হোম / আহতদের তালিকা / সিরাজুল ইসলাম
 সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: চালক (মাহেন্দ্রা)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সিরাজুল ইসলামের জন্ম ১৯৮৯ সালের ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার বড়দুয়ারা গ্রামে। পাহাড় ও নদীঘেরা এই জনপদটি একসময় ছিল কৃষি ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতির মূলকেন্দ্র। তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক দরিদ্র পরিবারে। তার পিতা মৃত খলিলুর রহমান ছিলেন একজন কৃষিশ্রমিক, যিনি পরিবার চালাতে দিন-রাত মাঠে কাজ করতেন। খুব অল্প বয়সেই বাবার মৃত্যু তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মা হাজেরা খাতুন তখন সদ্য বিধবা, বয়স এখন প্রায় ৬৫। সংসারে তখন অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। সিরাজুলের শৈশব কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে, স্কুলে যাওয়া হয়নি নিয়মিত; বরং কাঁধে ছিল সংসারের বোঝা। তবে জন্মভূমির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল। এখানকার মানুষ, প্রকৃতি ও অভাবই তাকে গড়েছে এক সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। তার মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অন্যরকম মনন শ্রম, ন্যায়বোধ ও প্রতিবাদী চেতনার সমন্বয়ে এক দৃঢ়চেতা যুবক হয়ে উঠেন তিনি।

কর্ম
অভাব তাকে জীবিকার খোঁজে ঠেলে দেয় বিভিন্ন কাজে। প্রথমে দিনমজুর, তারপর ট্রাক হেলপার এবং শেষমেশ নিজ এলাকায় মাহেন্দ্রা চালিয়ে যাত্রী পরিবহন করেই জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। পেশায় তিনি মাহেন্দ্রা চালক হলেও তার মধ্যে ছিল সততা ও মানবিকতা। দরিদ্র যাত্রীদের কাছ থেকে অনেক সময় ভাড়া নিতেন না। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি রাস্তার ধুলা-ধোঁয়া গায়ে মেখে সে ছুটে বেড়াতেন জীবিকার জন্য। তার মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। এ দিয়েই চলতো ছয় সদস্যের সংসার স্ত্রী, দুই সন্তান, মা ও নিজেকে নিয়ে গড়া এক গরিব অথচ আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ পরিবার। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ড্রাইভিং পেশায় তিনি কখনো অন্যায় বা অবিচার সহ্য করেননি। পুলিশ কিংবা সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি রুখে দাঁড়াতেন সাহসিকতার সঙ্গে। তাই সমাজে তাকে সকলে চিনতো ‘সোজা মানুষ, কিন্তু সত্যবাদী’। তার এই সৎ পেশাই একদিন তাকে দাঁড় করায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

পারিবারিক বর্ণনা
সিরাজুল ইসলামের পরিবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের এক প্রান্তিক গ্রামে বসবাসরত একটি শ্রমজীবী পরিবার। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছয়জন তিনি নিজে, তার স্ত্রী, মা হাজেরা খাতুন (৬৫) এবং দু’টি শিশু সন্তান। বড় ছেলে ফরহাদুল ইসলাম, বয়স ১০, স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছোট ছেলে ফাহাদ রিফাতুল ইসলাম, বয়স ৫, সেও স্কুলে যায়। মা গৃহিণী, বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও সংসারে তার ভূমিকা অপরিসীম। বাবার মৃত্যু এবং সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সিরাজুল। স্ত্রী ঘরের কাজ সামলান, আর তিনিই উপার্জন করেন পুরো পরিবারে। তার আয় সীমিত, কিন্তু মন উদার। পরিবারের সদস্যরা তাঁর সৎ উপার্জনে গর্বিত হলেও অভাবের চাপ তাদের শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। সিরাজুল জীবনের প্রতিটি ধাপে পরিবারকে সামনে রেখেছেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ, মায়ের ওষুধ, স্ত্রীর প্রয়োজন সব কিছুতেই ছিল তার নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা। পরিবার তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়, কিন্তু সেই দায়ই তাকে ঠেলে দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। সে জানত, প্রতিবাদ করলে বিপদ আসবে, কিন্তু নীরব থাকলে সন্তানদের ভবিষ্যতই অন্ধকার।

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন সমগ্র বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়, তখন চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, পটিয়া এই আন্দোলন হয়ে ওঠে গণবিস্ফোরণের রূপ। বেকারত্ব, শিক্ষা ও চাকরিতে বৈষম্য, ছাত্রলীগ-যুবলীগের দৌরাত্ম্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব একত্রে ঘনীভূত হয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। তরুণরা পথে নামে, নারী-পুরুষ-শ্রমজীবী মানুষ একাত্ম হয় আন্দোলনে। এই আন্দোলন ছিল নেতৃত্বহীন এক জনজাগরণ, যেখানে ‘আমার ভাই কোথায় চাকরি পাবে?’ প্রশ্নটাই হয়ে ওঠে সর্বজনীন শ্লোগান। সিরাজুল ইসলাম নিজে রাজনীতি করতেন না, তবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পেছপা হননি। এই আন্দোলনের সময় তার মাহেন্দ্রা গাড়ি হয়ে ওঠে প্রতিবাদী ছাত্রদের যাতায়াতের বাহন। তিনি বুঝতেন না পলিটিক্স, কিন্তু বোঝেন ন্যায়-অন্যায়ের তফাৎ। তাই ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার বিবেকের দাবি।

আন্দোলনে যোগদান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুরের রোদ্দুরে সিরাজুল ইসলাম তার মাহেন্দ্রা গাড়ি নিয়ে বড়দুয়ারা থেকে কেরানিহাট অভিমুখে যাচ্ছিলেন। পথে আন্দোলনরত কিছু ছাত্র তাকে অনুরোধ করে, কেরানিহাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি বিনা দ্বিধায় রাজি হন। তিনি জানতেন না, এই সিদ্ধান্ত তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। যখন তারা বড়দুয়ারা পার হচ্ছিল, তখন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল সন্ত্রাসী তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। প্রথমে ইট-পাটকেল, পরে লাঠি ও রড নিয়ে তারা মারতে থাকে। সিরাজুলকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে ফেলে বেধড়ক পেটায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এই পুরো ঘটনার কারণ শুধু একটি— তিনি ন্যায়পথে হেঁটেছেন, ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের সাহস দেখে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভয় পেয়েছিল। তাই তারা এই নির্মমতা চালায়।

আহত পরবর্তী জীবন
আহতের পর সিরাজুলকে স্থানীয় লোকজন ও প্রতিবাদী ছাত্ররাই উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যায়। তার হাতে গভীর আঘাত লাগে, কেটে যায় হাড় পর্যন্ত। হাতে অনেকগুলো সেলাই দিতে হয়। ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। এই সময়ে তার পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। উপার্জন বন্ধ, চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়। ছোট সন্তানরা খাবারের জন্য কাঁদে, মা ও স্ত্রী চোখের জল ফেলেন। তিনি বর্তমানে কর্মহীন। ডান হাতে শক্তি নেই আগের মতো, গাড়ি চালানোও সম্ভব নয় এখন। পরিবারের ভরণপোষণ চরম সঙ্কটে। তার মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এই আঘাত মানেই পুরো পরিবারের জীবন থমকে যাওয়া। সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার কেউ খোঁজ নেয়নি তার। অথচ তিনি কেবল ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন দিন কাটে অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কায়। তার মতো আহতরা এখন এই রাষ্ট্রে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই কি ছিল প্রতিবাদের মূল্য?

চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
হামলার পর সিরাজুলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তার ডান হাতের বেশ কিছু কাটা ও ছেঁড়া অংশে সেলাই দেন। হাড়ে আঘাত থাকায় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন বলে জানানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসাশেষে ১০ দিন হাসপাতালে থেকে তিনি বাড়ি ফেরেন। কিন্তু এখনও তার হাতে জোর ফিরে আসেনি, অনেক সময় যন্ত্রণা করে, মাঝে মধ্যে হাত অবশ হয়ে আসে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো এই পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এমআরআই, থেরাপি এবং ওষুধ সব মিলিয়ে প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা দরকার, যা এখনকার দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের পক্ষে অপ্রাপ্তিযোগ্য। সরকারি কোনো সহায়তা বা এনজিওর সহযোগিতা এখনো পাননি তিনি। গ্রামের কিছু লোক স্বেচ্ছায় কিছু সাহায্য করেছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া এই আহত অবস্থায় তার জীবন এখন শুধুই এক অনিশ্চয়তা।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : সিরাজুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১৪-০৪-১৯৮৯
জন্মস্থান : বড়দুয়ারা
পেশা : ড্রাইভার (মাহেন্দ্রা চালক)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বাজালিয়া, ৭নং ওয়ার্ড, ইউনিয়ন: বাজালিয়া, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত খলিলুর রহমান
মায়ের নাম : হাজেরা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৬
সন্তানদের বিবরণ
১. ফরহাদুল ইসলাম, বয়স: ১০, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে
২. ফাহাদ রিফাতুল ইসলাম, বয়স: ৫, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : বড় দোয়ারা, চট্টগ্রাম
আহত হওয়ার সময় : ০৫-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ যুবলীগ
চিকিৎসা : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

প্রস্তাবনা
১. আহত সিরাজুল ইসলামের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে
২. তার হাতের পূর্ণ চিকিৎসা ও থেরাপির ব্যবস্থা বিনামূল্যে করতে হবে
৩. পরিবার চালানোর জন্য মাসিক ভাতা প্রদান করতে হবে
৪. দুই সন্তানের লেখাপড়ার জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে
৫. পরিবারে আয়বর্ধক প্রকল্পে স্ত্রী/মাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে
৬. হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ নিরীহদের ওপর হামলার সাহস না পায়
৭. সমাজ ও রাষ্ট্রকে আহতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য জনসচেতনতা ও সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি করতে হবে
৮. সিরাজুল ইসলামের মতো আহতদের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍