হোম / আহতদের তালিকা / মুহাম্মদ আব্দুল খালেক
মুহাম্মদ আব্দুল খালেক

মুহাম্মদ আব্দুল খালেক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ছাত্র, চট্টগ্রাম মহসীন কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মুহাম্মদ আব্দুল খালেক
পেশা: ছাত্র, চট্টগ্রাম মহসীন কলেজ
ক্রমিক- ৪৩৬
আইডি: চট্টগ্রাম- ২৬

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার একটি দ্বীপগ্রাম চরণদ্বীপ। এ গ্রামের সকাল শুরু হয় মেঘনা নদীর হাওয়ায়, আর রাত নামে মাটির ঘরের টিনের ছাদে ঝুম বৃষ্টির শব্দে। এখানেই ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর জন্ম নেয় মুহাম্মদ আব্দুল খালেক। তার বাবা, মুহাম্মদ আব্দুস সালাম, বয়স ৬২। সারা জীবন কৃষিকাজ করেই চলেছেন। মা, সুফিয়া বেগম, বয়স ৫২। সারাদিন ঘরের কাজ, মুরগি পালা আর ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করে দিন কাটে। মাসিক আয় ১০,০০০ টাকা। এই টাকায় চাল, ডাল, বই, ওষুধ, বোনের বিয়ের দেনা, সব কিছু চালাতে হয়। ঘরটা মাটির, চালা টিনের। বৃষ্টি হলে ঘরের এক কোণে চৌকি সরিয়ে অন্য কোণে রাখতে হয়। সম্পত্তি বলতে আছে মাত্র ৪ শতক জমি। যেখানে কখনো শাক সবজি হয়, কখনো শুধু আগাছা। খালেক এই ঘরে বড় হয়েছেন। তার ভাই আব্দুল কাদের (৩০) ও আব্দুল মান্নান (২৮)। দুজনেই দিনমজুর, কখনো রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, কখনো বেকার থাকেন। এই বাস্তবতার মধ্যেই খালেক হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের আশার আলো, যিনি পড়তেন চট্টগ্রাম মহসীন কলেজে, যার চোখে ছিলো রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন, যার বুকের ভেতরে ছিল এক অজানা তৃষ্ণা— “এই দেশে ন্যায়ের জায়গা কি আদৌ আছে?”

রাজপথে নামা এবং একটি রক্তাক্ত দুপুর
৪ আগস্ট ২০২৪। দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা রাস্তায়। চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন বাজার তখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। খালেকও ছিলেন সেদিন সেখানে। সে কারো নেতৃত্ব করেনি, কারো চক্রান্তে ছিল না, শুধু নিজের বিবেকের তাগিদে রাস্তায় গিয়েছিল। সেদিন ছিল একটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। খালেকের দাবি ছিল, সংবিধানের সম্মান, মানুষের ভোটাধিকার, ন্যায্যতা। মিছিল চলছিলো, খালেক একটু ক্লান্ত হয়ে সড়কের এক পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। ঠিক তখনই ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ, তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। পিছন দিক থেকে অতর্কিত হামলা। লোহার রড, কাঠের বাটাম দিয়ে তার পিঠ, পা, হাতে আঘাত করা হয়। কেউ গালাগালি দেয়, কেউ লাথি মারে। খালেক কিছু বোঝার আগেই শরীর তার নিথর হয়ে আসে। কোনোমতে সেখান থেকে পালিয়ে আসে সে। রক্তাক্ত, ব্যথিত, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা এক চেতনাহীন শরীর নিয়ে।
চিকিৎসা না হয়ে যন্ত্রণা, আর যন্ত্রণা
আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম শহরের বোনের বাসায়। কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক সঙ্কট এতই চরমে ছিলো যে, কোনো বড় ডাক্তার বা হাসপাতালে নেওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে, তাকে গ্রামে ফেরত আনা হয়। চরণদ্বীপে একজন পল্লি চিকিৎসক তাকে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দেন। এক্সরে করানো হয়নি, কারণ তাতে খরচ বেশি। পরিবার ভয় পায়। আবার যদি হামলা হয়? তারা চুপ থাকে। খালেকও চুপ। কিন্তু তার পিঠ, কোমর, হাঁটু সব চিৎকার করতে থাকে। আজও সেই ব্যথা চলে না। রাতে ঘুম আসে না, মাথা ভার হয়, পায়ের জয়েন্টে আগুন ধরে। তবুও, সে জানে চিকিৎসা ব্যয়বহুল, আর ব্যথা বিনামূল্যেই সহ্য করতে হয়। এই ছেলেটি আবারো বই খুলে, খালেক থেমে যায়নি। সে আবারো ফিরে এসেছে চট্টগ্রাম শহরে। আবারো মহসীন কলেজে যাত্রা শুরু হয়েছে। শরীর তার আগের মতো নেই, মনও অজস্র দাগে ক্ষতবিক্ষত। তবুও বই খোলে সে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ে, রাজনীতি পড়ে, সংবিধান পড়ে। যে রাষ্ট্র একদিন তাকে আঘাত করেছিল, আজ সে সেই রাষ্ট্রকেই বোঝার চেষ্টা করে। তার বুকের ভিতর এখনও এক প্রশ্ন, “রাষ্ট্র কি তার সন্তানদের পিঠে রড মারতে শেখে? না কি তাদের হাতে বই তুলে দিতে জানে?”
একজন খালেক মানেই একটি অবহেলিত রাষ্ট্রচিত্র
খালেক শহীদ হয়নি, তার নামে ব্যানার হয়নি, মুখে স্লোগান ওঠেনি, চোখে মোবাইল ক্যামেরা ধরা হয়নি। তবু সে প্রতিদিন একটি রাষ্ট্রীয় নীরবতার ভিতর দিয়ে মরে। তার বুকের ব্যথা, পিঠের ক্ষত আর মনের ভাঙাচোরা কল্পনাগুলো, সব মিলে এক অন্তরজ্বলন্ত যুদ্ধক্ষেত্র, যার কোনো সংবিধান নেই, বিচার নেই, সহানুভূতি নেই। খালেক প্রতিদিন একটি নিরুত্তর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকে । সে চিৎকার করে না, পোস্ট দেয় না, চায়ের দোকানে তর্কে জেতার চেষ্টা করে না। তবু তার ভেতরে গুমরে ওঠে অসংখ্য ‘কেন?’ “কেন আমি মার খেয়েছিলাম?” “কেন আমি আজও পুরোপুরি সেরে উঠিনি?” “কেন রাষ্ট্র আমায় না দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়?” খালেক একদিন চাকরি করতে চেয়েছিল। আজ সে ঘরে বসে হাঁটতে পারবে কিনা, রাতটা নির্ঘুম যাবে কিনা, সেই চিন্তায় জর্জরিত। তার স্বপ্নগুলো এখন মাথার ভেতর নয়, ওষুধের প্যাকেটের ভেতর আটকে থাকে।
আর আমরা, যারা ‘দেশপ্রেম’ শব্দটা বলে গলা শুকিয়ে ফেলি, আমরা কি এই ছেলেটার জন্য একবারও থেমে দেখি? হাসিনা কেবল রক্ত ঝরিয়ে চলে না, হাসিনা কখনো কখনো নীরবতার ছুরি চালিয়ে ধীরে ধীরে হত্যা করে। খালেক শহীদ হয়নি, কিন্তু হাসিনা তাকে বেঁচে থেকেও মেরে ফেলেছে। আমরা যদি আজ খালেকের মতো ছেলেদের কথা না লিখি, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাস একদিন আমাদের লেখার অধিকার ছিনিয়ে নেবে। তখন আর কিছু লেখা যাবে না, কারণ কাগজেও থাকবে রক্তের দাগ।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মুহাম্মদ আব্দুল খালেক
জন্ম তারিখ : ২৪-১০-১৯৯৯
জন্মস্থান : চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, চট্টগ্রাম মহসীন কলেজ
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: চরণদ্বীপ, ইউনিয়ন: ৭নং চরণদ্বীপ, থানা: বোয়ালখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
পিতার নাম : মুহাম্মদ আব্দুস সালাম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৬২
মায়ের নাম : সুফিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫২
মাসিক আয় : ১০,০০০/=
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬
বাড়ি : মাটি ও টিনের
সম্পদ : ৪ শতক পরিমাণ
ভাই- বোনদের তথ্যাদি
১. আব্দুল কাদের, বয়স: ৩০, পেশা: মিস্ত্রী সম্পর্ক: ভাই
২. আব্দুল মান্নান, বয়স: ২৮, পেশা: মিস্ত্রী সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : রিয়াজ উদ্দিন বাজার, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.০০টা
পুনর্বাসন প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করা
২. পড়াশোনার জন্য পূর্ণ বৃত্তির ব্যবস্থা
৩. পাকা বাসস্থান নির্মাণে সহায়তা
৪. পড়াশোনা শেষ হলে উপযুক্ত সরকারি/বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৫. স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন থেরাপি
৬. আহত ছাত্রদের জন্য পৃথক কল্যাণ তহবিল গঠন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍