হোম / আহতদের তালিকা / আবুল হাসনাত
আবুল হাসনাত

আবুল হাসনাত

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চাকরি, হিলটপ রেস্টুরেন্ট

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

গুলির ভেতর বেঁচে থাকা এক প্রাণ
মো: আবুল হাসনাত
পেশা: চাকরি, হিলটপ রেস্টুরেন্ট
ক্রমিক: ৪৩৯
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ২৯

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর দক্ষিণ পুইছড়ি গ্রামে ২০০১ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল ভোরে জন্ম নেয় মোঃ আবুল হাসনাত। এই জনপদে সূর্য ওঠে ধানের গন্ধ মেখে, শিশুর কান্না মিশে যায় মায়ের কোলের উষ্ণতায়। জন্মের পর থেকেই তার চারপাশে ছিল দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর জীবনের সঙ্গে প্রতিদিনের বোঝাপড়া। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই হাসনাত নিজেকে আলাদা করে গড়ে তোলে একজন শান্ত, দায়িত্বশীল আর পরিশ্রমী তরুণ হিসেবে।

কর্ম
পড়ালেখা থেমে যায় পারিবারিক চাপে, কিন্তু থেমে থাকে না জীবন। হাসনাত এখন কাজ করে চট্টগ্রামের “হিলটপ রেস্টুরেন্ট”-এ। রেস্টুরেন্টের চায়ের কাপ ধোয়া থেকে শুরু করে অতিথিদের খাবার পরিবেশন, সবই সে করে হাসিমুখে। কারণ এ কাজই এখন তার মা ও শিশুপুত্রের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। রোজ সকালে কাজে বের হওয়ার সময় হাসনাত চোখে রোদ পড়া মাটির উঠোন পেরিয়ে হাঁটে। মনে পড়ে তার ছোট ভাইয়ের হাসি, মায়ের ক্লান্ত মুখ, আর নিজের বাচ্চা সন্তানের চাহনি। তার কাজ শুধু বেতন নয়, তার কাজ একটা পরিবারের নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনতে নিজের ঘাম ঝরানো।

পারিবারিক বর্ণনা
বাবা মাহবুবুল আলম আর বেঁচে নেই। সংসারের ভার পুরোপুরি এসে পড়ে হাসনাতের কাঁধে। মা রিফতারা বেগম, ৪২ বছর বয়সী, কষ্টের সংসারে হাসিমুখে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন। পরিবারে আর কেউ উপার্জনক্ষম নেই। হাসনাতের কোলে এখন মাত্র ১০ মাস বয়সী একটি ছেলে মোঃ তাজবীর। এই শিশুর মুখে দুধ তুলে দেয়ার লড়াই এখন প্রতিদিনের যুদ্ধ। তাদের ঘর বাঁশ ও টিনে তৈরি, সম্পদ বলতে আছে মাত্র ২ শতক জমি। এই জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিবার। যার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে এই তরুণ।

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের এক দগদগে ক্ষত। ছাত্র-জনতা যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে, তখন ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়াল বাহিনী ও পুলিশ মিলে এক নারকীয় তাণ্ডব চালায়। বাঁশখালী, পটিয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা সব জায়গায় রক্তের ছাপ। হাজারো সাধারণ ছেলে-মেয়ের স্বপ্নে আঘাত আসে খুনি হাসিনার শাসকের লাঠি, রাবার বুলেট, শর্টগান ও গুলির মাধ্যমে।

আন্দোলনে যোগদান
৪ আগস্ট ২০২৪। সকাল ১০টা। হাসনাত তখন নিউমার্কেট এলাকায় জনতার মিছিলে দাঁড়িয়ে। তার চোখে কোনো ব্যানার নেই, নেই কোনো দলের পতাকা। থাকে কেবল দেশের জন্য ক্ষোভ, ভালোবাসা আর সাম্যবাদের স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করেই আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। চারপাশ থেকে গুলি ছুটে আসে। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে মিছিল। বুলেট আসে, টিয়ারশেল ছোড়া হয়, লাঠি ও লোহার রড দিয়ে চালানো হয় দফায় দফায় আঘাত। হাসনাত মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়, পায়ে ও হাতে পড়ে আঘাত। কিছুই বুঝে ওঠার আগেই সে লুটিয়ে পড়ে।
আহত পরবর্তী জীবন
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয় হাসনাতকে। সেখানে ৫ দিন ধরে চলে চিকিৎসা। তার মাথার গুলির জখম আজও ঠিক হয়নি। ব্যথা এখনও মাথার পেছনে হুম হুম করে ওঠে। হাত ও পায়ের আঘাত স্বাভাবিক চলাফেরায় বাঁধা দেয়। আজও সে রেস্টুরেন্টে যেতে চায়, কিন্তু শরীর বলে “থেমে যাও!” পুত্র তাজবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে সে দাঁত কামড়ে আবার রিকশায় উঠে কাজে যায়। শরীর বলে “না”, মন বলে “হ্যাঁ”, কারণ এখন আর একা বাঁচা নয়, পরিবারটাকেও বাঁচিয়ে রাখা তার দায়িত্ব।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
ঘটনার পর হাসনাত সরাসরি ভর্তি হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাথার আঘাত এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চোটের জন্য তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ৫ দিনের মধ্যে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও আজও সে পুরোপুরি সুস্থ নয়। চিকিৎসা চলছে বাসা থেকে, তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর কোনো নিউরো-হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় ডাক্তাররা। কিন্তু সে খরচ একজন রেস্টুরেন্ট কর্মচারির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সে এখনও কেবল ওষুধ আর ব্যথানাশকে ভর করে বেঁচে আছে।
শেষ কথা
মোঃ আবুল হাসনাত একজন কর্মজীবী তরুণ যার কোনো রাজনীতি নেই, কিন্তু ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মন। আজ তার মাথায় গুলির চিহ্ন, পায়ে ব্যথা, কিন্তু চোখে এখনো প্রতিরোধের দীপ্তি। এই রাষ্ট্র যদি তার মতো সাধারণ মানুষকে গুলি করে চুপ করাতে চায়, তাহলে ইতিহাস একদিন চুপ করবে না। আমাদের প্রয়োজন এখন এই সাধারণ মানুষদের অসাধারণ লড়াইকে তুলে ধরা এবং সাহসে পাশে দাঁড়ানো।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আবুল হাসনাত
জন্ম তারিখ : ০১-১২-২০০১
জন্মস্থান : বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পেশা : চাকরি, হিলটপ রেস্টুরেন্ট
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ পুইছড়ি, ইউনিয়ন: পুইছড়ি, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মাহবুবুল আলম
মায়ের নাম : রিফতারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
বাড়ি : বাঁশের বেড়া এবং টিন
সম্পদ : ২ শতক জমি আছে
সন্তানের বিবরণ
১. মো: তাজবীর, বয়স: ১০ মাস, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : নিউমার্কেট, চট্টগ্রাম
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, সকাল ১০.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ বাহিনী
চিকিৎসা : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ছুরির আঘাতের জখম এখনও পরিপূর্ণ সুস্থ হয়নি
প্রস্তাবনা
১. মাথার উন্নত চিকিৎসা ও স্নায়ুবিশেষজ্ঞের অধীনে পূর্ণ চিকিৎসা
২. পুনর্বাসনের জন্য স্বল্পশ্রমে উপযুক্ত চাকরি
৩. শিশুপুত্রের জন্য শিক্ষা সহায়তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা
৪. পরিবারের জন্য একটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণে সহায়তা
৫. আইনগত সহায়তা এবং নির্যাতনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
৬. আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍