মোঃ আনিছুর রহমান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
গুলির ক্ষত নিয়ে সে এখনও
বেঁচে আছে নীরবে
মোঃ আনিছুর রহমান
পেশা: ছাত্র, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ে, নবম: শ্রেণি
ক্রমিক: ৪৪০
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ৩০
২০০৮ সালের ১৯ এপ্রিল, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেয় মোঃ আনিছুর রহমান। চারপাশে ধানক্ষেত, মাটির ঘর আর ছায়াঘেরা বাঁশবন। এই প্রকৃতির কোলে সে বেড়ে ওঠে। গ্রামীণ কোলাহল ও কষ্ট তার জীবনের অংশ, কিন্তু সে কষ্ট কখনো তাকে থামাতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে বাবার ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর মায়ের নিরব আত্মত্যাগ। তাদের চোখে জীবনের কঠিন বাস্তবতা ধরা পড়ে, কিন্তু আনিছুরের চোখে থাকে স্বপ্ন। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আলোকিত মানুষ হবার।
কর্ম ও শিক্ষা
আনিছুর এখন পড়ছে নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ে। মাত্র নবম শ্রেণিতে, কিন্তু তার চিন্তা ও উপলব্ধি বয়স ছাড়িয়ে যায়। সে শুধু বই পড়ে না, খেয়াল করে দেশের অবস্থা, মানুষের অসহায়ত্ব, রাষ্ট্রের অবিচার। তার স্বপ্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠা। স্কুলশেষে সে মাঝে মাঝে বাবার কৃষিকাজে সাহায্য করে। ভাই-বোনদের পড়ায় সাহায্য করে। পরিবারে এক টুকরো আশার নাম এখন সে।
পারিবারিক বর্ণনা
আনিছুর রহমানের পরিবার একটি সাধারণ কৃষক পরিবার, যাদের জীবনগাঁথা প্রতিটি দিনে লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম আর আশার গল্প। তার বাবা মোঃ আব্দুল মোনাফ, বয়স ৪৪, একজন পরিশ্রমী কৃষক। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি জমির দিকে রওয়ানা হন, সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত সেই মাঠেই কাটে তার দিন। বছরের পর বছর, ঋতুর পর ঋতু। এই জমিতেই বীজ বুনে সংসার টিকিয়ে রাখেন তিনি। মা মোরশেদা বেগম, বয়স ৩৯, ঘর সামলান, সন্তানদের দেখভাল করেন। রান্না, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সন্তানদের পড়াশোনা, দেখাশোনা, সব দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। তার চোখে যেন পৃথিবীর সব প্রার্থনা জমা আছে। সন্তানদের সুস্থতা, লেখাপড়া, আর একটু ভালো দিন দেখার আশা। এই পরিবারে সদস্য ৮ জন। পাঁচজন সন্তান নিয়েই তাদের মূলত চলমান সংসার। বড় বোন জয়নাব সুলতানা, এসএসসি পাশ করে এখন ঘরেই সময় কাটায়; ভাগ্যের ফেরে উচ্চশিক্ষা তার কাছে এখনও দূর স্বপ্ন। আকলিমা সুলতানা, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে স্থানীয় মাদ্রাসায়। প্রতিদিন সকালে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে স্কুলে যায়, কখনও জুতো ছাড়া পায়ে। মোমেনা সিকদার, ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মায়ের আঁচল ধরে স্কুলে যেতে ভালোবাসে।
আর ছোট্ট উর্মী সুলতানা, বয়স মাত্র ১ বছর ৬ মাস। এই ঘরের প্রাণ। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা। এই টাকায় চলে খাবার, কাপড়, ওষুধ, স্কুলের খরচ আর কখনও কখনও ধার শোধ। বাড়ির অবস্থা- মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি আর একটা ছোট উঠান। বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, গরমে টিন গরম হয়ে উঠে। বাবার নামে মাত্র ৬০ শতক জমি আছে, যেখানে ধান, শাকসবজি আর মৌসুমি কিছু ফসল চাষ করেন। সেই জমির ফলনেই কোনোভাবে খাওয়া-পরা চলে। কখনো চাল থাকে, কিন্তু ডাল থাকে না। কখনও শিশুদের বই কেনার টাকা আসে না, চিকিৎসার খরচ মেটানো যায় না। এই পরিবারে ঈদ মানে পুরনো জামা ধুয়ে নতুন করে পরা। আনন্দের দিনেও মায়ের চোখে জল ঝরে। শুধু এই ভেবে, “আরেকটা ভালো দিন কখন আসবে?” আনিছুর এই সংসারের এক বড় আশার নাম। তার শিক্ষাজীবন আর লড়াইয়ের মধ্যেই যেন এই পরিবারের ভবিষ্যত লুকিয়ে আছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাাসা, এমনকি স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায় নামে। অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ জেগে ওঠে। প্রতিটি মিছিল, প্রতিটি শ্লোগান তখন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে- “আমরা কেন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারি না?” শেখেরখীল অঞ্চলেও আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছায়। আনিছুর তখন শিবিরের সাথে মিছিলে যোগ দেয়। তার বয়স তখন মাত্র ১৬, কিন্তু তার চোখে থাকে ভয় নয়, থাকে প্রতিবাদ।
আন্দোলনে যোগদান
৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টার দিকে আনিছুর শিবিরের ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেয়। তারা যখন শেখেরখীল রাস্তার মাথায় পৌঁছায়, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় ২০-২৫ জন পুলিশ সদস্য। আন্দোলনকারীরা তাদের বলেন, “আমাদের পাঁচ মিনিট সময় দিন, আমরা সরে যাচ্ছি।” পুলিশ রাজি হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চাম্বল জেনারেল হাসপাতালের দিক থেকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সমন্বিত বাহিনী আসে এবং শুরু হয় গুলিবর্ষণ। আনিছুর সেই মুহূর্তে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। চারপাশে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কেউ পড়ে থাকে রক্তে, কেউ দৌড়ে পালায়। আনিছুর মাটিতে পড়ে যায়, চোখে অন্ধকার নেমে আসে।
আহত পরবর্তী জীবন
আনিছুরের জীবন থেমে যায় সে দিন। প্রথমে স্থানীয় একজন পল্লি চিকিৎসকের কাছে যায় তার পরিবার। তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার তার পা থেকে বুলেট বের করেন। এরপর দেয়া হয় ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। কিন্তু এখনও সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে কষ্ট হয়, ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে ব্যথায়। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। খেলাধুলা ভুলে গেছে। বন্ধুদের মাঝে সে আর আগের মতো হাসে না। তার চোখে এখন শুধু একটি প্রশ্ন। “আমি কী দোষ করেছিলাম?”
চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য
আহত হওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা পল্লি চিকিৎসকের মাধ্যমে নেয়। পরে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বুলেট অপসারণ করা হয়। ডাক্তার দামি ও হাই-পাওয়ারের ওষুধ দেন। উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও আর্থিক অক্ষমতার কারণে তা এখনো সম্ভব হয়নি। আজও মাঝে মাঝে পায়ের ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
একনজরে প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন: বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও আনিছুর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। শরীরের মধ্যে গুলির ক্ষত রয়েছে, স্নায়ু দুর্বলতা এবং শারীরিক ব্যথা অনুভব করে। উন্নতমানের সেবা ও নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা জরুরি।
২. পরিবারের জন্য পুনর্বাসন সহায়তা প্রয়োজন: কৃষিনির্ভর এই পরিবারে ৮ সদস্যের ভরণপোষণ একা বাবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাবার জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ (যেমন- কৃষি উপকরণ, ছাগল/মুরগি পালন, স্থানীয়ভাবে ভর্তুকিমূলক ব্যবসা) জরুরি।
৩. শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা: আনিছুর একজন ছাত্র। আহত হওয়ার পর তার লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা ও ভরণপোষণ খরচে শিক্ষার খরচ চালানো কঠিন। এজন্য তাকে শিক্ষাবৃত্তি বা বই-খাতা, ইউনিফর্ম, যাতায়াত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
৪. একটি ঘর নির্মাণ সহায়তা: তাদের ঘর মাটির দেয়ালে, টিনের ছাউনিতে তৈরি। বর্ষাকালে পানি পড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে বসবাস করা যায় না। একটি পাকা বা আধা পাকা ঘরের সহায়তা পেলে পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পাবে।
৫. পরিবারভিত্তিক খাদ্য সহায়তা: আনিছুরের আহত হওয়ার পর কৃষিকাজ ব্যাহত হয়েছে। ফলে মাসিক খাদ্য খরচ মেটানো কঠিন। কমপক্ষে ৬ মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা (চাল, ডাল, তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য) প্রদান করা প্রয়োজন।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আনিছুর রহমান
জন্ম তারিখ : ১৯-০৪-২০০৮
জন্মস্থান : বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : শেখেরখীল, ইউনিয়ন: শেখেরখীল, থানা: বাঁশখালী জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মোঃ আব্দুল মোনাফ
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৪৪
মায়ের নাম : মোরশেদা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৯
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ি : মাটির কাঁচা ঘর
সম্পদ : পরিবারের ৬০ শতক জমি আছে
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. জয়নাব সুলতানা, বয়স: ২০, পেশা: শিক্ষার্থী
২. আকলিমা সুলতানা, বয়স: ১৪, শেখেরখীল দাখিল মাদরাসা, ৭ম শ্রেণি
৩. মোমেনা সিকদার, বয়স: ৪, ১ম শ্রেণি
৮. উর্মী সুলতানা, বয়স: ১.৬ মাস
আহত হওয়ার স্থান : চাম্বল বাজার সড়ক, চট্টগ্রাম
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
চিকিৎসা: বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: উন্নত চিকিৎসা দরকার
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: বাবার চাকরি
বেঁচে আছে নীরবে
মোঃ আনিছুর রহমান
পেশা: ছাত্র, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ে, নবম: শ্রেণি
ক্রমিক: ৪৪০
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ৩০
২০০৮ সালের ১৯ এপ্রিল, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেয় মোঃ আনিছুর রহমান। চারপাশে ধানক্ষেত, মাটির ঘর আর ছায়াঘেরা বাঁশবন। এই প্রকৃতির কোলে সে বেড়ে ওঠে। গ্রামীণ কোলাহল ও কষ্ট তার জীবনের অংশ, কিন্তু সে কষ্ট কখনো তাকে থামাতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে বাবার ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর মায়ের নিরব আত্মত্যাগ। তাদের চোখে জীবনের কঠিন বাস্তবতা ধরা পড়ে, কিন্তু আনিছুরের চোখে থাকে স্বপ্ন। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আলোকিত মানুষ হবার।
কর্ম ও শিক্ষা
আনিছুর এখন পড়ছে নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ে। মাত্র নবম শ্রেণিতে, কিন্তু তার চিন্তা ও উপলব্ধি বয়স ছাড়িয়ে যায়। সে শুধু বই পড়ে না, খেয়াল করে দেশের অবস্থা, মানুষের অসহায়ত্ব, রাষ্ট্রের অবিচার। তার স্বপ্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠা। স্কুলশেষে সে মাঝে মাঝে বাবার কৃষিকাজে সাহায্য করে। ভাই-বোনদের পড়ায় সাহায্য করে। পরিবারে এক টুকরো আশার নাম এখন সে।
পারিবারিক বর্ণনা
আনিছুর রহমানের পরিবার একটি সাধারণ কৃষক পরিবার, যাদের জীবনগাঁথা প্রতিটি দিনে লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম আর আশার গল্প। তার বাবা মোঃ আব্দুল মোনাফ, বয়স ৪৪, একজন পরিশ্রমী কৃষক। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি জমির দিকে রওয়ানা হন, সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত সেই মাঠেই কাটে তার দিন। বছরের পর বছর, ঋতুর পর ঋতু। এই জমিতেই বীজ বুনে সংসার টিকিয়ে রাখেন তিনি। মা মোরশেদা বেগম, বয়স ৩৯, ঘর সামলান, সন্তানদের দেখভাল করেন। রান্না, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সন্তানদের পড়াশোনা, দেখাশোনা, সব দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। তার চোখে যেন পৃথিবীর সব প্রার্থনা জমা আছে। সন্তানদের সুস্থতা, লেখাপড়া, আর একটু ভালো দিন দেখার আশা। এই পরিবারে সদস্য ৮ জন। পাঁচজন সন্তান নিয়েই তাদের মূলত চলমান সংসার। বড় বোন জয়নাব সুলতানা, এসএসসি পাশ করে এখন ঘরেই সময় কাটায়; ভাগ্যের ফেরে উচ্চশিক্ষা তার কাছে এখনও দূর স্বপ্ন। আকলিমা সুলতানা, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে স্থানীয় মাদ্রাসায়। প্রতিদিন সকালে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে স্কুলে যায়, কখনও জুতো ছাড়া পায়ে। মোমেনা সিকদার, ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মায়ের আঁচল ধরে স্কুলে যেতে ভালোবাসে।
আর ছোট্ট উর্মী সুলতানা, বয়স মাত্র ১ বছর ৬ মাস। এই ঘরের প্রাণ। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা। এই টাকায় চলে খাবার, কাপড়, ওষুধ, স্কুলের খরচ আর কখনও কখনও ধার শোধ। বাড়ির অবস্থা- মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি আর একটা ছোট উঠান। বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, গরমে টিন গরম হয়ে উঠে। বাবার নামে মাত্র ৬০ শতক জমি আছে, যেখানে ধান, শাকসবজি আর মৌসুমি কিছু ফসল চাষ করেন। সেই জমির ফলনেই কোনোভাবে খাওয়া-পরা চলে। কখনো চাল থাকে, কিন্তু ডাল থাকে না। কখনও শিশুদের বই কেনার টাকা আসে না, চিকিৎসার খরচ মেটানো যায় না। এই পরিবারে ঈদ মানে পুরনো জামা ধুয়ে নতুন করে পরা। আনন্দের দিনেও মায়ের চোখে জল ঝরে। শুধু এই ভেবে, “আরেকটা ভালো দিন কখন আসবে?” আনিছুর এই সংসারের এক বড় আশার নাম। তার শিক্ষাজীবন আর লড়াইয়ের মধ্যেই যেন এই পরিবারের ভবিষ্যত লুকিয়ে আছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাাসা, এমনকি স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায় নামে। অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ জেগে ওঠে। প্রতিটি মিছিল, প্রতিটি শ্লোগান তখন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে- “আমরা কেন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারি না?” শেখেরখীল অঞ্চলেও আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছায়। আনিছুর তখন শিবিরের সাথে মিছিলে যোগ দেয়। তার বয়স তখন মাত্র ১৬, কিন্তু তার চোখে থাকে ভয় নয়, থাকে প্রতিবাদ।
আন্দোলনে যোগদান
৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টার দিকে আনিছুর শিবিরের ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেয়। তারা যখন শেখেরখীল রাস্তার মাথায় পৌঁছায়, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় ২০-২৫ জন পুলিশ সদস্য। আন্দোলনকারীরা তাদের বলেন, “আমাদের পাঁচ মিনিট সময় দিন, আমরা সরে যাচ্ছি।” পুলিশ রাজি হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চাম্বল জেনারেল হাসপাতালের দিক থেকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সমন্বিত বাহিনী আসে এবং শুরু হয় গুলিবর্ষণ। আনিছুর সেই মুহূর্তে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। চারপাশে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কেউ পড়ে থাকে রক্তে, কেউ দৌড়ে পালায়। আনিছুর মাটিতে পড়ে যায়, চোখে অন্ধকার নেমে আসে।
আহত পরবর্তী জীবন
আনিছুরের জীবন থেমে যায় সে দিন। প্রথমে স্থানীয় একজন পল্লি চিকিৎসকের কাছে যায় তার পরিবার। তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার তার পা থেকে বুলেট বের করেন। এরপর দেয়া হয় ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। কিন্তু এখনও সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে কষ্ট হয়, ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে ব্যথায়। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। খেলাধুলা ভুলে গেছে। বন্ধুদের মাঝে সে আর আগের মতো হাসে না। তার চোখে এখন শুধু একটি প্রশ্ন। “আমি কী দোষ করেছিলাম?”
চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য
আহত হওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা পল্লি চিকিৎসকের মাধ্যমে নেয়। পরে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বুলেট অপসারণ করা হয়। ডাক্তার দামি ও হাই-পাওয়ারের ওষুধ দেন। উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও আর্থিক অক্ষমতার কারণে তা এখনো সম্ভব হয়নি। আজও মাঝে মাঝে পায়ের ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
একনজরে প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন: বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও আনিছুর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। শরীরের মধ্যে গুলির ক্ষত রয়েছে, স্নায়ু দুর্বলতা এবং শারীরিক ব্যথা অনুভব করে। উন্নতমানের সেবা ও নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা জরুরি।
২. পরিবারের জন্য পুনর্বাসন সহায়তা প্রয়োজন: কৃষিনির্ভর এই পরিবারে ৮ সদস্যের ভরণপোষণ একা বাবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাবার জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ (যেমন- কৃষি উপকরণ, ছাগল/মুরগি পালন, স্থানীয়ভাবে ভর্তুকিমূলক ব্যবসা) জরুরি।
৩. শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা: আনিছুর একজন ছাত্র। আহত হওয়ার পর তার লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা ও ভরণপোষণ খরচে শিক্ষার খরচ চালানো কঠিন। এজন্য তাকে শিক্ষাবৃত্তি বা বই-খাতা, ইউনিফর্ম, যাতায়াত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
৪. একটি ঘর নির্মাণ সহায়তা: তাদের ঘর মাটির দেয়ালে, টিনের ছাউনিতে তৈরি। বর্ষাকালে পানি পড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে বসবাস করা যায় না। একটি পাকা বা আধা পাকা ঘরের সহায়তা পেলে পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পাবে।
৫. পরিবারভিত্তিক খাদ্য সহায়তা: আনিছুরের আহত হওয়ার পর কৃষিকাজ ব্যাহত হয়েছে। ফলে মাসিক খাদ্য খরচ মেটানো কঠিন। কমপক্ষে ৬ মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা (চাল, ডাল, তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য) প্রদান করা প্রয়োজন।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আনিছুর রহমান
জন্ম তারিখ : ১৯-০৪-২০০৮
জন্মস্থান : বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : শেখেরখীল, ইউনিয়ন: শেখেরখীল, থানা: বাঁশখালী জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মোঃ আব্দুল মোনাফ
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৪৪
মায়ের নাম : মোরশেদা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৯
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ি : মাটির কাঁচা ঘর
সম্পদ : পরিবারের ৬০ শতক জমি আছে
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. জয়নাব সুলতানা, বয়স: ২০, পেশা: শিক্ষার্থী
২. আকলিমা সুলতানা, বয়স: ১৪, শেখেরখীল দাখিল মাদরাসা, ৭ম শ্রেণি
৩. মোমেনা সিকদার, বয়স: ৪, ১ম শ্রেণি
৮. উর্মী সুলতানা, বয়স: ১.৬ মাস
আহত হওয়ার স্থান : চাম্বল বাজার সড়ক, চট্টগ্রাম
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
চিকিৎসা: বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: উন্নত চিকিৎসা দরকার
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: বাবার চাকরি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍