হোম / আহতদের তালিকা / মো: আরফাত
 মো: আরফাত

মো: আরফাত

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শ্রমিক (রাজমিস্ত্রী)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: আরফাত
পেশা: শ্রমিক (রাজমিস্ত্রী)
ক্রমিক: ৪৪১
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ ৩১

২০০৫ সালের ৩ জুলাই, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নের এক ছোট্ট গ্রাম লাল জীবন। নামেই যার এক জীবন্ত ইতিহাস, সেই গ্রামেই জন্ম নেয় মোঃ আরফাত। তার জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে স্বপ্নের চেয়ে প্রয়োজন বেশি আহারের। আগেই দুশ্চিন্তা এসে দাঁড়ায়। খুব অল্প বয়সেই আরফাত তা বুঝে ফেলে, জীবন কেবল জন্মদিনের কেক বা ঈদের জামার নাম নয়। জন্মের কয়েক বছরের মাথায় পরিবারের জীবন সংগ্রামে যুক্ত হয় সে নিজেও। একজন শিশু শ্রমিক হিসেবে। তার চারপাশের শিশুরা যখন স্কুলের মাঠে খেলছিল, আরফাত তখন কাঁধে তুলছিল ইঁট। জন্ম শুধু তার একটি দিন নয়, বরং এক যুদ্ধের সূচনা। যেখানে প্রতিদিনই টিকে থাকতে হয় অভাব, বৈষম্য আর অবহেলার বিপরীতে।

কর্ম
আরফাত বর্তমানে একজন রাজমিস্ত্রী শ্রমিক। কিশোর বয়সেই সে কাজ শেখে একজন সহকারী হিসেবে। প্রথম দিকে মাটি টানা, বালতি ধোয়া বা মিস্ত্রির যন্ত্রপাতি গুছিয়ে দেয়াই ছিল তার কাজ। এখন সে নিজেই দেয়াল গাঁথে, প্লাস্টার করে, নতুন ঘর বানায়। অথচ নিজের থাকার ঘরটি এখনও বাঁশের বেড়া ঘেরা, টিনের চালের অস্থায়ী আশ্রয়। তার কাজের সময় কোনো ছুটি নেই, অসুস্থতা নেই, নেই কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দিনের বেলায় সে রোদে-ঘামে ভিজে কাজ করে; আর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বোনের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। সে জানে, তার হাতে তৈরি ঘরগুলো একদিন কারো বাসস্থান হবে, কিন্তু তার নিজের মাথার ওপর ছাদের নিশ্চয়তা নেই। রাজমিস্ত্রী হিসেবে কাজ করলেও, আরফাতের ভিতর আছে এক যোদ্ধার হৃদয়। সে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিল না, নেতা ছিল না, বরং ছিল এক সাধারণ শ্রমজীবী যুবক যার ভেতরে ছিলো একটি অসাধারণ সাহস। সেই সাহসই তাকে রাজপথে নিয়ে আসে অন্যায়ের প্রতিবাদে।
পারিবারিক বর্ণনা
মোঃ আরফাতের পরিবার একটি হতদরিদ্র, শ্রমজীবী পরিবার। পিতা সেলিম উল্লাহ, বয়স মাত্র ৩৬, কিন্তু কাঁধে যেন ষাট বছরের ভার। তিনি একজন দিনমজুর। কখনো রড-বালির কাজ, কখনো নির্মাণাধীন ভবনের খাটুনিতে দিন কাটান। সংসারের আয় বলতে মাস শেষে যা হাতে আসে, তা বড়জোর ১৬,০০০ টাকা। এই অর্থ দিয়ে চাল, ডাল, ওষুধ, পড়ালেখা, সন্তানদের জামা-কাপড় সবকিছু মেটাতে হয়। মা নাছিমা বেগম মাত্র ২৪ বছর বয়সী। বয়সে তরুণী হলেও জীবনের ভারে ক্লান্ত। ঘরের সব কাজ করেন তিনি, আবার শিশু সন্তানদের লালনপালন করেন একা হাতে। কখনো পরের বাড়িতে গিয়ে ছোটখাটো কাজে সাহায্যও করেন, যাতে বাড়তি কিছু রোজগার হয়। আরফাতের দুটি বোন রয়েছে। সাদিয়া সুলতানা, বয়স ১২, ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন হেঁটে মাদ্রাসায় যায় শেখেরখীল দারুসসালাম আদর্শ সিনিয়র মাদ্রাসায়। স্কুলের ফি দেয়ার মতো অর্থ না থাকলে সে মুখ নিচু করে বাড়িতে বসে থাকে। সাফা মারওয়া সাবিহা, বয়স মাত্র ৩ বছর। সে এখনো পুরোপুরি কথা বলতে শেখেনি, কিন্তু তার নিষ্পাপ মুখে লেখা থাকে এক ভবিষ্যতের অপেক্ষা। তাদের বাড়ি একটি বাঁশের বেড়ার কাঁচাঘর। বর্ষাকালে চারদিক দিয়ে পানি চুঁয়ে পড়ে, শীতে বাঁশের ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢোকে। ঘরের ভেতর মাটির মেঝে, প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা কিছু অংশ। তারা কোনো জমির মালিক নয়। এক ইঞ্চি জমিও নেই। আশপাশের প্রতিবেশীর সহানুভূতি আর সেলিম উল্লাহর ঘামের উপার্জনে চলে তাদের জীবন। এই পরিবারটি যেন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে শত শত পরিবার আছে, যাদের ভাগ্যে উন্নয়নের স্লোগান পৌঁছায় না, কিন্তু রাজপথে রক্ত ঝরে তাদেরই সন্তানদের। আরফাতের পরিবার শুধু একটি ছেঁড়া ছাউনি নয়, এটা একটি সমাজের মুখচ্ছবি, যেখানে প্রতিদিন স্বপ্ন টিকে থাকে একটু ভাত, ঔষধ আর একটু সম্মানের আশায়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে শুরু হয় এক ইতিহাসবিধ্বংসী গণআন্দোলন। যেখানে মিছিলে নামে স্কুল ছাত্র, শ্রমিক, মাদ্রাসার হাফেজ, কলেজ-পড়ুয়া তরুণী, রিকশাচালক, এমনকি গ্রাম্য কৃষকও। সবাই এক সুরে বলে উঠে “বৈষম্যের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের পতনের জন্য।” এই আন্দোলন ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়। এটা ছিল বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়াই। এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। শেখেরখীল, চাম্বল, পুইছড়ি, নাপোড়া প্রতিটি গ্রামে আন্দোলনের স্লোগান গর্জে ওঠে। এই সময়েই মোঃ আরফাত, যিনি তখন একজন রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন, বুঝে ফেলেন। শুধু খেটে খাওয়া দিয়ে জীবন চলবে না, রাষ্ট্র যদি তোমার কণ্ঠটাকেও চেপে ধরে। তার মাথায় ঘুরতে থাকে একটাই প্রশ্ন— “আমার ছোট বোনটা এই রাষ্ট্রে মাথা তুলে কথা বলতে পারবে তো?” আরফাত কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মিছিলে যোগ দেন ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে। সে জানে না, এই সিদ্ধান্ত তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। চাম্বল বাজারের দক্ষিণ পাশে অপেক্ষায় ছিল হাসিনার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী। পুলিশ আর ছাত্রলীগের ছদ্মবেশী গুন্ডারা। প্রথমে তারা ইট, পাটকেল, গালি দিয়ে তেড়ে আসে। তারপর শুরু হয় গুলিবর্ষণ। আরফাতের শরীরে ঢুকে যায় একের পর এক গুলি। রক্তে ভেসে যায় তার জামা, ছেঁড়া প্যান্ট আর বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা চোখ দুটি। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তবুও শেষবারের মতো তার মুখে ভেসে ওঠে একটি বাক্য- “আমি কিছু বলেছিলাম, তাই কি আমায় গুলি করতে হলো?” বন্ধুরা ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করে। অটোরিকশায় উঠিয়ে এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। তখনও তার শরীরে ঢুকে আছে ২০টিরও বেশি বুলেট। এই অংশগ্রহণ ছিল আরফাতের জীবনের সবচেয়ে সত্যবাদী কাজ। যে রাষ্ট্র তার খাবার দিতে পারে না, তাকে রক্ষা করতে পারে না তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সে রাজপথে যায়, আর ফিরে আসে গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে। এখনও আরফাতের পায়ে গুলি রয়ে গেছে। প্রতিদিন ব্যথা বাড়ে, ক্ষত শুকায় না। তবু সে জানে এই পথ সে নিজে বেছে নিয়েছে, কারণ ন্যায়ের জন্য চুপ থাকা পাপ।
আহত পরবর্তী জীবন
বর্তমানে আরফাতের শরীরে এখনো অনেকগুলো বুলেট রয়ে গেছে। তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে সবসময় ব্যথা অনুভূত হয়, হাঁটতে গেলে কষ্ট হয়। কাজ করতে গেলে পায়ের চাপে জ্বালা ধরে। কোনোদিন ভোরে ঘুম ভাঙে তীব্র যন্ত্রণায়। সে জানে, চিকিৎসা ছাড়া এই যন্ত্রণা চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেয় না।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
প্রথমে বন্ধুরা তাকে নিয়ে যায় সরকার বাজারের ডা. আশেক এলাহীর কাছে। তিনি আরফাতের শরীর থেকে ২০টি বুলেট বের করেন। কিছুদিন পর কিছু বুলেট শরীরের গভীরে ঢুকে যায়, যেগুলো পরবর্তীতে নাপেড়া বাজারের ডা. এম আকবর আহমদের কাছে গিয়ে বের করা হয়। আরও পাঁচটি বুলেট তিনি বের করেন এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ দেন। এখনো শরীরে কিছু বুলেট রয়ে গেছে, যা জরুরিভাবে অপারেশনের মাধ্যমে বের করতে হবে।
পূর্বে যে ধররে চিকিৎসা নিয়েছে: প্রাইভেট হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা: উন্নতমানের চিকিৎসা প্রয়োজন। এখনও শরীরে বুলেট যেগুলো আছে, তা দ্রুত বের করার ব্যবস্থা নেয়া।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আরফাত
জন্ম তারিখ : ০৩-০৭-২০০৫
জন্মস্থান : বাঁশখালী
পেশা : শ্রমিক (রাজমিস্ত্রী)
স্থায়ী ঠিকানা : লাল জীবন, ইউনিয়ন: শেখেরখীল, থানা: বাঁশখালী জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: ঘোনারটেক এলাকা, ০৯ নং ওয়ার্ড থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : সলিম উল্লাহ
পিতার পেশা ও বয়স : শ্রমিক, ৩৬
মায়ের নাম : নাছিমা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ২৪
মাসিক আয় : ১৬,০০০
বাড়ি : বাঁশের বেড়ার কাঁচা ঘর
সম্পদ : কোনো জায়গা সম্পদ নেই
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. সাদিয়া সুলতানা, বয়স: ১২, সম্পর্ক: বোন, শ্রেণি: ৫ম, প্রতিষ্ঠান: শেখেরখীল দারুসসালাম আদর্শ সিনিয়র মাদ্রাসা
২. সাফা মারওয়া সাবিহা, বয়স: ৩, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : চাম্বল বাজারের দক্ষিণ পাশে
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
একনজরে প্রস্তাবনা
১. চিকিৎসা সহায়তা: শরীরে থাকা বুলেটগুলোর অপারেশন জরুরি। উন্নতমানের চিকিৎসা তার জীবন রক্ষা করতে পারে
২. পুনর্বাসন সহায়তা: পরিবারটি ভূমিহীন এবং আরফাত আয়ের একমাত্র উৎস। তাকে সহযোগিতা না করলে পরিবারটি ধ্বংসের পথে যাবে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍