মোহাম্মদ আবদুর রহিম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ব্যবসা (মুদি দোকান)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আব্দুর রহিম, একজন সাধারণ চায়ের দোকানদার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নের সন্তান তিনি। জন্ম নিয়েছিলেন ২০০০ সালের ২৫ ডিসেম্বর, এক দরিদ্র ঘরের ভাঙাচোরা উঠোনে। তার বাবা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান পেশায় একজন কৃষক, এক সময় গায়ে-গতরে খেটে যিনি সংসার চালিয়েছেন। এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ, ৬০ ছুঁই ছুঁই করে হেঁটে বেড়ান। মা লাইলা বেগম, বয়স ৫৫, এখনও সংসারের কাজ সামলে রাখেন আপন সাধ্যে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। আব্দুর রহিম নিজে বিবাহিত, একমাত্র কন্যা ফারিয়া বয়সে এখনও কোমলমতি, মাত্র চার মাস বয়স তার।
আন্দোলনের দিনগুলো
চায়ের দোকান মানে যেন আজকের দিনের অঘোষিত সংবাদকক্ষ; আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, দেশ-দুনিয়ার হালচাল সব ঘুরে ফিরে আসে এই টং দোকানে। আব্দুর রহিমের দোকানটিও ব্যতিক্রম নয়। সংসারের দায়দায়িত্ব, কন্যার মুখের হাসি আর বৃদ্ধ বাবা-মার ঋণ মাথায় নিয়ে প্রতিদিন সকালবেলা কেটলির শোঁ শোঁ আওয়াজে তার দিন শুরু হয়।
তবে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দিনটা ছিল ভিন্ন। সে দিনটা কেবল একটি মিছিলের দিন ছিল না, ছিল প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, আর রক্তের ইতিহাস লেখার দিন। দেশজুড়ে তখন অস্থিরতা। জনগণ মুখে মুখে বলছে; “আর নয়, এবার বিদায় হোক ফ্যাসিস্ট হাসিনার।” বছরের পর বছর ধরে দেখা যায়, একের পর এক প্রহসনের নির্বাচন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে ছিল, কিন্তু প্রতিবারই তারা প্রতারিত হয়েছে। ২০২৪ সালের কথিত নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঘরে বসে সবকিছু সহ্য করে নেয়া মানুষ এবার আর চুপ থাকেনি। পুকুরের শান্ত জলে নুড়ি পড়ার মতো এক তরঙ্গ তৈরি হয়; সরকারি চাকরিতে সমতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে।
পরিকল্পনা করি মিছিল বের করবো
এই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। চট্টগ্রামের চাম্বলে সেই আগুনের ছায়ায় আব্দুর রহিমও জ্বলে ওঠেন। তিনি বুঝে যান, চায়ের কাপে আলোচনার সময় শেষ। এবার রাস্তায় নামতে হবে। তার দোকানে যাঁরা চা খেতে আসে, তাঁদের অনেকেই ছাত্র, বেকার যুবক, ক্ষুব্ধ কৃষক; তাদের চোখে-মুখে যেন আগুন। আব্দুর রহিম তাদের জড়ো করেন। বলেন, “আর না! আর মুখ বুজে থাকা যাবে না।”
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ৪ আগস্ট একটি মিছিল করবেন শেখেরখীল থেকে চাম্বল বাজার পর্যন্ত। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না, আহতদের যন্ত্রণায় দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ যেন ব্যথিত হয়। সেই রক্তের প্রতিদান, সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবেই এই মিছিল। সেদিন আব্দুর রহিমকে কেউ একজন চায়ের দোকানদার বলে চিহ্নিত করেনি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন পথপ্রদর্শক, প্রতিবাদের আগুনে দগ্ধ এক সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। শেখেরখীল রাস্তার মাথা থেকে মিছিল যাত্রা শুরু করে। চারপাশে প্রতিজ্ঞার মতো ধ্বনি; “হাসিনা তুই পদত্যাগ কর!” “শহীদের রক্তের জবাব চাই!” বাঁশের লাঠিতে পতপত করে উড়ে জাতীয় পতাকা।
মাথায় বুলেট এসে বিদ্ধ হয়
কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই মিছিল যে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে তা বুঝে উঠতে সময় লাগেনি। চাম্বল বাজারে পৌঁছাতেই পূর্ব থেকে ওঁতপেতে থাকা আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ; তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাত্র ২০০ গজ দূর থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। হাতে তাদের দেশীয় অস্ত্র, রামদা, চাপাতি, আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠি আর তাদের পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। তারাও গুলি ছুড়ছে শিক্ষার্থী ও জনতাকে লক্ষ্য করে।
তখন বিকাল ৪টা। প্রথমে গুলির শব্দ, এরপর মানুষের চিৎকার। শরীর থেকে রক্তের ফিনকি ছুটে আসে। লাঠিসোটা, ইটপাটকেল হাতে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে তারা দুর্বল। সেই সময় চারদিকে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ শুনে আব্দুর রহিম অনুভব করেন তার মাথায় কিছু একটা আঘাত করেছে। এরই মধ্যে আরেকটি গুলি লাগে তার পায়ে। ব্যথায় তিনি যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন। চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে। মিছিলের ভিতরে থেকে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, “রহিম ভাইরে গুলি করছে!” সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরে মিছিলের পেছনে নিয়ে আসে। তার শার্ট ও রাস্তার পিচ ঢেকে যায় রক্তধারায়।
হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ ছিল না
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, এখন যাবে কোথায়? শহরের হাসপাতালে নেয়া যাবে না, কারণ পথঘাট দখল করে রেখেছে ছাত্রলীগের গুন্ডারা। তারা রক্ত চায়, নাম চায়, মোবাইল ঘেটে পরিচয় চায়। কেউ যদি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাকে গুলি করা, না হয় পিটিয়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে রাস্তার পাশে।
তাই আব্দুর রহিমকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের একজন স্থানীয় ডাক্তারের কাছে। সেখানেই তার মাথা ও পায়ের ক্ষত সেলাই করা হয়। সামান্য ব্যান্ডেজ আর ব্যথানাশক ওষুধেই সেদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে বাঁশখালী উপজেলা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন আব্দুর রহিম। সেখানে ডাক্তার ক্ষতস্থান পরিচ্ছন্ন করে স্থানগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অপারেশন করে কয়েকটি গুলি বেরও করেন। কিন্তু একটি গুলি এখনো রয়ে গেছে ভেতরেই। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডাক্তার তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে যেতে বলেন। বাসায় এসে কিছুদিন থাকার পর শারীরিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তিনি পুনরায় এসে বাঁশখালী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতালের পর বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরেও একটা বুলেট এখনো বের করতে পারেননি শরীর থেকে।
কর্মহীন হয়ে আব্দুর রহিম এখনো বেঁচে আছেন। মাথার ক্ষত থেকে মাঝে মাঝে যন্ত্রণার ঢেউ ওঠে, পায়ে এখনও ঠিকভাবে ভর দিতে পারেন না। কিন্তু তার চোখে আগুন এখনো নিভে যায়নি। তার বুকের ভেতরে এখনও বাজে সেই স্লোগান, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।”
এই দেশের মাটি সাক্ষী, সাধারণ চায়ের দোকানদার আব্দুর রহিমের শরীরে যে গুলিবিদ্ধ হয়েছে তা কেবল রক্ত ঝরায়নি, তা ইতিহাসের বুকে এক অমোচনীয় প্রতিবাদের ছাপ রেখে গেছে।
মাথা ও পায়ে
গুলিবিদ্ধ
আব্দুর রহিম: এক চায়ের দোকানদারের দ্রোহগাঁথা
পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, আর কিছু মানুষ নিজেই ইতিহাস রচনা করে। মোহাম্মদ আবদু রহিম হয়তো ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টাতে আসেননি, কিন্তু তিনি তার শরীর দিয়ে সেই ইতিহাসকে রক্তাক্ত করেছেন।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদিগুলিবিদ্ধ
নাম : মোহাম্মদ আবদু রহিম
জন্ম : ২৫-১২-২০০০
জন্মস্থান : পশ্চিম চাম্বল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
পেশা : ব্যবসা (মুদি দোকান)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : পশ্চিম চাম্বল, ১০ নং চাম্বল ইউনিয়ন, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পিতা : মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান
পেশা ও বয়স : বেকার (বৃদ্ধ), ৬০
মাতা : লাইলা বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
বাড়ি : টিনের বাড়ি ও বাবার নামে ২ গণ্ডা পরিমাণ জমি আছে
পরিবারের সদস্য : ০৭ জন
ভাই-বোনের/সন্তানের তথ্যাদি
১. ছারোয়ার, পেশা: ব্যবসা, বয়স: ২৫, সম্পর্ক: বড় ভাই
২. ফারিয়া, সম্পর্ক: মেয়ে, বয়স: ৪ মাস
আক্রমণকারী : চাম্বল বাজারে ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় ছাত্রলীগ,
যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা, অনেকের হাতে ছিল অস্ত্র, চাপাতি, লাঠিসোঁটা
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪টা
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
অভাবের সংসারে কর্মহীন হয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাই নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা রইলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি-
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
আন্দোলনের দিনগুলো
চায়ের দোকান মানে যেন আজকের দিনের অঘোষিত সংবাদকক্ষ; আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, দেশ-দুনিয়ার হালচাল সব ঘুরে ফিরে আসে এই টং দোকানে। আব্দুর রহিমের দোকানটিও ব্যতিক্রম নয়। সংসারের দায়দায়িত্ব, কন্যার মুখের হাসি আর বৃদ্ধ বাবা-মার ঋণ মাথায় নিয়ে প্রতিদিন সকালবেলা কেটলির শোঁ শোঁ আওয়াজে তার দিন শুরু হয়।
তবে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দিনটা ছিল ভিন্ন। সে দিনটা কেবল একটি মিছিলের দিন ছিল না, ছিল প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, আর রক্তের ইতিহাস লেখার দিন। দেশজুড়ে তখন অস্থিরতা। জনগণ মুখে মুখে বলছে; “আর নয়, এবার বিদায় হোক ফ্যাসিস্ট হাসিনার।” বছরের পর বছর ধরে দেখা যায়, একের পর এক প্রহসনের নির্বাচন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে ছিল, কিন্তু প্রতিবারই তারা প্রতারিত হয়েছে। ২০২৪ সালের কথিত নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঘরে বসে সবকিছু সহ্য করে নেয়া মানুষ এবার আর চুপ থাকেনি। পুকুরের শান্ত জলে নুড়ি পড়ার মতো এক তরঙ্গ তৈরি হয়; সরকারি চাকরিতে সমতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে।
পরিকল্পনা করি মিছিল বের করবো
এই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। চট্টগ্রামের চাম্বলে সেই আগুনের ছায়ায় আব্দুর রহিমও জ্বলে ওঠেন। তিনি বুঝে যান, চায়ের কাপে আলোচনার সময় শেষ। এবার রাস্তায় নামতে হবে। তার দোকানে যাঁরা চা খেতে আসে, তাঁদের অনেকেই ছাত্র, বেকার যুবক, ক্ষুব্ধ কৃষক; তাদের চোখে-মুখে যেন আগুন। আব্দুর রহিম তাদের জড়ো করেন। বলেন, “আর না! আর মুখ বুজে থাকা যাবে না।”
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ৪ আগস্ট একটি মিছিল করবেন শেখেরখীল থেকে চাম্বল বাজার পর্যন্ত। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না, আহতদের যন্ত্রণায় দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ যেন ব্যথিত হয়। সেই রক্তের প্রতিদান, সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবেই এই মিছিল। সেদিন আব্দুর রহিমকে কেউ একজন চায়ের দোকানদার বলে চিহ্নিত করেনি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন পথপ্রদর্শক, প্রতিবাদের আগুনে দগ্ধ এক সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। শেখেরখীল রাস্তার মাথা থেকে মিছিল যাত্রা শুরু করে। চারপাশে প্রতিজ্ঞার মতো ধ্বনি; “হাসিনা তুই পদত্যাগ কর!” “শহীদের রক্তের জবাব চাই!” বাঁশের লাঠিতে পতপত করে উড়ে জাতীয় পতাকা।
মাথায় বুলেট এসে বিদ্ধ হয়
কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই মিছিল যে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে তা বুঝে উঠতে সময় লাগেনি। চাম্বল বাজারে পৌঁছাতেই পূর্ব থেকে ওঁতপেতে থাকা আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ; তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাত্র ২০০ গজ দূর থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। হাতে তাদের দেশীয় অস্ত্র, রামদা, চাপাতি, আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠি আর তাদের পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। তারাও গুলি ছুড়ছে শিক্ষার্থী ও জনতাকে লক্ষ্য করে।
তখন বিকাল ৪টা। প্রথমে গুলির শব্দ, এরপর মানুষের চিৎকার। শরীর থেকে রক্তের ফিনকি ছুটে আসে। লাঠিসোটা, ইটপাটকেল হাতে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে তারা দুর্বল। সেই সময় চারদিকে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ শুনে আব্দুর রহিম অনুভব করেন তার মাথায় কিছু একটা আঘাত করেছে। এরই মধ্যে আরেকটি গুলি লাগে তার পায়ে। ব্যথায় তিনি যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন। চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে। মিছিলের ভিতরে থেকে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, “রহিম ভাইরে গুলি করছে!” সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরে মিছিলের পেছনে নিয়ে আসে। তার শার্ট ও রাস্তার পিচ ঢেকে যায় রক্তধারায়।
হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ ছিল না
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, এখন যাবে কোথায়? শহরের হাসপাতালে নেয়া যাবে না, কারণ পথঘাট দখল করে রেখেছে ছাত্রলীগের গুন্ডারা। তারা রক্ত চায়, নাম চায়, মোবাইল ঘেটে পরিচয় চায়। কেউ যদি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাকে গুলি করা, না হয় পিটিয়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে রাস্তার পাশে।
তাই আব্দুর রহিমকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের একজন স্থানীয় ডাক্তারের কাছে। সেখানেই তার মাথা ও পায়ের ক্ষত সেলাই করা হয়। সামান্য ব্যান্ডেজ আর ব্যথানাশক ওষুধেই সেদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে বাঁশখালী উপজেলা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন আব্দুর রহিম। সেখানে ডাক্তার ক্ষতস্থান পরিচ্ছন্ন করে স্থানগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অপারেশন করে কয়েকটি গুলি বেরও করেন। কিন্তু একটি গুলি এখনো রয়ে গেছে ভেতরেই। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডাক্তার তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে যেতে বলেন। বাসায় এসে কিছুদিন থাকার পর শারীরিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তিনি পুনরায় এসে বাঁশখালী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতালের পর বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরেও একটা বুলেট এখনো বের করতে পারেননি শরীর থেকে।
কর্মহীন হয়ে আব্দুর রহিম এখনো বেঁচে আছেন। মাথার ক্ষত থেকে মাঝে মাঝে যন্ত্রণার ঢেউ ওঠে, পায়ে এখনও ঠিকভাবে ভর দিতে পারেন না। কিন্তু তার চোখে আগুন এখনো নিভে যায়নি। তার বুকের ভেতরে এখনও বাজে সেই স্লোগান, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।”
এই দেশের মাটি সাক্ষী, সাধারণ চায়ের দোকানদার আব্দুর রহিমের শরীরে যে গুলিবিদ্ধ হয়েছে তা কেবল রক্ত ঝরায়নি, তা ইতিহাসের বুকে এক অমোচনীয় প্রতিবাদের ছাপ রেখে গেছে।
মাথা ও পায়ে
গুলিবিদ্ধ
আব্দুর রহিম: এক চায়ের দোকানদারের দ্রোহগাঁথা
পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, আর কিছু মানুষ নিজেই ইতিহাস রচনা করে। মোহাম্মদ আবদু রহিম হয়তো ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টাতে আসেননি, কিন্তু তিনি তার শরীর দিয়ে সেই ইতিহাসকে রক্তাক্ত করেছেন।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদিগুলিবিদ্ধ
নাম : মোহাম্মদ আবদু রহিম
জন্ম : ২৫-১২-২০০০
জন্মস্থান : পশ্চিম চাম্বল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
পেশা : ব্যবসা (মুদি দোকান)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : পশ্চিম চাম্বল, ১০ নং চাম্বল ইউনিয়ন, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পিতা : মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান
পেশা ও বয়স : বেকার (বৃদ্ধ), ৬০
মাতা : লাইলা বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
বাড়ি : টিনের বাড়ি ও বাবার নামে ২ গণ্ডা পরিমাণ জমি আছে
পরিবারের সদস্য : ০৭ জন
ভাই-বোনের/সন্তানের তথ্যাদি
১. ছারোয়ার, পেশা: ব্যবসা, বয়স: ২৫, সম্পর্ক: বড় ভাই
২. ফারিয়া, সম্পর্ক: মেয়ে, বয়স: ৪ মাস
আক্রমণকারী : চাম্বল বাজারে ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় ছাত্রলীগ,
যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা, অনেকের হাতে ছিল অস্ত্র, চাপাতি, লাঠিসোঁটা
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪টা
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
অভাবের সংসারে কর্মহীন হয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাই নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা রইলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি-
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍