হোম / আহতদের তালিকা / ইয়াছিন আরাফাত
 ইয়াছিন আরাফাত

ইয়াছিন আরাফাত

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ড্রাইভার

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

যেভাবে আন্দোলনে গেলেন
ইয়াছিন আরাফাত একজন মটরযান ড্রাইভার। চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার চাম্বল গ্রামে তার জন্ম। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়ালেখায় ছেদ ঘটে। জীবন-জীবিকার তাগিদে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন অল্পবয়সে। সাধারণত একাডেমিক শিক্ষা কম থাকলে নানা পেশায় জড়িয়ে যেতে হয়। ইয়াছিনও জীবনের প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন। ফাঁকে ফাঁকে শিখে নেন ড্রাইভিং। ড্রাইভার হয়ে পেশায় স্থিতি পান। জীবন চলছিল আপন গতিতে। পেশার প্রয়োজনেই তাকে থাকতে হয় পথে পথে। পথ তার নিত্য সঙ্গী। পথে থাকলে পথের ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে থাকেন। অজপাড়াগাঁয়ের ইয়াছিন খবর রাখেন দেশ ও সমাজের। দেশের ভেতরের ঘটনা তার চোখ এড়ায় না। ইয়াছিন সচেতন হয়ে ওঠেন।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করেন নিজে নিজে। তার চোখের সামনে ঘটে গেল জুলাই বিপ্লব। এই বিপ্লবে সরকারের অত্যাচারে ইয়াছিন আরাফাতের মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের সাহসী সন্তান। এক সময় জীবন বাজি রেখে যোগ দেন আন্দোলনে।

গুলিবিদ্ধ ইয়াছিন আরাফাত
ইয়াছিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হন ৪ আগস্ট। তার আগেই দেশে ঘটে গেছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ছাত্র আন্দোলনে কেঁপে ওঠেছিল সরকারের ভিত। তারপর কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে দমন করে সে আন্দোলন।


জুলাইয়ে শুরু হয় কোটা বিরোধী আন্দোলন। কোটার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয় ন্যায্যতা থেকে। তাই তারা দাবি নিয়ে সরব হয়। ক্রমে ক্রমে দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ হতে থাকে ছাত্র সমাজ। দাবি আদায়ে নেমে আসে রাজপথে। প্রথমে ঢাকা ভার্সিটি, সেখান থেকে ভার্সিটির প্রাণকেন্দ্র টিএসসি ও রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হতে থাকে। তারপর আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবি নিয়ে চলে আসে শাহবাগ।

এই শাহবাগ কুখ্যাত গণজাগরণ মঞ্চের জন্য ইতোমধ্যেই রাজনীতি সচেতন জনতার কাছে পরিচিত। গণজাগরণ মঞ্চের অন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন করে আদালত। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা।

গণজাগরণ মঞ্চ বিচার না চেয়ে রাজপথে দাবি জানায় ফাঁসির। মানুষ অপরাধী হলে বিচার হবে। বিচারপ্রার্থী বিচার চাইতে পারে। আদালত সাক্ষী-প্রমাণ মতে বিচার করবে। বিচারে অভিযুক্ত খালাস পেতে পারে। শাস্তি হতে পারে। গণজাগরণ মঞ্চ কী করল? সরাসরি বলে দিল ফাঁসি চাই। ফ্যাসিবাদের বীজ এখান থেকেই রোপণ করা হয়। তারপর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের ঘাড়ে তার ফ্যাসিবাদী থাবা প্রবলভাবে চেপে ধরে।

নানা সময় নানাভাবে দমন করে বিরোধী মত। আওয়ামী লীগের আমলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় আটক রাখে বছরের পর বছর। জামায়াতের দলের নেতা- কর্মীদের হত্যা করে, অজস্র মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে শূন্য করার চক্রান্ত চালিয়ে যায় অবিরাম। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জুডিশিয়াল কিলিংয়ে হত্যা করা হয়।

গুমের রাজত্ব কায়েম করে আওয়ামী লীগ। ঘুম থেকে তরতাজা মানুষকে ডেকে নিয়ে গিয়ে নাই করে দেওয়া হয়। আয়নাঘর আওয়ামী লীগের অত্যাচারের আরেক অধ্যায়। সভ্য সমাজে এ এক অসভ্য শাসকের বীভৎস কাহিনী।
আওয়ামী বর্বরতার কাহিনী বলতে গেলে মহাকাব্য হবে, তবু কাহিনী শেষ হবে না। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন জনগণ। ছাই চাপা আগুন বুকে নিয়ে চলতে থাকে জনতা।

ছাত্ররাও তাদের আন্দোলন বিস্তৃত করতে থাকে। আন্দোলন দমনের নামে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র আওয়ামী লীগ। রক্তাক্ত করা হয় ছাত্রদের। বিশেষ করে ছাত্রীদের উপর আওয়ামী হামলার দৃশ্য মূলধারার মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। একযোগে সারাদেশের স্কুল কলেজ, মাদরাসা সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সোচ্চার হয়।
আওয়ামী লীগের নির্যাতন, বর্বরতাও বৃদ্ধি পায়। ছাত্রদের ওপর সরাসরি বুলেট ছুড়ে। শহীদ হতে থাকে দেশের সোনার ছেলেরা। জুলাইয়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ শহীদ হয়। আহত হয় হাজার হাজার।
এই আন্দোলনে কেউ হারায় চোখ, কেউ পা, কেউ আহত হয় আরও মারাত্মকভাবে। জুলাইয়ের পুলিশ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নির্মমতার দৃশ্য দেখলে গা শিউরে ওঠে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোঁড়া হয়। বাসার ভিতর মারা যায় মানুষ। দেশ এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তবু হাসিনা থাকতে পারেনি। পালিয়ে যায় ভারতে।
ভারতই হাসিনার শেষ আশ্রয়। হাসিনা সরকার ছিল ভারতের ছায়া সরকার। অনুগত হতে হতে হাসিনা হয়ে পড়েছিল লেন্দুপ দর্জি। স্বাধীন দেশের মানচিত্রের আড়ালে হয়ে পড়েছিল ভারতের ইচ্ছার ঘুড়ি।
ভারতের ইশারায় নাগরিকের বুকে হাসিনা চালিয়ে যায় গুলি। তবু আন্দোলনকারীরা থেমে থাকেনি। দীর্ঘ পনেরো বছর বসে আছে দেশের ঘাড়ে ফ্যাসিবাদের দৈত্য। তাকে নামাতেই হবে। ইয়াছিন আরাফাত এসব বিষয় জানে। আওয়ামী অত্যাচারের দৃশ্য তিনি দেখেন প্রতিদিনই। তিনি যেন কালের সাক্ষী। পেশাগত কারণে নিত্যনতুন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হন তিনি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তিনি তাই নামলেন বিবেকের দায়বদ্ধতায়। ৪ আগস্টের আগেও নেমেছিলেন।

৪ আগস্ট আবার যোগ দেন আন্দোলনে
হাসিনার পদত্যাগ, শহীদ ভাইদের হত্যাকারীর বিচারের দাবি, আহতদের সাথে একাত্মতা ঘোষণায় তিনি মিছিলে যান। শেখেরখীল রাস্তার মোড় থেকে তিনি মিছিলে যোগ দেন। পৌছেন চাম্বল বাজারে। ওখানে পূর্ব থেকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রস্তত ছিল। মিছিল পৌছতেই তারা হামলা করে। দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তারা আক্রমণ করে। মিছিলে হামলা করে পুলিশও। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। আহত হন ইয়াছিন আরাফাত। হাত-পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। আন্দোলনকারীরা তাকে হাসপাতালে নেন।

গুলিবিদ্ধ হয়েও চিকিৎসা
নিতে পারেননিইয়াছিন আরাফাত মটরযান ড্রাইভার। তারা দুই ভাই। তার এক ভাই ড্রাইভার, অপর ভাই চট্রগ্রাম বাঁশখালী শেখেরখীল দাখিল মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী। ইয়াছিম আরাফাত জুলাই ২০২৪ এর আহত যোদ্ধা। তার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার চাম্বল গ্রামে। ঘটনার সামগ্রিক বয়ান নিচে দেয়া হলো:

চিকিৎসা সংক্রান্ত সামগ্রিক তথ্য
ইয়াছিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হন হাত-পায়ে। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেয়া হয়। সেখানেই তিনি আন্দাজ করেন আবার আক্রমণ কিংবা গ্রেফতারের। আতঙ্কে হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছেন তারা নির্বিঘ্নে চিকিৎসাও নিতে পারেননি। শহীদের জানাজায় বাধা দিয়েছে। দাফনে বাধা দিয়েছে। এমনকি শহীদের জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের ধরপাকড়ও করেছে। এমন ভয়ংকর দিন অতিক্রম করতে হয়েছে এই জাতিকে। তিনি তাই পালিয়ে এসে আত্মগোপনে চিকিৎসা নিয়েছেন। পরিচিত চিকিৎসকের মাধ্যমে গোপনে চিকিৎসা নিয়েছেন। গুলি অপসারণ করেছেন।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাব
আক্রান্ত স্থানে এখনও সমস্যা হয়। নানারকম জটিলতায় ভুগছেন। তাই উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন আছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাব
পেশায় ড্রাইভার, তাকে নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলে ভালো। ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিলে ব্যবসাও করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত বাজেট
৪ /৫ লাখ টাকার প্রয়োজন।

নাম : ইয়াছিন আরাফাত
জন্ম তারিখ : ০১-০১-২০০০
জন্মস্থান : বাঁশখালী
পেশা/ পদবি : ড্রাইভার
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম চাম্বল, ইউনিয়ন: ১০ নং চাম্বল, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
পিতার নাম : কামাল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : বার্ধক্যজনিত অবসর, ৬০ বছর
মায়ের নাম : দিলুয়ারা বেগম
মায়ের পেশা : গৃহিণী
পারিবারিক অবস্থা
আয় : ১৫,০০০ হাজার
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
বাড়ি : সেমি পাকা
সম্পদ : ১.৫ শতক জমি আছে
ভাই- বোনের তথ্যাদি
১. হাসান নুর, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: ড্রাইভার
২. রাকিবুল ইসলাম, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: শিক্ষার্থী মাদ্রাসা
আহত হওয়ার স্থান : শেখেরখীল রাস্তার মাথা, চাম্বল বাজার, চট্টগ্রাম
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩ টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণে পড়েন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍