হোম / আহতদের তালিকা / নুরুন নবী
  নুরুন নবী

নুরুন নবী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শিক্ষার্থী , ফেনী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


ফেনীর পূর্ব বিজয় সিংহ গ্রামে ২০০০ সালের ১ মে জন্ম নুরুন নবীর। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার, যেখানে প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রাম আর স্বপ্নের মিশ্রণ। পিতা হারিছ মিয়া, কৃষক; মাতা আনোয়ারা বেগম, গৃহিণী। দুই ভাই তারেক ও মিজানসহ ছয়জনের সংসার, যেখানে নুরুন নবী নিজেকে শিক্ষার পথে প্রস্তুত করেছিল, আর পরিবারের হাসি-আনন্দের জন্য দায়িত্বশীলতার বীজ বুনেছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে, ফেনী শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়, নুরুন নবী কেবল শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই তরুণ প্রজন্মের প্রতীক, যে স্বপ্ন আর ন্যায়ের পথে দাঁড়িয়ে বিপদের মুখেও সাহস হারায়নি। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন তাকে এক সাহসী যোদ্ধায় রূপ দেয়, যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার এবং দেশের জন্য লড়াই করতে জানে।

ছাত্র জনতার জাগরণ
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই ছিল প্রতিরোধের এক বিস্ফোরণ। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিষ্ঠুর আঘাত মানুষকে নিঃশ্বাস নিতে দেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালজুড়ে গুম, খুন, বিচারহীনতা ও দলীয় সন্ত্রাস একটি ভয়াবহ রূপ নেয়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হাত ধরে ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ- সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ভয় আর অনিশ্চয়তা।
এই দীর্ঘ নিরবতার দেয়াল ভেঙে দেয় দেশের ছাত্র ও তরুণরা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তারা রাস্তায় নামে অন্যায়ের প্রতিবাদে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় একটি স্পষ্ট আহ্বান “বৈষম্য মানি না, মানবো না ”। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে গড়ে ওঠে প্রতিরোধের জোয়ার। শিক্ষার বৈষম্য, চাকরির সংকট, এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতায় তারা আর চুপ থাকেনি।
তারা এসেছিল হাতে কোনো অস্ত্র নয়, বরং সত্যের শক্তি নিয়ে। কিন্তু খুনী হাসিনা সরকারের জবাব ছিল ভয়াবহ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে সরকার ছাত্রদের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেয় সহিংসতার পুরো রূপ। চালানো হয় গুলি, লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস। রাজপথ রঞ্জিত হয় তরুণদের তাজা রক্তে। কেউ হারায় চোখ, কেউ শরীরের অঙ্গ, কেউ আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না।
এই বর্বরতা দিয়েও থামানো যায়নি ছাত্র-জনতার দাবি। জুলাইয়ের শেষে আন্দোলন কিছুটা স্থিমিত হলেও, আগস্টের শুরুতে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নতুন উদ্দীপনায় রাজপথ দখলে নেয় জনগণ। প্রতিটি প্ল্যাকার্ড, প্রতিটি কণ্ঠ বলে ওঠে - এটা শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন নয়, এটা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের রুখে দাঁড়ানো।
জুলাই ২০২৪-এর এই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়: ইতিহাসে কখনো কখনো একটি প্রজন্ম জেগে ওঠে, যারা ভয় না পেয়ে প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে, এবং প্রয়োজন হলে রক্তও দেয়। তারা ফিরে যায় না, যতক্ষণ না অন্যায়ের মুকুট ভেঙে চূর্ণ হয়।

উত্তপ্ত মহিপাল
৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা। ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক জুড়ে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়েছিল। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, শুধু ন্যায়ের দাবি আর বুকভরা সাহস। সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি। নুরুন নবীও ছিলেন সেই মিছিলের সঙ্গী। সারাদেশে নিরাপরাধ ভাইদের হত্যা ও গণগ্রেফতারের ঘটনায় হাজারো জনতার ন্যায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনিও। রাজপথে নামেন ঘাতক হাসিনা বাহিনীর নির্মমতার বিরুদ্ধে।

আওয়ামী বাহিনীর তাণ্ডব
দুপুর গড়াতেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশে বিক্ষোভকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যোহরের নামাজ শেষ হওয়ার মাত্র বিশ-পঁচিশ মিনিট পরেই হঠাৎ নেমে আসে আগ্রাসনের ঝড়। ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী ছুটে আসে, শুরু হয় টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ। শান্তিপূর্ণ স্লোগান মুহূর্তেই ডুবে যায় গুলির শব্দে, লাঠির আঘাতে, আর মানুষের আর্তনাদে। মুহূর্তেই চারদিক অস্থির হয়ে যায়। ঘাতকদের ছোড়া সেই বুলেটের একটি এসে আঘাত করে নুরুন নবীর ডান হাতে।

চিকিৎসা সংগ্রাম
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি উপস্থিত হন ফেনী সদর হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তারা প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরবর্তীতে হাতের গুলি অপারেশন করে বের করা হয়। আজও সেই বিভীষিকাময় ৪ই আগস্টের কথা ভুলতে পারেননি তিনি।
নুরুন নবীর কাহিনী শুধু একটি আহত ছাত্রের গল্প নয়; এটি সেই তরুণ প্রজন্মের লড়াই, যারা নিরস্ত্রভাবে দাঁড়িয়ে গেছে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, এবং তাদের সাহস ও বলিদানের ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়ে গেছে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তিনি মোটামোটি সুস্থ রয়েছেন। তবে তার হাতের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তিনি একজন শিক্ষার্থী। পড়ালেখা শেষে তার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : নুরুন নবী
জন্ম তারিখ : ০১-০৫-২০০০
পেশা/ পদবি : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পূর্ব বিজয় সিংহ, পৌরসভা: ফেনী, থানা: ফেনী সদর, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : হারিছ মিয়া
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫২
মায়ের নাম : আনোয়ারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. তারেক, বয়স: ২৮, পেশা: চাকুরী, সম্পর্ক: ভাই
২. মিজান, বয়স: ২৬, পেশা: ব্যবসা, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার
আহত হওয়ার সময় : ০৪ আগস্ট ২০২৪ , দুপুর ২ টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ
আঘাতের ধরন : হাতে গুলি লাগে
চিকিৎসা : গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা : উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍