আব্দুল খালেক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
লক্ষ্মীপুরের নয়নপুরে ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে জন্ম নেওয়া আব্দুল খালেক পেশায় ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। যিনি ছিলেন পরিবারের নয়জনের ভরসা। দারিদ্র্যের ভিতর দিয়েই তিনি শিখেছিলেন সত্যের পাশে দাঁড়াতে, আর সেই বোধ থেকেই যুক্ত হন জুলাইয়ের আন্দোলনে। রায়েরবাগে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী পুলিশের গুলিতে আহত হলেও নতি স্বীকার করেননি বরং অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠেন। আজও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত শুধু নিজের জন্য নয়, তিন মাস বয়সী কন্যা রুমাইয়া নূরের ভবিষ্যতের আলোর জন্য। তাঁর জীবন তাই এক বুলেটের ক্ষত নয়, বরং প্রতিরোধের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠা এক সাধারণ মানুষের অনন্য ইতিহাস।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
গুলিতে ক্ষতবিক্ষত পা, তবুও মাথা নত নয়
আব্দুল খালেক
ক্রমিক: ০৪০
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪০
পরিচিতি ও পটভূমি
অন্ধকার যখন এত গভীর হয়ে ওঠে যে, আলো খুঁজে পেতে হয় বুকের ভিতর তখন জন্ম নেয় আব্দুল খালেকের মতো মানুষ। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারির প্রথম প্রভাতে লক্ষ্মীপুর জেলার নয়নপুর গ্রামে একটি শিশুর কান্না উঠেছিল আকাশে, নাম রাখা হয় আবদুল খালেক। সেই কাদা গায়ে ঘর থেকে উঠে আসা ছেলেটি জানত, জীবন তাকে কখনো কাঁঠালবাগান দেখাবে না; দেখাবে গলির পেট, ফুটপাতের পাথর, দারিদ্র্যের ধারালো ছুরি। যাত্রাবাড়ীতে ছোট একটি দোকানে দিন শুরু করতেন তিনি, ভোর হতেই উঠতেন, কারণ দোকান মানে শুধু রুটি নয় তার মানে ছিল বাবার ওষুধ, মায়ের হাসি, মেয়ের দুধ আর ঘরের ভেতরের আলোটুকু ধরে রাখার একমাত্র উপায়।
খালেক ছিলেন না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছিলেননা সেলিব্রিটি অথবা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ছিলেন একটি সৎ মুখ, যিনি গুলিস্তানের হকারদের ভিড়ে হারিয়ে যান না, বরং মাথা উঁচু করে বলেন, "এই দেশ আমাদের, আমরাই রাস্তায় থাকি, আমরাই শহর চালাই, আমরাই মরছি, তবু আমাদের কথা কেউ শোনে না।" যখন রাষ্ট্র কোটা আন্দোলনের নামে দেশের ছেলেমেয়েদের রক্তে ভাসিয়ে দিল, যখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরাও হয়ে গেল অপরাধী তখন খালেক বুঝলেন, এবার চুপ করে থাকলে তার মেয়ে রুমাইয়া নূরের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই ডুবে যাবে। রুমাইয়ার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। মুখে শুধু দুধ আর ঘুমের আরেশ কিন্তু তার বাবার কাঁধে চাপা পড়ে ছিল একটি জাতির ব্যর্থতার দায়। যিনি জানতেন, তার কন্যার ভবিষ্যত অন্যায়ের ছায়ায় গড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। তাই তিনি নাম লেখালেন জুলাই বিপ্লবে, যেখানে মৃত্যু ছিল গন্তব্য, তবু প্রতিরোধ। ছিল দায়িত্ব।
খালেক সেই দায় থেকে পালিয়ে যাননি। তিনি জানতেন তাঁর সামনে দু'টি রাস্তা: এক, চুপ থেকে নিজের ব্যবসা করে যাওয়া, আর দুই, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তিনি বেছে নিয়েছিলেন দ্বিতীয়টি। ১৯ জুলাইয়ের দুপুরে, তিনি একাই বেরিয়ে যান দোকান বন্ধ করে। তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী, যে চোখ দিয়ে দেখছিল কীভাবে রাজপথে ছেলেরা পড়ছে, মেয়ে-ছেলেরা চিৎকার করছে, আর চারদিক থমথমে রাষ্ট্রীয় গুলির ঘ্রাণে ভরে উঠছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্ত
আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মতোই হঠাৎ নেমে এসেছিল গুলির শব্দ। শহরের বুকজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বিদ্রোহের আহ্বান, আর রায়েরবাগের রক্তাক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল খালেক একজন দোকানদার, একজন পিতা, একজন নাগরিক। তাঁর হাতে ছিল না ব্যানার, চোখে ছিল না চশমার ফ্রেমে তাত্ত্বিক বুদ্ধি তাঁর ছিল কেবল এক অন্তঃস্থ আগুন, যা জন্ম নিয়েছিল বৈষম্যের যন্ত্রণায়। সেই আগুন নিয়েই তিনি পেছনের ট্রাক থেকে নামেন ২০ জুলাইয়ের সে বিকেলে। থানা দখলের অভিযানে তিনি শুধু সামনেই এগিয়েছিলেন না তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের এক নিরব মুখ, যার ভাষা ছিল 'সত্য', যার সঙ্গী ছিল 'সাহস'।
চারদিকে তখন শুধু হাঁকডাক, গর্জন, আর পুলিশের গুলির ধ্বনি। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর। খালেক জানতেন, এই মুহূর্তে পিছু হটা মানে শুধু পরাজয় নয়, রুমাইয়ার ভবিষ্যতের মুখ থেকে হাসি মুছে যাওয়া। তাই তিনি সামনে যান শ্লোগান দিতে দিতে, বুক উঁচু করে, যেন চোখে ভেসে উঠছে একটি মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু বিকেল ৪ টায়, হঠাৎ সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় একমাত্র একটি বুলেটে যেটি এসে গেঁথে যায় তাঁর পায়ে। তিনি থেমে যান, শরীর নুয়ে পড়ে, মাটির স্পর্শে লুটিয়ে পড়ে তাঁর আগুন-জ্বলা শরীর। ভাই হাবিব তখন ছুটে আসেন, চিৎকার করে ডেকে ওঠেন, "খালেক ভাই! আপনি কথা বলেন। আপনার চোখ বন্ধ কইরেন না।" আরও কয়েকজন ছুটে আসেন, তাঁকে টেনে তোলা হয় রক্তভেজা রাস্তায় থেকে। প্রথমে নেয়া হয় শনিরআখড়ার রয়েল হাসপাতালে, সেখানে বলা হয় এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়, ঢাকা মেডিকেলে যান। সময় যাচ্ছে, রক্ত ঝরছে, আর রাষ্ট্র? রাষ্ট্র তখন ব্যস্ত ছিল আন্দোলনের নামে "ষড়যন্ত্র" খুঁজতে, আহতের ব্যথা নয় রাষ্ট্রের ভাষায় ওরা ছিল "দাঙ্গাবাজ"।
ঢাকা মেডিকেলে খালেকের পায়ে সেলাই হয়, তবে গুলির ক্ষত ঠিকমতো সাফ হয় না। প্রয়োজন ছিল অস্ত্রোপচারের, বিশ্রামের, ফিজিওথেরাপির কিন্তু এসব করতে তো টাকা চায়, যে টাকায় চলত রুমাইয়ার দুধ, ঘরের ভাড়া, মায়ের ওষুধ। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়, পা আর আগের মতো চলে না। আজও যখন খালেক হাঁটেন, তাঁর পায়ের পাতায় বুলেটের চাপ ভীষনভাবে পর্যুদস্ত করে ফেলে।
কিন্তু মজার ব্যাপার, তিনি থেমে যাননি। দোকান হয়তো খুলতে পারছেন না ঠিকমতো, পা হয়তো আগের মতো চলে কিন্তু মুখ বন্ধ হয়নি। প্রতিবাদ থামেনি। কারণ খালেক বিশ্বাস করেন শুয়ে থাকা মানে মৃত্যুকে মেনে নেয়া, কিন্তু ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানে ইতিহাসের সামনে চিহ্ন এঁকে যাওয়া।
এই রাষ্ট্র খালেককে শহীদ করেনি। কিন্তু জনতার হৃদয়ে, রুমাইয়ার নিঃশ্বাসে, মায়ের দৃষ্টিতে তিনি হয়ে উঠেছেন চলমান বিপ্লবের এক জীবন্ত চিহ্ন। তিনি জানেন, একদিন এই গুলির ক্ষত নয়, এ প্রতিবাদের শক্তি হবে ভবিষ্যতের প্রেরণা। কারণ যারা দাঁড়ায় গুলির মুখে, তারাই গড়তে পারে নতুন ভোরের প্রতিচ্ছবি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পুনর্বাসনের আবেদন
আজ খালেক দাঁড়ান না আগের মতো, কিন্তু পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে গুলির ইতিহাস, আর শরীর জুড়ে লেগে আছে রাষ্ট্রীয় অবহেলার আঁচড়। ভারী কিছু তুলতে গেলেই কেঁপে ওঠে তাঁর বুক, শুধু ব্যথায়, এবং অপমানের ভারে। তিনি আর কাজ করতে পারেন না, অথচ তাঁর কাঁধে ভরসা করে তাকিয়ে আছে নয়জন মানুষ বাবা-মা, ভাই-ভাবী, স্ত্রী, কোলের তিন মাসের মেয়ে রুমাইয়া নূর। খালেক জানেন, তিনি কোনো চোর বা অপরাধী ছিলেন না তবু রাস্তায় দাঁড়ানোর অপরাধে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে শাসকের বুলেট।
কিন্তু তিনি হেরে যাননি। এখন তিনি কাতারের ভিসার জন্য চেষ্টা করছেন হাতের। কারিগরি দিয়ে আবার গড়তে চান একটি ভাঙা জীবন। তিনি চান না সহানুভূতি, চান কেবল একটি সুযোগ যেন তাঁর মেয়েটি একদিন স্কুলে যেতে পারে মাথা উঁচু করে, যেন স্ত্রী জানে, তার স্বামী শুধু গুলি খায়নি সে ভবিষ্যতের জন্যও লড়েও। গেছে। প্রতিদিন খরচ বাড়ে, আয় থাকে শূন্যে, কিন্তু খালেকের স্বপ্ন আজও নিভে যায়নি। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন যে, মানুষ দেশের জন্যও রক্ত দেয়, সেই দেশ একদিন তার হাত ধরে বলবেই, "তুমি একা নও।" আর সেটাই হবে জুলাই বিপ্লবের পরিণত সত্য।
প্রস্তাবনা
আঃ খালেকের জন্য স্থায়ী চিকিৎসা ফান্ড, যাতে তিনি নিয়মিত থেরাপি ও চিকিৎসা নিতে পারেন। তাঁর জন্য প্রয়োজন বিদেশ গমনের আর্থিক সহায়তা, কাতার যাত্রার খরচ বহনের জন্য। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের জন্য স্বল্পমূল্যে বাসস্থান ও শিশুশিক্ষা সহায়তা। আঃ খালেকের নামে "আহত বীর" স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কার্ড। এই রাষ্ট্র আজ যদি তাঁকে উপেক্ষা করে, কাল তাঁর মেয়ে রুমাইয়া নূর ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে: "বাবা গুলি খেয়েছিল আপনারা কি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন?"
একনজরে আব্দুল খালেক
নাম: আব্দুল খালেক
জন্ম তারিখ: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
পিতার নাম: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
মাতার নাম: কহিনুর বেগম
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নয়নপুর, হাজী বাড়ি, ডাকঘর: নুনিয়াপাড়া-৩৭১০, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
বর্তমান ঠিকানা
পেশা: নয়নপুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
: পূর্বে ব্যবসায়ী (বর্তমানে বেকার)
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম ও পেশা: মোস্তাফিজুর রহমান।
মায়ের নাম ও পেশা: কহিনুর বেগম
ভাই: ১. বড় ভাই হাবিবুর রহমান ঢাকার গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার মার্কেটে দোকানদার। ২. ছোট ভাই আ. মালেক একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন
সন্তান: রুমাইয়া নুর (তিন মাস)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা
৯ জন
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়:২০ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৪টা
আহত হওয়ার স্থান: রায়েরবাগ
আক্রমণকারী: পুলিশ
আব্দুল খালেক
ক্রমিক: ০৪০
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪০
পরিচিতি ও পটভূমি
অন্ধকার যখন এত গভীর হয়ে ওঠে যে, আলো খুঁজে পেতে হয় বুকের ভিতর তখন জন্ম নেয় আব্দুল খালেকের মতো মানুষ। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারির প্রথম প্রভাতে লক্ষ্মীপুর জেলার নয়নপুর গ্রামে একটি শিশুর কান্না উঠেছিল আকাশে, নাম রাখা হয় আবদুল খালেক। সেই কাদা গায়ে ঘর থেকে উঠে আসা ছেলেটি জানত, জীবন তাকে কখনো কাঁঠালবাগান দেখাবে না; দেখাবে গলির পেট, ফুটপাতের পাথর, দারিদ্র্যের ধারালো ছুরি। যাত্রাবাড়ীতে ছোট একটি দোকানে দিন শুরু করতেন তিনি, ভোর হতেই উঠতেন, কারণ দোকান মানে শুধু রুটি নয় তার মানে ছিল বাবার ওষুধ, মায়ের হাসি, মেয়ের দুধ আর ঘরের ভেতরের আলোটুকু ধরে রাখার একমাত্র উপায়।
খালেক ছিলেন না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছিলেননা সেলিব্রিটি অথবা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ছিলেন একটি সৎ মুখ, যিনি গুলিস্তানের হকারদের ভিড়ে হারিয়ে যান না, বরং মাথা উঁচু করে বলেন, "এই দেশ আমাদের, আমরাই রাস্তায় থাকি, আমরাই শহর চালাই, আমরাই মরছি, তবু আমাদের কথা কেউ শোনে না।" যখন রাষ্ট্র কোটা আন্দোলনের নামে দেশের ছেলেমেয়েদের রক্তে ভাসিয়ে দিল, যখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরাও হয়ে গেল অপরাধী তখন খালেক বুঝলেন, এবার চুপ করে থাকলে তার মেয়ে রুমাইয়া নূরের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই ডুবে যাবে। রুমাইয়ার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। মুখে শুধু দুধ আর ঘুমের আরেশ কিন্তু তার বাবার কাঁধে চাপা পড়ে ছিল একটি জাতির ব্যর্থতার দায়। যিনি জানতেন, তার কন্যার ভবিষ্যত অন্যায়ের ছায়ায় গড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। তাই তিনি নাম লেখালেন জুলাই বিপ্লবে, যেখানে মৃত্যু ছিল গন্তব্য, তবু প্রতিরোধ। ছিল দায়িত্ব।
খালেক সেই দায় থেকে পালিয়ে যাননি। তিনি জানতেন তাঁর সামনে দু'টি রাস্তা: এক, চুপ থেকে নিজের ব্যবসা করে যাওয়া, আর দুই, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তিনি বেছে নিয়েছিলেন দ্বিতীয়টি। ১৯ জুলাইয়ের দুপুরে, তিনি একাই বেরিয়ে যান দোকান বন্ধ করে। তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী, যে চোখ দিয়ে দেখছিল কীভাবে রাজপথে ছেলেরা পড়ছে, মেয়ে-ছেলেরা চিৎকার করছে, আর চারদিক থমথমে রাষ্ট্রীয় গুলির ঘ্রাণে ভরে উঠছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্ত
আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মতোই হঠাৎ নেমে এসেছিল গুলির শব্দ। শহরের বুকজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বিদ্রোহের আহ্বান, আর রায়েরবাগের রক্তাক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল খালেক একজন দোকানদার, একজন পিতা, একজন নাগরিক। তাঁর হাতে ছিল না ব্যানার, চোখে ছিল না চশমার ফ্রেমে তাত্ত্বিক বুদ্ধি তাঁর ছিল কেবল এক অন্তঃস্থ আগুন, যা জন্ম নিয়েছিল বৈষম্যের যন্ত্রণায়। সেই আগুন নিয়েই তিনি পেছনের ট্রাক থেকে নামেন ২০ জুলাইয়ের সে বিকেলে। থানা দখলের অভিযানে তিনি শুধু সামনেই এগিয়েছিলেন না তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের এক নিরব মুখ, যার ভাষা ছিল 'সত্য', যার সঙ্গী ছিল 'সাহস'।
চারদিকে তখন শুধু হাঁকডাক, গর্জন, আর পুলিশের গুলির ধ্বনি। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর। খালেক জানতেন, এই মুহূর্তে পিছু হটা মানে শুধু পরাজয় নয়, রুমাইয়ার ভবিষ্যতের মুখ থেকে হাসি মুছে যাওয়া। তাই তিনি সামনে যান শ্লোগান দিতে দিতে, বুক উঁচু করে, যেন চোখে ভেসে উঠছে একটি মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু বিকেল ৪ টায়, হঠাৎ সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় একমাত্র একটি বুলেটে যেটি এসে গেঁথে যায় তাঁর পায়ে। তিনি থেমে যান, শরীর নুয়ে পড়ে, মাটির স্পর্শে লুটিয়ে পড়ে তাঁর আগুন-জ্বলা শরীর। ভাই হাবিব তখন ছুটে আসেন, চিৎকার করে ডেকে ওঠেন, "খালেক ভাই! আপনি কথা বলেন। আপনার চোখ বন্ধ কইরেন না।" আরও কয়েকজন ছুটে আসেন, তাঁকে টেনে তোলা হয় রক্তভেজা রাস্তায় থেকে। প্রথমে নেয়া হয় শনিরআখড়ার রয়েল হাসপাতালে, সেখানে বলা হয় এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়, ঢাকা মেডিকেলে যান। সময় যাচ্ছে, রক্ত ঝরছে, আর রাষ্ট্র? রাষ্ট্র তখন ব্যস্ত ছিল আন্দোলনের নামে "ষড়যন্ত্র" খুঁজতে, আহতের ব্যথা নয় রাষ্ট্রের ভাষায় ওরা ছিল "দাঙ্গাবাজ"।
ঢাকা মেডিকেলে খালেকের পায়ে সেলাই হয়, তবে গুলির ক্ষত ঠিকমতো সাফ হয় না। প্রয়োজন ছিল অস্ত্রোপচারের, বিশ্রামের, ফিজিওথেরাপির কিন্তু এসব করতে তো টাকা চায়, যে টাকায় চলত রুমাইয়ার দুধ, ঘরের ভাড়া, মায়ের ওষুধ। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়, পা আর আগের মতো চলে না। আজও যখন খালেক হাঁটেন, তাঁর পায়ের পাতায় বুলেটের চাপ ভীষনভাবে পর্যুদস্ত করে ফেলে।
কিন্তু মজার ব্যাপার, তিনি থেমে যাননি। দোকান হয়তো খুলতে পারছেন না ঠিকমতো, পা হয়তো আগের মতো চলে কিন্তু মুখ বন্ধ হয়নি। প্রতিবাদ থামেনি। কারণ খালেক বিশ্বাস করেন শুয়ে থাকা মানে মৃত্যুকে মেনে নেয়া, কিন্তু ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানে ইতিহাসের সামনে চিহ্ন এঁকে যাওয়া।
এই রাষ্ট্র খালেককে শহীদ করেনি। কিন্তু জনতার হৃদয়ে, রুমাইয়ার নিঃশ্বাসে, মায়ের দৃষ্টিতে তিনি হয়ে উঠেছেন চলমান বিপ্লবের এক জীবন্ত চিহ্ন। তিনি জানেন, একদিন এই গুলির ক্ষত নয়, এ প্রতিবাদের শক্তি হবে ভবিষ্যতের প্রেরণা। কারণ যারা দাঁড়ায় গুলির মুখে, তারাই গড়তে পারে নতুন ভোরের প্রতিচ্ছবি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পুনর্বাসনের আবেদন
আজ খালেক দাঁড়ান না আগের মতো, কিন্তু পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে গুলির ইতিহাস, আর শরীর জুড়ে লেগে আছে রাষ্ট্রীয় অবহেলার আঁচড়। ভারী কিছু তুলতে গেলেই কেঁপে ওঠে তাঁর বুক, শুধু ব্যথায়, এবং অপমানের ভারে। তিনি আর কাজ করতে পারেন না, অথচ তাঁর কাঁধে ভরসা করে তাকিয়ে আছে নয়জন মানুষ বাবা-মা, ভাই-ভাবী, স্ত্রী, কোলের তিন মাসের মেয়ে রুমাইয়া নূর। খালেক জানেন, তিনি কোনো চোর বা অপরাধী ছিলেন না তবু রাস্তায় দাঁড়ানোর অপরাধে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে শাসকের বুলেট।
কিন্তু তিনি হেরে যাননি। এখন তিনি কাতারের ভিসার জন্য চেষ্টা করছেন হাতের। কারিগরি দিয়ে আবার গড়তে চান একটি ভাঙা জীবন। তিনি চান না সহানুভূতি, চান কেবল একটি সুযোগ যেন তাঁর মেয়েটি একদিন স্কুলে যেতে পারে মাথা উঁচু করে, যেন স্ত্রী জানে, তার স্বামী শুধু গুলি খায়নি সে ভবিষ্যতের জন্যও লড়েও। গেছে। প্রতিদিন খরচ বাড়ে, আয় থাকে শূন্যে, কিন্তু খালেকের স্বপ্ন আজও নিভে যায়নি। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন যে, মানুষ দেশের জন্যও রক্ত দেয়, সেই দেশ একদিন তার হাত ধরে বলবেই, "তুমি একা নও।" আর সেটাই হবে জুলাই বিপ্লবের পরিণত সত্য।
প্রস্তাবনা
আঃ খালেকের জন্য স্থায়ী চিকিৎসা ফান্ড, যাতে তিনি নিয়মিত থেরাপি ও চিকিৎসা নিতে পারেন। তাঁর জন্য প্রয়োজন বিদেশ গমনের আর্থিক সহায়তা, কাতার যাত্রার খরচ বহনের জন্য। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের জন্য স্বল্পমূল্যে বাসস্থান ও শিশুশিক্ষা সহায়তা। আঃ খালেকের নামে "আহত বীর" স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কার্ড। এই রাষ্ট্র আজ যদি তাঁকে উপেক্ষা করে, কাল তাঁর মেয়ে রুমাইয়া নূর ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে: "বাবা গুলি খেয়েছিল আপনারা কি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন?"
একনজরে আব্দুল খালেক
নাম: আব্দুল খালেক
জন্ম তারিখ: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
পিতার নাম: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
মাতার নাম: কহিনুর বেগম
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নয়নপুর, হাজী বাড়ি, ডাকঘর: নুনিয়াপাড়া-৩৭১০, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
বর্তমান ঠিকানা
পেশা: নয়নপুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
: পূর্বে ব্যবসায়ী (বর্তমানে বেকার)
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম ও পেশা: মোস্তাফিজুর রহমান।
মায়ের নাম ও পেশা: কহিনুর বেগম
ভাই: ১. বড় ভাই হাবিবুর রহমান ঢাকার গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার মার্কেটে দোকানদার। ২. ছোট ভাই আ. মালেক একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন
সন্তান: রুমাইয়া নুর (তিন মাস)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা
৯ জন
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়:২০ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৪টা
আহত হওয়ার স্থান: রায়েরবাগ
আক্রমণকারী: পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍