মো: আব্দুল মুনতাকিম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
স্বৈরশক্তির নৃশংসতার চিহ্ন আজও গেঁথে
আছে মুনতাকিমের শরীরে
মো: আব্দুল মুনতাকিম
পেশা: ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)
ক্রমিক- ৪৩৭
আইডি: চট্টগ্রাম- ২৭
শান্ত নদীর স্রোতে জন্ম নেওয়া সংগ্রামী একটি নাম ১৩ নভেম্বর ২০০২, চট্টগ্রামের ১নং পানির কল এলাকার একটি সাদামাটা ঘরে জন্ম নেয় মোঃ আব্দুল মুনতাকিম। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণায় নয়, জন্ম হয় নিঃশব্দে, এক নিঃশ্বাসেই। বাইরের দুনিয়া তখনও জানতো না এই ছেলেটিই একদিন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম শিকার হয়ে ইতিহাসের পাতায় এক শব্দহীন চিৎকার হয়ে জায়গা করে নেবে। তার জন্মস্থানের নামটিও যেন প্রতীকী “পানির কল”।
পারিবারিক বর্ণনা
যেমন জল শান্ত থাকে, স্রোতের নিচে থাকে গভীর গতি তেমনি মুনতাকিমও ছোটবেলা থেকেই শান্ত-শিষ্ট, নম্র ও ভদ্র। সে কখনো কারো সঙ্গে তর্ক করত না, চিৎকার করত না, তবু ছিল তার ভেতরে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। একটি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা। পিতা-মাতা মুনতাকিমকে বড় করেছেন আদর্শ ও আস্থার পরশে। শিক্ষা ছিল তার জীবনের প্রথম ব্রত এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল জন্মগত। এভাবেই শুরু মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের গল্প। যেটি একদিকে এক মায়ের গর্ব, অন্যদিকে একটি নিঃশব্দ খুনী হাসিনার নির্মমতার দলিল।
ছোট একটি পরিবার, যার ভিত, কাঁপিয়ে দিয়েছে অন্যায়। মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের পরিবার এখনো এক সাদামাটা জীবনযাপন করে। বাবা মোঃ আব্দুল মতিন, বয়স ৫০, চাকরিজীবী। প্রতিদিন সকালে কাজে যান, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। পরিবারে শান্তি থাকুক, ছেলেরা মানুষ হোক এই চাওয়া নিয়েই বাঁচেন তিনি। মা রাশিদা আক্তার, বয়স ৪৪, একজন গৃহিণী। ঘরের কাজ সামলান, ছেলেদের খেয়াল রাখেন, পড়াশোনার প্রতি নজর দেন। তার চোখে মুনতাকিম শুধু ছেলে নয়, সে ছিল একটি স্বপ্ন, যে একদিন পরিবারকে আলোর মুখ দেখাবে। ছোট ভাই মোঃ রাইসুল ইসলাম, বয়স ১৮, চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে পড়াশোনা করে। ভাইয়ের চিকিৎসার খবরে সেও আজ দিশেহারা। এই চারজনের ছোট পরিবারে মাসিক আয় প্রায় ২৬,০০০ টাকা। তাদের ২০ শতক জমি আছে, বাড়ি সেমিপাকা। টিনের ছাউনি, পাকা মেঝে, কাঁচা বাস্তবতায় গড়া একখণ্ড আশ্রয়। এই পরিবারে বিলাসিতা নেই কিন্তু ভালোবাসা আছে। অভাব আছে কিন্তু আদর্শও আছে। তারা সাদামাটা, কিন্তু মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।
কর্ম ও শিক্ষা
মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন শিক্ষার্থী। তাঁর অধ্যয়ন চলছিল বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-তে। এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চতর জ্ঞানের চর্চাকেন্দ্র নয় বরং এটি একধরনের আদর্শের প্রতীক। যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তাধারা পাশাপাশি হাঁটে। আর এই দুই ধারার মিলনেই গড়ে উঠেছে মুনতাকিমের মানসিকতা। সে একাধারে কুরআনের আলোয় নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাসের জটিলতা নিয়েও চিন্তা করে। সে জানে, শুধু পাণ্ডিত্য নয়, একজন মানুষের দায়িত্বও শেখার বিষয়। আর এই বোধ থেকেই মুনতাকিম হয়ে উঠেছে ভিন্ন মাত্রার ছাত্র। একজন পাঠক, একজন বিশ্লেষক, একজন সচেতন নাগরিক। বাবা-মায়ের চোখে সে এমন এক সন্তান যে শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য স্বপ্ন বুনে। ভাইয়ের চোখে সে বন্ধুর মতো, আর প্রতিবেশীদের কাছে সে ভদ্র, নম্র, সর্বদা সালাম প্রদানকারী এক তরুণ।
তাঁর স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে দেশের জন্য কিছু করা। ভবিষ্যতে হয়তো সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবে, হয়তো প্রশাসনে ঢুকে সিস্টেমকে চিরদিনের জন্য ঠিক করবে। তার বন্ধুরা বলে, “মুনতাকিম এমন একজন, যার চোখে স্বপ্ন থাকলেও মুখে অহংকার নেই। সে সবসময় আত্মপ্রত্যয়ী, সদালাপী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিঃসংকোচ কণ্ঠস্বরের অধিকারী।” তবে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, ভয় না পাওয়া। সে জানে কীভাবে যুক্তির সাথে কথা বলতে হয়, কিভাবে অহিংস প্রতিবাদে বিশ্বাস রাখতে হয়। ক্লাসরুমে শিক্ষক যেমন তাকে পছন্দ করতেন তার সৌজন্যবোধের জন্য, তেমনি তার সহপাঠীরা তাকেই খুঁজতো যে কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের সমাধানে। এসব পরিচয়ে গড়ে ওঠা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী মুনতাকিম, যার বইয়ের ব্যাগে স্বপ্ন, আর হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম। সেই মুনতাকিম একদিন পড়লো খুনী হাসিনার পেটোয়া ছাত্রলীগ ও পুলিশের লাঠির নিচে। তার পায়ের হাড় ভেঙে গেলেও তার আদর্শ কখনো ভাঙেনি।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের অধ্যায় শুরু হয়। সারাদেশে শিক্ষার্থীরা একযোগে আন্দোলনে সামিল হয়। চাকরিতে কোটা সংস্কার, শিক্ষায় সমানাধিকার, ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারসহ একাধিক দাবিতে রাজপথ কাঁপে। এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নয় বরং এক নিঃস্ব জাতির অভ্যন্তরীণ আর্তনাদের প্রকাশ। যেখানে আইআইইউসি-এর মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শামিল হয় অধিকার প্রতিষ্ঠার শুদ্ধ যুদ্ধে।
আন্দোলনে যোগদান
যেখানে একটি গলির শেষপ্রান্তেই রাষ্ট্র তার নাগরিককে ভেঙে দেয় ১৮ জুলাই ২০২৪। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ যেন সেদিন ভারী হয়ে ছিল প্রতিজ্ঞায়। শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে। তারা আর সহ্য করতে পারছিল না বৈষম্য, শোষণ, অন্যায়। তারা রওনা দেয় ২নং গেইট, ষোলশহরের ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দিতে। তাদের হাতে ছিল না অস্ত্র, ছিল না রড, লাঠি বা হকস্টিক। শুধু ছিল সত্য বলার সাহস আর স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। পথে পথে ওঁত পেতে ছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা, পাশে পাশে ছিল পুলিশের নির্বিকার চোখ, যারা দেখেও না দেখার ভান করে। এই মিলিত দানবীয় জোট আচমকা আক্রমণ চালায়। মুনতাকিম ও তার কয়েকজন বন্ধু তখন একটি গলির মুখে এসে পড়ে। তারা দেখে পেছনে থেকে দৌড়ে আসছে লোহার রড, বাঁশের লাঠি, রক্তচক্ষু। তারা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে আশ্রয় নেয় একটি একতলা ঘরে। তাদের মনে হয়, ভেতরে ঢুকলে অন্তত মাথার ওপরে ছাদ থাকবে, প্রাণটা রক্ষা পাবে। কিন্তু না। এই দানবেরা জানালার শিক পেরিয়ে, দরজার কাঠ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা মানুষ নয় তারা হায়েনা। তারা ঘরে ঢুকে মুনতাকিমকে টেনে ফেলে। কেউ ধরে হাত, কেউ ধরে পা। আর একজন তীব্র লোহার রডের আঘাতে সজোরে আঘাত করে তার বাম পায়ে। একটা, দুইটা, তিনটা। হাড়ের চিড় ধরে কানের ভিতর দিয়ে। মুনতাকিম তখন আর কিছু শুনতে পায় না, চোখের সামনে অন্ধকার।
সে বুঝতে পারে। একটি রাষ্ট্র তার ছাত্রকে মারছে, কারণ সে প্রশ্ন তুলেছিল। যখন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই পা দু’টি ছিল নিথর। চোখে শুধু একটাই দৃশ্য। ভাঙাঘরের মেঝেতে নিজের রক্ত আর সন্ত্রাসীদের নিঃশ্বাস। এ হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক বর্বরতার প্রতিচ্ছবি। একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজের ভবিষ্যতকে গলির ভেতরে কেটে ফেলে, মুনতাকিম তার জীবন্ত প্রমাণ।
আহত পরবর্তী জীবন
মুনতাকিমের জীবন থেমে গেছে এক নির্দিষ্ট বিকেলবেলায়। ১৮ জুলাই ২০২৪ বিকাল চারটার দিকে সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা দেয়, তখনও তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের আলো। কিন্তু সেই বিকেল গড়িয়ে এখন সে প্রতিদিন বয়ে চলেছে ব্যথা, অবহেলা। আজ মুনতাকিম আর আগের মতো হাঁটতে পারে না। পায়ের হাড়ে এখনো ধাতব পাত বসানো। হাঁটতে গেলে ব্যথায় মুখ কুঁচকে যায়। বৃষ্টির দিনে সেই ব্যথা যেন পায়ের হাড় ছুঁয়ে হৃদয়ে উঠে আসে। মাঠে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পাসের কথা ভাবলে চোখে জল আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, বন্ধুদের আড্ডা, ক্যাম্পাসের মাটি। সব এখন কেবল স্মৃতির ভিতর। যেখানে সে একসময় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতো, এখন সেখানে শুধু ব্যথার হিসাব কষে। বন্ধুরা যখন বেড়াতে যায়, ক্লাসে ফিরে, মেসে আড্ডা দেয় মুনতাকিম তখন জানালার পাশে বসে থাকে। সে দেখে আকাশ, কিন্তু পা টেনে রাখতে হয় মাটিতে। মনে পড়ে যায় অপারেশনের সময় ডাক্তার কীভাবে বলেছিল “দুটা হাড়ে পাত বসাতে হবে, অন্তত দুই বছর পর খুলে ফেলা যাবে। তার আগে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।” এখন চলাফেরা মানে সাবধানতা। চলাফেরা মানে সীমাবদ্ধতা। চলাফেরা মানে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়া স্বৈরাচারী হাসিনা কীভাবে মানুষকে বিকলাঙ্গ করে দেয়।
তার ঘর এখনও আছে, বাবা-মা আছে, ভাই আছে। কিন্তু যে তরুণটি দেশের জন্য ভাবতো, স্বপ্ন দেখতো। সে মনটি আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে ব্যথার নীচে। মুনতাকিম এখনও বাঁচে, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাকে যুদ্ধ মনে হয়।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
যন্ত্রণার ভিতরে আটকে থাকা একটি চলমান জীবন আহতের পরপরই মুনতাকিমকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তখন তার বাম পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে, রক্তক্ষরণ থামছে না। পরিবার আতঙ্কে দিশেহারা। কী করবে, কোথায় যাবে? কিন্তু দ্রুতই বোঝা যায়, সরকারি হাসপাতালে সীমিত সুযোগে তার মতো গুরুতর জখমের চিকিৎসা সম্ভব নয়। তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। আর্থিক সংকটের মধ্যেও উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা। তাকে স্থানান্তর করা হয় মুরাদপুরের ডেল্টা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে। সেখানে দায়িত্ব নেন ডা. জাবেদ জাহাঙ্গীর তুহিন। ডাক্তাররা জানান, তার বাম পায়ের দু’টি হাড় ভেঙে গেছে এবং সেগুলো জোড়া লাগাতে ধাতব পাত বসানো ছাড়া বিকল্প নেই। এই অপারেশন শুধু একটি চিকিৎসা নয়, এটা ছিল মুনতাকিমের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতকে রক্ষা করার এক মরিয়া চেষ্টা। অপারেশন হয়। পাত বসানো হয় হাড়ে। পায়ের ভেতরে এখন ধাতব শরীর বয়ে বেড়ায় সে।
প্রতিদিন সেই পাত তাকে মনে করিয়ে দেয়, এ যন্ত্রণা কেবল একটি দিনের নয়, এটি এখন তার চলার সঙ্গী।
ডাক্তাররা জানিয়েছেন, এই অপারেশন শুধু প্রথম ধাপ
দুই বছর পর আবার অপারেশন করতে হবে সেই ধাতব পাতগুলো খোলার জন্য। তবে ততদিন পর্যন্ত চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা, ভারী কিছু তোলা নিষেধ এবং প্রয়োজন প্রতিনিয়ত ব্যথানাশক ওষুধের। মুনতাকিম এখনও চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিনের ওষুধ, ফলোআপ, ব্যান্ডেজ, এক্স-রে সব কিছুর পেছনে যে অর্থ লাগে, সেটা তার পরিবারের জন্য বোঝার চেয়েও বেশি। এই চিকিৎসা কেবল তার পায়ের চিকিৎসা নয়, এটি তার জীবনের পুনর্গঠনের যন্ত্রণাদায়ক একটি অধ্যায়।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম: মোঃ আব্দুল মুনতাকিম
জন্ম: ১৩-১১-২০০২
জন্মস্থান: চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: ১নং পানির কল, ইউনিয়ন: সরাই পাড়া
পিতার নাম: আব্দুল মতিন
পিতার পেশা ও বয়স চাকরি, ৫০
মায়ের নাম: রাশিদা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৪৪
মাসিক আয়: ২৬,০০০
আয়ের উৎস: পিতার চাকরি
বাড়ি: সেমি পাকা ঘর আছে
সম্পদ: ২০ শতক জমি আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪ জন, বাবা-মা, ভাই
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ রাইসুল ইসলাম, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম পলিটেকনিক, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার সময় ১৮ জুলাই, ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান চট্টগ্রাম শহরের ২নং গেইট সংলগ্ন, মেয়র গলি
চিকিৎসা: বাম পায়ে অপারেশনের মাধ্যমে পাত লাগিয়ে দুটি হাড় জোড়া দেয়া হয়েছে
প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসা: বাম পায়ের ধাতব পাত খোলার জন্য ভবিষ্যতে পুনরায় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি ও নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও এক্স-রে খরচে আর্থিক সহায়তা
২. কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা: শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারি বা বেসরকারি সংস্থায় উপযোগী চাকরির সুযোগ প্রদান। ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ থাকলে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে
৩. পুনর্বাসন সহায়তা: পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাসে এককালীন পুনর্বাসন অনুদান, পড়াশুনা চালিয়ে যেতে শিক্ষাবৃত্তি বা শিক্ষা-সহায়তা প্রদান
৪. বাসস্থান উন্নয়ন: সেমিপাকা বাড়ির উন্নয়নে অনুদান বা আর্থিক সহায়তা, আবাসন ঝুঁকিহীন করার জন্য ঘরের মেরামত বা পুনঃনির্মাণ সহায়তা
৫. মানসিক সহায়তা: সহিংসতার মানসিক ট্রমা কাটাতে কাউন্সেলিং ও মনো-সামাজিক সাপোর্ট প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা
আছে মুনতাকিমের শরীরে
মো: আব্দুল মুনতাকিম
পেশা: ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)
ক্রমিক- ৪৩৭
আইডি: চট্টগ্রাম- ২৭
শান্ত নদীর স্রোতে জন্ম নেওয়া সংগ্রামী একটি নাম ১৩ নভেম্বর ২০০২, চট্টগ্রামের ১নং পানির কল এলাকার একটি সাদামাটা ঘরে জন্ম নেয় মোঃ আব্দুল মুনতাকিম। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণায় নয়, জন্ম হয় নিঃশব্দে, এক নিঃশ্বাসেই। বাইরের দুনিয়া তখনও জানতো না এই ছেলেটিই একদিন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম শিকার হয়ে ইতিহাসের পাতায় এক শব্দহীন চিৎকার হয়ে জায়গা করে নেবে। তার জন্মস্থানের নামটিও যেন প্রতীকী “পানির কল”।
পারিবারিক বর্ণনা
যেমন জল শান্ত থাকে, স্রোতের নিচে থাকে গভীর গতি তেমনি মুনতাকিমও ছোটবেলা থেকেই শান্ত-শিষ্ট, নম্র ও ভদ্র। সে কখনো কারো সঙ্গে তর্ক করত না, চিৎকার করত না, তবু ছিল তার ভেতরে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। একটি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা। পিতা-মাতা মুনতাকিমকে বড় করেছেন আদর্শ ও আস্থার পরশে। শিক্ষা ছিল তার জীবনের প্রথম ব্রত এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল জন্মগত। এভাবেই শুরু মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের গল্প। যেটি একদিকে এক মায়ের গর্ব, অন্যদিকে একটি নিঃশব্দ খুনী হাসিনার নির্মমতার দলিল।
ছোট একটি পরিবার, যার ভিত, কাঁপিয়ে দিয়েছে অন্যায়। মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের পরিবার এখনো এক সাদামাটা জীবনযাপন করে। বাবা মোঃ আব্দুল মতিন, বয়স ৫০, চাকরিজীবী। প্রতিদিন সকালে কাজে যান, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। পরিবারে শান্তি থাকুক, ছেলেরা মানুষ হোক এই চাওয়া নিয়েই বাঁচেন তিনি। মা রাশিদা আক্তার, বয়স ৪৪, একজন গৃহিণী। ঘরের কাজ সামলান, ছেলেদের খেয়াল রাখেন, পড়াশোনার প্রতি নজর দেন। তার চোখে মুনতাকিম শুধু ছেলে নয়, সে ছিল একটি স্বপ্ন, যে একদিন পরিবারকে আলোর মুখ দেখাবে। ছোট ভাই মোঃ রাইসুল ইসলাম, বয়স ১৮, চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে পড়াশোনা করে। ভাইয়ের চিকিৎসার খবরে সেও আজ দিশেহারা। এই চারজনের ছোট পরিবারে মাসিক আয় প্রায় ২৬,০০০ টাকা। তাদের ২০ শতক জমি আছে, বাড়ি সেমিপাকা। টিনের ছাউনি, পাকা মেঝে, কাঁচা বাস্তবতায় গড়া একখণ্ড আশ্রয়। এই পরিবারে বিলাসিতা নেই কিন্তু ভালোবাসা আছে। অভাব আছে কিন্তু আদর্শও আছে। তারা সাদামাটা, কিন্তু মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।
কর্ম ও শিক্ষা
মোঃ আব্দুল মুনতাকিমের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন শিক্ষার্থী। তাঁর অধ্যয়ন চলছিল বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-তে। এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চতর জ্ঞানের চর্চাকেন্দ্র নয় বরং এটি একধরনের আদর্শের প্রতীক। যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তাধারা পাশাপাশি হাঁটে। আর এই দুই ধারার মিলনেই গড়ে উঠেছে মুনতাকিমের মানসিকতা। সে একাধারে কুরআনের আলোয় নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাসের জটিলতা নিয়েও চিন্তা করে। সে জানে, শুধু পাণ্ডিত্য নয়, একজন মানুষের দায়িত্বও শেখার বিষয়। আর এই বোধ থেকেই মুনতাকিম হয়ে উঠেছে ভিন্ন মাত্রার ছাত্র। একজন পাঠক, একজন বিশ্লেষক, একজন সচেতন নাগরিক। বাবা-মায়ের চোখে সে এমন এক সন্তান যে শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য স্বপ্ন বুনে। ভাইয়ের চোখে সে বন্ধুর মতো, আর প্রতিবেশীদের কাছে সে ভদ্র, নম্র, সর্বদা সালাম প্রদানকারী এক তরুণ।
তাঁর স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে দেশের জন্য কিছু করা। ভবিষ্যতে হয়তো সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবে, হয়তো প্রশাসনে ঢুকে সিস্টেমকে চিরদিনের জন্য ঠিক করবে। তার বন্ধুরা বলে, “মুনতাকিম এমন একজন, যার চোখে স্বপ্ন থাকলেও মুখে অহংকার নেই। সে সবসময় আত্মপ্রত্যয়ী, সদালাপী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিঃসংকোচ কণ্ঠস্বরের অধিকারী।” তবে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, ভয় না পাওয়া। সে জানে কীভাবে যুক্তির সাথে কথা বলতে হয়, কিভাবে অহিংস প্রতিবাদে বিশ্বাস রাখতে হয়। ক্লাসরুমে শিক্ষক যেমন তাকে পছন্দ করতেন তার সৌজন্যবোধের জন্য, তেমনি তার সহপাঠীরা তাকেই খুঁজতো যে কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের সমাধানে। এসব পরিচয়ে গড়ে ওঠা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী মুনতাকিম, যার বইয়ের ব্যাগে স্বপ্ন, আর হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম। সেই মুনতাকিম একদিন পড়লো খুনী হাসিনার পেটোয়া ছাত্রলীগ ও পুলিশের লাঠির নিচে। তার পায়ের হাড় ভেঙে গেলেও তার আদর্শ কখনো ভাঙেনি।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের অধ্যায় শুরু হয়। সারাদেশে শিক্ষার্থীরা একযোগে আন্দোলনে সামিল হয়। চাকরিতে কোটা সংস্কার, শিক্ষায় সমানাধিকার, ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারসহ একাধিক দাবিতে রাজপথ কাঁপে। এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নয় বরং এক নিঃস্ব জাতির অভ্যন্তরীণ আর্তনাদের প্রকাশ। যেখানে আইআইইউসি-এর মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শামিল হয় অধিকার প্রতিষ্ঠার শুদ্ধ যুদ্ধে।
আন্দোলনে যোগদান
যেখানে একটি গলির শেষপ্রান্তেই রাষ্ট্র তার নাগরিককে ভেঙে দেয় ১৮ জুলাই ২০২৪। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ যেন সেদিন ভারী হয়ে ছিল প্রতিজ্ঞায়। শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে। তারা আর সহ্য করতে পারছিল না বৈষম্য, শোষণ, অন্যায়। তারা রওনা দেয় ২নং গেইট, ষোলশহরের ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দিতে। তাদের হাতে ছিল না অস্ত্র, ছিল না রড, লাঠি বা হকস্টিক। শুধু ছিল সত্য বলার সাহস আর স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। পথে পথে ওঁত পেতে ছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা, পাশে পাশে ছিল পুলিশের নির্বিকার চোখ, যারা দেখেও না দেখার ভান করে। এই মিলিত দানবীয় জোট আচমকা আক্রমণ চালায়। মুনতাকিম ও তার কয়েকজন বন্ধু তখন একটি গলির মুখে এসে পড়ে। তারা দেখে পেছনে থেকে দৌড়ে আসছে লোহার রড, বাঁশের লাঠি, রক্তচক্ষু। তারা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে আশ্রয় নেয় একটি একতলা ঘরে। তাদের মনে হয়, ভেতরে ঢুকলে অন্তত মাথার ওপরে ছাদ থাকবে, প্রাণটা রক্ষা পাবে। কিন্তু না। এই দানবেরা জানালার শিক পেরিয়ে, দরজার কাঠ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা মানুষ নয় তারা হায়েনা। তারা ঘরে ঢুকে মুনতাকিমকে টেনে ফেলে। কেউ ধরে হাত, কেউ ধরে পা। আর একজন তীব্র লোহার রডের আঘাতে সজোরে আঘাত করে তার বাম পায়ে। একটা, দুইটা, তিনটা। হাড়ের চিড় ধরে কানের ভিতর দিয়ে। মুনতাকিম তখন আর কিছু শুনতে পায় না, চোখের সামনে অন্ধকার।
সে বুঝতে পারে। একটি রাষ্ট্র তার ছাত্রকে মারছে, কারণ সে প্রশ্ন তুলেছিল। যখন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই পা দু’টি ছিল নিথর। চোখে শুধু একটাই দৃশ্য। ভাঙাঘরের মেঝেতে নিজের রক্ত আর সন্ত্রাসীদের নিঃশ্বাস। এ হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক বর্বরতার প্রতিচ্ছবি। একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজের ভবিষ্যতকে গলির ভেতরে কেটে ফেলে, মুনতাকিম তার জীবন্ত প্রমাণ।
আহত পরবর্তী জীবন
মুনতাকিমের জীবন থেমে গেছে এক নির্দিষ্ট বিকেলবেলায়। ১৮ জুলাই ২০২৪ বিকাল চারটার দিকে সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা দেয়, তখনও তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের আলো। কিন্তু সেই বিকেল গড়িয়ে এখন সে প্রতিদিন বয়ে চলেছে ব্যথা, অবহেলা। আজ মুনতাকিম আর আগের মতো হাঁটতে পারে না। পায়ের হাড়ে এখনো ধাতব পাত বসানো। হাঁটতে গেলে ব্যথায় মুখ কুঁচকে যায়। বৃষ্টির দিনে সেই ব্যথা যেন পায়ের হাড় ছুঁয়ে হৃদয়ে উঠে আসে। মাঠে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পাসের কথা ভাবলে চোখে জল আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, বন্ধুদের আড্ডা, ক্যাম্পাসের মাটি। সব এখন কেবল স্মৃতির ভিতর। যেখানে সে একসময় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতো, এখন সেখানে শুধু ব্যথার হিসাব কষে। বন্ধুরা যখন বেড়াতে যায়, ক্লাসে ফিরে, মেসে আড্ডা দেয় মুনতাকিম তখন জানালার পাশে বসে থাকে। সে দেখে আকাশ, কিন্তু পা টেনে রাখতে হয় মাটিতে। মনে পড়ে যায় অপারেশনের সময় ডাক্তার কীভাবে বলেছিল “দুটা হাড়ে পাত বসাতে হবে, অন্তত দুই বছর পর খুলে ফেলা যাবে। তার আগে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।” এখন চলাফেরা মানে সাবধানতা। চলাফেরা মানে সীমাবদ্ধতা। চলাফেরা মানে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়া স্বৈরাচারী হাসিনা কীভাবে মানুষকে বিকলাঙ্গ করে দেয়।
তার ঘর এখনও আছে, বাবা-মা আছে, ভাই আছে। কিন্তু যে তরুণটি দেশের জন্য ভাবতো, স্বপ্ন দেখতো। সে মনটি আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে ব্যথার নীচে। মুনতাকিম এখনও বাঁচে, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকাকে যুদ্ধ মনে হয়।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
যন্ত্রণার ভিতরে আটকে থাকা একটি চলমান জীবন আহতের পরপরই মুনতাকিমকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তখন তার বাম পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে, রক্তক্ষরণ থামছে না। পরিবার আতঙ্কে দিশেহারা। কী করবে, কোথায় যাবে? কিন্তু দ্রুতই বোঝা যায়, সরকারি হাসপাতালে সীমিত সুযোগে তার মতো গুরুতর জখমের চিকিৎসা সম্ভব নয়। তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। আর্থিক সংকটের মধ্যেও উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা। তাকে স্থানান্তর করা হয় মুরাদপুরের ডেল্টা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে। সেখানে দায়িত্ব নেন ডা. জাবেদ জাহাঙ্গীর তুহিন। ডাক্তাররা জানান, তার বাম পায়ের দু’টি হাড় ভেঙে গেছে এবং সেগুলো জোড়া লাগাতে ধাতব পাত বসানো ছাড়া বিকল্প নেই। এই অপারেশন শুধু একটি চিকিৎসা নয়, এটা ছিল মুনতাকিমের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতকে রক্ষা করার এক মরিয়া চেষ্টা। অপারেশন হয়। পাত বসানো হয় হাড়ে। পায়ের ভেতরে এখন ধাতব শরীর বয়ে বেড়ায় সে।
প্রতিদিন সেই পাত তাকে মনে করিয়ে দেয়, এ যন্ত্রণা কেবল একটি দিনের নয়, এটি এখন তার চলার সঙ্গী।
ডাক্তাররা জানিয়েছেন, এই অপারেশন শুধু প্রথম ধাপ
দুই বছর পর আবার অপারেশন করতে হবে সেই ধাতব পাতগুলো খোলার জন্য। তবে ততদিন পর্যন্ত চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা, ভারী কিছু তোলা নিষেধ এবং প্রয়োজন প্রতিনিয়ত ব্যথানাশক ওষুধের। মুনতাকিম এখনও চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিনের ওষুধ, ফলোআপ, ব্যান্ডেজ, এক্স-রে সব কিছুর পেছনে যে অর্থ লাগে, সেটা তার পরিবারের জন্য বোঝার চেয়েও বেশি। এই চিকিৎসা কেবল তার পায়ের চিকিৎসা নয়, এটি তার জীবনের পুনর্গঠনের যন্ত্রণাদায়ক একটি অধ্যায়।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম: মোঃ আব্দুল মুনতাকিম
জন্ম: ১৩-১১-২০০২
জন্মস্থান: চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: ১নং পানির কল, ইউনিয়ন: সরাই পাড়া
পিতার নাম: আব্দুল মতিন
পিতার পেশা ও বয়স চাকরি, ৫০
মায়ের নাম: রাশিদা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৪৪
মাসিক আয়: ২৬,০০০
আয়ের উৎস: পিতার চাকরি
বাড়ি: সেমি পাকা ঘর আছে
সম্পদ: ২০ শতক জমি আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪ জন, বাবা-মা, ভাই
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মোঃ রাইসুল ইসলাম, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম পলিটেকনিক, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার সময় ১৮ জুলাই, ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান চট্টগ্রাম শহরের ২নং গেইট সংলগ্ন, মেয়র গলি
চিকিৎসা: বাম পায়ে অপারেশনের মাধ্যমে পাত লাগিয়ে দুটি হাড় জোড়া দেয়া হয়েছে
প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসা: বাম পায়ের ধাতব পাত খোলার জন্য ভবিষ্যতে পুনরায় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি ও নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও এক্স-রে খরচে আর্থিক সহায়তা
২. কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা: শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারি বা বেসরকারি সংস্থায় উপযোগী চাকরির সুযোগ প্রদান। ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ থাকলে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে
৩. পুনর্বাসন সহায়তা: পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাসে এককালীন পুনর্বাসন অনুদান, পড়াশুনা চালিয়ে যেতে শিক্ষাবৃত্তি বা শিক্ষা-সহায়তা প্রদান
৪. বাসস্থান উন্নয়ন: সেমিপাকা বাড়ির উন্নয়নে অনুদান বা আর্থিক সহায়তা, আবাসন ঝুঁকিহীন করার জন্য ঘরের মেরামত বা পুনঃনির্মাণ সহায়তা
৫. মানসিক সহায়তা: সহিংসতার মানসিক ট্রমা কাটাতে কাউন্সেলিং ও মনো-সামাজিক সাপোর্ট প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍