হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ ইব্রাহীম
মোঃ ইব্রাহীম

মোঃ ইব্রাহীম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ইব্রাহীম এবং তার সংগ্রামী পরিবার
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানার অন্তর্গত মুছাপুর ইউনিয়নের মুছাপুর গ্রামে পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ ইব্রাহীম। বাবা মোঃ আইয়ুব আলী(৬০) পেশায় একজন চাকরিজীবী। আর গৃহিনী মা কুলছুম বেগম (৫০) ঘরসহ পাঁচ সন্তান সামলান পাকা হাতে। এলাকার রেলওয়ে গর্ভমেন্ট স্কুল থেকে পাশ করে এখন পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। তাদের নেই কোনো আবাদযোগ্য জমি। আছে শুধু ভিটের ঐ ২ শতক জমি। তাই শুরু থেকেই বাবা ছিলেন সংগ্রামী। জীবিকার সন্ধানে নিজের ঐ যৎসামান্য ভিটেটুকু ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে আসেন চট্টগ্রামের হালিশহরে। থাকেন ভাড়া বাসায়। সংগ্রামী পরিবারের সন্তানদেরও প্রয়োজনের তাগিদে সংগ্রামী হয়ে উঠতে হয়। অনেক অপ্রাপ্তিকে মাথা পেতে নিতে হয়।

ইব্রাহীমের পরে তার আরো তিন ভাইবোন আসেন পৃথিবীতে। সাত সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের ঘানি টানতে বাবা একটা বেসরকারি চাকরি নেন। ওদিকে ইব্রাহীমের খালামনির সাথে খালুর চলছে দীর্ঘদিনের বিরোধ। খালু সংসার পেতেছেন অন্য জায়গায়। তাই খালামনিও তার ছোট ছেলেটাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে চলে আসেন তাদের বাড়িতে থাকতে। বড়ভাই আমির আলী জীবিকার খোঁজে পাড়ি জমিয়েছেন। ভেবেছিলেন এবার হয়তো ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। কিন্তু সেখানে তিনি যে চাকরি করেন তার বেতন দিয়ে তিনি নিজের খরচ চালানোর পর বাড়িতে টাকা পাঠানোর আর সুযোগ থাকে না। এভাবেই চলছে তাদের অভাবের সংসার। তবুও চোখে স্বপ্ন নিয়ে পরিবারটি এগিয়ে চলছে সামনের দিকে।

শুরু থেকেই ইব্রাহীম ছিল আন্দোলনের একাংশ
কোটা আন্দোলনের শুরু থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন করে যাচ্ছিলেন ইব্রাহীম। তিনি তার বিবেক খাটিয়ে যুক্তিমিলিয়ে আন্দোলনকে সমর্থন না করার কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই পূর্ণ সমর্থন দিয়ে শুরু থেকে নিজের ফেইসবুক আইডিতে কোটা আন্দোলনের পক্ষে নিয়মিত পোস্ট দিতে থাকেন ইব্রাহীম। ১৪ জুলাই তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধান হাসিনা মেধাবীদের রাজাকার বলে গালি দিলে সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ ভাগ হয়ে যায় দুইভাগে। একভাগ মেধাবী শিক্ষার্থীদের পক্ষে, অন্যভাগ স্বৈরাচার সরকারের পক্ষে। পরেরদিন ১৫ জুলাই আন্দোলনকে বেগবান করতে ঢাকাস্থ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রিত হলে ছাত্রলীগ তাদের নেতাকর্মীসহ ঢাকাস্থ গুন্ডাদের ভাড়া করে এনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করলে ইব্রাহীম তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।
ভাই-বোনদের ওপর ছাত্রলীগের অন্যায়ভাবে হামলা সহ্য করতে না পেরে নিজেই হলেন আন্দোলনযোদ্ধা
কেন যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করেও হামলার স্বীকার হতে হলো আমাদের ভাইবোনদের? প্রশ্নের উত্তর যেন মিলে না। রাতেই স্থির করেন তিনিও যুক্ত হবেন এ আন্দোলনে। ১৫ জুলাই হামলা হয়েছে, পরের দিনও হামলা হবে নিশ্চিত জেনেও ১৬ জুলাই দুপুর ২ টার দিকে তিনিসহ তার আরো ২০ জন বন্ধু যুক্ত হলো ছাত্রশিবির ও পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীদের মিছিলে। আন্দোলনকে ধারণ এবং ইতিহাসের স্বাক্ষী হতে শিক্ষার্থীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিল করতে চলে গেলেন ইব্রাহীম ও তার এলাকার বন্ধুরা।

লুকিয়েও রক্ষা পেল না; ছাড় দিল না হায়েনারা
যেহেতু তার পরিবার হালিশহরে বাসা ভাড়া করে থাকতেন তাই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এলাকার ভাই ব্রাদারদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেন ইব্রাহীম। কিন্তু ইব্রাহীম তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন তখন যখন তিনি আন্দোলনের অংশ হলেন। ১৬ তারিখ শিক্ষার্থীদের সাথে মিছিল করতে গেলেও ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ সকল রাস্তা বেড়িকেট দিয়ে ব্লক করে দেয়। তখন মিছিল করতে না পেরে যখন বাসায় ফিরছিলেন তখন প্রায় সন্ধ্যা। ছাত্রলীগের গুন্ডারা, যুবলীগের হায়েনারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার জন্য।

তাদের এই প্ল্যানের কারণে মিছিল করার জন্য মুরাদপুর চত্বরে একত্রিত হওয়া সকল শিক্ষার্থী ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দিকে। সন্ত্রাসীরা যখন ধাওয়া করে তখন যে যার মতো করে পালাতে থাকে। তখন ইব্রাহিম ও তার বন্ধু মোঃ ইরফান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (কেজিডি) এর পেছনে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু হায়েনারা তাদের দুজনকে খুঁজে বের করে বেধড়ক মারে এবং ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত করে ইব্রাহিমকে। হাতে থাকা স্মার্টফোনটিও ছিনিয়ে নিয়ে যায় চাঁদাবাজ খ্যাত ছাত্রলীগ।
যখন ইব্রাহীমকে ফেলে রেখে চলে যায় হায়েনারা, তার কিছুক্ষণ পরে সে কোনোরকম উঠে আস্তে আস্তে করে লুকিয়ে অলিগলির ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে যায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেলে চলে চিকিৎসা
আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে গেলে সেখানকার ডাক্তার ইব্রাহীমের ক্ষতস্থান ড্রেসিং করেন এবং পিঠে ৯টি ও মাথায় ৮টি সেলাই দেন। এখনো তার চিকিৎসা চলমান রয়েছে। মাঝে মাঝে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।
আক্রমণে ব্যবহার করা হয়েছিল দেশীয় অস্ত্র; ক্ষত শুকায়নি আজও। আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ইব্রাহীমকে দেশীয় অস্ত্র (ছুরি) দিয়ে পোঁচ দেয় পিঠে। ক্ষত হয় ইব্রাহীমের শরীর। মাথায় জোরে আঘাত করার ফলে এখনো ইব্রাহীম যন্ত্রণা অনুভব করে। ঘুমের ঘরে লাফিয়ে ওঠে আতঙ্কে।

যে সর্দি আতঙ্ক থেকে হয় তা কখনো ভালো হবার নয়। সাক্ষাৎকারে মো: ইব্রাহীম বলেন ঐদিনের ঘটনার পর থেকে আমার যে সর্দি-কাশি হয়েছিল সে সর্দি-কাশি এখনো ভালো হচ্ছে না। চিকিৎসা নেওয়ার পরও তা ভালো হচ্ছে না। সর্দি-কাশির পাশাপাশি শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থতা বোধ করছি। হয়তো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক ঔষধ খাওয়ার কারণে শরীর বেশি দুর্বল হয়ে গেছে।

নাম : মোঃ ইব্রাহীম
জন্ম তারিখ : ৩০/১০/২০০৫
জন্মস্থান : চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মুছাপুর ইউনিয়ন: মুছাপুর থানা: সন্দ্বীপ জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : বাসা: জেসমিন ম্যানসন এলাকা: সোনাশাহ মাজার রোড, ঈদগাহ, থানা: হালিশহর জেলা: চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
মাসিক আয় : নাই
ঘটনাস্থল : মুরাদপুর রোড, চট্টগ্রাম
আঘাতকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময়কাল : ১৬ জুলাই ২০২৪

পারিবারিক তথ্যাদি
পিতার নাম : আইয়ুব আলী (৬০)
পেশা : চাকরিজীবী
মাতার নাম : কুলছুম বেগম(৫০)
পেশা : গৃহিণী
পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা: ৯
পারিবারিক অবস্থা : অসচ্ছল
পরিবারের মাসিক আয় : ১৬,৫০০/-
উপার্জনকারী : বাবা
সম্পদ : ২ শতক জমি আছে
বাড়ী : সেমি পাকা বাড়ি

পরিবারের অন্যান্য সদস্য
১. আমির আলী(২৬), ভাই-চাকরিজীবী
২. নাহিদা আক্তার(১৭), বোন-কলেজ শিক্ষার্থী
৩. মুনসুর আলী(১৩), ভাই-৭ম শ্রেণির ছাত্র
৪. নাদিয়া আক্তার(৯), বোন-৫ম শ্রেণির ছাত্র

পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা।
৩. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান।
৪. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু।
৫. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
৬. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍