হোম / আহতদের তালিকা / মো: মারুফ খান
মো: মারুফ খান

মো: মারুফ খান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো: মারুফ খান এক সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগুনে রাজপথে দাঁড়িয়ে হয়ে ওঠেন নীরব প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীক। গুলি তাঁর হাত আর পা ভেদ করেছে, ছুরির কোপ কেটেছে শরীর, কিন্তু কোনো আঘাতই তাঁর ন্যায়বিচারের বিশ্বাসকে থামাতে পারেনি। ব্যথা সয়ে তিনি আজও স্বপ্ন দেখেন নিজের শক্তিতে দাঁড়ানোর, পরিবারের তিন ভাইকে আগলে রাখার, এবং বঞ্চিত তরুণদের জন্য কর্মদুয়ার খুলে দেওয়ার। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে লেখা আছে এক অদম্য ঘোষণা: “আমি অক্ষম নই, সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম।”

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহত ছাত্রের অনাড়ম্বর প্রতিরোধ
মো: মারুফ খান
ক্রমিক: ০৩৯
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৯
পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
মো: মারুফ খান। একজন সাধারণ তরুণ শিক্ষার্থী। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর তাঁর নাম হয়ে উঠেছে এক অনাড়ম্বর প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এ ছাত্রটি শুধু কোড শেখেননি, তিনি শিখেছিলেন কোডচাপা সমাজে দাঁড়ানো মানে কী।
ন্যায়-অন্যায়ের বর্ণনা কেবল সফটওয়্যারে নয়, রক্তে লিখেও দেয়া যায়।
তিন ভাইয়ের সংসার। বড় ভাই হওয়া মানে এখানে শুধু রেজাল্ট ভালো করা নয়, এখানে তার মানে বিপদের সামনে বুক মেলে দেয়া। মাহিন ভর্তি পরীক্ষার স্বপ্নে জেগে থাকা কিশোর, মুহতাসিম মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের ছাত্র; আর তাদের মাথার ছায়া ছিলেন মারুফ। পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যার পেনশন নেই, শুধু দু'টি সিএনজির আয় দিয়ে চলে সংসার টিকিয়ে রাখার লড়াই। মা নীরব সংগ্রামী, যিনি তিনটি ছেলেকে আগুনের ভেতর দিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। এই পরিবার শিখিয়েছিল মাথা নিচু না করতে, অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে জানতে।
১৯ জুলাই, সন্ধ্যা নামে শংকর ইবনে সিনার মোড়ে। রাস্তায় তখনো পিচ গরম হয়নি যতটা গরম হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের গর্জন। ছাত্রেরা দাঁড়িয়েছিল হাতে পতাকা, মুখে শ্লোগান, আর বুকভরা বিশ্বাস নিয়ে। সেই ভিড়ে মারুফ নেতা হয়ে নয়, প্রতিনিধি হয়ে নয়, শুধু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর মুখে শ্লোগান ছিল, চোখে আগুন ছিল, আর পায়ের নিচে ভবিষ্যতের রক্তাক্ত পথ। তখনই আচমকা শব্দ গুলির, রাষ্ট্রীয় বর্বরতার।
মারুফের ডান হাতে লাগে প্রথম গুলি, যেন সে আর মায়ের মুখে শান্তির থালা তুলে দিতে না পারে। তারপর পায়ে, যেন সে চলতে না পারে আর স্বাধীনতার দিকে। কিন্তু সে পড়ে না, থামে না। কারণ তার পায়ে গুলি লাগলেও তার আত্মা ছিল নির্ভীক। রক্ত গড়ায়, চিৎকার ওঠে, বন্ধুরা এগিয়ে আসে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, অস্ত্রোপচার হয়, কিন্তু ব্যথা যায় না, কারণ এ ব্যথা শুধু হাড়ে নয়, পাষাণ রাষ্ট্রের বুকের ভেতরে।
মারুফের গুলিবিদ্ধ হাত আজও কাঁপে যখন সে কলম ধরতে চায়, তার পা আজও ছড়িয়ে দেয় যন্ত্রণা যখন সে হাঁটতে চায় ক্লাসরুমের দিকে। কিন্তু এ কষ্ট তাঁকে থামায় না, বরং স্মরণ করিয়ে দেয়, সে রক্ত দিয়েছিল। কারণ সে বিশ্বাস করত, ভবিষ্যত বদলানো সম্ভব। এখনো সে লেখে, শ্লোগান দেয় মাথার ভেতর, কোডের ভেতর, চোখের কোণে জমে থাকা জলে।
মারুফ জানে সে গুলি খেয়েছে সত্যের পক্ষে এবং সেই সত্য একদিন গর্জে উঠবেই, যেমন রক্তে লেখা ইতিহাস একদিন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
শহীদ না হলেও সে এক জীবিত বিপ্লবের নিঃশব্দ স্তম্ভ, যার বেঁচে থাকাই একটি প্রত্যুত্তর, একটি অস্বীকার, একটি ভবিষ্যতের ওয়াদা।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্ত ও ছাত্রলীগের ছুরিকাঘাত
সন্ধ্যা তখন ঠিক পা রাখেনি শহরে, কিন্তু রাজপথে নেমে এসেছিল আগুনের ছায়া। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকার বাতাসে ভাসছিল নতুন এক গণজাগরণের সুর। রাজপথে মুখরিত শ্লোগান "কোটা সংস্কার নয়, রাষ্ট্র সংস্কার চাই" তা যেন কেবল দাবি নয়, ছিল এক জনতার ঘোষণা। শংকর মোড় তখন আর কোনো মোড় নয়, তা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার এক সাময়িক ক্যাম্প, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তরুণ, তরুণী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, কবি যার যার ভাষায় রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শপথে।
সেখানেই ছিলেন মো: মারুফ খান, গায়ে ছিল না কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাজ, কণ্ঠে ছিল না কোনো মঞ্চের বুলন্দ আওয়াজ; তবুও তিনি ছিলেন সম্মুখ সারিতে। তাঁর হাতে ছিল আত্মবিশ্বাস, চোখে আগুন, আর মগজে একটি প্রশ্ন, "আমার ভাই কেন চাকরি পায় না, আমার মা কেন লাইনে দাঁড়িয়ে চাল চায়?" এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি রাস্তায়।
সন্ধ্যার ঠিক আগে শুরু হয় ছাত্রলীগের সম্মিলিত আক্রমণ। শংকর মোড়ে হঠাৎই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসে। কেউ জানে না কার হাত থেকে, কিন্তু বুঝে যায় কার ইশারায়। মারুফ পড়ে যান মাটিতে, ডান হাতে গুলি, বাম পায়ে রক্ত। ব্যথার তীব্রতা তাঁকে থামাতে পারেনি, কারণ তাঁর শরীর তখন শুধুই একটা বুলেটের ঠিকানা নয়, সেটা ছিল এক পতাকার প্রতিরোধ।
কিন্তু দুঃস্বপ্নের শেষ এখানেই নয়। সময় এগোয় আগস্টের দিকে। ৪ আগস্ট, শহরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
রাষ্ট্র তখন মুখ খুলছে না, কিন্তু ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী। পিলখানার সামনে দাঁড়ানো মারুফ, যার শরীরে তখনো গুলির ক্ষত শুকায়নি, তাঁকে ঘিরে ধরে একদল মুখোশধারী। এক ছুরির কোপ পড়ে তাঁর ডান হাতে, রক্ত ছুটে যায় রাস্তায়, চিৎকার দেয়া হয় না, কারণ বিপ্লবীরা চিৎকার দেয় না তারা শুধু রক্ত দিয়ে ইতিহাস লেখে।
শংকর ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন চলে জরুরি চিকিৎসা। তারপর চুপচাপ একটা কাগজে 'রিলিজ' লেখা হয়, যেন এক সংগ্রামী মানুষের যন্ত্রণাও সময়সীমার মধ্যেই পড়ে। আজ পর্যন্ত সে কোনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পায়নি। ব্যথা আছে, ক্ষতও শুকায়নি ঠিক মতো। তবুও মারুফ হাঁটে লাঠিতে ভর দিয়ে নয়, স্বপ্নে ভর করে। সে এখনও স্বপ্ন দেখে একটি গার্মেন্টস খোলার, যেখানে অন্য বঞ্চিত তরুণদের হাতে তুলে দিতে পারবে কর্মের চাবি, সম্মানের রুটি।
রাষ্ট্র চেয়েছিল তাকে মেরে ফেলতে, আর সে বেঁচে আছে, বাঁচিয়ে রাখছে এক নীরবতাপূর্ণ বিদ্রোহকে। কারণ সে জানে, রক্ত কখনো বৃথা যায় না। একদিন এই শহর তার রক্তাক্ত হাতে লেখা ইতিহাস ফেরত দেবে। মাথা নত করেনি সে, করেছে কেবল নিজের আকাশটা আরও বিস্তৃত।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
একজন গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা মো: মারুফ খানের কন্ঠে এখনও বজ্রগম্ভীর প্রত্যয়, "আমি অক্ষম নই, আলহামদুলিল্লাহ।” এই বাক্য যেন গুলি ভেদ করে ওঠা এক দৃপ্ত ঘোষণা- পঙ্গু দেহ নয়, স্বপ্নহীন আত্মা-ই প্রকৃত অক্ষম। রাষ্ট্র যখন চুরি মারে হাতেও গুলি চালায় পায়ে, তখনও সে চায় না করুণা বা অনুদান। সে চায় কেবল সুযোগ, একটি সরকারি চাকরি, না হলে মাঝারি মানের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলে দাঁড়াতে চায় নিজস্ব সক্ষমতায়। স্বপ্ন শুধু জীবিকার জন্য হবে না, এখানে চাকরি মানে পরাজয় নয়, গার্মেন্টস মানে ছোট হয়ে যাওয়া নয় বরং এগুলোই হবে নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিপ্লবের আগুন।
-
মারুফ জানে তার পরিবারের অবস্থা ভঙ্গুর নয়, তবু ভাঙার সম্ভাবনায় প্রতিদিন ঝুঁকে পড়ে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবার - সিএনজি চালানোর টাকায় সংসার চলে, কিন্তু একটা গুলিবিদ্ধ ছেলে যেন প্রতিদিনই সেই চালকের চাকা থামিয়ে দেয়। এই তরুণ = জানে সে কারো দয়ার পাত্র নয়, সে একজন সত্যের সৈনিক, যে - রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ বলছে, "আমাকে করুণা দিও না, আমাকে কাজ দাও।" এই চাওয়ার মধ্যে আছে পুরো জুলাই বিপ্লবের প্রতিধ্বনি, যেখানে আমরা চেয়েছিলাম গুলি নয়, সুযোগ: ভিক্ষা নয়, ন্যায্যতা এবং নিম্নশেষ নয়, সম্ভাবনার মুক্ত স্রোত।
-
প্রস্তাবনা
১। মোঃ মারুফ খানের সরকারি চাকরিতে বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগের ব্যবস্থা।

এক নজরে মো: মারুফ খান
নাম: মো: মারুফ খান
শিক্ষা: ছাত্র, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (B.Sc. in SWE)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: বাড়ি-৭৫/১, ডিএসসিসি, ওয়ার্ড ৫৫, কামরাঙ্গীচর, ঢাকা
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম: মো: মজিবুর রহমান খান
বাবার বয়স ও পেশা: ৫৪, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বর্তমানে ২টি সিএনজির মালিক যা দিয়ে সংসার চলে
মায়ের নাম: মাহামুদা আফরোজ
মায়ের পেশা: গৃহিণী
ভাই: মোট ৩ ভাই
মাহিন খান: ছাত্র (বিশ্ববিদ্যালয় এডমিশন প্রার্থী)
মুহতাসিম খান।: মোহাম্মদপুর সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করছেন
আহত হওয়ার স্থান: শংকর ইবনে সিনা ও পিলখানার সামনে
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍