হোম / আহতদের তালিকা / মো: হানিফ
মো: হানিফ

মো: হানিফ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ভোলার নদীভাঙন এলাকা পেরিয়ে ঢাকায় এসে জীবনের হাল ধরে রাখা ভ্যানচালক মো: হানিফ জন্ম নেন ১৩ আগস্ট ১৯৮৬ সালে। এক পরিশ্রমী মানুষ, যার কাঁধে ছিল সাতজনের সংসারের ভার। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনে সাইন্সল্যাব মোড়ে তিনি কোনো স্লোগান দেননি, তবু রাষ্ট্রীয় হামলায় ভেঙে যায় তাঁর ডান হাত, থেমে যায় রুটি-রুজির পথ। নয় মাস শয্যাশায়ী থেকেও তিনি হার মানেননি। বাঁকা হাতেই আবার রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়েছেন জীবিকার প্রয়োজনে। তাঁর সংগ্রাম শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, বরং হাফসা, সিয়াম ও আকরামের ভবিষ্যৎ রক্ষার অদম্য প্রতিশ্রুতি। বিপ্লব শুধু মিছিলের নয় এটি প্রতিদিন উঠে দাঁড়ানো এক শ্রমজীবী মানুষের নীরব সাহসের নাম।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহত বিপ্লবী যে ভাঙা হাতে সই করলো স্বাধীনতার নতুন খসড়া
মো: হানিফ
ক্রমিক: ০৪২
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪২
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচিতি
নাম মো: হানিফ একজন ভ্যান চালক, কিন্তু তার গল্প শুধু ভ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। জন্মভূমি ভোলা, যেখানে একদিন নদী গিলে খেয়েছে তার ঘর, শেকড়, শৈশব। সেই নদীর মতোই রাষ্ট্রও যেন এক অদৃশ্য জোয়ার যে ধীরে ধীরে গিলে নেয় প্রান্তিকদের নিঃশ্বাস। হানিফ আজ ঢাকার ধুলোমাখা রাস্তায়, ৪৪/১ নম্বর ঠিকানায়, নিউমার্কেটের গলিতে একটা ভাঙাচোরা ভ্যানে তার জীবন চালায়, পেছনে সাতজনের সংসার, বাবা-মা, স্ত্রী, আর তিন সন্তানের নির্ভরতা।
৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখনই হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ। ছাত্রলীগ আর পুলিশের যৌথ সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয় সাধারণ জনতার ওপরে। সেখানে কেউ ছিলেন না নেতা, কেউ ছিলেন না দলীয় কর্মী তবে ছিলেন মানুষ, প্রতিবাদী, বুকের ভেতর ক্ষোভ নিয়ে দাঁড়ানো নীরব সৈনিক। হানিফ ছিলেন সেই মিছিলের এক প্রান্তে। কোনো স্লোগান না দিয়েও তিনি রাষ্ট্রের চোখে হয়ে উঠেছিলেন "শত্রু।" তাকে মারতে ছুটে আসে হেলমেটধারী হায়েনারা। লাঠির ঘায়ে, বন্দুকের বাঁটের আঘাতে তার হাত থেঁতলে যায়, শরীরের হাড়গুলো কেঁপে ওঠে।
সে মুহূর্তে হানিফ ভ্যানচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী পিতা, যিনি চান তার মেয়ে হাফসা এসএসসি পরীক্ষা দিক, ছেলে সিয়াম যেন প্রাইমারির গণ্ডি পেরোয়, আর আকরাম একদিন নিজের কষ্টকে জয় করুক। কিন্তু সেই আঘাতে থেমে যায় তার সংসারের ইঞ্জিন। একটি হাত ভেঙে থাকা মানে একজন ভ্যানচালকের সম্পূর্ণ জীবিকা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। নয় মাস ধরে তিনি শুয়ে ছিলেন গ্রামের মাটির ঘরে, যেখানে নেই কোনো ডাক্তার, নেই চিকিৎসা, কেবল চোখের জল ও সময়ের আশায় পঁচে যাওয়া দিন।
তার মায়ের বয়স এখন ষাট, বাবার সত্তর। তারা ভরসা করেন হানিফের ঘামঝরা আয়ের ওপর। অথচ সেই ঘামে এখন রক্ত, সেই শরীরে এখন ব্যথা। যাঁরা বলে, "এই আন্দোলন ছিল ছাত্রদের" তারা ভুল বলেন, এই আন্দোলন ছিল হানিফদেরও, যাঁরা গুলি খায় না, তবু বুলেটের আওয়াজে ঘরহারা হয়। তিনি যখন বলেন, "ঢাকায় থাকতে গিয়েছি পরিবারের জন্য, সেই ঢাকাতেই মরতে বসেছিলাম" তখন বোঝা যায়, একটি রাষ্ট্র শুধু জনসংখ্যা দিয়ে গণনা হয় না, হয় যন্ত্রণার পরিমাণ দিয়ে।
আজ হানিফ ধীরে ধীরে আবার রাস্তায় ফিরছেন। হাত এখনো ব্যথা করে, তবু ভ্যান চালান। কেননা তিনি জানেন, যদি থেমে যান, তাহলে থেমে যাবে হাফসার পড়া, সিয়ামের খেলা, আকরামের মুখের হাসি। তিনি চান না সহানুভূতি, চান সুযোগ একটি নতুন সকাল, যেখানে তার শ্রমের মূল্য থাকবে, তার চোখে আর কোনো চোখের পানি থাকবে না। হানিফের গল্প তাই কেবল একটি আহত হাতের নয়, এটি হলো সেই হাজারো মানুষের প্রতিচ্ছবি যারা 'বিপ্লব' শব্দটি উচ্চারণ না করেও সেটিকে বুকে ধারণ করে চোখে জল রেখে, পায়ে চলার অঙ্গীকার নিয়ে।
বিপ্লব ও বিদ্রোহ: কেন শুরু হয়েছিল জুলাই আন্দোলন
জুলাই ২০২৪ একটি আগুনঝরা মাস, এক জনতার প্রতিজ্ঞা, এক তরুণ প্রজন্মের ঝাঁপিয়ে পড়া সময়ের খোঁজে। রাস্তায় যখন হাজার হাজার মুখ, কণ্ঠে একটাই দাবি, "সংস্কার চাই, ন্যায্যতা চাই, স্বাধীনতা চাই!" তখন ঢাকার বাতাসে বারুদের গন্ধের সাথে মিশে ছিল স্বপ্নের ঘ্রাণ। কোটা সংস্কার আন্দোলন নামে শুরু হলেও এটি আর ছিল না কেবল কোটা কিংবা চাকরির প্রশ্ন: এটি হয়ে উঠেছিল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণমানুষের অভ্যুত্থান যেখানে প্রশ্ন ছিল অস্তিত্বের, সমতার এবং ভবিষ্যতের।
স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ২০১৮ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কোটা সংস্কারের। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বদলে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলেছে সময়ক্ষেপণ, অবজ্ঞা, আর পর্দার আড়ালে কোটা আবারো ফিরিয়ে আনার চক্রান্ত। আর ২০২৪ সালে সেই চক্রান্ত যখন বাস্তব হয়ে ফিরে আসে তখন বলে, "এটা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত"। তখন তরুণরা বুঝে যায় আর চুপ করে থাকার জায়গা নেই। সঙ্গে যুক্ত হয় ২০২৪ সালের একদলীয় নির্বাচন, যেখানে ব্যালটের বদলে চলে রাবার স্ট্যাম্পের মহোৎসব। পুলিশের গুলিতে মরে যায় প্রতিবাদী, ছাত্রলীগের হাতে রক্তাক্ত হয় রাজপথ, আর এক রাষ্ট্রব্যবস্থা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে জল্লাদের পাশে।
এই বাস্তবতায় একজন মো: হানিফ ছিলেন রাজপথে। না, তিনি
কোনো মিছিলে নেতৃত্ব দেননি, কোনো ব্যানার হাতে রাখেননি। তার হাতে ছিল ভ্যানের হ্যান্ডেল, কাঁধে ছিল ঘাম, আর হৃদয়ে ছিল সংসারের দায়। একটা মেয়ে এসএসসি দেবে, দুটো ছেলে এখনও ছোট, একা ঢাকায় থেকে তিনি ভ্যান চালান, যেন ভাঙা নদীভূমির মানুষটা একটু বাঁচতে পারে। কিন্তু ৫ আগস্ট, সাইন্স ল্যাবের চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে যখন শ্লোগান গর্জে ওঠে, তিনি থেমে যান একপাশে। দাঁড়িয়ে দেখেন তরুণেরা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য লড়ছে।
ঠিক তখনই, পেছন থেকে নেমে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ আক্রমণ। হানিফ কিছুই করেননি, শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবু তাকেও ছাড়েনি তারা। লাঠির বাড়ি এসে পড়ে তাঁর হাতে, কনুইয়ের হাড় থেঁতলে যায়, দেহে রক্ত জমে ওঠে। এরপর? নয় মাস কর্মক্ষমতা হারিয়ে বসে থাকেন গ্রামের ঘরে। সেই ঘর যেটা ভোলা থেকে হারিয়ে আজ নোয়াখালীতে ঠাঁই পেয়েছে, যেখানে আশ্রয় আছে, কিন্তু আয় নেই।
এই হানিফেরা ছিলেন বলেই এই বিপ্লব শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে গ্রামের দরজায়, পেশার বেড়াজাল ভেঙে ঢুকে পড়েছে ভ্যানচালক, দিনমজুর, দোকানদারদের হৃদয়ে। কারণ একদিন সকলেই জেনেছে এই রাষ্ট্র শুধু ছাত্রের নয়, শ্রমিকেরও নয়, এমনকি কারোই নয়, বরং কিছু দুর্বৃত্তের সম্পত্তি হয়ে উঠেছে। তাই, হানিফদের উপস্থিতি এই বিপ্লবের আসল সুর।
আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা
৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট। ঢাকার সাইন্সল্যাবের চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনের সেই ঝাঁঝালো দুপুর যেন ইতিহাসের এক রক্তাক্ত পৃষ্ঠা হয়ে রয়েছে হানিফের জীবনে। দিনটা ছিল অগাস্টের আগুনপোড়া এক দিন। তপ্ত বাতাস, রাজপথে ক্ষুব্ধ কণ্ঠের গর্জন, চোখে স্বপ্ন আর প্রতিবাদের ঝলকানি। হানিফ, একজন ভ্যানচালক, কাজের ফাঁকে একটু দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তায়। না কোনো দলের সঙ্গে, না কোনো নেতার নির্দেশে; কেবল মানুষ হিসেবে, একজন অভাগা পিতার মন দিয়ে সেই মিছিলের দিকে তাকিয়েছিলেন, যেখানে কন্ঠে কন্ঠ মিশে উচ্চারিত হচ্ছিল "হাসিনা তুই স্বৈরাচার, এই মুহূর্তে গদি ছাড়।"
এই ছোট্ট দাঁড়ানোই যেন অপরাধ ছিল। ছাত্রলীগের হেলমেটধারী সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে হঠাৎ ছুটে আসে সে দিকে। গুলি আর লাঠির শব্দে কেঁপে ওঠে ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা। একদিকে ছাত্রদের গলা ফাটানো স্লোগান, আরেকদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নিঃশব্দ বর্বরতা। পুলিশের সামনে রড হাতে নামিয়ে আনা হয় প্রতিরোধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। হানিফ, যিনি কারো পথ আটকাননি, কারো গায়ে হাত তোলেননি তাঁকেও রেহাই দেয়নি হিংসার হাত। ডান হাতে সজোরে রডের আঘাত আসে হাড় গুঁড়িয়ে যায়, রক্ত ছুটে চলে শরীরের শিরা দিয়ে, আর তার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই ছবি ভেসে ওঠে তার মেয়ে হাফসা, যে এসএসসি দেবে এ বছর।
মাটিতে লুটিয়ে পড়া হানিফকে পেছনে ফেলে চলে যায় হায়েনার দল। কেউ পানি দেয় না, কেউ ফোন করে না অ্যাম্বুলেন্সে। এটাই ঢাকার রাজপথ, যেখানে "গরিব" মানুষের ব্যথা রাষ্ট্রের শব্দতালিকায় নেই। পরে স্থানীয়রা মিলে তাঁকে ফার্মেসিতে নিয়ে যান। চিকিৎসা চলে। হাত বেঁধে ব্যান্ডেজ করা হয়, কিন্তু জীবন আর আগের মতো স্বাভাবিক হয় না। প্রায় ৯ মাস বিছানায় পড়ে ছিলেন একাই, কারণ তাঁর পরিবার গ্রামের ভাঙা ঘরে। তিন সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা, ঘরে উপার্জনের অন্য কোনো পথ নেই। হানিফ নিজের শরীর দিয়ে প্রতিবাদ করেননি, কিন্তু রাষ্ট্র যেন প্রতিশোধ নেয় এক দরিদ্র নাগরিকের "অপমানজনক বেঁচে থাকার সাহস" থেকে।
ভ্যান চালানো মানুষদের হাতে থাকে ঘাম, পিঠে থাকে রোদ, পায়ে থাকে ক্লান্তি কিন্তু মাথায় থাকে একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন। সেই হাতই যখন ভেঙে ফেলা হয়, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, একটি সংসার ভেঙে যায়, একটি ভবিষ্যৎ মুখ থুবড়ে পড়ে। হানিফের জন্য এই গ্রীষ্মকাল ছিল এক রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বর্ষাকাল যেখানে রক্ত পড়ে ছিল গরম রাস্তায়, আর আশ্বাস শুকিয়ে গিয়েছিল ক্ষমতার সিংহাসনের ছায়ায়।
তবু হানিফ হারেননি। একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠলে আবার ভ্যান চালানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর কথায়, "আমি ভিক্ষা চাই না। আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা যেন স্কুল ছেড়ে সংসার না টানে। আমি চাই কাজ, চাই সম্মান আমি তো এই দেশের নাগরিক, আমি কি এতটুকু প্রাপ্য না?" এই প্রশ্নটাই আজ জেগে উঠুক প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে। কারণ হানিফের হাতে শুধু হাড় ছিল না ছিল সম্মান, ছিল শ্রম, ছিল দেশের প্রতি মৌন দায়বদ্ধতা। সেই দায় ভুলে গেলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
চিকিৎসা ও বর্তমান অবস্থা
চন্দ্রিমা মার্কেটের সেই রক্তাক্ত দুপুরের পরে মো: হানিফ আর ছিলেন না কেবল একজন ভ্যানচালক তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রীয় অবহেলার জ্যান্ত প্রমাণ, যার শরীরে খোদাই হয়ে গেছে অন্যায়ের চিহ্ন। রডের আঘাতে ডান হাত ভেঙে যায়, কাঁপতে কাঁপতে তিনি যখন মাটিতে পড়ে যান, কেউ এগিয়ে আসেনি। আশেপাশে যারা ছিলেন, তারাও সন্ত্রস্ত, কারণ যারা আঘাত করে তাদের পেছনে থাকে রাষ্ট্র। হাসপাতালের বিল, ওষুধের খরচ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব এক সঙ্গে চেপে বসে তাঁর বুকের উপর। সেদিন ঢাকার রাজপথে যা ঘটেছিল, তা হানিফের শরীরের হাড়ে লেখা হয়ে গেছে অদৃশ্য নয়, অমোচনীয়।
রিকশা, ভ্যান, কিংবা ব্যাটারিচালিত যানের হ্যান্ডেল ধরা মানুষেরা প্রতিদিন যে যুদ্ধ করে, তা আমরা কেউ দেখি না। হানিফ সেই যোদ্ধাদের একজন, যাঁর যুদ্ধ শুধু খদ্দের জোগাড় কিংবা ভাড়ার জন্য নয়, বরং একখণ্ড সম্মানের জন্য। যখন তিনি বুঝলেন ঢাকায় আর সুরক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই, আশ্রয় নেই, তখন তৎক্ষণাৎ চলে গেলেন নোয়াখালীর গ্রামে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর আসল লড়াই। হাতের ভাঙা হাড়ে প্লেট বসানো হয়, ডাক্তাররা বলেন "ছয় মাস পর অপারেশন করে প্লেট খুলতে হবে।" কিন্তু চিকিৎসা তো শুধু অস্ত্রোপচার না চিকিৎসা মানে খরচ, বাসা, পথ্য, বিশ্রাম, আর সবচেয়ে বড় কথা সময় এবং সামর্থ্য। হানিফের কাছে সেসব কিছুই ছিল না।
ছয় মাস পেরিয়ে যায়, অর্থ জোগাড় হয় না। প্লেট আর খোলা হয় না। হাত কিছুটা শক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু আগের মতো নয় বাঁকা হয়ে আছে, ব্যথা মাঝে মধ্যে তীব্র হয়ে ওঠে, আর হানিফ। জানেন, এটিই তাঁর ভবিষ্যতের স্থায়ী বোঝা। তবু তিনি বসে থাকেননি। কারণ গরিবদের হাতে থেমে যাওয়ার সময় থাকে না। দুঃখ বিলাসিতা নয়, বাধ্যবাধকতা। তিনি আবারও রাস্তায় নামেন ভ্যান চালাতে। বাঁকা হাতেই স্টিয়ারিং ধরে।
এখন প্রতিদিন সকাল মানে একটি নতুন চাবুক হাতের ওপর, ঘাড়ের ওপর, সমাজের ওপর। কেউ বলে না, "তুমি বীর।" কেউ বলে না, "তোমার চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে।" কারণ এই রাষ্ট্র কানে তুলো গুঁজে রেখেছে, চোখে বাধা পড়ছে সুবিধাবাদের কাপড়। হানিফের একটিই কথা, "আমি সাহায্য চাই না, আমি শুধু চাই, একটা দিন যেন কাজে যাই, রাতে সন্তানের মুখ দেখি, মাথা উঁচু করে ঘুমাই।" এমন অনুরোধ একটি রাষ্ট্রের কাছে বড় কিছু নয়, কিন্তু অবহেলার পাহাড়ে সে কন্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়।
তবু হানিফের মুখে ক্লান্তি নেই, চোখে দুঃখ থাকলেও জেগে আছে একরকম দৃঢ়তা। এই মানুষটিই জুলাই বিপ্লবের এক নিঃশব্দ সৈনিক, যার অস্ত্র ছিল শ্রম। তাঁর বাঁকা হাত, তাঁর অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, তাঁর আবার উঠে দাঁড়ানো এ সবকিছু মিলিয়ে একটাই কথা বলে: এই বিপ্লব শুধু মিছিলে নয়, এই বিপ্লব রোজকার জীবনযুদ্ধেও।
প্রস্তাবনা
১. হাতের অস্ত্রোপচারের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার গ্রহণ
২. ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য পুঁজি বা পুনর্বাসন তহবিল
৩. সন্তানদের জন্য শিক্ষা সহায়তা বা স্কলারশিপ
ঘটনার বিবরণ: আন্দোলনের সময় সাইন্সল্যাব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের গণ হামলায় তিনি আক্রান্ত হন। হামলায় তার ডান হাতের হাড় ভেঙ্গে যায়।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
প্রাথমিক চিকিৎসা: আহত হওয়ার পর নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে নোয়াখালীতে চলে যান।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা: হাতে প্লেট বসানো হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা: অসুস্থতার পর প্রায় ৯ মাস বাড়িতে থাকতে
হয়েছে। অর্থের অভাবে ছয় মাস পরে প্লেট খোলার কথা থাকলেও তা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে হাতের অবস্থা কিছুটা ভালো হওয়ায় কাজ করতে পারছেন।
বিশেষ নোট: প্রায় ৮ বছর আগে নদী ভাঙনে বাড়ি বিলীন হয়ে যাওয়ায় তিনি নোয়াখালীতে বাড়ি করেছেন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা পরিবর্তন না করায় দাপ্তরিক কাজে ভোলার ঠিকানা ব্যবহৃত হয়।


এক নজরে মো: হানিফ
নাম: মো: হানিফ
জন্ম তারিখ: ১৩ আগস্ট ১৯৮৬
পিতার নাম: ইয়াসিন
মাতার নাম: রানু বেগম
পেশা: ভ্যান চালক
মাসিক আয়: ২০,০০০ টাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: উত্তর বাটামারা, হোল্ডিং: হোসেন আলী বাড়ী, ডাকঘর: দক্ষিণ বাটামারা-৮৩২০ ওয়ার্ড নং: ৬. ইউনিয়ন: বড় মাইনকা, থানা: বোরহানউদ্দিন, জেলা: ভোলা
বর্তমান ঠিকানা: ৪৪/১, ঢাকা কলেজ রোড (পোস্ট অফিস গেইট), ওয়ার্ড নং: ১৮ থানা: নিউমার্কেট, জেলা: ঢাকা সিটি দক্ষিণ
পারিবারিক তথ্য
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭ জন
পিতার বয়স: ৭০ বছর
মাতার বয়স: ৬০ বছর
সন্তানদের বিবরণ
হাফসা আক্তার: বয়স ১৮, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী
আকরাম: বয়স ১৫, তৃতীয় শ্রেণি পাশ
সিয়াম: বয়স ১১, চতুর্থ শ্রেণি
আহত হওয়ার তারিখ ও সময় ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২:৩০ মিনিট
আহত হওয়ার স্থান।: সাইন্স ল্যাব, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍