জাহেদুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা/ পদবি : সিকিউরিটি গার্ড
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ভয়াবহ চিত্র
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় দমননীতির অংশ, যার লক্ষ্য ছিল জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে রক্তাক্ত করে তোলা। একদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাস, অন্যদিকে সরকারি পুলিশের বন্দুকের গুলি-এই যৌথ বর্বরতার শিকার হয়েছে হাজারো নিরীহ শিক্ষার্থী। যারা দাবি করেছিল শিক্ষা, গণতন্ত্র ও জীবনের নিরাপত্তা-তাদেরই ওপরে চালানো হয়েছে নির্মম হামলা, গুলি, গ্রেফতার এবং নিপীড়ন। হাসপাতালে যাওয়া পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয়েছে অনেকের। কোনো মানবিকতা, বিচারবোধ বা ন্যায়ের উপস্থিতি ছিল না। বরং ফ্যাসিস্ট দোসরদের মতো রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করেছে জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে।
জুলাই আন্দোলনের বীর: জাহেদুল ইসলাম
জাহেদুল ইসলাম একজন নির্ভীক, সংগ্রামী ও সাহসী ছাত্র, যিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অকুতোভয়ে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ফকিরহাট ইউনিয়নের ছদাহা ফজুর পাড়া গ্রামের এক সাদামাটা পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট। তার পিতা সরওয়ার জামাল একজন সাধারণ মুদির দোকানদার, যিনি সংগ্রামী জীবনের মধ্য দিয়ে নিজের সাত সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মা শাহিনা আক্তার একজন মমতাময়ী ও আদর্শ গৃহিণী, যিনি ভালোবাসা, ত্যাগ আর মূল্যবোধে সন্তানদের মানুষ করার কঠিন দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। জাহেদের পরিবারে রয়েছেন দুই ভাই ও পাঁচ বোন। বড় ভাই জামশেদুল ইসলাম একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিবাহিত। পাঁচ বোনের মধ্যে তিনজন বিবাহিত। চতুর্থ বোন জেরিন আক্তার (১৯) সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং সর্বকনিষ্ঠ বোন ইসরাত সুলতানা ইপ্তি (১৫) বর্তমানে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
দেশব্যাপী চলমান ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবির আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে জাহেদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নির্মম শিকার হন। শেখ হাসিনার সরকারপন্থী সন্ত্রাসী বাহিনী-ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় তার একটি হাত ভেঙে দুটি টুকরো হয়ে যায়।
এ হৃদয়বিদারক ঘটনার ফলে তিনি তার বহু আকাঙ্ক্ষিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি এবং এখনো শারীরিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে স্বাভাবিক পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারছেন না। তাঁর এই আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান জুলাই আন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে। জাহেদুল ইসলাম আজ নিছক একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি এক প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি-এক সাহসী কণ্ঠ, যার যন্ত্রণা, ত্যাগ আর বঞ্চনা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
আমি জাহেদুল ইসলাম, একজন ছাত্র এবং একজন আন্দোলনকারী। জুলাই মাসজুড়ে চলা ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবির আন্দোলনে আমি শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলাম। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট-এই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দিনগুলোর একটি। সকাল থেকেই আমরা কিছু শিক্ষার্থী নিউ মার্কেট চত্বরে, কেরানীহাট মোড়ে জড়ো হতে শুরু করি। লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবিগুলো জানানো। আন্দোলন তখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি, এমন সময় হঠাৎ করেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ছাত্রলীগ ও পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী আমাদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। আমি প্রাণ বাঁচাতে অন্যদের সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করি।
এমন সময় মানুষের ভিড়ে পড়ে যাই। উঠার চেষ্টা করছিলাম, তখনই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী দৌড়ে এসে আমার হাতে হকস্ট্রিক দিয়ে সজোরে আঘাত করে। আমার ডান হাত ভেঙে যায়-আক্ষরিক অর্থেই দুই টুকরো হয়ে যায়। ব্যথা, রক্ত আর আতঙ্কে আমি সেখানেই লুটিয়ে পড়ি। নড়াচড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলি। পরে কিছু সাহসী ছাত্র-জনতা আমাকে তুলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে আমার হাতের হাড় চূর্ণ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর ব্যথার মধ্য দিয়ে এখনও বেঁচে আছি, তবে আমি সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাইনি, কারণ এই ঘটনার কারণে আমি আমার বহু প্রতীক্ষিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
২০২৪ সালের ১ আগস্ট রাতে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকালে আমি নির্মম হামলার শিকার হয়ে গুরুতরভাবে আহত হই। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমাকে সরাসরি হাসপাতালে নিতে না পেরে কয়েকজন সাহসী সহযোদ্ধা গোপনে একটি গাড়িতে করে আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম মেডিকেলে পৌঁছানোর পরপরই আমাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা দ্রুত এক্স-রে করে নিশ্চিত হন যে, আমার হাতের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় অপারেশনের মাধ্যমে হাতে রড বসানো হয় এবং ব্যান্ডেজ করে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপে পাঠানো হয়।
চিকিৎসকেরা জানান,বর্তমানে যে রডটি হাতের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, সেটি স্থায়ীভাবে রাখা যাবে না। ভবিষ্যতে আরও একটি অপারেশনের মাধ্যমে রডটি অপসারণ করতে হবে,না হলে ইনফেকশন বা জটিলতা থেকে হাতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে আমি হাতের সেই গুরুতর আঘাত নিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারি না, লেখাপড়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চিকিৎসার খরচ ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে মানসিক চাপও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি বর্তমানে মারাত্মক শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। অপারেশনের মাধ্যমে আমার হাতে রড বসানো হয়েছে, যা ডাক্তারদের মতে, র্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ বা হাতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। বাবার ছোট একটি মুদি দোকান ছাড়া পরিবারের কোনো নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস নেই, আর আমি নিজে এখন কর্মক্ষম নই। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা আমাদের পরিবারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আমি সংশ্লিষ্ট মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং দয়ালু ব্যক্তিদের কাছে চিকিৎসা ব্যয়ে সহযোগিতা প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি, যাতে পরবর্তী অপারেশন সম্পন্ন করে আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারি এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারি।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
পূর্বে ছাত্র ছিলেন, বর্তমানে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে শহরে কর্মরত।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, যেখানে নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জাহেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২৫-০৮-২০০৭
জন্মস্থান : সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবি : সিকিউরিটি গার্ড
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: ছদাহা ফজুর পাড়া, ইউনিয়ন: ফকিরহাট, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : অক্সিজেন, চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : সরওয়ার জামাল
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা (মুদির দোকান), ৫৯
মায়ের নাম : শাহিনা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫,০০০/=
আয়ের উৎস : মুদির দোকানের ব্যবসা
বাড়ী : পাকা বাড়ি
সম্পদ : ৬ গণ্ডা পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ভাই- বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ জামসেদুল ইসলাম, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: ব্যবসা
২. জেরিন আক্তার, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৯, পেশা: শিক্ষার্থী
৩. ইসরাত সুলতানা ইপ্তি, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী
৪. তিন বোন বিবাহিতা
আহত হওয়ার স্থান : নিউ মার্কেট, কেরানীহাট, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১ আগস্ট ২০২৪, রাত ১২টা
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় দমননীতির অংশ, যার লক্ষ্য ছিল জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে রক্তাক্ত করে তোলা। একদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাস, অন্যদিকে সরকারি পুলিশের বন্দুকের গুলি-এই যৌথ বর্বরতার শিকার হয়েছে হাজারো নিরীহ শিক্ষার্থী। যারা দাবি করেছিল শিক্ষা, গণতন্ত্র ও জীবনের নিরাপত্তা-তাদেরই ওপরে চালানো হয়েছে নির্মম হামলা, গুলি, গ্রেফতার এবং নিপীড়ন। হাসপাতালে যাওয়া পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয়েছে অনেকের। কোনো মানবিকতা, বিচারবোধ বা ন্যায়ের উপস্থিতি ছিল না। বরং ফ্যাসিস্ট দোসরদের মতো রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করেছে জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে।
জুলাই আন্দোলনের বীর: জাহেদুল ইসলাম
জাহেদুল ইসলাম একজন নির্ভীক, সংগ্রামী ও সাহসী ছাত্র, যিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অকুতোভয়ে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ফকিরহাট ইউনিয়নের ছদাহা ফজুর পাড়া গ্রামের এক সাদামাটা পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট। তার পিতা সরওয়ার জামাল একজন সাধারণ মুদির দোকানদার, যিনি সংগ্রামী জীবনের মধ্য দিয়ে নিজের সাত সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মা শাহিনা আক্তার একজন মমতাময়ী ও আদর্শ গৃহিণী, যিনি ভালোবাসা, ত্যাগ আর মূল্যবোধে সন্তানদের মানুষ করার কঠিন দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। জাহেদের পরিবারে রয়েছেন দুই ভাই ও পাঁচ বোন। বড় ভাই জামশেদুল ইসলাম একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিবাহিত। পাঁচ বোনের মধ্যে তিনজন বিবাহিত। চতুর্থ বোন জেরিন আক্তার (১৯) সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং সর্বকনিষ্ঠ বোন ইসরাত সুলতানা ইপ্তি (১৫) বর্তমানে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
দেশব্যাপী চলমান ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবির আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে জাহেদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নির্মম শিকার হন। শেখ হাসিনার সরকারপন্থী সন্ত্রাসী বাহিনী-ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় তার একটি হাত ভেঙে দুটি টুকরো হয়ে যায়।
এ হৃদয়বিদারক ঘটনার ফলে তিনি তার বহু আকাঙ্ক্ষিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি এবং এখনো শারীরিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে স্বাভাবিক পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারছেন না। তাঁর এই আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান জুলাই আন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে। জাহেদুল ইসলাম আজ নিছক একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি এক প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি-এক সাহসী কণ্ঠ, যার যন্ত্রণা, ত্যাগ আর বঞ্চনা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
আমি জাহেদুল ইসলাম, একজন ছাত্র এবং একজন আন্দোলনকারী। জুলাই মাসজুড়ে চলা ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবির আন্দোলনে আমি শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলাম। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট-এই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দিনগুলোর একটি। সকাল থেকেই আমরা কিছু শিক্ষার্থী নিউ মার্কেট চত্বরে, কেরানীহাট মোড়ে জড়ো হতে শুরু করি। লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবিগুলো জানানো। আন্দোলন তখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি, এমন সময় হঠাৎ করেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ছাত্রলীগ ও পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী আমাদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। আমি প্রাণ বাঁচাতে অন্যদের সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করি।
এমন সময় মানুষের ভিড়ে পড়ে যাই। উঠার চেষ্টা করছিলাম, তখনই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী দৌড়ে এসে আমার হাতে হকস্ট্রিক দিয়ে সজোরে আঘাত করে। আমার ডান হাত ভেঙে যায়-আক্ষরিক অর্থেই দুই টুকরো হয়ে যায়। ব্যথা, রক্ত আর আতঙ্কে আমি সেখানেই লুটিয়ে পড়ি। নড়াচড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলি। পরে কিছু সাহসী ছাত্র-জনতা আমাকে তুলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে আমার হাতের হাড় চূর্ণ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর ব্যথার মধ্য দিয়ে এখনও বেঁচে আছি, তবে আমি সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাইনি, কারণ এই ঘটনার কারণে আমি আমার বহু প্রতীক্ষিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
২০২৪ সালের ১ আগস্ট রাতে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকালে আমি নির্মম হামলার শিকার হয়ে গুরুতরভাবে আহত হই। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমাকে সরাসরি হাসপাতালে নিতে না পেরে কয়েকজন সাহসী সহযোদ্ধা গোপনে একটি গাড়িতে করে আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম মেডিকেলে পৌঁছানোর পরপরই আমাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা দ্রুত এক্স-রে করে নিশ্চিত হন যে, আমার হাতের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় অপারেশনের মাধ্যমে হাতে রড বসানো হয় এবং ব্যান্ডেজ করে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপে পাঠানো হয়।
চিকিৎসকেরা জানান,বর্তমানে যে রডটি হাতের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, সেটি স্থায়ীভাবে রাখা যাবে না। ভবিষ্যতে আরও একটি অপারেশনের মাধ্যমে রডটি অপসারণ করতে হবে,না হলে ইনফেকশন বা জটিলতা থেকে হাতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে আমি হাতের সেই গুরুতর আঘাত নিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারি না, লেখাপড়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চিকিৎসার খরচ ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে মানসিক চাপও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি বর্তমানে মারাত্মক শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। অপারেশনের মাধ্যমে আমার হাতে রড বসানো হয়েছে, যা ডাক্তারদের মতে, র্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ বা হাতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। বাবার ছোট একটি মুদি দোকান ছাড়া পরিবারের কোনো নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস নেই, আর আমি নিজে এখন কর্মক্ষম নই। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা আমাদের পরিবারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আমি সংশ্লিষ্ট মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং দয়ালু ব্যক্তিদের কাছে চিকিৎসা ব্যয়ে সহযোগিতা প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি, যাতে পরবর্তী অপারেশন সম্পন্ন করে আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারি এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারি।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
পূর্বে ছাত্র ছিলেন, বর্তমানে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে শহরে কর্মরত।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, যেখানে নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জাহেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২৫-০৮-২০০৭
জন্মস্থান : সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবি : সিকিউরিটি গার্ড
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: ছদাহা ফজুর পাড়া, ইউনিয়ন: ফকিরহাট, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : অক্সিজেন, চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : সরওয়ার জামাল
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা (মুদির দোকান), ৫৯
মায়ের নাম : শাহিনা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫,০০০/=
আয়ের উৎস : মুদির দোকানের ব্যবসা
বাড়ী : পাকা বাড়ি
সম্পদ : ৬ গণ্ডা পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ভাই- বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ জামসেদুল ইসলাম, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: ব্যবসা
২. জেরিন আক্তার, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৯, পেশা: শিক্ষার্থী
৩. ইসরাত সুলতানা ইপ্তি, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী
৪. তিন বোন বিবাহিতা
আহত হওয়ার স্থান : নিউ মার্কেট, কেরানীহাট, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১ আগস্ট ২০২৪, রাত ১২টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍