হোম / আহতদের তালিকা / সাইম হোসেন
সাইম হোসেন

সাইম হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সাইম হোসেন ২০১৩ সালের ১৪ জুন কুমিল্লা জেলার বরুরা উপজেলার ভাকসার গ্রামে জন্ম নেয়। তার শৈশব গড়ে ওঠে সীমিত আয়ের একটি পরিবারে। বাবার নাম আনোয়ার হোসেন, বয়স ৩৫, তিনি একটি চাকরি করেন। মা সুমি বেগম, বয়স ৩৪, একজন গৃহিণী। তাদের মাসিক আয় মাত্র ১৪,০০০ টাকা। পরিবারে সদস্য সংখ্যা আটজন। সাইমের শৈশব কাটে মমতা, অভাব আর স্বপ্নের মধ্যে। শিশুকাল থেকেই সে চটপটে, কথা বলায় সাবলীল এবং স্কুলমুখী। ছোটবেলায় সে কুমিল্লা থেকে পরিবারসহ চট্টগ্রামে আসে জীবিকার প্রয়োজনে। বর্তমানে তারা বসবাস করে আকবরশাহ থানার পাঞ্জাবী লাইনে, যেখানে তারা নানার বাড়ির আশ্রয়ে থাকে। তার হাতে থাকে বই, চোখে স্বপ্ন। মা প্রতিদিন তাকে স্কুলে পাঠান, বাবা অফিসে যান। এই ছেলেটা হতে চায় বড় কিছু। যে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু সেই স্বপ্নে আঘাত আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। পাহাড়তলীতে একটি প্রতিবাদ মিছিল দেখতে গিয়ে গুলিতে মারাত্মক আহত হয় সে। হাতে লোহার পাত বসানো হয়, এবং পা থেকে চামড়া কেটে হাতে লাগানো হয়। আজ সেই চঞ্চল শিশুটি দগদগে ক্ষত আর ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে দিন পার করে।

কর্ম
সাইম একজন ছাত্র। তার বয়স এখন ১১ বছর। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাই, বই নিয়ে পড়ে থাকি। মা খাতা-কলম গুছিয়ে দেয়, বাবা আদর করে বিদায় জানায়। তার কর্মজীবন মানে পড়ালেখা, শেখা, বড় হওয়ার প্রস্তুতি। ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনার প্রতিযোগিতা করি। শিক্ষকরা ভালোবাসে, কারণ সে শৃঙ্খলাপরায়ণ আর একনিষ্ঠ। তার স্বপ্ন একদিন একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করা। কিন্তু সে পথ থেমে যায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। পাহাড়তলীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ডান হাত অকেজো হয়ে পড়ে। এখন আর কলম ধরা যায় না, বইয়ের পাতা উল্টানো যায় না। এই মুহূর্তে তার ‘কর্ম’ বলতে চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি আর ব্যথা সহ্য করা। স্কুলে ফিরতে পারি না, হাত নাড়াতে পারি না। প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য ড্রেসিং করতে হয়, ব্যথানাশক খেতে হয়। আজ সাইম আর সাধারণ ছাত্র নয়। সে আওয়ামী সহিংসতার এক জীবন্ত চিহ্ন। যেখানে তার বয়সের অন্যরা ক্রিকেট খেলছে, স্কুল যাচ্ছে, সাইম সেখানে হাসপাতালের বিছানায় চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। এক ভিন্ন জীবনের দিকে।

পারিবারিক বর্ণনা
সাইম একটি আট সদস্যের পরিবারের সদস্য। তার বাবা আনোয়ার হোসেন চাকরি করেন, বয়স ৩৫। মা সুমি বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৩৪। ভাই সোহানসহ তারা সবাই মিলে নানাবাড়িতে দিন কাটায়। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বাবার স্বল্প বেতনের চাকরি। জমি-জায়গা নেই, নিজের কোনো বাড়িও নেই। প্রতিদিন তারা খরচ আর ঋণের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মা সারাক্ষণ সাইমের সেবায় নিয়োজিত। সকালে ওষুধ, দুপুরে ড্রেসিং, রাতে ব্যথা হলে পাশে বসে থাকেন। বাবাও কাজের ফাঁকে ছেলের জন্য ছুটে আসেন। ভাই সোহানও সহানুভূতি নিয়ে পাশে থাকে। এই পরিবারে এখন হাসি নেই, স্বস্তি নেই। একদিকে চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে ঘরভাড়া, ওষুধ, খাবার। সবকিছু যেন এক বিভীষিকা। মা বলেন, “আমার ছেলেটা ছিল সব থেকে প্রাণবন্ত, আজ তাকিয়ে থাকি। চোখে শুধু কষ্ট।” পাড়ার মানুষরা কেউ কেউ সহানুভূতি জানায়, কেউ এড়িয়ে যায়। আত্মীয়রাও দূরত্ব তৈরি করে। একটি ছোট্ট পরিবারের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এমন নিঃশব্দ আঘাত তাদেরকে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের মধ্যভাগে দেশের নানা স্থানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষা, চাকরি, প্রশাসনে বৈষম্যমূলক কোটাপ্রথার বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবকেরা রাস্তায় নামে। এই আন্দোলন কেবল রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে নয়, ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ডাক। পাহাড়তলী, প্রেস ক্লাব, নিউমার্কেট। দেশজুড়ে তরুণেরা দাবি তোলে, “আমরা বঞ্চিত, আমাদের অধিকার চাই।” সরকার এই ন্যায্য দাবি শুনে না, বরং পুলিশ, যুবলীগ, ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়। তারা মিছিলে গুলি চালায়, লাঠিচার্জ করে, গ্রেফতার করে। এমনকি পথচারী, সাধারণ মানুষ। কারো দিকেই ছাড় দেয় না। এই বর্বরতায় সাইমের জীবন বদলে যায়। সে ছিল স্রেফ এক দর্শক, একটি শিশু। কিন্তু তাতেও রেহাই মেলে না। তার ক্ষত-বিক্ষত শরীর বলে, এ রাষ্ট্র কাকে ভয় পায়? এমনকি শিশুদেরও নয় কি?
আন্দোলনে যোগদান
সাইম সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেয় না। বয়সও সেভাবে উপযুক্ত নয়। কিন্তু আন্দোলনের প্রতি কৌতূহল তার মনে জন্ম নেয়। ৫ আগস্ট বিকালে সে পাহাড়তলীর দিকে যায়, দেখতে চায় মানুষ কী বলছে, কী করছে। মিছিল তখন চলছিল, “বৈষম্য নিপাত যাক” স্লোগান উঠছে। হঠাৎ পুলিশ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিত আক্রমণ চালায়। গুলি ছোড়ে, ধাওয়া করে, মারধর করে। সাইম পালাতে চায়, কিন্তু এক গুলি এসে লাগে তার ডান হাতে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, চার পাশে আতঙ্ক। কয়েকজন দৌড়ে এসে তাকে তুলে নেয়, হাসপাতালে নিয়ে যায়। এই একটি গুলিই তার হাত ভেঙে দেয়, স্বপ্ন থামিয়ে দেয়, শিশুকাল ছিনিয়ে নেয়। এখন সে ঘরে বসে দিন কাটায়, ডান হাতে শক্তি নেই, চামড়া নেই। তার পাশে মা বসে থাকেন, চোখে জল নিয়ে। সেই বিকেলটা আজও তার মনে গেঁথে আছে। কীভাবে এক শিশু হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার। এই ভাবনা প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে।
আহত পরবর্তী জীবন
চিকিৎসার পরও সাইম আজও পুরোপুরি সুস্থ নয়। তার ডান হাতে বসানো লোহার পাত এখনো ব্যথা দেয়। সেই হাতে কাজ করা তো দূরের কথা, হালকা চাপেও যন্ত্রণা হয়। প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়, হাতে ড্রেসিং করতে হয়, ব্যথানাশক নিতে হয়। তার চেহারায় এখন সে আগের হাসি নেই। চোখে গভীর বিষণ্নতা, মুখে নীরবতা। স্কুলে আর যাওয়া হয় না। বই দেখলেও মন বসে না। শিক্ষক, বন্ধু, স্কুলের মাঠ, সব কিছুর স্মৃতি চোখে ভাসে। কিন্তু সে জানে- সে দিন আর ফিরে আসবে না। মা তার সাথেই থাকেন। দিন-রাত সেবাযত্ন করেন। বাবা চাকরি থেকে ফিরে এসে ওষুধ কেনেন, চিকিৎসার কাগজপত্র দেখেন। ভাই সোহান চুপচাপ পাশে বসে থাকে। এখন তাদের ঘর যেন এক নিঃশব্দ যন্ত্রণার কেন্দ্র। কেউ হাসে না, কেউ গান গায় না। শুধু একটার পর একটা ব্যথা আর চিকিৎসার হিসাব চলে।
চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য
আহতের পর সাইমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে জরুরি অপারেশনে তার ডান হাতে লোহার পাত বসানো হয়। পরবর্তীতে তার ডান হাতে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয় তার পা থেকে। এই চিকিৎসার খরচ ছিল অনেক। আর্থিক সীমাবদ্ধতায় পরে সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। বর্তমানে তার হাতে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ব্যথা থামানো যায় না। চিকিৎসক ফিজিওথেরাপি, ব্যথানাশক ও নিয়মিত চেকআপের পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের পক্ষে এ ব্যয় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। উন্নত হাসপাতাল বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা প্রয়োজন। পাশাপাশি একজন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, কারণ সে গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে আছে।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম: সাইম হোসেন
জন্ম তারিখ: ১৪-০৬- ২০১৩
জন্মস্থান: কুমিল্লা
পেশা: ছাত্র
নিজ জেলা: চট্টগ্রাম
ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ভাকসার, ইউনিয়ন: ভাকসার, থানা: বরুরা, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: পাঞ্জাবী লাইন, এলাকা: কালিবাড়ি, থানা: আকবরশাহ, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: আনোয়ার হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স চাকফা, ৩৫
মায়ের নাম: সুমি বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স গৃহিণী, ৩৪
মাসিক আয়: ১৪,০০০
আয়ের উৎস: চাকরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৮ (বাবা, মা, ভাই, ও সাইম)
সম্পদ: নিজস্ব জমি নেই
ভাইয়ের বিবরণ
১. সোহান হোসেন, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান পাহাড়তলী
আক্রমণকারী: যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময় ৫ আগস্ট, ২০২৪, বিকাল ৩.০০টা
প্রস্তাবনা
সাইম হোসেনের পুনর্বাসনের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া দরকার:
১. পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা: সরকারিভাবে অথবা দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে উন্নত হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
২. চাকরি: সাইমের বাবাকে সরকারিভাবে একটি স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা দিতে হবে, যাতে পরিবারটি বাঁচতে পারে
৩. স্থায়ী বাসস্থান: একটি নিরাপদ, নিজস্ব ঘরের ব্যবস্থা করা জরুরি
৪. শিক্ষা: সাইমের জন্য ঘরে বসে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার উপযোগী শিক্ষক ও সহায়ক উপকরণ প্রদান করতে হবে
৫. মনোবৈজ্ঞানিক সহায়তা: একজন শিশুমনের কাউন্সেলরের অধীনে নিয়মিত কাউন্সেলিং দরকার
এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে সাইম শুধু একটি ক্ষতবিক্ষত শিশুই নয়, একটি নতুন জীবনের পথ খুঁজে পাবে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍