হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ তারেক
মোঃ তারেক

মোঃ তারেক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: চাকরিজীবি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মোঃ তারেক ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার বড় হাতিয়া গ্রামে। তার জন্ম হয় একটি মধ্যবিত্ত, ধর্মভীরু মুসলিম পরিবারে। পিতা মৃত নুরুল হাকিম ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, যিনি জীবদ্দশায় কৃষি ও খণ্ডকালীন শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারটির আর্থিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মাতা আয়েশা বেগম এখন ষাটোর্ধ্ব, একজন গৃহিণী, যিনি সংসার ও সন্তানদের নিয়ে সীমিত আয়ে জীবনযাপন করছেন। ছয় সদস্যের পরিবারে তারেক বড় সন্তান, যিনি ছোট ভাইয়ের সহায়তায় পরিবারের খরচ বহন করেন। ছোট ভাই মোঃ ফারুক একজন শ্রমিক। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা শুরু করে তারেক ধাপে ধাপে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে এবং বর্তমানে চাকরি করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। জন্মস্থানে সামাজিকভাবে সে শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের জন্য পরিচিত, যার মধ্যে রয়েছে নেতৃত্বের বীজ। শিশুকাল থেকেই সে সমাজের অন্যায়-অবিচার, বৈষম্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তার জীবন সংগ্রামী কিন্তু দৃঢ়। এভাবেই সে বড় হতে থাকে, পরিবারকে আগলে রেখে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

কর্ম
মোঃ তারেক একজন চাকরিজীবী। জীবন-জীবিকার জন্য তিনি এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি কাজের প্রস্তুতি নেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তার মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা, যা দিয়ে নিজের পরিবার চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। পিতা না থাকায় সে-ই এখন পরিবারের প্রধান অভিভাবক, মায়ের ও ভাইয়ের দায়িত্ব তার কাঁধে। তার চাকরি শুধুমাত্র উপার্জনের পথ নয় এটি তার আত্মমর্যাদা রক্ষার মাধ্যম। সহকর্মীদের কাছে তিনি বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত। দারিদ্র্যের কারণে হয়তো সে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু নিজের আত্মশক্তি ও নৈতিকতা দিয়ে সমাজে স্থায়ী জায়গা করে নিতে চায়। তার চোখে সমাজের অবিচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সে চায় পরিবর্তন, তাই নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। কর্মজীবনে তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার সততা, দায়িত্ববোধ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, তখনও সে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে পিছিয়ে থাকে না। কর্মই তার ধর্ম, কর্মই তার প্রতিবাদ।

পারিবারিক বর্ণনা
মোঃ তারেকের পরিবার একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রামীণ পরিবার, যেখানে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও রয়েছে ভালোবাসা, একতা ও সম্মান। তার পিতা মারা গেছেন অনেক আগেই, যার শূন্যতা আজও তাদের পরিবারে অনুভূত হয়। মা আয়েশা বেগম একজন গৃহিণী, যিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কিন্তু সন্তানদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ আজও অটুট। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র দশ হাজার টাকা, যা চাকরি করা তারেকের একার উপার্জন। ছোট ভাই ফারুক একজন শ্রমিক হিসেবে অল্প কিছু টাকা আয় করে, যা সংসারে সাহায্য করে। পরিবারের ছয় সদস্য একত্রে একটি সাধারণ বাড়িতে বসবাস করে। এ বাড়ি তাদের জন্য কেবল বসবাসের স্থান নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক বর্ণময় প্রতিচ্ছবি। সংসারে সঞ্চয় নেই, নেই জমি-জমা বা ধনসম্পদ তবে আছে একটি স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ গড়ার ইচ্ছা। তারেক নিজে এই পরিবারের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো ক্লান্ত হন না তিনি, বরং মা ও ভাইয়ের মুখে হাসি দেখতে চেয়েই সংগ্রাম করে চলেছেন। এ পরিবারই তার বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, তার ভবিষ্যত স্বপ্নের ভিত্তি।

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশ জুড়ে এক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিনের অবিচার, রাষ্ট্রীয় দমননীতি ও আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা ধ্বংস, ধর্মীয় অনুশীলনে বাধা, বাকস্বাধীনতা হরণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সব মিলে সাধারণ জনগণ ও ছাত্রসমাজে এক অসন্তোষ জমে ওঠে। সরকারের দুর্নীতি, পুলিশি বর্বরতা, বিরোধীদের দমন ও শহীদদের রক্ত নিয়ে উপহাস মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। আন্দোলনের নেতৃত্ব নেয় ছাত্ররা, কিন্তু সাথে সাধারণ চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিকরাও যুক্ত হয়। মোঃ তারেক এই সময় একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন, দেশের ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর এক ফ্যাসিস্ট পথে হাঁটছে। শহীদদের রক্তের দাবি, বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি মিছিল-মিটিংয়ে যুক্ত হন। তার চোখে এই আন্দোলন শুধুই ছাত্রদের প্রতিবাদ নয় এটি জাতিগত মুক্তির আন্দোলন, নতুন বাংলাদেশের আন্দোলন। এই সময় তারেক ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম দুই প্রান্তে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। শাহবাগে গিয়ে দেখেন, দেশের ছাত্ররা কীভাবে বুক দিয়ে প্রতিবাদ করছে। এ সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত তার মনে গেঁথে যায় চিরদিনের মতো।

আন্দোলনে যোগদান
তারেক আন্দোলনে যুক্ত হন ২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে। প্রথমে লোহাগাড়ার পদুয়ায় একটি ছাত্র মিছিলে অংশ নেন, যেখানে হঠাৎ হামলা চালায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। লগি-বৈঠা দিয়ে তাকে মারধর করা হয়, তখন সে সামান্য আহত হন। এরপর তিনি রাতেই ঢাকা রওনা দেন এবং ৪ আগস্ট শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেন। সেখানে বিকাল ৪টার দিকে শুরু হয় ভয়াবহ হামলা। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ একত্র হয়ে মিছিলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেই গুলিতে তারেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে বুলেটবিদ্ধ হয়। মুহূর্তেই সে মাটিতে পড়ে যায়, রক্তে ভিজে যায় কাপড়। মিছিল থেকে সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু সেখানে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরে এক আত্মীয়ের সহায়তায় তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তার জীবন বাঁচাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে। এই সময় সে জানে না সে বেঁচে থাকবে কি না। তার মন ভেঙে যায় না; বরং সে ভাবে, একটি সঠিক দাবির জন্য জীবন দিয়ে হলেও দাঁড়ানো উচিত ছিল। তার প্রতিবাদ, তার রক্ত যেন এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকে।

আহত পরবর্তী জীবন
আহত হওয়ার পর তারেকের জীবন নতুন এক সংগ্রামের নাম হয়ে দাঁড়ায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে বুলেটবিদ্ধ হওয়ায় তার চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। ব্যথা, ফুলে যাওয়া ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ তাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে। চট্টগ্রাম মেডিকেলে কিছু চিকিৎসা হয়, পরে বায়েজীদ ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে কিছু বুলেট অপসারণ করা হয়। তবুও আজও তার শরীরে বুলেট রয়ে গেছে, যা তীব্র ব্যথা ও শারীরিক সমস্যার কারণ। চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় পরিবার তা বহন করতে পারে না। চাকরি অনিয়মিত হয়ে পড়ে; আয় বন্ধ হলে সংসারে অভাব তীব্র আকার ধারণ করে। তারেকের নিজের জীবনযাত্রাও একেবারে পাল্টে যায়। আগে যিনি ছিলেন সচল, কর্মব্যস্ত, এখন তিনি ব্যথার মধ্যে দিন কাটান। আত্মীয়-স্বজনরা সাহায্য করে বটে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। তিনি এখন শুধুই একজন আহত নাগরিক নন, বরং একজন জীবন্ত দলিল যিনি প্রমাণ করেন, প্রতিবাদ কখনো সহজ নয়, কিন্তু জরুরি। তার চোখে এখনো স্বপ্ন আছে পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠবেন, কর্মজীবনে ফিরবেন এবং শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবেন।

চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
তারেক বর্তমানে চিকিৎসার মারাত্মক সংকটে রয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে বায়েজীদ ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে শরীরের কিছু অংশ থেকে বুলেট অপসারণ করা হয়, তবে শরীরে এখনো কয়েকটি বুলেট রয়ে গেছে, যা গভীর ক্ষতের কারণ। প্রতিদিন ব্যথা বাড়ে, ফুলে যায় শরীরের বিভিন্ন জায়গা। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, উন্নত এক্স-রে, এমআরআই, ও অপারেশন প্রয়োজন, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মাসিক ১০ হাজার টাকার আয় দিয়ে এ চিকিৎসা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য তিনি পাননি। চিকিৎসা অবহেলা, ঢাকায় চিকিৎসা না পাওয়া এবং স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। একসময় যিনি ছিলেন কর্মক্ষম, এখন তিনি প্রায় অচল। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় বা সংগঠনের সহায়তা, যা তাকে সুস্থ করে আবার কর্মমুখী করতে পারে। চিকিৎসা ছাড়া তার জীবন থেমে যেতে পারে, যা জাতি ও সমাজের জন্য একটি লজ্জা হয়ে থাকবে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম: মোঃ তারেক
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৯৮
জন্মস্থান: লোহাগাড়া
পেশা: চাকরিজীবি
নিজ জেলা: চট্টগ্রাম
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: বড় হাতিয়া, ইউনিয়ন: বড় হাতিয়া, থানা: লোহাগাড়া, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারসংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মৃত নুরুল হাকিম
মায়ের নাম: আয়েশা বেগম
মাসিক আয়: ১০,০০০/=
মায়ের পেশা ও বয়স গৃহিণী ও ৬২
আয়ের উৎস: চাকরির বেতন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ০৬
ভাইয়ের পরিচয়
১ মোঃ ফারুক, বয়স: ২১, পেশা: শ্রমিক, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : পদুয়া লোহাগাড়া, শাহবাগ
আহত হওয়ার সময় : ০২-০৮-২০২৪ (দুপুর ২.০০টা), ০৪-০৮-২০২৪, (বিকাল ৪.০০টা)
আক্রমণকারী: ঢাকা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
প্রস্তাবনা
১. তারেকের শরীরে এখনও যে বুলেট রয়ে গেছে তা দ্রুত অপারেশনের মাধ্যমে অপসারণ করা প্রয়োজন। উন্নত হাসপাতাল ও সার্জনের অধীনে চিকিৎসা জরুরি।
২. চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ওষুধের ব্যয়ভার বহনের জন্য রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক তহবিল গঠন করতে হবে।
৩. তার কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ফিজিওথেরাপি, কাউন্সেলিং ও পুনরায় চাকরি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. একজন আহত আন্দোলনকারীর ন্যায্য অধিকারের অংশ হিসেবে তাকে চিকিৎসা ও জীবিকা উভয়ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আওতায় আনা উচিত।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍