হাবিব উল্লাহ হামিম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
এই কথাটি ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল প্রেরণা ও প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে দেশ এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসনামলে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, মৌলিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা। রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার- সবকিছুতে আরোপ করা হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ভিন্নমতকে দমন করতে ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রীয় যন্ত্র। সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক-কেউই এই দমন-পীড়নের হাত থেকে রেহাই পায়নি। দেশের মানুষ স্বাধীন দেশে থেকেও অনুভব করতে থাকে এক প্রকার বন্দিত্বের বাস্তবতা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা এমন চরমে পৌঁছে যায় যে, তরুণ প্রজন্ম আর চুপ থাকতে পারেনি। শিক্ষা, চাকরি, ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা-সবকিছু হারাতে বসা এই সময়েই দেশের ছাত্রসমাজ এবং সচেতন জনতা রাস্তায় নেমে আসে। তারা শুধুমাত্র নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং গোটা দেশের মুক্তি ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য সংগ্রাম শুরু করে।
এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল
বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার পুনরুদ্ধার
ভোটাধিকার নিশ্চিত করা
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অবসান
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া
ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানো
ছাত্র-জনতার এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এতটাই তীব্র ও ব্যাপক ছিল যে, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। আন্দোলনের চাপে ভেঙে পড়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের দম্ভ। জনগণ বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে তরুণদের রক্ত, সাহস আর আত্মত্যাগ মিলিয়ে রচিত হয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাস। এটি প্রমাণ করে, যখন জনগণ জেগে ওঠে, তখন কোনো স্বৈরতন্ত্রই চিরস্থায়ী হতে পারে না।
জুলাই আন্দোলনের জীবন্ত শহীদ: হাবিবুল্লাহ হামিম
বৈষম্যবিরোধী ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী যোদ্ধা হাবিবুল্লাহ হামিম, লেখাপড়া করার জন্য গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন। তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন অংশ নিয়ে গুরুতর আহত হয়ে নিজের জীবনটিই বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন তিনি। যার শরীর আজও বয়ে বেড়াচ্ছে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ক্ষতচিহ্ন, তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের মনোহর চৌধুরীপাড়া গ্রামে-এক সরল-নির্মল গ্রামীণ পরিবেশে।
হামিম বেড়ে উঠেছেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কঠিন বাস্তবতায়, সংগ্রাম আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে। তাঁর বাবা, মরহুম মোঃ নুরুচ্ছফা, ছিলেন একজন সাধারণ পানের দোকানদার। এই ছোট ব্যবসার মাধ্যমে জীবনসংগ্রামের একটানা ক্লান্তির মধ্য দিয়েই তিনি সন্তানদের বড় করে তুলেছিলেন। আজ তিনি আর বেঁচে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন নীতির শিক্ষা, শ্রমের মর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস।
হামিমের মা, হোসনে আরা বেগম (৪৫), একজন গৃহিণী। সংসারের ভার, সন্তানদের লালন-পালন এবং শূন্যতার গভীর ক্লেশ-সবই তিনি বুকভরা ধৈর্য আর স্নেহে ধারণ করেছেন। একজন মমতাময়ী মায়ের মতো তিনি তিন পুত্রসন্তানকে আগলে রেখেছেন নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে।
হাবিবুল্লাহ হামিম বর্তমানে ঢাকায় অবস্থিত ‘সরকারি মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকা’র একজন অধ্যয়নরত ছাত্র। আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তিনি দিন গুনছিলেন কিন্তু হঠাৎ একদিন সে স্বপ্নে নেমে আসে গুলির গর্জন, রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের নির্মম হাত।
তাঁর পরিবারে রয়েছে আরও দুই ভাই ও ৩ বোন। বড় ভাই মোঃ হাসান (২৪), জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে একটি ছোটখাটো চাকরি করছেন, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পথ চলছেন চুপচাপ। মাঝের ভাই মোঃ আতিকুল্লাহ নাইম (২২), একজন উচ্চ শিক্ষার্থী-বর্তমানে ডিগ্রী ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত এবং তার ৩বোন বিবাহিত। তারা তাদের পরিবার নিয়ে জীবন যাপন করছেন।
এই পরিবারটি বাংলার হাজারো সংগ্রামী পরিবারের প্রতিচ্ছবি যেখানে প্রত্যেকে আশার আলো জ্বালাতে চেয়েছে নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। আর সেই আলোর মশাল হয়ে হামিম আজ দাঁড়িয়ে আছেন “জুলাই আন্দোলনের জীবন্ত শহীদ” রূপে-শরীরে গুলির দাগ, হৃদয়ে ন্যায়ের শপথ এবং সমাজের কাছে এক মৌন প্রশ্ন হয়ে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ: জুলাই যোদ্ধার জবানীতে শুনুন
জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের ভয়াল প্রেক্ষাপটে আমার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট-বাংলার আকাশ যেন তখন বারুদের ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। বাতাসে ছিল আতঙ্ক, রাস্তায় ছিল রক্তের ছিটে, আর মানুষের হৃদয়ে জেগেছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা। সেই ভয়াবহ সময়কাল ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে “জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ড” নামে-যেখানে ছাত্র- জনতার ন্যায্য দাবি দমন করতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নামানো হয়েছিল সরকারি দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী এবং উর্দিধারী লেলিয়ে দেওয়া হায়েনাদের।
সে দিনটিও ছিল তেমনই এক রক্তাক্ত দিন ৫ আগস্ট, ২০২৪। দিনটি ছিল সোমবার, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে হেলে পড়ছে। আমি উপস্থিত ছিলাম ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে, চানখারপুল এলাকায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মুখভাগে। সেখানে জড়ো হয়েছিল হাজারো হৃদয়- বিচারহীনতা, বৈষম্য, নিপীড়ন আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে।
আমরা কেউ হাতে অস্ত্র নিইনি, হাতে ছিল শুধু প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড আর বুকভরা সাহস। কিন্তু হঠাৎ করেই ঝড় নেমে এলো। আকাশজুড়ে অশনি সংকেতের মতো গর্জে উঠলো ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের একত্রিত রণহুংকার। তারা দেশীয় অস্ত্র, লোহার রড, হকস্টিক এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের উপর। নির্বিচারে মারধর, ছুরি চালানো, লাঠিচার্জের মাঝে হঠাৎ করেই এক পর্যায়ে শুরু হয় গুলিবর্ষণ। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। হতবিহ্বল জনতা ছুটতে থাকে যার যার দিকে, প্রাণ বাঁচানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।
ঠিক তখনই, আন্দোলনের সামনের সারিতে অবস্থানরত আমি হঠাৎ কোমরের পিছনের দিকে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করি। বুঝে উঠার আগেই শরীর অসাড় হয়ে আসে। আওয়ামী মদদপুষ্ট পুলিশের গুলির বুলেট আমার পিঠ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে যায়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। চোখের সামনে ধোঁয়া, শব্দ আর রক্তে রাঙানো পথ-সব কিছু মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় দৃশ্যপটে পরিণত হয়। রক্তক্ষরণ এতটাই তীব্র ছিল যে আমি অচেতন হয়ে পড়ি।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে। পরে জানতে পারি, আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা জীবন বাজি রেখে আমাকে টেনে তুলেছিল মৃত্যুর মুখ থেকে। কিন্তু সেখানেও শুরু হয় আরেক যুদ্ধ চিকিৎসা সংকটের যুদ্ধ। যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় আমাকে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতালে। সেখানে প্রায় পনেরো দিন ধরে চলে অস্ত্রোপচার, রক্ত সঞ্চালন, ওষুধ আর যন্ত্রনাদায়ক থেরাপি। কিন্তু হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ডাক্তাররা জানান আমার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনকভাবে অবনতি ঘটেছে।
তড়িঘড়ি করে আমাকে রেফার করা হয় ঢাকা সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল)। সেখানে শুরু হয় আমার দীর্ঘ চিকিৎসাজীবন। হাসপাতালের শীতল দেওয়াল, বেডের চারপাশে ভেসে বেড়ানো জীবনের অনিশ্চয়তা আর যন্ত্রপাতির কর্কশ শব্দ সব মিলিয়ে যেন আমি নিজেই এক যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে গেছি। এক পর্যায়ে চিকিৎসকেরা আমাকে সাময়িকভাবে বাড়িতে পাঠান ‘বেড রেস্ট’-এর জন্য। কিন্তু দুর্বল শরীর কোনো শান্তি নিতে পারেনি; অবস্থার অবনতি হলে আবার হাসপাতালে ফিরে আসতে হয়। ৫ আগস্ট থেকে এই পযন্ত ৫টি কঠিন অপারেশন করা হয়েছে, সামনে আরো ২টি মেজর অপারেশন বাকি আছে। আর হাসপাতালে খরচ প্রাথমিক দিক দিয়ে সংগঠন বহন করেছিল। বর্তমানে সরকার বহন করছে, তবে ফ্যামিলি ব্যাক আপের জন্য আমাদের কষ্টসাধ্য হয়।
স্মৃতিগুলো বুকে দোলা দিয়ে যায় সুন্দর এক বাংলাদেশের স্বপ্নে
আমার পিঠে সেই গুলির চিহ্ন আজও বিদ্যমান, আর প্রতিটি ব্যথা আমাকে সেই ভয়াল আগস্টের কথা মনে করিয়ে দেয়-যেখানে রাষ্ট্র তার সন্তানদের গুলি করে নিস্তব্ধ করতে চেয়েছিল।
তবুও আমি বেঁচে আছি। কারণ “আমার রক্ত শুধু রক্ত নয়-এটি অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অমোঘ সাক্ষ্য। আমাদের এই রক্ত কখনো বৃথা যাবে না। বরং এ রক্তই একদিন বীজ হয়ে অঙ্কুরিত হবে মুক্তি ও সাম্যের নতুন সূর্যোদয়ে বাংলাদেশ, ইনশাআল্লাহ।”
এই ভয়াল অভিজ্ঞতা শুধু আমার একার নয় জুলাই-আগস্টে দেশের অসংখ্য ছাত্র, তরুণ এবং সাধারণ নাগরিক এই বর্বর রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার হয়েছে। আমাদের রক্ত, আমাদের যন্ত্রণা এবং ত্যাগই একদিন এই বৈষম্যহীন, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
“আমি রক্ত দিয়েছি বৈষম্যবিরোধী স্বপ্নের জন্য। তবে এখন লড়ছি জীবনের জন্য।”
৫ আগস্ট ২০২৪ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দমননীতির নির্মম শিকার হয়ে যখন আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, তখনো কল্পনা করিনি আমার সামনে অপেক্ষা করছে আরও দীর্ঘ,ব্যয়বহুল ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট এক চিকিৎসাজীবন। সহযোদ্ধা ভাইদের প্রাণপণ চেষ্টায় আমাকে আহত অবস্থায় প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেখানকার অব্যবস্থাপনা ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে।
জীবন বাঁচানোর তাগিদে সেখান থেকে ইমারজেন্সি ভিত্তিতে স্থানান্তর করা হয় একটি বেসরকারি হাসপাতাল অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে প্রায় ৮০/৯০টা সেলাই ও অপারেশন করা হয়। আমার পেটে ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আমাকে রাখেন। প্রায় ১৫ দিন ধরে আমার উপর চলে শারীরিক ও মানসিক সহ্যসীমার পরীক্ষা। গুলির ক্ষতস্থানে ইনফেকশন, রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ, ব্যথা ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে দিনগুলো ছিল দুঃস্বপ্নের চেয়ে ভয়াবহ।
কিন্তু শারীরিক অবস্থার হঠাৎ করে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ায়, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে আমাকে অবিলম্বে রেফার করা হয় ঢাকা সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল)। সেখানে পৌঁছেই আবার শুরু হয় এক নতুন যুদ্ধ জীবনের জন্য, অস্তিত্বের জন্য। সিএমএইচ-এর অভিজ্ঞ চিকিৎসকদল আমাকে দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড় চিকিৎসা দিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে আনার চেষ্টা করেন। মাঝখানে এক পর্যায়ে সাময়িকভাবে বাড়ি পাঠানো হলেও শারীরিক অবস্থার ফের অবনতির কারণে আবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর আমার শরীরে যে গভীর কাটাছেড়ার দাগ তৈরি হয়, তা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি।
তবে দুঃখের বিষয়, এত কিছু করেও এখনো আমার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয়নি। শরীরে এখনো রয়েছে সেই গুলির ক্ষতচিহ্ন, রয়েছে ব্যথা, দুর্বলতা, থেরাপির প্রয়োজনীয়তা। উন্নততর চিকিৎসা না পেলে ভবিষ্যতে এই ক্ষত আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সেই চিকিৎসা গ্রহণের পথকে প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
এই অবস্থায়, আমার জীবনরক্ষাকারী এই চিকিৎসার বিষয়টি যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা মানবিক দৃষ্টিকোণে বিবেচনায় নেন, যদি আমাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেন, তবে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আমার এই আবেদন কোনো করুণা নয়, এটি একজন আহত নাগরিকের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার আদায়ের আকুতি।
আমি বিশ্বাস করি, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই পথে আমার রক্ত বৃথা যাবে না, আর এই জীবন যদি বেঁচে থাকে, তা হবে মানবিকতা ও সহমর্মিতার এক মহান উদাহরণ।”
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি বর্তমানে ঢাকা সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) থেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছি। গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর শরীরে প্রায় ৮০/৯০টি সেলাইসহ জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। সেই অস্ত্রোপচারের চিহ্ন আজও আমার দেহে বহন করছি। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ইনফেকশন প্রতিরোধ, থেরাপি ও ওষুধ প্রয়োগ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আমার পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার জন্য উন্নতমানের চিকিৎসা ও বিশেষায়িত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আমি চাই
া উন্নত মেডিকেল ফলোআপের ব্যবস্থা
া প্রয়োজনীয় থেরাপি ও ইনজেকশনের খরচ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
পরবর্তী সার্জারি বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সুবিধা
৫ আগস্ট থেকে এই পযন্ত ৫টি কঠিন অপারেশন করা হয়েছে, সামনে আরো ২টি মেজর অপারেশন বাকি আছে। বিশেষত, “আমি আহত হওয়ার পর থেকে যেকোন প্রয়োজন, আমার সার্বিক এবং আর্থিক সহযোগিতায় পাশে ছিলো ছিলো আমার প্রাণপ্রিয় সংগঠন (বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির) এখনো আছেন। আমি আমার প্রিয় সংগঠনের প্রতি অজস্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
এই পরিস্থিতিতে, আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তর, মানবিক সংগঠন, সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান এবং হৃদয়বান ব্যক্তিদের প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি-আমার চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতা প্রদান করুন। আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
পুনর্বাসনসম্পর্কিত তথ্য
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ছাত্র, সরকারি মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকা।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
হাবিবুল্লাহ হামিম একজন সংগ্রামী তরুণ, যিনি জুলাই ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতরভাবে আহত হন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি সাহস হারাননি। আজ তিনি জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি-কর্মসংস্থানের প্রয়োজন।
একজন চাকরি প্রত্যাশী তরুণ হিসেবে, হামিমের মনের মধ্যে আছে স্বনির্ভর হওয়ার দৃঢ় সংকল্প। তাঁর পরিবার বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষাজীবন এবং সংসার-সব মিলিয়ে একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক পেশার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর সামনে।
একটি স্থায়ী সম্মানজনক চাকরি
অথবা উপযুক্ত স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিংয়ের সুযোগ।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : হাবিবুল্লাহ হামিম
জন্ম তারিখ : ০৩-০১-২০০৩
জন্মস্থান : সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবী : ছাত্র
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মনোহর চৌধুরীপাড়া, ইউনিয়ন: ছদাহা, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : চকবাজার, ঢাকা
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মৃত মোঃ নুরুচ্ছফা
মায়ের নাম : হোসনে আরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১০,০০০/=
আয়ের উৎস : বড় ভাইয়ের চাকরি
বাড়ী : সেমিপাকা বাড়ি
সম্পদ : ৪ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
ভাই- বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ হাসান, সম্পর্ক ভাই, বয়স: ২৪, পেশা: চাকরি
২. মোঃ আতিকুল্লাহ নাইম, বয়স: ২২, পেশা: শিক্ষার্থী ২য় বর্ষ
৩. তিন বোন সকলেই বিবাহিত এবং গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকা মেডিকেলের সামনে, ঢাকার প্রাণকেন্দ্র চানখারপুল এলাকায়
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ১২টা ৫০মিনিটের দিকে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍