হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ আব্দুল আউয়াল ইমাদ
মোঃ আব্দুল আউয়াল ইমাদ

মোঃ আব্দুল আউয়াল ইমাদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, বিজিসি ট্রাস্ট, ছন্দনাইশ, চট্টগ্রাম

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


জন্ম যেখানে যেমন
পাইরোল গ্রামের ঘরে যেখান থেকে শুরু। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার এক প্রান্তে, জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের ছোট্ট এক গ্রাম পাইরোল। মাটি আর টিনে গড়া একজোড়া ঘর, পাঁচ শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। এই ঘরেই ২০০৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর, জন্ম নেয় মোঃ আব্দুল আউয়াল ইমাদ। তার বাবা, মোঃ এয়াকুব সাদা (৫৫), ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। দিন চলে দোকানের বিক্রিতে, রাতে জমা পড়ে হিসাবের চিন্তা। মা, মনোয়ারা বেগম (৪৫), সংসারের যোদ্ধা। তিন ভাইয়ের মধ্যে ইমাদ সবার বড়। ভাই ইয়াহইয়া সিয়াম, ৭ম শ্রেণিতে পড়ে, আর ছোট ভাই সাদ মাহমুদ ১ম শ্রেণির ছাত্র। মাসিক আয় ১৫,০০০ টাকা। এই টাকায় তিন ভাইয়ের পড়ালেখা, বাজার খরচ, ওষুধপত্র, সবই চলতে হয়। ঘরটা মাটির, চালা টিনের, গরমে আগুন ছুটে, বৃষ্টিতে ছাতা লাগে। এই ঘর থেকেই ইমাদ বেরিয়ে যেত কলেজে, বিজিসি ট্রাস্ট কলেজ, চন্দনাইশ। যেখানে তার স্বপ্ন ছিল একদিন দেশের জন্য কিছু করার, মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার।

রক্তের মধ্যে ভেঙে পড়া একটি বিকেল
১৮ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪:৩০ মিনিট। রাজপথ তখন মুখর আন্দোলনে। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল। ইমাদও ছিলেন সেদিন সবার সাথে। তার মুখে কোনো মাইক্রোফোন ছিল না, কিন্তু তার চোখে ছিল স্পষ্ট প্রতিবাদ, তার কণ্ঠে ছিল “সবার জন্য সমান অধিকার চাই”। বহদ্দারহাট মোড়ে পৌঁছাতেই আওয়ামী কর্মী ও পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়। যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং পুলিশ মিলে রাজপথে গুলি ছোঁড়ে। তার শরীর তখন প্রতিবাদের আগুনে ফুঁসছিল, কিন্তু মুহূর্তেই সে পড়ে যায়। কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়। রক্ত ঝরতে থাকে, কেউ পাশে দাঁড়ায় না। এতটা রক্ত কোনো ছাত্রের শরীর থেকে বের হলে কেবল চিকিৎসাই নয়। সমাজের বিবেককেও কাঁপে ওঠা উচিত ছিল। হাসপাতালের পথ থেকে ঘরের বিছানায়। আঘাতের পর ইমাদকে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার পা থেকে গুলি বের করেন, ব্যান্ডেজ করে দেন, ওষুধ দেন। কিন্তু আন্দোলনের গরম পরিস্থিতিতে, হাসপাতালেও অবস্থান করা সম্ভব ছিল না।
রাষ্ট্র যখন সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে, তখন হাসপাতালও এক অচেনা জায়গা হয়ে ওঠে। তাকে ফিরিয়ে আনা হয় ঘরে। আর চিকিৎসা চলে পাশের ফার্মেসি থেকে কেনা ওষুধে। তাকে বলা হয়— “চুপচাপ থাকো, বেশি কথা বলো না।” তার বাড়ির লোকজনও ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে নেয়। ইমাদের চিকিৎসা আজও শেষ হয়নি। পায়ের ব্যথা, সেলাইয়ের দাগ, ভয়ের ঘাম সবই সঙ্গে রয়েছে। রাত নামলে ব্যথা বাড়ে, ঘুম ভেঙে যায় বারবার। তবু চিকিৎসা হয় শুধু ব্যথানাশকে তাকে শক্ত করে দাঁড় করানোর কেউ নেই। আবারও স্বপ্ন দেখে, অসাড় পা নিয়েও ইমাদ আজও একজন ছাত্র। তাকে বলা হয়েছিল, “চুপ থাকো, না হলে আর হাঁটতে পারবে না।” কিন্তু সে ভাবে, “আমার পা হয়তো দুর্বল, কিন্তু আমার প্রতিবাদ থেমে যাবে কেন?” সে এখনো বই খুলে পড়ে, নোট তৈরি করে। যদিও উঠে দাঁড়ানো এখন কষ্টের, তবু তার চোখে আগের মতোই স্বপ্ন, একটি মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। সে চায় ন্যায়বিচার, চায় ন্যায্যতা। তাকে চাকরি দিতে কেউ আসেনি, চিকিৎসার খোঁজও কেউ রাখেনি। তবুও সে বেঁচে আছে। কারণ সে জানে, রাষ্ট্র যদি নিষ্ঠুর হয়, জনগণের হৃদয় যেন তা না হয়।
এক ছাত্র, এক রক্তাক্ত সত্য
ইমাদ শুধু গুলিবিদ্ধ এক যুবক নয়। সে এক প্রতীক। যে দেখিয়েছে, একটি রাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন ছাত্রও বলার অধিকার রাখে। “আমিও মানুষ, আমারও অধিকার আছে।” তার শরীরের গুলির দাগ রাষ্ট্র লুকাতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তা মুছে ফেলতে পারবে না। আজ ইমাদের মতো ছেলেরা রাষ্ট্রের গোলাম নয়, বিবেকের সৈনিক। তাদের গল্প লিখলে আগামী প্রজন্ম সাহস পায়, আর না লিখলে আমাদের নীরবতা একদিন রক্তে লেখা চিঠি হয়ে ফেরে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আব্দুল আউয়াল ইমাদ
জন্ম তারিখ : ১৪-১২-২০০৪
জন্মস্থান : চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, বিজিসি ট্রাস্ট, ছন্দনাইশ, চট্টগ্রাম
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পাইরোল, ইউনিয়ন: জঙ্গলখাইন, থানা: পটিয়া, জেলা :চট্টগ্রাম
পিতার নাম : মোঃ এয়াকুব সাদা
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসায়ী, ৫৫
মায়ের নাম : মনোয়ারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১৫,০০০/=
আয়ের উৎস : ব্যবসা
বাড়ি : মাটি ও টিন দিয়ে তৈরি
সম্পদ : ৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. ইয়াহহিয়া সিয়াম, বয়স: ১৪, ছাত্র, ৭ম শ্রেণি, সম্পর্ক: ভাই
২. সাদ মাহমুদ, বয়স: ৭, ছাত্র ১ম শ্রেণি, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : বহদ্দারহাট, পুলিশবক্স
আক্রমণকারী : যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই, ২০২৪, বিকাল ৪:৩০ টা
প্রস্তাবনা
১. উন্নত মেডিকেল চিকিৎসার পূর্ণ সরকারি ব্যয় প্রদান
২. পড়াশোনার জন্য স্থায়ী শিক্ষা বৃত্তি বরাদ্দ
৩. পরিবারকে মাসিক সহায়তা প্রদান
৪. ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত সরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৫. ঘর পাকা করার জন্য সরকারি গৃহ নির্মাণ সহায়তা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍