হোম / আহতদের তালিকা / সাজ্জাদ হোসেন
সাজ্জাদ হোসেন

সাজ্জাদ হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চাকরি, চট্টগ্রাম নিউমার্কেট

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সাজ্জাদ হোসেন ২০০৮ সালের ২০ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম এমন এক সময়ে যখন দেশজুড়ে বৈষম্য, নিপীড়ন ও অনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল। গ্রামীণ পরিবেশে, কৃষিজ পরিবারে বেড়ে ওঠা সাজ্জাদের শৈশব কাটে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, মাটির ঘরে, সীমিত আর্থিক সম্পদের মাঝেই। তার পিতা জামাল হোসেন একজন কৃষক এবং মাতা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি সাদাসিধে জীবন যাপন করে বড় হতে থাকেন। পরিবারে পাঁচজন সদস্য, যার মধ্যে সাজ্জাদ মধ্যম। বড় ভাই প্রবাসে, ছোট ভাই আজাদ স্কুলছাত্র। ছোটবেলা থেকেই সাজ্জাদ ছিলেন কর্মঠ ও দায়িত্বশীল, পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা তার চিন্তাজগতে স্থান করে নেয় অল্প বয়সেই।

কর্ম
অল্প বয়সেই সংসারের চাপে পড়ালেখা বাদ দিয়ে সাজ্জাদ জীবিকার সন্ধানে নামে। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম শহরের নিউ মার্কেট এলাকায় একটি দোকানে কাজ করে। প্রতিদিন ভোরে সাতকানিয়া থেকে চট্টগ্রামে এসে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে। মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজের খরচ সামলে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তার কাজ মূলত দোকানের বিক্রয় সহকারী হিসেবে, পণ্য ওঠানো-নামানো, হিসাব রাখা, গ্রাহকদের সেবা দেয়া ইত্যাদি। কাজের গাম্ভীর্য ও একাগ্রতা তাকে অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। সামান্য বেতনে জীবনের ভার বইতে হয় তাকে, তবুও কোনো অভিযোগ নেই মুখে। তার স্বপ্ন ছিল, একদিন নিজেই ছোট একটি ব্যবসা দাঁড় করাবে, মায়ের মুখে হাসি ফুটাবে।

পারিবারিক বর্ণনা
সাজ্জাদের পরিবার একটি দরিদ্র কৃষক পরিবার। পিতা জামাল হোসেন বয়স ৫৮, মাটির সঙ্গে মিশে থাকা একজন খাঁটি কৃষক। জমিজমা বলতে মাত্র ২ গণ্ডা পরিমাণ জমি, যার ওপর নির্ভর করেই সংসার চলে। মাতা আছিয়া খাতুন, বয়স ৪৮, একজন গৃহিণী সারাদিন সংসারের খুঁটিনাটি সামলান। ছেলেদের জন্য চিন্তিত থাকেন। সংসারের আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা, যা দিয়ে মাসশেষে টিকে থাকা দুঃসাধ্য। বাড়ি মাটির দেয়াল, টিনের চালা, বর্ষায় বৃষ্টি পড়ে, গ্রীষ্মে গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। বড় ভাই এহসান (২৭) জীবিকার তাগিদে প্রবাসে। প্রেরিত অর্থেও সংসারে স্বস্তি আসে না। ছোট ভাই মোঃ আজাদ, বয়স ৯, এখনো স্কুলে পড়ে। পরিবারের সবাই একে অন্যের প্রতি অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাদের এই কঠিন জীবনেও তারা আত্মমর্যাদাশীল, সহানুভূতিশীল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক দফা এক দাবির আন্দোলন, যেখানে সাধারণ জনগণ বৈষম্য, নির্যাতন, অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এই আন্দোলন মূলত দরিদ্র, নিপীড়িত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্তচিৎকার হয়ে ওঠে। সরকারবিরোধী এই গণআন্দোলনে যুবসমাজ ছিল অগ্রণী ভূমিকায়। চট্টগ্রাম মহানগর, বিশেষ করে নিউ মার্কেট এলাকা, হয়ে ওঠে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। যুবলীগ ও পুলিশের বর্বরতা, সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবীদের ওপর হামলা, মিথ্যা মামলা এসব পরিস্থিতি যুবসমাজের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সাজ্জাদের মতো শ্রমজীবী যুবক, যারা প্রতিদিন শহরে কাজ করতে আসে, তারাও বুঝতে পারে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের দমিয়ে রাখতে চায়, তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চায়। তাই অসংগঠিত জীবনের মাঝেও তারা আন্দোলনে শামিল হয়, তাদের প্রজন্মের জন্য ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্নে।

আন্দোলনে যোগদান
০৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল সাড়ে চারটায়, চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট মোড়ে যখন ‘এক দফা এক দাবি’ মিছিলের ঢল নামে, তখন সাজ্জাদও নিজ দোকানের কাজ ফেলে মিছিলে যোগ দেন। শ্রমজীবী হলেও তার হৃদয়ে ছিল প্রতিবাদ ও ন্যায়ের স্পষ্ট চেতনা। মিছিল অগ্রসর হতে না হতেই পুলিশ ও যুবলীগের লোকজন অতর্কিতে হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাবার বুলেট এসে তার চোখ ও পিঠে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারান, পিঠে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করেন।

আহত পরবর্তী জীবন
আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর সাজ্জাদ কিছুদিন চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। সেখান থেকে কয়েকটি গুলি বের করা হয়। চোখে মারাত্মক আঘাত থাকায় তিনি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। পরবর্তীতে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভর্তি করা হয় কেরানীহাট হেলথ কেয়ার হাসপাতালে। চিকিৎসার মধ্যেও দুশ্চিন্তার ছায়া ঘনিয়ে আসে পরিবারের ওপর । চিকিৎসার খরচ, ভবিষ্যৎ জীবিকা, মানসিক ট্রমা সব মিলিয়ে সাজ্জাদ দীর্ঘ দুঃস্বপ্নে আটকে পড়ে। কাজ করতে না পারায় তার পরিবারের উপার্জন কমে আসে, মাসিক ১০ হাজার টাকায় ৫ জনের সংসার চালানো তার কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। চোখের ক্ষত সেরে উঠলেও এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। অল্প আলোতে চোখে ব্যথা হয়, পিঠে এখনও ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়ায়নি। কিন্তু তার ভেতরে এখনও প্রতিবাদের শক্তি, জীবনের প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ বেঁচে আছে।

চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
আহত হওয়ার পরই সাজ্জাদকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার চোখ ও পিঠ থেকে কয়েকটি রাবার বুলেট অপসারণ করা হয়। চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও সম্পূর্ণ সুস্থ হননি। পরে তাকে তার বাড়ির কাছে কেরানীহাট হেলথ কেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। চোখের সমস্যা এখনও বিদ্যমান। দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ ফিরে আসেনি, ব্যথাও থেকে গেছে। চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিলেও পরিবারের আর্থিক অবস্থায় তা সম্ভব করছে না। প্রয়োজন উন্নত চক্ষু বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা, স্নায়ুবিক পরীক্ষাসমূহ, দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি ও পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা। অথচ সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা এখনও তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি।

প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ: সাজ্জাদ হোসেনের চোখে রাবার বুলেটের আঘাতে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে আংশিকভাবে দৃষ্টিশক্তি ফিরে এলেও অন্ধত্বের ঝুঁকি রয়েই গেছে। স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা থাকায় তার প্রয়োজন উন্নতমানের চক্ষু বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা, এমআরআই ও স্নায়ুবিজ্ঞানী কর্তৃক পরামর্শ। তাই সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে তাকে ঢাকা বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো জরুরি। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন খরচ বহনের জন্য সরকারি অনুদান ও সমাজের বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
২. কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রদান: চোখ ও পিঠের আঘাতের কারণে সাজ্জাদ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। আগের মতো পরিশ্রমমূলক কাজ করতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তাকে একটি টেকসই ও সহনশীল কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, যেমন: কম্পিউটার অপারেটর, ছোট পরিসরের ব্যবসা বা হস্তশিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণশেষে তার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা অথবা স্বনির্ভর প্রকল্পে অনুদান প্রদান করতে হবে, যাতে সে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং পরিবারের ভরণপোষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও পুনর্বাসন তহবিল গঠন: এ ধরনের আহতদের জন্য আলাদা পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত হয়ে সাজ্জাদের মতো অনেকেই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এসব মানুষের জন্য সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ব্যয়, বাসস্থান ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে তাদের জন্য মাসিক ভাতা, চিকিৎসা কার্ড এবং সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসা সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু সাজ্জাদ নয়, বরং আহত সকল আন্দোলনকারীর জন্য একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : সাজ্জাদ হোসেন
জন্ম তারিখ : ২০-০৩-২০০৮
জন্মস্থান : সাতকানিয়া
পেশা : চাকরি, চট্টগ্রাম নিউমার্কেট
ঠিকানাসংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: ছদাহা, ইউনিয়ন: ছদাহা, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : জামাল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি ও ৫৮
মায়ের নাম : আছিয়া খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ি : মাটির দেয়াল টিনসেট
সম্পদ : ২ গণ্ডা পরিমাণ জমি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. এহসান, বয়স: ২৭, পেশা: প্রবাসী, সম্পর্ক: ভাই
২. মোঃ আজাদ, ছাত্র, বয়স: ৯, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : নিউমার্কেট, চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী : যুবলীগ, পুলিশ
আঘাতের ধরন : চোখে ও পিঠে গুলিবিদ্ধ
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.৩০ মিনিট
চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য : চিকিৎসা সেবা: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, কেরানীহাট হেলথকেয়ার হাসপাতাল

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍