জাবেদুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র ও বক্সিং খেলোয়ার
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জাবেদুল ইসলাম
পেশা: ছাত্র, আনোয়ারা সরকারি কলেজ
এবং বক্সিং খেলোয়াড়
ক্রমিক: ৪৩০
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ২০
ভয়ের রাজনীতি থেকে পতনের পথে: শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পটভূমি
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল ছিল এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের ইতিহাস। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত এই শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছিল। দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে এক ভয়াল সময়-যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করাই ছিল অপরাধ, সমালোচনা করলেই নেমে আসত রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয় গুম, খুন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার ধারাবাহিক হামলা। হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ে মিথ্যা মামলার আসামি, কারো ঘর পুড়ে যায়, কেউ নিখোঁজ হয় চিরতরে, আবার কেউ দিনের পর দিন কারাবরণ করে। কোনো বিচার নেই, নেই জবাবদিহিতাও। সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এমনকি সাধারণ জনগণও পরিণত হয় নজরদারির শিকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা কালাকানুন ব্যবহার করে চাপিয়ে দেওয়া হয় নিঃশ্বাসরুদ্ধ এক শাসনব্যবস্থা। এই ভয়ের রাজনীতি ধীরে ধীরে দেশকে পরিণত করে একটি নতজানু করদরাজ্যে, যেখানে জনগণ আর রাষ্ট্রের মালিক নয় বরং একটি দমনযন্ত্রের নিঃশব্দ ভুক্তভোগী মাত্র। মানুষ তখন কথা বলা ভুলে যায়, প্রতিবাদ করা শিখে নেয় চাপা কান্নার ভেতর দিয়ে।
জুলাই বিপ্লবের বিপ্লবী: জাবেদুল ইসলাম
জাবেদুল ইসলাম একজন সংগ্রামী ও বিপ্লবী তরুণ, সাহসী কর্মী এবং সচেতন সমাজসেনানী, যিনি জুলাই বিপ্লবের বিপ্লবী হিসেবে পরিচিতি। তিনি ১৯৯৯ সালের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ গ্রাম শাহমীরপুর-এ জন্মগ্রহণ করেন।
জাবেদুলের বাবা আব্দুল জব্বার (৫৭) একজন নিরাপত্তারক্ষী (সিকিউরিটি গার্ড) হিসেবে কর্মরত। তাঁর মা রোকেয়া বেগম (৫৩) একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও অসাধারণ একজন মা- যিনি সীমাহীন ভালোবাসা, মমতা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিজের সন্তানদের বড় করে তুলেছেন নানা প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাবেদুল ইসলাম বর্তমানে আনোয়ারা সরকারি কলেজের একজন ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একজন বক্সিং খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, যা তার শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং লড়াকু মনোভাবের পরিচয় বহন করে। বক্সিংয়ের মঞ্চে যেমন তিনি সাহসের সাথে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন, তেমনি জীবনের বাস্তব সংগ্রামেও তিনি একজন অগ্রবর্তী যোদ্ধা।
পারিবারিক জীবনে জাবেদ একজন আদর্শ স্বামী ও দায়িত্বশীল পিতা। তাঁর এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে-
● আহমদ উল্লাহ আলিফ (বয়স ১ বছর ১০ মাস)
● আমাতুল্লাহ তাবাচ্চুম আয়েশা (বয়স ২ মাস)
জাবেদ তাঁর মা-বাবা, জীবনসঙ্গিনী স্ত্রী, দুই সন্তান এবং দুই ভাই, বড় ভাই নাম শাহজাহান তিনি একজন প্রাইভেট ব্যাংকের গাড়িচালক এবং মেঝ ভাই নাম জালাল উদ্দিন তিনি অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করেন তাদের নিয়েই একটি যৌথ পরিবারে বসবাস করেন, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির বন্ধন রয়েছে। এই পরিবার তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি এবং প্রেরণার উৎস।
শুধু একজন খেলোয়াড় বা ছাত্র নয়, জাবেদুল ইসলাম একজন আন্দোলনকামী তরুণ, যিনি সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জুলাই বিপ্লবে তাঁর সাহসিক অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অনুকরণীয় প্রতীকে পরিণত করেছে। জাবেদুল ইসলামের জীবন এক সংগ্রামের গল্প, যেখান থেকে ভবিষ্যতের বহু তরুণ সাহস ও প্রেরণা লাভ করবে। ইনশাআল্লাহ।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ: আহত বিপ্লবী বীরের মূখনিসৃত বাণী
“আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু মন বিদ্রোহে অটল” ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, চট্টগ্রামের রাজপথে একটি ঐতিহাসিক দিন রচিত হচ্ছিল। আমি, জাবেদুল ইসলাম, একজন ছাত্র, একজন সাধারণ মানুষ—তবুও অসমতাকে মেনে নিতে পারিনি। তাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আমি প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে থাকি চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে শুরু হওয়া মিছিলে।
কিন্তু হঠাৎ করেই আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রূপ নেয় বিভীষিকায়। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র—ইট-পাটকেল, রামদা, লাঠি, এমনকি বন্দুকও। তারা আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। সেই মুহূর্তে আমরা ছাত্ররা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
কিন্তু ভয়াবহতা তখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মিছিল যেন মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে আমার মাথা, পিঠ, পা ও উরুতে বুলেট বিদ্ধ হয়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, অজ্ঞান হয়ে যাই।
আমার ভাই আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রাস্তায় বাধা দেয়—একজন আহত বিপ্লবীকে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকারও তারা দেয়নি! আমার ভাই বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সেখানেই স্থানীয় একজন এমবিবিএস ডাক্তার, ডা. আহমদ তৌকির, প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তবে উন্নত চিকিৎসার অভাবে মাথায় ইনফেকশন হয়ে যায়।
পরবর্তীতে জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বুলেট অপসারণ করা হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেনি এই ফ্যাসিবাদী হামলা। ফিরে এসেছিল আরেকটি রক্তাক্ত দিন ৪ আগস্ট ২০২৪। সেদিনও আমি আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলার শিকার হই। আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ পুনরায় আঘাতে জর্জরিত হয়। ঘাতকরা আবারও প্রমাণ করে, এই সরকার গণতন্ত্রের নয়, বর্বরতা ও নিপীড়নের প্রতীক।
বীরের একটি বার্তা
আমি জানি, আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত। তবু আমার চেতনা অমলিন। এই রাষ্ট্রযন্ত্রের গুলি আমাকে থামাতে পারেনি। আমি প্রতিবাদ করতে শিখেছি, মাথা নোয়াতে নয়। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের এই আন্দোলন থেমে যাবে না। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে-একজন জাবেদুল ইসলাম ছিল, যে গুলিবিদ্ধ হয়েও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
গুলিবিদ্ধ শরীর, রুদ্ধ হাসপাতালের পথ-আহত বিপ্লবীর যন্ত্রণার ইতিহাস ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় আমি ভয়াবহভাবে গুলিবিদ্ধ হই। মাথা, পিঠ, পা ও উরুতে বুলেটের আঘাতে আমি রক্তাক্ত অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আমার ভাই আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে ছুটে যান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
তারা শুধু হুমকি-ধমকি দেয়নি, বরং আমাকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে দেয়নি। এমনকি একজন গুলিবিদ্ধ নাগরিকের চিকিৎসা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারও তারা নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত করে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমার ভাই বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। সে সময় আমার রক্তক্ষরণ ভয়াবহ রূপ নেয়। পরে চট্টগ্রামের একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ডা. আহমদ তৌকির প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে আমার রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন এবং সাময়িকভাবে আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ হয়নি। ৪ আগস্ট, ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সন্ত্রাসীরা আমাকে আবারও আক্রমণ করে। ছাত্রলীগের একদল ক্যাডার আমাকে লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে, যার ফলে আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে নতুন করে গুরুতর আঘাত লাগে।
অবশেষে, যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পরে, পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়, তখন ১৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে সক্ষম হই। সেখানে আমার মাথায় অস্ত্রোপচার করে বুলেট বের করা হয় এবং শরীরের অন্যান্য আঘাতেরও চিকিৎসা করা হয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে সুস্থ আছেন, আলহামদুলিল্লাহ। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন থেরাপি দিতে হয়।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র, আনোয়ারা সরকারি কলেজ এবং বক্সিং খেলোয়ার
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী, যেখানে নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখতে পারবে। তার মধ্যে রয়েছে শৃঙ্খলা, সততা ও কর্মদক্ষতা, যা যেকোনো পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য অপরিহার্য।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জাবেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০৭-১০-১৯৯৯
জন্মস্থান : কর্ণফুলি, চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবি : ছাত্র ও বক্সিং খেলোয়ার
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: শাহমীরপুর, ইউনিয়ন: বড় উঠান, থানা: কর্ণফুলি, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : আব্দুল জব্বার
পিতার পেশা ও বয়স : সিকিউরিটি গার্ড, ৫৭
মায়ের নাম : রোকেয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৩
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৪,০০০/=
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ি : সেমিপাকা বাড়ি
সম্পদ : মায়ের নামে ৩ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
স্ত্রীর নাম : তাসফিয়া জান্নাত
স্ত্রীর বয়স ও পেশা : ২১
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ শাহজাহান, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ৩৬, পেশা: চাকরি (গাড়ি ড্রাইভার)
২. মোঃ জালাল উদ্দিন, বয়স: ২৮, পেশা: পড়াশোনা
আহত হওয়ার স্থান : নতুন ব্রিজ, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই, ২০২৪, দুপুর ১২টা এবং ৪ আগস্ট, ২০২৪ সকাল ১১টা
পেশা: ছাত্র, আনোয়ারা সরকারি কলেজ
এবং বক্সিং খেলোয়াড়
ক্রমিক: ৪৩০
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ২০
ভয়ের রাজনীতি থেকে পতনের পথে: শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পটভূমি
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল ছিল এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের ইতিহাস। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত এই শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছিল। দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে এক ভয়াল সময়-যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করাই ছিল অপরাধ, সমালোচনা করলেই নেমে আসত রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয় গুম, খুন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার ধারাবাহিক হামলা। হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ে মিথ্যা মামলার আসামি, কারো ঘর পুড়ে যায়, কেউ নিখোঁজ হয় চিরতরে, আবার কেউ দিনের পর দিন কারাবরণ করে। কোনো বিচার নেই, নেই জবাবদিহিতাও। সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এমনকি সাধারণ জনগণও পরিণত হয় নজরদারির শিকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা কালাকানুন ব্যবহার করে চাপিয়ে দেওয়া হয় নিঃশ্বাসরুদ্ধ এক শাসনব্যবস্থা। এই ভয়ের রাজনীতি ধীরে ধীরে দেশকে পরিণত করে একটি নতজানু করদরাজ্যে, যেখানে জনগণ আর রাষ্ট্রের মালিক নয় বরং একটি দমনযন্ত্রের নিঃশব্দ ভুক্তভোগী মাত্র। মানুষ তখন কথা বলা ভুলে যায়, প্রতিবাদ করা শিখে নেয় চাপা কান্নার ভেতর দিয়ে।
জুলাই বিপ্লবের বিপ্লবী: জাবেদুল ইসলাম
জাবেদুল ইসলাম একজন সংগ্রামী ও বিপ্লবী তরুণ, সাহসী কর্মী এবং সচেতন সমাজসেনানী, যিনি জুলাই বিপ্লবের বিপ্লবী হিসেবে পরিচিতি। তিনি ১৯৯৯ সালের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ গ্রাম শাহমীরপুর-এ জন্মগ্রহণ করেন।
জাবেদুলের বাবা আব্দুল জব্বার (৫৭) একজন নিরাপত্তারক্ষী (সিকিউরিটি গার্ড) হিসেবে কর্মরত। তাঁর মা রোকেয়া বেগম (৫৩) একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও অসাধারণ একজন মা- যিনি সীমাহীন ভালোবাসা, মমতা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিজের সন্তানদের বড় করে তুলেছেন নানা প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাবেদুল ইসলাম বর্তমানে আনোয়ারা সরকারি কলেজের একজন ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একজন বক্সিং খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, যা তার শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং লড়াকু মনোভাবের পরিচয় বহন করে। বক্সিংয়ের মঞ্চে যেমন তিনি সাহসের সাথে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন, তেমনি জীবনের বাস্তব সংগ্রামেও তিনি একজন অগ্রবর্তী যোদ্ধা।
পারিবারিক জীবনে জাবেদ একজন আদর্শ স্বামী ও দায়িত্বশীল পিতা। তাঁর এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে-
● আহমদ উল্লাহ আলিফ (বয়স ১ বছর ১০ মাস)
● আমাতুল্লাহ তাবাচ্চুম আয়েশা (বয়স ২ মাস)
জাবেদ তাঁর মা-বাবা, জীবনসঙ্গিনী স্ত্রী, দুই সন্তান এবং দুই ভাই, বড় ভাই নাম শাহজাহান তিনি একজন প্রাইভেট ব্যাংকের গাড়িচালক এবং মেঝ ভাই নাম জালাল উদ্দিন তিনি অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করেন তাদের নিয়েই একটি যৌথ পরিবারে বসবাস করেন, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির বন্ধন রয়েছে। এই পরিবার তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি এবং প্রেরণার উৎস।
শুধু একজন খেলোয়াড় বা ছাত্র নয়, জাবেদুল ইসলাম একজন আন্দোলনকামী তরুণ, যিনি সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জুলাই বিপ্লবে তাঁর সাহসিক অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অনুকরণীয় প্রতীকে পরিণত করেছে। জাবেদুল ইসলামের জীবন এক সংগ্রামের গল্প, যেখান থেকে ভবিষ্যতের বহু তরুণ সাহস ও প্রেরণা লাভ করবে। ইনশাআল্লাহ।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ: আহত বিপ্লবী বীরের মূখনিসৃত বাণী
“আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু মন বিদ্রোহে অটল” ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, চট্টগ্রামের রাজপথে একটি ঐতিহাসিক দিন রচিত হচ্ছিল। আমি, জাবেদুল ইসলাম, একজন ছাত্র, একজন সাধারণ মানুষ—তবুও অসমতাকে মেনে নিতে পারিনি। তাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আমি প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে থাকি চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে শুরু হওয়া মিছিলে।
কিন্তু হঠাৎ করেই আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রূপ নেয় বিভীষিকায়। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র—ইট-পাটকেল, রামদা, লাঠি, এমনকি বন্দুকও। তারা আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। সেই মুহূর্তে আমরা ছাত্ররা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
কিন্তু ভয়াবহতা তখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মিছিল যেন মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে আমার মাথা, পিঠ, পা ও উরুতে বুলেট বিদ্ধ হয়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, অজ্ঞান হয়ে যাই।
আমার ভাই আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রাস্তায় বাধা দেয়—একজন আহত বিপ্লবীকে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকারও তারা দেয়নি! আমার ভাই বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সেখানেই স্থানীয় একজন এমবিবিএস ডাক্তার, ডা. আহমদ তৌকির, প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তবে উন্নত চিকিৎসার অভাবে মাথায় ইনফেকশন হয়ে যায়।
পরবর্তীতে জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বুলেট অপসারণ করা হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেনি এই ফ্যাসিবাদী হামলা। ফিরে এসেছিল আরেকটি রক্তাক্ত দিন ৪ আগস্ট ২০২৪। সেদিনও আমি আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলার শিকার হই। আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ পুনরায় আঘাতে জর্জরিত হয়। ঘাতকরা আবারও প্রমাণ করে, এই সরকার গণতন্ত্রের নয়, বর্বরতা ও নিপীড়নের প্রতীক।
বীরের একটি বার্তা
আমি জানি, আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত। তবু আমার চেতনা অমলিন। এই রাষ্ট্রযন্ত্রের গুলি আমাকে থামাতে পারেনি। আমি প্রতিবাদ করতে শিখেছি, মাথা নোয়াতে নয়। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের এই আন্দোলন থেমে যাবে না। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে-একজন জাবেদুল ইসলাম ছিল, যে গুলিবিদ্ধ হয়েও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
গুলিবিদ্ধ শরীর, রুদ্ধ হাসপাতালের পথ-আহত বিপ্লবীর যন্ত্রণার ইতিহাস ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় আমি ভয়াবহভাবে গুলিবিদ্ধ হই। মাথা, পিঠ, পা ও উরুতে বুলেটের আঘাতে আমি রক্তাক্ত অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আমার ভাই আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে ছুটে যান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
তারা শুধু হুমকি-ধমকি দেয়নি, বরং আমাকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে দেয়নি। এমনকি একজন গুলিবিদ্ধ নাগরিকের চিকিৎসা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারও তারা নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত করে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমার ভাই বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। সে সময় আমার রক্তক্ষরণ ভয়াবহ রূপ নেয়। পরে চট্টগ্রামের একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ডা. আহমদ তৌকির প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে আমার রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন এবং সাময়িকভাবে আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ হয়নি। ৪ আগস্ট, ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সন্ত্রাসীরা আমাকে আবারও আক্রমণ করে। ছাত্রলীগের একদল ক্যাডার আমাকে লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে, যার ফলে আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে নতুন করে গুরুতর আঘাত লাগে।
অবশেষে, যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পরে, পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়, তখন ১৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে সক্ষম হই। সেখানে আমার মাথায় অস্ত্রোপচার করে বুলেট বের করা হয় এবং শরীরের অন্যান্য আঘাতেরও চিকিৎসা করা হয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে সুস্থ আছেন, আলহামদুলিল্লাহ। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন থেরাপি দিতে হয়।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র, আনোয়ারা সরকারি কলেজ এবং বক্সিং খেলোয়ার
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী, যেখানে নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখতে পারবে। তার মধ্যে রয়েছে শৃঙ্খলা, সততা ও কর্মদক্ষতা, যা যেকোনো পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য অপরিহার্য।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জাবেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০৭-১০-১৯৯৯
জন্মস্থান : কর্ণফুলি, চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবি : ছাত্র ও বক্সিং খেলোয়ার
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: শাহমীরপুর, ইউনিয়ন: বড় উঠান, থানা: কর্ণফুলি, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : আব্দুল জব্বার
পিতার পেশা ও বয়স : সিকিউরিটি গার্ড, ৫৭
মায়ের নাম : রোকেয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৩
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৪,০০০/=
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ি : সেমিপাকা বাড়ি
সম্পদ : মায়ের নামে ৩ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
স্ত্রীর নাম : তাসফিয়া জান্নাত
স্ত্রীর বয়স ও পেশা : ২১
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ শাহজাহান, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ৩৬, পেশা: চাকরি (গাড়ি ড্রাইভার)
২. মোঃ জালাল উদ্দিন, বয়স: ২৮, পেশা: পড়াশোনা
আহত হওয়ার স্থান : নতুন ব্রিজ, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই, ২০২৪, দুপুর ১২টা এবং ৪ আগস্ট, ২০২৪ সকাল ১১টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍