মো: আরিফুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মেধার বদলে গুলি : চাকরি প্রত্যাশী
আরিফুলের নির্মম ইতিহাস
মো: আরিফুল ইসলাম
পেশা: ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী
ক্রমিক- ৪৪২
আইডি: চট্টগ্রাম- ৩২
শাহাদাতের দিকে এগিয়ে চলা জীবন
মোঃ আরিফুল ইসলাম ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের কদমরসুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। পিতা মোহাম্মদ আবু বকর ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষ, যিনি তার সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্নে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মা বেবী আক্তার একজন গৃহিণী, যিনি সংসার সামলে নিজের মতো করে সন্তানদের আগলে রাখতেন। আরিফুলের শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কোলে, সবুজেঘেরা বাঁশখালীর গ্রাম্য পরিবেশে। গ্রামের বিদ্যালয় থেকেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনায় তাঁর আগ্রহ বরাবরই গভীর ছিল। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।
জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে এবং পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তিনি একাধারে ছাত্র চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে জীবন কাটাতে থাকেন। শৈশবকাল থেকেই আরিফুলের মাঝে একটা সমাজসচেতন মানসিকতা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে শিখেছিলেন কীভাবে একটিমাত্র পরিবারের শ্রম সীমিত সম্পদে পাঁচজনের জীবনধারণ হয়। তিনি ছিলেন মেধাবী ও ভদ্র প্রকৃতির। তার মধ্যে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা তাকে ধীরে ধীরে সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবতে শেখায়। এ পটভূমিই তাকে ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু এ চেতনাই পরবর্তীতে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটির দিকে তাকে ঠেলে দেয়। যেদিন পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। একজন স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ, কৃষকের ছেলে আরিফুল ইসলামের জন্ম এক সংগ্রামী জীবনের সূচনা।
কর্ম
মোঃ আরিফুল ইসলামের জীবনপথ কেবল একজন ছাত্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে ছিল না; তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী তরুণ, যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য ছুটছিলেন এক অনিশ্চিত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। গ্রাম থেকে শহরে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা ও চাকরির খোঁজে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরি করে পরিবারকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, বৃদ্ধ বাবার কাঁধ থেকে সংসারের ভার কমানো এবং ছোট বোনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য এবং দুর্নীতি ছিল সাধারণ নিয়ম। এসব সত্ত্বেও আরিফুল হাল ছাড়েননি। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি পড়াশোনায় ব্যয় করতেন, আর অবসর সময় কাটাতেন বিভিন্ন গণআন্দোলনের খোঁজখবর নিয়ে, সমাজে চলমান বৈষম্য আর অবিচারের খবর সংগ্রহ করে। ছোটখাটো টিউশনির মাধ্যমে নিজের খরচ চালিয়ে নিতেন যাতে পরিবারের ওপর চাপ না পড়ে। আরিফুল নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বারবার চেষ্টা করলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈষম্যমূলক নীতিমালা এবং পারিবারিক দরিদ্র অবস্থা তাকে স্থায়ী চাকরির মুখ দেখাতে দেয়নি। চাকরির পরীক্ষার জন্য কোচিংয়ে যাওয়া, আবেদন ফি সংগ্রহ করা বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস কেনার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে তাকে চরম কষ্ট পেতে হয়েছে। এই সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা। সমাজে বিদ্যমান অসাম্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব, ও পেশাভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ দিনে দিনে জমে উঠছিল। নিজে যেমন সমস্যার ভুক্তভোগী ছিলেন, তেমনি দেশজুড়ে হাজার হাজার তরুণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠার অভিপ্রায়ে তিনি সম্পৃক্ত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে। তার কর্মজীবন এখন থমকে আছে। না পাওয়া চাকরি, না পূরণ হওয়া স্বপ্নের শূন্যতায়।
পারিবারিক বর্ণনা
আরিফুল ইসলামের পরিবার একটি দরিদ্র কৃষক পরিবার। তার বাবা মোহাম্মদ আবু বকর, বয়স ৭০, আজও জমিতে হাল ধরে রাখেন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়ছে, তবুও মাটি ছেড়ে দেন না। বৃদ্ধ শরীরেই তিনি ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। পরিবারের ভরসার কেন্দ্র তিনিই। মা বেবী আক্তার, বয়স ৬০, একজন সাদামাটা গৃহিণী। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি চুলার ধারে, সংসারের নিত্য টানাপোড়েনে ক্লান্ত শরীরে ছেলে-মেয়েদের মুখে ভাত তুলে দিতে চান। এই পরিবারে মোট সদস্য পাঁচজন। বড় ভাই মোহাম্মদ ফারুক, বয়স ৪০, একটি চাকরিতে আছেন। তার আয়ে কিছুটা সাহায্য হলেও শহরের জীবনযাত্রা ও পরিবারের চাহিদা মেটাতে তা যথেষ্ট নয়। ছোট বোন নাসরিন সুলতানা মাস্টার্স (এমএসএস) এ পড়ছেন। স্বপ্ন দেখেন শিক্ষক হওয়ার, কিন্তু পড়ালেখার খরচ চালাতে তাকে বারবার সংকটে পড়তে হয়। পরিবারের একমাত্র স্থায়ী সম্পদ বাবার নামে থাকা ১০ গণ্ডা জমি। সেই জমিতে সারা বছর ফসল হয় না, হয়তো বছরে একবার ধান ওঠে। বাড়িটি ছোট, বেড়ার দেয়াল আর ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি। বর্ষায় চুঁইয়ে পানি পড়ে, শীতে ঠাণ্ডায় কাঁপে সবাই। আধুনিক জীবনের কোনো সুবিধা এখানে নেই। নেই শৌচাগারের নিরাপত্তা, নেই বিদ্যুৎ সংযোগের নিরবচ্ছিন্নতা, নেই পানীয় জলের নিশ্চয়তা। এ পরিবার প্রতিদিন বাঁচে সংগ্রামের মধ্যে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কিন্তু আয়ের হিসাব বাড়ে না। অথচ এ অস্থির জীবনের মাঝেও তাদের চোখে স্বপ্ন থাকে। আরিফুল ভালো চাকরি পাবে, সংসারটা ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সেই স্বপ্নেও এখন ভয়ের ছায়া।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সাল। বাংলাদেশ জুড়ে অসন্তোষ জমে ওঠে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, শিক্ষা ও চাকরির সুযোগে বৈষম্য, দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন। সবকিছু মিলিয়ে এক ক্রমাগত অবিচারের চিত্র ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবনে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের তরুণরা দেখতে পায়, তারা যতই পড়ালেখা করুক, যতই মেধাবী হোক, সংরক্ষিত গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবস্থায় তাদের ঠাঁই নেই। নিয়োগবাণিজ্য, কোটা বৈষম্য এবং ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় তরুণদের সম্ভাবনা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ গড়ে ওঠে। ঢাকা থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি শহরে। এর নেতৃত্ব নেয় সাধারণ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ এবং মানবিক চিন্তাসম্পন্ন নাগরিকেরা। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জাতিগত, শ্রেণিভিত্তিক ও দলীয় সংরক্ষণ প্রথার অবসান; মেধার ভিত্তিতে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা; শহীদ ও আহতদের বিচার এবং ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের অবসান। চট্টগ্রাম শহরও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধনে অংশ নেয় হাজার হাজার তরুণ। নিউমার্কেট, আন্দরকিল্লা, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনরাত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে “অধিকার চাই” স্লোগান। তবে এই ন্যায্য দাবি ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাবে খুনি হাসিনা সরকার ও তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামে সহিংস বাহিনী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় রাস্তায় নামে। শুরু হয় গণগ্রেফতার, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এমনকি গুলি। শহরের বুকে, রাজপথের মাঝে একে একে ঝরে পড়ে বহু তরুণের রক্ত। এই আন্দোলনের ঢেউ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের হৃদয়েও এসে লাগে। তার নিজের জীবনের সংকটগুলো যেন মিলে যায় বৃহত্তর জনগণের যন্ত্রণার সঙ্গে। তাই তিনি আর চুপ করে থাকতে পারেন না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্রোধ, বঞ্চনা, ক্ষোভ নিয়ে তিনিও নামেন রাস্তায়। নিজের অধিকার আর দেশের ভবিষ্যতের প্রশ্নে হাতে তুলে নেন প্রতিবাদের পতাকা।
আন্দোলনে যোগদান
আরিফুল ইসলাম যখন দেখেন, তার মতো হাজার হাজার তরুণ চাকরির জন্য ছুটছে, অথচ মেধা নয় রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য, কিংবা জাতিগত সংরক্ষণই নিয়োগের মানদণ্ড হয়ে উঠছে, তখন তার ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধে। তার পড়াশোনা, প্রতিদিনের পরিশ্রম, জীবনের সব সংগ্রাম সব যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতায়। এই ক্রমবর্ধমান অবিচার ও অনিরাপত্তার বিরুদ্ধে যখন সারাদেশের তরুণরা রাস্তায় নামে, তখন তিনিও আর নীরব থাকতে পারেন না। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, চট্টগ্রামের নিউমার্কেট মোড় থেকে শুরু হয় একটি মিছিল। উদ্দেশ্য আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দমননীতি, ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের ওপর সহিংসতা, শহীদদের রক্তের প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে বৈষম্য নিরসনের দাবি জানানো। আরিফুল সকাল থেকেই প্রস্তুত থাকেন মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে অদম্য প্রত্যয়ের দীপ্তি। মধ্যদুপুরে তিনি নিউমার্কেট মোড়ে আসেন এবং সেখান থেকে সহযোদ্ধা ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলের সারিতে অবস্থান নেন। মিছিলটি মুরাদপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। ছাত্রলীগের একটি দল প্রথমে ইট-পাটকেল ছুড়ে মিছিলের ওপর হামলা চালায়। এরপর পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। হঠাৎ করেই গুলি চালানো শুরু হয়। আরিফুল দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। দৌড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তার পায়ে গুলি লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই ছাত্রলীগের কয়েকজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠি দিয়ে মারতে থাকে, পায়ের ওপর আঘাত করে, কোমরে লাথি দেয়। এ নির্মম হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। রাস্তার পাশে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পড়ে থাকেন কিছুক্ষণ। কিছু সহযোদ্ধা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যায়। তার শরীর তখন নিথর, চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন। এই কি ছিল ন্যায়ের জন্য রাস্তায় নামার পরিণাম? আন্দোলনে তার এ অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সাহসের প্রতীক নয়, বরং প্রমাণ করে সত্য, সমতা আর ন্যায়ের জন্য একজন সাধারণ ছাত্র কতটা মূল্য দিতে পারেন।
আহত পরবর্তী জীবন
মুরাদপুরের রক্তাক্ত দুপুরের পর থেকে আরিফুল ইসলামের জীবন যেন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এটি আর সংগ্রামী ছাত্রজীবন নয়, এটি বেঁচে থাকার প্রতিদিনের যুদ্ধ। পায়ে গুলির ক্ষত, কোমরে লাঠির আঘাত। এই দুটি যন্ত্রণা তার শরীরকে করে দেয় অক্ষম, আর মনকে করে তোলে ভারী। যেদিন তিনি রাস্তায় নামেন, সেদিন তার স্বপ্ন ছিল। বৈষম্যের অবসান ঘটবে, রাষ্ট্র নতুন পথে হাঁটবে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই তিনি হয়ে যান রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক জীবন্ত দলিল। আহতের পর সহযোদ্ধারা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা হলেও পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন চিকিৎসার সুযোগ পান না। গুলির ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ, ব্যথার ওষুধ, কিছুদিন বিছানাবন্দি থাকার নির্দেশ। ব্যস, এটাই তার চিকিৎসা। দিন দিন ব্যথা বেড়ে যায়, পায়ের হাড়ের ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কোমরের আঘাতও তীব্র হয়ে ওঠে, বসা বা দাঁড়ানো সবকিছুই হয়ে ওঠে কষ্টকর। চিকিৎসার খরচ বহন করা তার পরিবারের জন্য অসম্ভব। বাবা একজন বৃদ্ধ কৃষক, মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা। সেই টাকায় সংসার চলে, চাল-ডাল কিনতে হয়, ছোট বোনের পড়াশোনা চালাতে হয়। আরিফুল নিজেও তো এতদিন পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, এখন চিকিৎসার ব্যয় যেন পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা বিদেশ যাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেন না তিনি। এখন তিনি একরকম ঘরে আবদ্ধ। চলাফেরার ক্ষমতা সীমিত, চাকরির স্বপ্ন হারিয়ে গেছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের ওপর আরও বোঝা হয়ে গেছেন তিনি এটা তার কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। অথচ কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন পরিবারের আশা, গ্রামের একজন সম্ভাবনাময় তরুণ, বন্ধুদের ভরসা। আহত হওয়ার পর থেকে তার জীবন কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত। তিনি হতাশ, ক্ষুব্ধ, কিন্তু ভেঙে পড়েন না। তার চোখে এখনও একটি স্বপ্ন জ্বলজ্বল করে। একদিন হয়তো এই দুঃসহ সময় পেরিয়ে আবার হাঁটবেন, হয়তো কোনোদিন এই রাষ্ট্র তার মতোদের কথা শুনবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নে পৌঁছাতে গেলে দরকার সহায়তা, চিকিৎসা এবং সমাজের সহমর্মিতা।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
মোঃ আরিফুল ইসলাম যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন, তখন তার শরীর থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সহযোদ্ধা কয়েকজন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের অধীনে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়: গুলির ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করা হয়, দেয়া হয় ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু ততক্ষণে তার পায়ের গভীরে গুলি ঢুকে গেছে এবং কোমরে ছাত্রলীগের লাঠির আঘাত চরম ব্যথা সৃষ্টি করছে। প্রথম কয়েকদিন বিশ্রামে থাকায় সাময়িক আরাম আসে, কিন্তু ক্ষতস্থানে ইনফেকশন দেখা দেয়। ব্যথা বাড়ে, হাঁটতে কষ্ট হয়, কোমরে বসার সময় অসহ্য যন্ত্রণা হয়। চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসা নিতে বলেন। হাড় ও নার্ভের বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে বলেন। কিন্তু সেই চিকিৎসা নিতে যে খরচ প্রয়োজন, তা আরিফুলের পরিবারের নাগালের বাইরে। চিকিৎসার খরচ, পথ্য, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে ব্যয় হয়ে দাঁড়ায় তার পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্ন। তার বাবা একজন বৃদ্ধ কৃষক, মাসে দশ হাজার টাকা আয় করেন, যা দিয়ে পুরো পরিবার চলে। মা গৃহিণী, আয় নেই। ভাইয়ের নিজের সংসার, ছোট বোন পড়াশোনায় ব্যস্ত। এই বাস্তবতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম শহরের বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়। আরিফুল এখন ঘরে বসে আছেন। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ, ব্যথা থেকে যায় প্রতিদিন, রাতে ঘুম ভাঙে যন্ত্রণায়। তার পায়ের ক্ষত এখনও মাঝে মাঝে ফুলে যায়, হাঁটুর নিচে জড়তা অনুভব করেন। কোমরের আঘাতের কারণে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে পারেন না, বিছানা থেকে উঠতে সময় লাগে। ফিজিওথেরাপি দরকার হলেও সেটা নিতে পারেন না নিয়মিতভাবে। চিকিৎসকেরা বলছেন— সঠিক চিকিৎসা না পেলে ভবিষ্যতে এ আঘাত স্থায়ী পঙ্গুত্বে রূপ নিতে পারে। আরিফুল নিজে জানেন, তার সময় কম। চিকিৎসা দরকার। শুধু শরীরের জন্য নয়, তার ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য। তিনি আজও অপেক্ষায়। সহানুভূতি, সহায়তা এবং সে রাষ্ট্রের দিক থেকে একটি প্রাথমিক দৃষ্টিপাতের, যেটির জন্য তিনি নিজের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন।
প্রস্তাবনা
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ এবং পঙ্গুত্বের মুখোমুখি হওয়া মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের জীবনচিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। একজন স্বপ্নবাজ তরুণ কেবল নিজের জন্য নয়, গোটা প্রজন্মের অধিকারের পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ অসুস্থ, কর্মহীন ও ভবিষ্যতহীন হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থেকে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নিচের প্রস্তাবনাগুলো পেশ করা হলো:
১. উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা: মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের পায়ে গুলির ক্ষত এবং কোমরের আঘাত আজীবন পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাকে। এ অবস্থায় তাকে উন্নততর চিকিৎসা (হাড় ও নার্ভ বিশেষজ্ঞ, সার্জারি, ও ফিজিওথেরাপি) সেবার আওতায় আনা একান্ত জরুরি। প্রয়োজন হলে তাকে ঢাকা বা বিদেশে চিকিৎসা করানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
২. আর্থিক অনুদান ও মাসিক সহায়তা প্রদান: বর্তমানে তিনি কোনো আয় করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন চিকিৎসা অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট মাসিক সহায়তা বরাদ্দ করা উচিত, যেন তিনি ও তাঁর পরিবার ন্যূনতম মানবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও শিক্ষা/চাকরি পুনঃযোগের সুযোগ: আহতের ফলে আরিফুলের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থমকে গেছে। মানসিক আঘাতও উপেক্ষার নয়। তাঁকে কাউন্সেলিং সেবা দেয়া এবং তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় একটি স্বনির্ভর কর্মপরিকল্পনা (হোমবেইসড ওয়ার্ক, রিমোট চাকরি, স্কিল ট্রেইনিং ইত্যাদি) গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই তিনটি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কেবল একজন ব্যক্তির জীবন নয়, একটি প্রজন্মের আন্দোলন এবং ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের ন্যায্য সম্মান প্রতিষ্ঠিত হবে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আরিফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৯৭
জন্মস্থান : বাঁশখালী
পেশা : ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কদমরসুল, ইউনিয়ন: খানখানাবাদ, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: খুলশী এলাকা: খুলশী, জেলা: চট্টগ্রাম
পিতার নাম : মোহাম্মদ আবু বকর
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৭০
মায়ের নাম : বেবী আক্তার
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের পরিচয়
১. মোহাম্মদ ফারুক, বয়স: ৪০, পেশা: চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
২. নাসরিন সুলতানা, বয়স: ৩০, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: মাস্টার্স (এমএসএস), সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : মুরাদপুর
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, সময়: দুপুর ১২.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
চিকিৎসাসেবা গ্রহণ: পায়ে গুলি লাগার পর প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন থেকে চিকিৎসা গ্রহণ
চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: পায়ে ও কোমরের জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
আরিফুলের নির্মম ইতিহাস
মো: আরিফুল ইসলাম
পেশা: ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী
ক্রমিক- ৪৪২
আইডি: চট্টগ্রাম- ৩২
শাহাদাতের দিকে এগিয়ে চলা জীবন
মোঃ আরিফুল ইসলাম ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের কদমরসুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। পিতা মোহাম্মদ আবু বকর ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষ, যিনি তার সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্নে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মা বেবী আক্তার একজন গৃহিণী, যিনি সংসার সামলে নিজের মতো করে সন্তানদের আগলে রাখতেন। আরিফুলের শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কোলে, সবুজেঘেরা বাঁশখালীর গ্রাম্য পরিবেশে। গ্রামের বিদ্যালয় থেকেই তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনায় তাঁর আগ্রহ বরাবরই গভীর ছিল। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।
জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে এবং পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তিনি একাধারে ছাত্র চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে জীবন কাটাতে থাকেন। শৈশবকাল থেকেই আরিফুলের মাঝে একটা সমাজসচেতন মানসিকতা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে শিখেছিলেন কীভাবে একটিমাত্র পরিবারের শ্রম সীমিত সম্পদে পাঁচজনের জীবনধারণ হয়। তিনি ছিলেন মেধাবী ও ভদ্র প্রকৃতির। তার মধ্যে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা তাকে ধীরে ধীরে সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবতে শেখায়। এ পটভূমিই তাকে ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু এ চেতনাই পরবর্তীতে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটির দিকে তাকে ঠেলে দেয়। যেদিন পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। একজন স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ, কৃষকের ছেলে আরিফুল ইসলামের জন্ম এক সংগ্রামী জীবনের সূচনা।
কর্ম
মোঃ আরিফুল ইসলামের জীবনপথ কেবল একজন ছাত্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে ছিল না; তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী তরুণ, যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য ছুটছিলেন এক অনিশ্চিত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। গ্রাম থেকে শহরে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা ও চাকরির খোঁজে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরি করে পরিবারকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, বৃদ্ধ বাবার কাঁধ থেকে সংসারের ভার কমানো এবং ছোট বোনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য এবং দুর্নীতি ছিল সাধারণ নিয়ম। এসব সত্ত্বেও আরিফুল হাল ছাড়েননি। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি পড়াশোনায় ব্যয় করতেন, আর অবসর সময় কাটাতেন বিভিন্ন গণআন্দোলনের খোঁজখবর নিয়ে, সমাজে চলমান বৈষম্য আর অবিচারের খবর সংগ্রহ করে। ছোটখাটো টিউশনির মাধ্যমে নিজের খরচ চালিয়ে নিতেন যাতে পরিবারের ওপর চাপ না পড়ে। আরিফুল নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বারবার চেষ্টা করলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈষম্যমূলক নীতিমালা এবং পারিবারিক দরিদ্র অবস্থা তাকে স্থায়ী চাকরির মুখ দেখাতে দেয়নি। চাকরির পরীক্ষার জন্য কোচিংয়ে যাওয়া, আবেদন ফি সংগ্রহ করা বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস কেনার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে তাকে চরম কষ্ট পেতে হয়েছে। এই সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা। সমাজে বিদ্যমান অসাম্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব, ও পেশাভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ দিনে দিনে জমে উঠছিল। নিজে যেমন সমস্যার ভুক্তভোগী ছিলেন, তেমনি দেশজুড়ে হাজার হাজার তরুণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠার অভিপ্রায়ে তিনি সম্পৃক্ত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে। তার কর্মজীবন এখন থমকে আছে। না পাওয়া চাকরি, না পূরণ হওয়া স্বপ্নের শূন্যতায়।
পারিবারিক বর্ণনা
আরিফুল ইসলামের পরিবার একটি দরিদ্র কৃষক পরিবার। তার বাবা মোহাম্মদ আবু বকর, বয়স ৭০, আজও জমিতে হাল ধরে রাখেন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়ছে, তবুও মাটি ছেড়ে দেন না। বৃদ্ধ শরীরেই তিনি ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। পরিবারের ভরসার কেন্দ্র তিনিই। মা বেবী আক্তার, বয়স ৬০, একজন সাদামাটা গৃহিণী। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি চুলার ধারে, সংসারের নিত্য টানাপোড়েনে ক্লান্ত শরীরে ছেলে-মেয়েদের মুখে ভাত তুলে দিতে চান। এই পরিবারে মোট সদস্য পাঁচজন। বড় ভাই মোহাম্মদ ফারুক, বয়স ৪০, একটি চাকরিতে আছেন। তার আয়ে কিছুটা সাহায্য হলেও শহরের জীবনযাত্রা ও পরিবারের চাহিদা মেটাতে তা যথেষ্ট নয়। ছোট বোন নাসরিন সুলতানা মাস্টার্স (এমএসএস) এ পড়ছেন। স্বপ্ন দেখেন শিক্ষক হওয়ার, কিন্তু পড়ালেখার খরচ চালাতে তাকে বারবার সংকটে পড়তে হয়। পরিবারের একমাত্র স্থায়ী সম্পদ বাবার নামে থাকা ১০ গণ্ডা জমি। সেই জমিতে সারা বছর ফসল হয় না, হয়তো বছরে একবার ধান ওঠে। বাড়িটি ছোট, বেড়ার দেয়াল আর ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি। বর্ষায় চুঁইয়ে পানি পড়ে, শীতে ঠাণ্ডায় কাঁপে সবাই। আধুনিক জীবনের কোনো সুবিধা এখানে নেই। নেই শৌচাগারের নিরাপত্তা, নেই বিদ্যুৎ সংযোগের নিরবচ্ছিন্নতা, নেই পানীয় জলের নিশ্চয়তা। এ পরিবার প্রতিদিন বাঁচে সংগ্রামের মধ্যে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কিন্তু আয়ের হিসাব বাড়ে না। অথচ এ অস্থির জীবনের মাঝেও তাদের চোখে স্বপ্ন থাকে। আরিফুল ভালো চাকরি পাবে, সংসারটা ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সেই স্বপ্নেও এখন ভয়ের ছায়া।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সাল। বাংলাদেশ জুড়ে অসন্তোষ জমে ওঠে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, শিক্ষা ও চাকরির সুযোগে বৈষম্য, দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন। সবকিছু মিলিয়ে এক ক্রমাগত অবিচারের চিত্র ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবনে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের তরুণরা দেখতে পায়, তারা যতই পড়ালেখা করুক, যতই মেধাবী হোক, সংরক্ষিত গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবস্থায় তাদের ঠাঁই নেই। নিয়োগবাণিজ্য, কোটা বৈষম্য এবং ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় তরুণদের সম্ভাবনা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ গড়ে ওঠে। ঢাকা থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি শহরে। এর নেতৃত্ব নেয় সাধারণ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ এবং মানবিক চিন্তাসম্পন্ন নাগরিকেরা। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জাতিগত, শ্রেণিভিত্তিক ও দলীয় সংরক্ষণ প্রথার অবসান; মেধার ভিত্তিতে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা; শহীদ ও আহতদের বিচার এবং ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের অবসান। চট্টগ্রাম শহরও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধনে অংশ নেয় হাজার হাজার তরুণ। নিউমার্কেট, আন্দরকিল্লা, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনরাত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে “অধিকার চাই” স্লোগান। তবে এই ন্যায্য দাবি ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাবে খুনি হাসিনা সরকার ও তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামে সহিংস বাহিনী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় রাস্তায় নামে। শুরু হয় গণগ্রেফতার, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এমনকি গুলি। শহরের বুকে, রাজপথের মাঝে একে একে ঝরে পড়ে বহু তরুণের রক্ত। এই আন্দোলনের ঢেউ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের হৃদয়েও এসে লাগে। তার নিজের জীবনের সংকটগুলো যেন মিলে যায় বৃহত্তর জনগণের যন্ত্রণার সঙ্গে। তাই তিনি আর চুপ করে থাকতে পারেন না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্রোধ, বঞ্চনা, ক্ষোভ নিয়ে তিনিও নামেন রাস্তায়। নিজের অধিকার আর দেশের ভবিষ্যতের প্রশ্নে হাতে তুলে নেন প্রতিবাদের পতাকা।
আন্দোলনে যোগদান
আরিফুল ইসলাম যখন দেখেন, তার মতো হাজার হাজার তরুণ চাকরির জন্য ছুটছে, অথচ মেধা নয় রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য, কিংবা জাতিগত সংরক্ষণই নিয়োগের মানদণ্ড হয়ে উঠছে, তখন তার ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধে। তার পড়াশোনা, প্রতিদিনের পরিশ্রম, জীবনের সব সংগ্রাম সব যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতায়। এই ক্রমবর্ধমান অবিচার ও অনিরাপত্তার বিরুদ্ধে যখন সারাদেশের তরুণরা রাস্তায় নামে, তখন তিনিও আর নীরব থাকতে পারেন না। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, চট্টগ্রামের নিউমার্কেট মোড় থেকে শুরু হয় একটি মিছিল। উদ্দেশ্য আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দমননীতি, ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের ওপর সহিংসতা, শহীদদের রক্তের প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে বৈষম্য নিরসনের দাবি জানানো। আরিফুল সকাল থেকেই প্রস্তুত থাকেন মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে অদম্য প্রত্যয়ের দীপ্তি। মধ্যদুপুরে তিনি নিউমার্কেট মোড়ে আসেন এবং সেখান থেকে সহযোদ্ধা ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলের সারিতে অবস্থান নেন। মিছিলটি মুরাদপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। ছাত্রলীগের একটি দল প্রথমে ইট-পাটকেল ছুড়ে মিছিলের ওপর হামলা চালায়। এরপর পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। হঠাৎ করেই গুলি চালানো শুরু হয়। আরিফুল দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। দৌড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তার পায়ে গুলি লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই ছাত্রলীগের কয়েকজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠি দিয়ে মারতে থাকে, পায়ের ওপর আঘাত করে, কোমরে লাথি দেয়। এ নির্মম হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। রাস্তার পাশে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পড়ে থাকেন কিছুক্ষণ। কিছু সহযোদ্ধা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যায়। তার শরীর তখন নিথর, চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন। এই কি ছিল ন্যায়ের জন্য রাস্তায় নামার পরিণাম? আন্দোলনে তার এ অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সাহসের প্রতীক নয়, বরং প্রমাণ করে সত্য, সমতা আর ন্যায়ের জন্য একজন সাধারণ ছাত্র কতটা মূল্য দিতে পারেন।
আহত পরবর্তী জীবন
মুরাদপুরের রক্তাক্ত দুপুরের পর থেকে আরিফুল ইসলামের জীবন যেন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এটি আর সংগ্রামী ছাত্রজীবন নয়, এটি বেঁচে থাকার প্রতিদিনের যুদ্ধ। পায়ে গুলির ক্ষত, কোমরে লাঠির আঘাত। এই দুটি যন্ত্রণা তার শরীরকে করে দেয় অক্ষম, আর মনকে করে তোলে ভারী। যেদিন তিনি রাস্তায় নামেন, সেদিন তার স্বপ্ন ছিল। বৈষম্যের অবসান ঘটবে, রাষ্ট্র নতুন পথে হাঁটবে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই তিনি হয়ে যান রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক জীবন্ত দলিল। আহতের পর সহযোদ্ধারা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা হলেও পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন চিকিৎসার সুযোগ পান না। গুলির ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ, ব্যথার ওষুধ, কিছুদিন বিছানাবন্দি থাকার নির্দেশ। ব্যস, এটাই তার চিকিৎসা। দিন দিন ব্যথা বেড়ে যায়, পায়ের হাড়ের ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কোমরের আঘাতও তীব্র হয়ে ওঠে, বসা বা দাঁড়ানো সবকিছুই হয়ে ওঠে কষ্টকর। চিকিৎসার খরচ বহন করা তার পরিবারের জন্য অসম্ভব। বাবা একজন বৃদ্ধ কৃষক, মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা। সেই টাকায় সংসার চলে, চাল-ডাল কিনতে হয়, ছোট বোনের পড়াশোনা চালাতে হয়। আরিফুল নিজেও তো এতদিন পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, এখন চিকিৎসার ব্যয় যেন পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা বিদেশ যাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেন না তিনি। এখন তিনি একরকম ঘরে আবদ্ধ। চলাফেরার ক্ষমতা সীমিত, চাকরির স্বপ্ন হারিয়ে গেছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের ওপর আরও বোঝা হয়ে গেছেন তিনি এটা তার কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। অথচ কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন পরিবারের আশা, গ্রামের একজন সম্ভাবনাময় তরুণ, বন্ধুদের ভরসা। আহত হওয়ার পর থেকে তার জীবন কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত। তিনি হতাশ, ক্ষুব্ধ, কিন্তু ভেঙে পড়েন না। তার চোখে এখনও একটি স্বপ্ন জ্বলজ্বল করে। একদিন হয়তো এই দুঃসহ সময় পেরিয়ে আবার হাঁটবেন, হয়তো কোনোদিন এই রাষ্ট্র তার মতোদের কথা শুনবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নে পৌঁছাতে গেলে দরকার সহায়তা, চিকিৎসা এবং সমাজের সহমর্মিতা।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
মোঃ আরিফুল ইসলাম যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন, তখন তার শরীর থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সহযোদ্ধা কয়েকজন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের অধীনে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়: গুলির ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করা হয়, দেয়া হয় ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু ততক্ষণে তার পায়ের গভীরে গুলি ঢুকে গেছে এবং কোমরে ছাত্রলীগের লাঠির আঘাত চরম ব্যথা সৃষ্টি করছে। প্রথম কয়েকদিন বিশ্রামে থাকায় সাময়িক আরাম আসে, কিন্তু ক্ষতস্থানে ইনফেকশন দেখা দেয়। ব্যথা বাড়ে, হাঁটতে কষ্ট হয়, কোমরে বসার সময় অসহ্য যন্ত্রণা হয়। চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসা নিতে বলেন। হাড় ও নার্ভের বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে বলেন। কিন্তু সেই চিকিৎসা নিতে যে খরচ প্রয়োজন, তা আরিফুলের পরিবারের নাগালের বাইরে। চিকিৎসার খরচ, পথ্য, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে ব্যয় হয়ে দাঁড়ায় তার পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্ন। তার বাবা একজন বৃদ্ধ কৃষক, মাসে দশ হাজার টাকা আয় করেন, যা দিয়ে পুরো পরিবার চলে। মা গৃহিণী, আয় নেই। ভাইয়ের নিজের সংসার, ছোট বোন পড়াশোনায় ব্যস্ত। এই বাস্তবতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম শহরের বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়। আরিফুল এখন ঘরে বসে আছেন। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ, ব্যথা থেকে যায় প্রতিদিন, রাতে ঘুম ভাঙে যন্ত্রণায়। তার পায়ের ক্ষত এখনও মাঝে মাঝে ফুলে যায়, হাঁটুর নিচে জড়তা অনুভব করেন। কোমরের আঘাতের কারণে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে পারেন না, বিছানা থেকে উঠতে সময় লাগে। ফিজিওথেরাপি দরকার হলেও সেটা নিতে পারেন না নিয়মিতভাবে। চিকিৎসকেরা বলছেন— সঠিক চিকিৎসা না পেলে ভবিষ্যতে এ আঘাত স্থায়ী পঙ্গুত্বে রূপ নিতে পারে। আরিফুল নিজে জানেন, তার সময় কম। চিকিৎসা দরকার। শুধু শরীরের জন্য নয়, তার ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য। তিনি আজও অপেক্ষায়। সহানুভূতি, সহায়তা এবং সে রাষ্ট্রের দিক থেকে একটি প্রাথমিক দৃষ্টিপাতের, যেটির জন্য তিনি নিজের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন।
প্রস্তাবনা
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ এবং পঙ্গুত্বের মুখোমুখি হওয়া মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের জীবনচিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। একজন স্বপ্নবাজ তরুণ কেবল নিজের জন্য নয়, গোটা প্রজন্মের অধিকারের পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ অসুস্থ, কর্মহীন ও ভবিষ্যতহীন হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থেকে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নিচের প্রস্তাবনাগুলো পেশ করা হলো:
১. উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা: মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের পায়ে গুলির ক্ষত এবং কোমরের আঘাত আজীবন পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাকে। এ অবস্থায় তাকে উন্নততর চিকিৎসা (হাড় ও নার্ভ বিশেষজ্ঞ, সার্জারি, ও ফিজিওথেরাপি) সেবার আওতায় আনা একান্ত জরুরি। প্রয়োজন হলে তাকে ঢাকা বা বিদেশে চিকিৎসা করানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
২. আর্থিক অনুদান ও মাসিক সহায়তা প্রদান: বর্তমানে তিনি কোনো আয় করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন চিকিৎসা অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট মাসিক সহায়তা বরাদ্দ করা উচিত, যেন তিনি ও তাঁর পরিবার ন্যূনতম মানবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও শিক্ষা/চাকরি পুনঃযোগের সুযোগ: আহতের ফলে আরিফুলের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থমকে গেছে। মানসিক আঘাতও উপেক্ষার নয়। তাঁকে কাউন্সেলিং সেবা দেয়া এবং তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় একটি স্বনির্ভর কর্মপরিকল্পনা (হোমবেইসড ওয়ার্ক, রিমোট চাকরি, স্কিল ট্রেইনিং ইত্যাদি) গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই তিনটি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কেবল একজন ব্যক্তির জীবন নয়, একটি প্রজন্মের আন্দোলন এবং ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের ন্যায্য সম্মান প্রতিষ্ঠিত হবে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আরিফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৯৭
জন্মস্থান : বাঁশখালী
পেশা : ছাত্র, চাকরি প্রত্যাশী
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কদমরসুল, ইউনিয়ন: খানখানাবাদ, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: খুলশী এলাকা: খুলশী, জেলা: চট্টগ্রাম
পিতার নাম : মোহাম্মদ আবু বকর
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৭০
মায়ের নাম : বেবী আক্তার
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের পরিচয়
১. মোহাম্মদ ফারুক, বয়স: ৪০, পেশা: চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
২. নাসরিন সুলতানা, বয়স: ৩০, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: মাস্টার্স (এমএসএস), সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : মুরাদপুর
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, সময়: দুপুর ১২.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
চিকিৎসাসেবা গ্রহণ: পায়ে গুলি লাগার পর প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন থেকে চিকিৎসা গ্রহণ
চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তাবনা: পায়ে ও কোমরের জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍