আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
রক্তে লেখা অধ্যায়: চট্টগ্রামের বীরসন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ
একটি নিঃশব্দ গ্রামের কোলাহল
২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর, চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনিয়ন জিরির কৈয়গ্রাম যেন এক নিস্তব্ধ আকাশের নিচে নতুন সূর্যের অপেক্ষায় ছিল। সেখানেই জন্ম নেন এক সাহসী সন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ। তার পিতা মোহাম্মদ হোসাইন, একজন কৃষক। বছরের পর বছর কৃষিজমিতে নিজের ঘাম ফেলে, মাটির সাথে মিশে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি পরিবার। মাত্র ২০ হাজার টাকার আয় দিয়েই ছয় জনের পরিবারের দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন।নোমানের মা, জনাবা লায়লা বেগম, একজন মমতাময়ী গৃহিণী। তার কোমল হাতে নোমানের শৈশবের পথ চলা মসৃণ হয়েছিল। বড় বোন সায়মা বিবাহিত, বড় ভাই মিজান (অনার্সের শিক্ষার্থী) ও নোমান, আর ছোট বোন সুমাইয়া (১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী) এ যেন এক স্বপ্নে জড়ানো পরিবার। পরিবারটি শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চেয়েছে। আর সেই স্বপ্নে সবচেয়ে বড় আশার নাম ছিল আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ।
স্বপ্নের চেতনায় জ্বলে ওঠা
চট্টগ্রামের হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজে পড়াশোনা করতেন নোমান। গ্রামের সহজ-সরল জীবন থেকে উঠে আসা এই তরুণ সময়ের প্রতিটি মুহূর্তেই দেশ ও জাতির জন্য ভাবতেন। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বৈষম্য তাকে বিব্রত করত। গণতন্ত্রের প্রতি তার আনুগত্য ছিল দৃঢ় এবং শিক্ষা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজই ছিল তার স্বপ্ন। টানা তিন তিনটি নির্বাচন লোপাট করে জনগণের ভোটের অধিকার কেঁড়ে নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হতে চাইলেও ফ্যাসিবাদী কায়দায় তাদেরকে আবদ্ধ রাখা হয়। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে পুরো বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত কারাগারে রূপান্তরিত করে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে, উন্নয়নের মেকী গল্প শুনিয়ে, কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার সমস্ত আয়োজন করা হয়। এই যখন প্রেক্ষিত, সচেতন ছাত্র-জনতার বোধোদয়ে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন।
জুলাইয়ের আগুন
২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তিম অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই রূপ নেয় এক গণবিপ্লবে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। সরকার তাদের দাবিকে অবজ্ঞা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “তারা সব রাজাকারের বাচ্চা।” এই অবমাননায় ফুঁসে ওঠে গোটা বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামের বাতাসও আন্দোলনের উত্তাপে ঝলসে উঠেছিল। সেই আগুনে জ্বলন্ত তরুণদের মধ্যে ছিলেন নোমানও। এ সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় হামলা চলে আন্দোলনকারীদের ওপর। একদিকে ফ্যাসিবাদী সরকার, অন্যদিকে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী ক্যাডাররা অস্ত্র হাতে নামে রাজপথে। চট্টগ্রামের সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী আক্রমণে নিজের জীবন হারাতে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের বীর সন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদসহ তার সহপাঠীরা।
৪ আগস্টের রক্তাক্ত বিকেল
সেই ভয়াল দিন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। ভোর হতেই চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট এলাকায় জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা। আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদও ছিলেন তাদের মধ্যে। রাজপথে তার গর্জন ছিল স্লোগানে স্লোগানে। “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না”, “এক দফা এক দাবি শেখ হাসিনা কবে যাবি?” শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের এই নিষ্পেষণ থেকে জাতিকে মুক্ত করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেয় সে ও তার সহপাঠীরা। নেমে আসে চট্টগ্রামের রাজপথে। চোখের সামনে মৃত্যু, পঙ্গুত্ব প্রিয়জনকে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলার সমস্ত আয়োজন দেখেও তারা ভড়কে যায়নি। বীরদর্পে লড়াই শুরু করে সরকারদলীয় কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের সাথে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয় আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় তখন শিক্ষার্থী ও জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে। জ্বালাময়ী সেসব স্লোগান যেন আগুনের ফুলকির মতো তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে। ১৫ বছরের জমানো ক্ষোভ, অবিচার, দুর্নীতি আর অন্যায়ের জমানো পাহাড় যেন স্লোগানে স্লোগানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে।
সকাল পেরিয়ে বিকেল হতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ছাত্রলীগের নেতারা, পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডাররা একত্রিত হয়ে আন্দোলনকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, কাঁদানে গ্যাস সব কিছু দিয়ে দমন করার চেষ্টা চলে। নোমান তার সহযোদ্ধারা পাশের একটি গলিতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই গলিতেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ।
এক পর্যায়ে, হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে নোমানের হাতে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। রক্তে ভিজে যায় তার জামা-কাপড়, রাস্তা। সহযোদ্ধারা ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে নেয়, শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর দৌড়।
হাসপাতালে বেঁচে ফেরা
চট্টগ্রাম সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয় নোমানকে। হাসপাতালে তখনও ছাত্রলীগ-পুলিশের দাপট। চুপিচুপি চিকিৎসা নিতে হয়। ধাপে ধাপে চিকিৎসা হয়, গুলিটি বের করা হয়, কিন্তু আঙুলের ফ্র্যাকচার ঠিক হয়নি। পরবর্তীতে ঢাকা সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখনো তার হাতে ব্যথা হয়, আঙুল বাঁকাতে পারেন না।
সহায়তা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবনা
নোমান এখনো একজন শিক্ষার্থী। চিকিৎসার খরচ চালানো তার পরিবারের পক্ষে কঠিন। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। একইসাথে, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে সে যেমন নিজের চিকিৎসা চালাতে পারবে, তেমনি তার পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারবে।
একটি রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা
আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ কোনো নামমাত্র ছাত্র নয়। সে এই দেশের আগামী দিনের স্বপ্ন। তার রক্তে যে অগ্নি লেখা আছে, তা এই দেশের প্রত্যেক বিবেকবান নাগরিকের কাছে একটি প্রশ্ন, এই কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্য লক্ষ প্রাণ উৎসর্গ করা হয়েছিল?
তার যন্ত্রণা, তার সাহস, তার রক্তাক্ত হাত আমাদের কাছে একটি প্রত্যয় ফরহাদ একা লড়েনি, সে আমাদের সকলের জন্য লড়েছে এবং এই লড়াই চলতেই থাকবে, যতদিন না গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা এ দেশের প্রতিটি মানুষকে আলিঙ্গন করে নেয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
জীবনবাজি রেখে লড়াই করা আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ সবেমাত্র কলেজের শিক্ষার্থী। তার পারিবারিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তার পক্ষে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন। উন্নত চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আক্রমণকারী
স্থানীয় ছাত্রলীগের ক্যাডার, তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগের মধ্যে জাকারিয়া দস্তগীর,
আ.জ.ম নাসির, নুরুল আজম রনি ও তাদের সমর্থকেরা
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ
জন্ম : ১০-১০-২০০৫
জন্মস্থান : কৈয়গ্রাম, জিরি ইউনিয়ন, পটিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠানের নাম : হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : কৈয়গ্রাম, জিরি ইউনিয়ন, পটিয়া, চট্টগ্রাম
পিতা : মোহাম্মদ হোসাইন
পেশা ও বয়স : কৃষিকাজ, ৬৪
মাতা : লায়লা বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
বাড়ি : দাদার নামে একটা ভিটাবাড়ি আছে
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মিজান, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ২১, পেশা: শিক্ষার্থী
২. সায়মা, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ২৭
৩. সুমাইয়া, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৬, পেশা: শিক্ষার্থী
পরিবারের সবাই একমাত্র বাবার কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। তাই একজন শিক্ষার্থী হিসাবে শিক্ষাবৃত্তি পেলে কিংবা সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা হলে তার পারিবারিক ব্যয় চালিয়ে নেয়া সহজ হয়।
একটি নিঃশব্দ গ্রামের কোলাহল
২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর, চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনিয়ন জিরির কৈয়গ্রাম যেন এক নিস্তব্ধ আকাশের নিচে নতুন সূর্যের অপেক্ষায় ছিল। সেখানেই জন্ম নেন এক সাহসী সন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ। তার পিতা মোহাম্মদ হোসাইন, একজন কৃষক। বছরের পর বছর কৃষিজমিতে নিজের ঘাম ফেলে, মাটির সাথে মিশে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি পরিবার। মাত্র ২০ হাজার টাকার আয় দিয়েই ছয় জনের পরিবারের দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন।নোমানের মা, জনাবা লায়লা বেগম, একজন মমতাময়ী গৃহিণী। তার কোমল হাতে নোমানের শৈশবের পথ চলা মসৃণ হয়েছিল। বড় বোন সায়মা বিবাহিত, বড় ভাই মিজান (অনার্সের শিক্ষার্থী) ও নোমান, আর ছোট বোন সুমাইয়া (১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী) এ যেন এক স্বপ্নে জড়ানো পরিবার। পরিবারটি শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চেয়েছে। আর সেই স্বপ্নে সবচেয়ে বড় আশার নাম ছিল আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ।
স্বপ্নের চেতনায় জ্বলে ওঠা
চট্টগ্রামের হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজে পড়াশোনা করতেন নোমান। গ্রামের সহজ-সরল জীবন থেকে উঠে আসা এই তরুণ সময়ের প্রতিটি মুহূর্তেই দেশ ও জাতির জন্য ভাবতেন। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বৈষম্য তাকে বিব্রত করত। গণতন্ত্রের প্রতি তার আনুগত্য ছিল দৃঢ় এবং শিক্ষা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজই ছিল তার স্বপ্ন। টানা তিন তিনটি নির্বাচন লোপাট করে জনগণের ভোটের অধিকার কেঁড়ে নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হতে চাইলেও ফ্যাসিবাদী কায়দায় তাদেরকে আবদ্ধ রাখা হয়। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে পুরো বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত কারাগারে রূপান্তরিত করে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে, উন্নয়নের মেকী গল্প শুনিয়ে, কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার সমস্ত আয়োজন করা হয়। এই যখন প্রেক্ষিত, সচেতন ছাত্র-জনতার বোধোদয়ে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন।
জুলাইয়ের আগুন
২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তিম অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই রূপ নেয় এক গণবিপ্লবে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। সরকার তাদের দাবিকে অবজ্ঞা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “তারা সব রাজাকারের বাচ্চা।” এই অবমাননায় ফুঁসে ওঠে গোটা বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামের বাতাসও আন্দোলনের উত্তাপে ঝলসে উঠেছিল। সেই আগুনে জ্বলন্ত তরুণদের মধ্যে ছিলেন নোমানও। এ সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় হামলা চলে আন্দোলনকারীদের ওপর। একদিকে ফ্যাসিবাদী সরকার, অন্যদিকে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী ক্যাডাররা অস্ত্র হাতে নামে রাজপথে। চট্টগ্রামের সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী আক্রমণে নিজের জীবন হারাতে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের বীর সন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদসহ তার সহপাঠীরা।
৪ আগস্টের রক্তাক্ত বিকেল
সেই ভয়াল দিন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। ভোর হতেই চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট এলাকায় জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা। আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদও ছিলেন তাদের মধ্যে। রাজপথে তার গর্জন ছিল স্লোগানে স্লোগানে। “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না”, “এক দফা এক দাবি শেখ হাসিনা কবে যাবি?” শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের এই নিষ্পেষণ থেকে জাতিকে মুক্ত করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেয় সে ও তার সহপাঠীরা। নেমে আসে চট্টগ্রামের রাজপথে। চোখের সামনে মৃত্যু, পঙ্গুত্ব প্রিয়জনকে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলার সমস্ত আয়োজন দেখেও তারা ভড়কে যায়নি। বীরদর্পে লড়াই শুরু করে সরকারদলীয় কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের সাথে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয় আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় তখন শিক্ষার্থী ও জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে। জ্বালাময়ী সেসব স্লোগান যেন আগুনের ফুলকির মতো তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে। ১৫ বছরের জমানো ক্ষোভ, অবিচার, দুর্নীতি আর অন্যায়ের জমানো পাহাড় যেন স্লোগানে স্লোগানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে।
সকাল পেরিয়ে বিকেল হতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ছাত্রলীগের নেতারা, পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডাররা একত্রিত হয়ে আন্দোলনকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, কাঁদানে গ্যাস সব কিছু দিয়ে দমন করার চেষ্টা চলে। নোমান তার সহযোদ্ধারা পাশের একটি গলিতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই গলিতেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ।
এক পর্যায়ে, হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে নোমানের হাতে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। রক্তে ভিজে যায় তার জামা-কাপড়, রাস্তা। সহযোদ্ধারা ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে নেয়, শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর দৌড়।
হাসপাতালে বেঁচে ফেরা
চট্টগ্রাম সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয় নোমানকে। হাসপাতালে তখনও ছাত্রলীগ-পুলিশের দাপট। চুপিচুপি চিকিৎসা নিতে হয়। ধাপে ধাপে চিকিৎসা হয়, গুলিটি বের করা হয়, কিন্তু আঙুলের ফ্র্যাকচার ঠিক হয়নি। পরবর্তীতে ঢাকা সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখনো তার হাতে ব্যথা হয়, আঙুল বাঁকাতে পারেন না।
সহায়তা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবনা
নোমান এখনো একজন শিক্ষার্থী। চিকিৎসার খরচ চালানো তার পরিবারের পক্ষে কঠিন। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। একইসাথে, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে সে যেমন নিজের চিকিৎসা চালাতে পারবে, তেমনি তার পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারবে।
একটি রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা
আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ কোনো নামমাত্র ছাত্র নয়। সে এই দেশের আগামী দিনের স্বপ্ন। তার রক্তে যে অগ্নি লেখা আছে, তা এই দেশের প্রত্যেক বিবেকবান নাগরিকের কাছে একটি প্রশ্ন, এই কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্য লক্ষ প্রাণ উৎসর্গ করা হয়েছিল?
তার যন্ত্রণা, তার সাহস, তার রক্তাক্ত হাত আমাদের কাছে একটি প্রত্যয় ফরহাদ একা লড়েনি, সে আমাদের সকলের জন্য লড়েছে এবং এই লড়াই চলতেই থাকবে, যতদিন না গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা এ দেশের প্রতিটি মানুষকে আলিঙ্গন করে নেয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
জীবনবাজি রেখে লড়াই করা আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ সবেমাত্র কলেজের শিক্ষার্থী। তার পারিবারিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তার পক্ষে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন। উন্নত চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আক্রমণকারী
স্থানীয় ছাত্রলীগের ক্যাডার, তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগের মধ্যে জাকারিয়া দস্তগীর,
আ.জ.ম নাসির, নুরুল আজম রনি ও তাদের সমর্থকেরা
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল্লাহ আল নোমান ফরহাদ
জন্ম : ১০-১০-২০০৫
জন্মস্থান : কৈয়গ্রাম, জিরি ইউনিয়ন, পটিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠানের নাম : হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : কৈয়গ্রাম, জিরি ইউনিয়ন, পটিয়া, চট্টগ্রাম
পিতা : মোহাম্মদ হোসাইন
পেশা ও বয়স : কৃষিকাজ, ৬৪
মাতা : লায়লা বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
বাড়ি : দাদার নামে একটা ভিটাবাড়ি আছে
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মিজান, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ২১, পেশা: শিক্ষার্থী
২. সায়মা, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ২৭
৩. সুমাইয়া, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৬, পেশা: শিক্ষার্থী
পরিবারের সবাই একমাত্র বাবার কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। তাই একজন শিক্ষার্থী হিসাবে শিক্ষাবৃত্তি পেলে কিংবা সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা হলে তার পারিবারিক ব্যয় চালিয়ে নেয়া সহজ হয়।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍