হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবু রায়হান
মো: আবু রায়হান

মো: আবু রায়হান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ছাত্র, কক্সবাজার সিটি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আবু রায়হান শহীদ না হলেও রাষ্ট্রীয় গুলিতে আহত হওয়া এই তরুণ এখন এক জীবন্ত দলিল যে প্রমাণ করে, কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেবল মরে গেলেই শহীদ হয় না; কেউ কেউ জীবিত থেকেও প্রতিদিন রক্ত দেয়।

২০০১ সালের ২ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুইছড়ি গ্রামে জন্ম নেয় মোঃ আবু রায়হান। গ্রামের এক কোণে বাঁশের ঝোপে ঘেরা ছোট্ট ঘরে তার প্রথম কান্না শোনা যায়। যে কান্না পরবর্তীতে এক প্রতিবাদী কণ্ঠে রূপ নেয়। তার জন্মের সময় চারদিকে শুধু অভাব, সংকট আর টিকে থাকার লড়াই। শৈশব কাটে কাঁচা রাস্তার ধুলো মেখে, সরু পুকুরপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে আর খালি পায়ে স্কুলে দৌড়ে গিয়ে। বাড়ির সামনের আমগাছ, মায়ের হাতের ভাত আর বাবার কাঠের দোকানের ঘ্রাণ। সব মিলিয়ে এক সাদামাটা, অথচ আত্মমর্যাদায় ভরপুর জীবন। ছোটবেলায় থেকেই সে খুব কম কথা বলে, কিন্তু চোখে সব কিছু বোঝার চেষ্টা করে।
যখন মা বলেন, “বাবা তোকে মানুষ করতে চাই,” তখন সে মুচকি হাসে। কারণ সেই ছোট্ট ছেলেটিও জানে, মানুষ হবার মানে কেবল বড় চাকরি নয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও মানুষ হবার বড় প্রমাণ। পুইছড়ির ওই মাটির গন্ধ, গ্রামীণ জীবন আর দরিদ্র বাস্তবতা। এই তিনে মিশে গড়ে ওঠে আবু রায়হানের এক সত্তা, যে স্বপ্ন দেখে, পড়ে, আর একদিন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলে।
কর্ম ও শিক্ষা
আবু রায়হান এখন একজন শিক্ষার্থী। সে কক্সবাজার সিটি কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য অধ্যয়ন করছে। ছাত্র হিসেবে সে অত্যন্ত মনোযোগী, নিরহংকারী এবং দায়িত্বশীল। কলেজের পাঠক্রমের বাইরে দেশ, সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে গভীর আগ্রহ রয়েছে তার। মেধার পাশাপাশি তার চিন্তা-চেতনায় রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছা। পড়াশোনার পাশাপাশি আবু রায়হান পারিবারিক কাজে সাহায্য করে। বাবা মোঃ বেলাল উদ্দীনের কাঠের ছোট্ট ব্যবসা থেকেই সংসারের খরচ চলে। কিন্তু আয় মাত্র ১৫,০০০ টাকা। সেই টাকায় চলে ছয় সদস্যের একটি পরিবার। যেখানে আবু রায়হান নিজের খরচ কমিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। তার বন্ধুদের ভাষায়- “রায়হান ভেতরে ভীষণ শক্ত একজন মানুষ। বাইরে যতই শান্ত দেখাক, অন্যায়ের সামনে সে কখনো মাথা নত করে না।” সে একদিন সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চায়, কারণ রাষ্ট্র ও রাজনীতির হিংস্র মুখগুলো সে খুব কাছ থেকে দেখেছে। সে বিশ্বাস করে, “শিক্ষিত না হলে প্রতিবাদ শক্তি হারিয়ে ফেলে, আর প্রতিবাদ না থাকলে মানুষ মানুষ থাকে না।” এই শিক্ষার পথেই হেঁটে সে যোগ দেয় ইতিহাস গড়া এক আন্দোলনে। যেখানে তার জীবন পুরোপুরি পাল্টে যায়।
পারিবারিক বর্ণনা
আবু রায়হানের পরিবারটি গ্রামীণ বাংলাদেশে হাজারো সংগ্রামী পরিবারের প্রতিচ্ছবি। বাঁশখালীর পুইছড়ির প্রত্যন্ত গ্রামে, বাঁশের বেড়া আর টিনের চালে ঘেরা ছোট্ট ঘরটিই তাদের আশ্রয়, ভালোবাসা আর লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। তার বাবা মোঃ বেলাল উদ্দীন একজন কাঠের ব্যবসায়ী। কিন্তু ‘ব্যবসা’ শব্দটি এখানে বড় মনে হলেও বাস্তবতা হলো- বাঁশ, কাঠ ও খুঁটির ছোটখাটো কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালান। মাসিক আয় মাত্র ১৫,০০০ টাকা, যার মধ্যে খাবার, ওষুধ, পোশাক, লেখাপড়া। সবই টানাটানি করে চলে। মা জান্নাতুন নায়েম একজন গৃহিণী। তিনি সারাদিন সংসার সামলান, কখনো মাটির চুলার পাশে, কখনো ছোট বোনকে পড়াতে গিয়ে ক্লান্ত চোখে পুকুর পাড়ে বসেন। তিনিই পরিবারের নীরব প্রেরণা, যিনি কষ্ট লুকিয়ে হাসেন, কাঁদেন চুপিচুপি। রায়হানের ভাই মনির খান, বয়স ২১, এখনো নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বোন জান্নাতুল, ১৮ বছর বয়সী এক সরল শিক্ষার্থী, যার চোখে এখনো স্বপ্নের জল। এই পরিবারের কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, নেই জমজমাট শহুরে আভিজাত্য- তবে আছে অটুট একতা, ভালোবাসা আর আত্মসম্মান। তাদের ৪ শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ঘরটিই যেন সাক্ষী হয়ে আছে। খুনি হাসিনা অবহেলা করলেও এই পরিবার একে অপরকে ধরে রেখেছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি কালো অধ্যায়। এ সময়টায় সারাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন। সরকারের একচেটিয়া দখলদারি, চাকরিতে অঞ্চলভিত্তিক কোটাবৈষম্য, গুম-খুন-নির্যাতন আর বাকস্বাধীনতার গলা চেপে ধরা পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষেরা রাজপথে নামে। এই আন্দোলন কোনো একক দলের ছিল না। এটি ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান, যেখানে ছাত্ররা কাঁধে বই রেখে হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে নেয়, যেখানে বাঁশের ফাঁক দিয়ে “স্বাধীনতা চাই”, “বৈষম্যের অবসান চাই” শ্লোগান উঠতে থাকে। সরকার, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে এই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করতে চায়। তারা চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদের ওপর নেমে আসে নির্বিচারে গুলি, লাঠিপেটা, গুম ও গ্রেপ্তারের মতো ভয়াবহ নির্যাতন।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর শেখেরখীল, চাম্বল, পটিয়া, বহদ্দারহাট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, ২ নম্বর গেইট এ এলাকাগুলোও হয়ে ওঠে রক্তাক্ত মাঠ, যেখানে তরুণদের রক্তে রঞ্জিত হয় মাটির পথ। গরিব, মেধাবী, বই হাতে রাজপথে দাঁড়ানো ছেলেরা হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। এই দুঃসহ সময়ে আবু রায়হানও চুপ থাকতে পারে না। কক্সবাজার থেকে নিজের গ্রামে ফিরে আসে শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে- “চুপ থাকলে শুধু আমি নয়, পুরো প্রজন্ম অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।” সেখান থেকেই শুরু হয় তার আরেক জীবনের গল্প, যেটা কেবল তার নয়- পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার একটা নির্মম চেহারা উন্মোচনের গল্প।
আন্দোলনে যোগদান
মোঃ আবু রায়হান কক্সবাজার সিটি কলেজের একজন সাধারণ ছাত্র। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের সূর্য যখন দগদগে রোদে জ্বলছিল, তখন তার মনে জ্বলছিল অন্য এক আগুন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগুন। ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল চারটা। বাঁশখালীর পুইছড়ি থেকে রায়হান যায় শেখেরখীল রাস্তার মাথায়, যেখানে স্থানীয় ছাত্র-জনতা মিছিল করে চাম্বল বাজারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শত শত কণ্ঠে গর্জে উঠেছিল- “বৈষম্যের অবসান চাই, ছাত্রদের রক্তের দাম চাই!” কিন্তু তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী পেটোয়া মুজিব বাহিনী, হারুন বাহিনী, এবং পুলিশ- সরকারের প্রশ্রয়ে তৈরি এক হায়েনার দল। তারা মিছিল লক্ষ্য করে হঠাৎ গুলি চালায়। কেউ পালিয়ে বাঁচে, কেউ পড়ে যায়, আর সে সময় এক বুলেট গিয়ে বিদ্ধ হয় রায়হানের পায়ে। ভয়ের চিৎকার আর রক্তের গন্ধে রাস্তা তখন এক ভয়ার্ত গহ্বরে রূপ নেয়। রায়হান পড়ে যায় রাস্তায়। গুলিবিদ্ধ পায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। কিন্তু ভয়, ক্ষোভ আর বেঁচে থাকার তাগিদ তাকে টেনে নেয় স্থানীয়দের আশ্রয়ে। তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় পল্লী চিকিৎসকের কাছে। রক্তপাত থামিয়ে তাকে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। তখনও রায়হান বোঝে না, তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
আহত পরবর্তী জীবন
গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই বিকেল যেন মোঃ আবু রায়হানের জীবনের দিক পাল্টে দেয়। একটা পা। যা নিয়ে সে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ, মাঠ আর হাটে ঘুরে বেড়াতো, সেই পা-ই আজ তার কষ্টের উৎস। চিকিৎসা করাতে হয় গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে। পরে নেয়া হয় বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। দামি ওষুধ, উন্নত চিকিৎসা, কিংবা এক্স-রে সবই তখন কল্পনার জিনিস। কারণ পরিবার চালায় মাসে মাত্র ১৫,০০০ টাকায়।
রায়হান এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। গুলির স্পর্শ শরীর থেকে মুছে গেলেও তার ব্যথা, দুর্বলতা, আর হাঁটার কষ্ট রয়ে গেছে প্রতিটি দিনে। চাম্বল বাজারের সে দিন আজও ফিরে আসে স্বপ্নে, সে ঘুম ভেঙে যায় রাতের গভীরে, বুক ধড়ফড় করে। কখনো পায়ে ব্যথা, কখনো মনে প্রশ্ন- “আমার অপরাধ কী ছিল?” ক্লাসে বসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। বন্ধুরা খেলা করে, হেঁটে চলে যায় দূর-দূরান্তে সে শুধু চেয়ে দেখে, এক পা একটু টেনে নিয়ে হাঁটতে শেখে। এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু শারীরিকভাবে না, মানসিকভাবেও পঙ্গু করে তুলছে। তবু রায়হান ভেঙে পড়ে না। সে জানে, তার মতো হাজার তরুণ আজ রক্ত দিয়েছে, কেউ শহীদ হয়েছে, কেউ পঙ্গু। সে তাদের একজন, যারা ভবিষ্যতের ইতিহাসের ভিত্ গড়েছে নিজের শরীরের দাগ দিয়ে।
প্রস্তাবনা
১. মোঃ আবু রায়হানের উন্নত চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক
২. তার শারীরিক পুনর্বাসনের জন্য দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন
৩. চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সেবা অবাধে সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হোক
৪. তার শিক্ষা অব্যাহত রাখতে টিউশনে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন
৫. পরিবারকে সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিয়ে চিকিৎসার ব্যয়ভার কমানো উচিত
৬. দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় এনজিও ও সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেয়া হোক
৭. তার সামাজিক ও মানসিক সমর্থনের জন্য স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি চালু করা হোক
৮. আক্রান্তদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আবু রায়হান
জন্ম তারিখ : ০২-০৯-২০০১
জন্মস্থান : বাঁশখালী
পেশা : ছাত্র, কক্সবাজার সিটি কলেজ
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: পুইছড়ি, ইউনিয়ন: পুইছড়ি, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মোঃ বেলাল উদ্দীন
পিতার পেশা ও বয়স : কাঠের ব্যবসা
মায়ের নাম : জান্নাতুন নায়েম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
বাড়ি : বাঁশের বেড়া ও টিন
সম্পদ : ৪ শতক জমি আছে
মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : পিতার কাঠের ব্যবসা
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মনির খান, বয়স: ২১, সম্পর্ক: ভাই
২. জান্নাতুল, বয়স: ১৮, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : শেখেরখীল রাস্তার মাথা থেকে চাম্বল বাজার
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ (মুজিব বাহিনী ও হারুন বাহিনী)
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍