ের নাম : আরজিনা
পিতার পেশা ও বয়স : চাকুরী, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও অন্যের বাসায় কাজ করে
মাসিক আয় : ১২ হাজার
আয়ের উৎস: চাকুরী থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. মোবারক, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: কওমি মাদ্রাসা, সম্পর্ক: ভাই
২. রুকাইয়া, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী (গার্লস স্কুল), শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: বোন
৩. রুফাইদা, বয়স: ১০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৩য় (সরকারি প্রা: বিদ্যালয়), সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : পাঁচমাথা মোড়, সৈয়দপুর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍