হোম / আহতদের তালিকা / মো: মিজানুর রহমান
মো: মিজানুর রহমান

মো: মিজানুর রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো: মিজানুর রহমান শরিয়তপুরের তেলীপাড়ায় ১৯৯৯ সালের ৯ জুন জন্ম নেওয়া এক সাধারণ হাসপাতাল কর্মচারী, যিনি জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনগুলোতে হয়ে ওঠেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নীরব প্রতীক। ধানমন্ডি ২৭ ও সাইন্সল্যাব মোড়ে পুলিশের ছিটা বুলেটে বিদ্ধ হয়ে শরীরে উনিশটিরও বেশি ক্ষত বয়ে বেড়ালেও তাঁর সাহস কোনদিন নত হয়নি। দুই দফা হামলায় চোখ ও দেহে স্থায়ী ক্ষত নিয়েও তিনি বিশ্বাস হারাননি ন্যায়বিচার একদিন ফিরবেই। পরিবার, স্ত্রী লামিয়া আক্তার ও ১৬ মাসের পুত্র লাবীদকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা এই তরুণ আজ রক্তাক্ত প্রজন্মের এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষত সাক্ষ্য দেয় সত্যের জন্য লড়াই করলে মানুষকে থামানো যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

দ্বিতীয় স্বাধীনতার অদম্য বীর
মো: মিজানুর রহমান
ক্রমিক: ০৪৪
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৪
পরিচিতি
রায়ের বাজারের পাবনা হাউজ মসজিদের পাশের একটি শান্ত গলির বাড়িতে যে মানুষটি বসবাস করেন, তার চেহারায় এখনো ধ্বনিত হয় জুলাইয়ের গুলিবিদ্ধ সন্ধ্যার নীরব আর্তনাদ। নাম তার মিজানুর রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নির্মম অথচ বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সৈনিক।
নড়িয়ার তেলীপাড়ার যে ছেলেটি একদিন স্বপ্ন দেখেছিল পরিবারকে ভালো রাখার, সমাজকে কিছু দেবার, আজ সে শরীরে বহন করে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অমোচনীয় ক্ষত। তার গ্রামের মাটি, শরীয়তপুরের চামটার বাতাস জানে; এই ছেলেটি কেবল রক্ত মাখেনি, সে মাটি ও মানুষের অধিকারের জন্য নিজের জীবনবাজি রেখেছে।
এক সন্ধ্যার বিভীষিকা
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই, যেন এক যন্ত্রণাময় ইতিহাসের পাতা হয়ে রয়ে গেছে বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দিনলিপিতে। দিনটা ছিল বুধবার, সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। ঢাকার ধানমন্ডি ২৭নম্বর, যেখানে সাধারণত দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করে, মানুষ ঘরে ফেরে, রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে নিরীহ আলো আর ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস। সেই চেনা ছন্দ হঠাৎ করেই ছিন্ন হয়ে গেল।
সন্ধ্যার ঘন আঁধারে হঠাৎই নামল পুলিশি তাণ্ডব। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো আতঙ্কের কান্না। কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার হাত ধরাধরি ছিল না সেখানে, ছিল না শ্রাবণের কোমল বৃষ্টির ফোঁটা কিংবা তরুণ কবির হাতে লেখা ভালোবাসার কবিতা। সে সন্ধ্যা রচিত হয়েছিল অন্য এক কালি দিয়ে, রাবার বুলেটের বারুদের ধোঁয়া, টিয়ারশেলের ঝাঁঝ আর আর্তনাদের দীর্ঘ সুরে।
মিজানুর রহমান ছিলেন সেই সন্ধ্যার ভেতর এক প্রতিবাদী মুখ, এক অনড় অবস্থান। তিনি এসেছিলেন বিশ্বাস নিয়ে। এই রাষ্ট্র একদিন বদলাবে, এই বৈষম্য একদিন দূর হবে। কিন্তু তার বিশ্বাসকে রক্তাক্ত করে দিল রাষ্ট্রীয় শক্তির নির্মম বর্বরতা। হঠাৎ করেই অচেনা দিক থেকে গর্জে উঠলো পুলিশের রাইফেল। রাবার বুলেট ছুটে এলো ঝড়ের মতো। কেউ পিঠে, কেউ বুকে, কেউ চোখে পেল সেই আগুনের ছোঁয়া।
মিজানুরের মুখ, হাত, পা, পিঠ এমনকি শরীরের নানা অংশে আঘাত হানল সেই রাবার বুলেটগুলো। একেকটি বুলেট যেন শুধু মাংস নয়, বিদীর্ণ করছিল তার বিশ্বাস, তার স্বপ্ন, তার নিরাপত্তার ধারণা। প্রতিটি আঘাতে ছুটে এসেছিল মৃত্যুর আতঙ্ক, কিন্তু মিজানুর তখনও মাটিতে পড়েননি, ছিটকে পড়েও দাঁড়াবার চেষ্টা করেছেন। তাঁর চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছিল রক্ত, আর্তনাদ আর আতঙ্কগ্রস্ত সহযোদ্ধারা।
অবশেষে, তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। হাসপাতালের আলোয় দাঁড়িয়েছিল এক রক্তাক্ত যুবক। বুকে, হাতে, পায়ে আঘাতের চিহ্ন, মুখের ভেতর ফেটে যাওয়া চামড়া, নিঃশ্বাসে রুদ্ধ যন্ত্রণা। চিকিৎসকরা একে একে তার শরীর থেকে উনিশটি রাবার বুলেট বের করেন। প্রতিটি গুলি যেন রাষ্ট্রের একেকটি প্রশ্নবিদ্ধ বিবেক।
সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের চোখেও ছিল বিস্ময়! এই মানুষটি বেঁচে আছেন কীভাবে? এত রক্ত, এত ক্ষত, এত তীব্র ব্যথা: এ কেবল দেহে সহ্য করার নয়, এ তো মন-প্রাণ ভেঙে দেয়ার মতো কষ্ট। কিন্তু মিজানুর রহমানের চোখে ছিল এক অন্য দৃঢ়তা, যেন বলছিল, "এই লড়াই থামানো যাবে না।"
যখন সবাই ভেবেছিল সে আর রাজপথে ফিরবে না, তখন নিজেই আবার সে ফিরল মিছিলে, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে, ব্যথা বয়ে নিয়ে। তার প্রতিবাদের ভাষ্য হয়ে উঠল যন্ত্রণার চেয়েও উচ্চ কন্ঠ, ক্ষতের মাঝেও উচ্চারিত হলো সাহসের ঘোষণা, "আমরা হারিনি, হারব না।"
এভাবেই ১৭ জুলাইয়ের সন্ধ্যা শুধু মিজানুর রহমান নয়, হাজারো প্রতিবাদীর রক্তে লেখা হয়ে যায় এক নির্মম অধ্যায় যেখানে প্রেম ছিল না, ছিল শুধু প্রজন্মের আর্তচিৎকার, ছিল একটি অসাম্য চক্র ভাঙার যুদ্ধ। আর মিজানুর হয়ে ওঠেন সেই যুদ্ধের এক নীরব বীর, এক রক্তাক্ত প্রতীক, যার শরীর জুড়ে লুকানো ইতিহাসের বহু না বলা কথা।
দ্বিতীয় আঘাতেও নত নয় হৃদয়
চারপাশে তখনও আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ, রাজপথ ছিল উত্তপ্ত, আর প্রতিবাদের আগুন নিভে যাওয়ার নাম নিচ্ছিল না। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, ঢাকার সাইন্স ল্যাব মোড়: যেখানে সাধারণত মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বলে, রিকশাগুলো অপেক্ষা করে যাত্রীদের জন্য, সেখানে হঠাৎ নেমে আসে নিকষ অন্ধকার। অন্ধকার কেবল সূর্যের অন্ত যাওয়ায় নয়, বরং সেটা ছিল এক রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার ছায়া, যা পুলিশের লাঠি ও রাবার বুলেটের ছদ্মবেশে নেমে এসেছিল নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর।
সে দিনের সকাল থেকে মিজানুর রহমান ছিল সক্রিয়, প্রত্যয়ী। আগের আঘাত সত্ত্বেও তিনি মাঠ ছেড়ে যাননি। যার শরীর থেকে মাত্র কিছুদিন আগেই উনিশটি রাবার বুলেট বের করা হয়েছিল, সে মানুষটিই আবার দাঁড়িয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আর্ত মানুষের পক্ষে। কিন্তু রাষ্ট্র মাফ করেনি। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ তোলে, তাদের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে যে রাষ্ট্র, তার নির্মমতার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় সেদিন সাইন্স ল্যাবে।
বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই আন্দোলনের মধ্যে হানা দেয় একদল পুলিশ। তাদের হাতে ছিল বুলেট, লাঠি, টিয়ারশেল; আর ছিল না কোনো মানবতা, কোনো সহানুভূতি। লক্ষ্য একটাই: ভয় দেখানো, থামিয়ে দেয়া, দমন করা। গর্জে ওঠে বুলেট, ঝাঁপিয়ে পড়ে লাঠি। মিজানুরের দিকেও ছুটে আসে এক ভয়ংকর আঘাত: একটি রাবার বুলেট গিয়ে লাগে তার চোখে। মুহূর্তেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়, হারিয়ে ফেলে সে ভারসাম্য, কিন্তু তিনি তখনও দৌড়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কে বলেছে একজন আহত মানুষ রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে পালাতে পারে? আর চার-পাঁচটি রাবার বুলেট তার শরীরের বিভিন্ন অংশে বিদ্ধ হয়। একটির পর একটি আঘাত তার মাংস ছিঁড়ে ঢুকে পড়ে গভীরে। সেদিন তার শরীরের ভেতরে যে বুলেটগুলো ঢুকেছিল, সেগুলো আজও রয়ে গেছে; নীরবে, যন্ত্রণার মতন প্রতিদিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই দ্বিতীয় বিকেলের দুঃস্বপ্ন। তাকে আবার নেওয়া হয় ইবনে সিনা হাসপাতালে। চিকিৎসা হয় কেবল নামমাত্র। কোনো সরকারি সহযোগিতা, মানবিক সহানুভূতি বা সান্ত্বনার হাত কিছুই আসে না তার কাছে। যারা গুলি করেছে তারাই যেন চুপচাপ থেকেছে, যেন তারা মানুষ নয়, বরং কোনো যন্ত্র, যারা কেবল 'অর্ডার' মানে।
তবু মিজানুর রহমান হার মানেননি। চোখে আঘাত, শরীরে বুলেট, তীব্র ব্যথা: সব কিছু নিয়েও তিনি মাথা নত করেননি। বরং তার ভেতরের প্রতিবাদের আগুন আরও জ্বলতে থাকে। প্রতিটি আঘাত যেন তার আত্মাকে আরও কঠিন করে তোলে, যেন প্রতিটি বুলেট তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়; এ লড়াই ব্যক্তিগত নয়, এ যুদ্ধ একটি প্রজন্মের স্বপ্ন বাঁচানোর।
মিজানুর রহমান কাঁদেন না, তিনি শুধুই সংগ্রাম করেন। কারণ তিনি জানেন; আঘাত তাকে থামাতে পারবে, কিন্তু পরাজিত করতে পারবে না। তার হৃদয়, তার সাহস, তার অঙ্গীকার: এমনই এক জ্যোতিষ্ক যা বুলেটেও নিভে না।
এভাবেই ৪ আগস্ট তার জীবনে হয়ে ওঠে আরেকটি কালো দিন একটি নির্মম পর্ব, যা তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করলেও, মানসিকভাবে করে তোলে আরও দৃঢ়, আরও অটল। এবং সেই অটল হৃদয়ের ভেতর আজও জ্বলছে প্রতিবাদের এক অনির্বাণ আগুন।
জীবনের বাইরে এক জীবন
মিজানুর রহমান বিবাহিত। তার স্ত্রীর নাম লামিয়া আক্তার একজন। ঘরের মানুষ, কিন্তু তার চোখে প্রতিদিন দেখা যায় স্বামীর অসহ্য। কষ্ট। তাদের ছোট্ট ছেলেটি, লাবীদ আল রাইয়ান, বয়স মাত্র ১৬ মাস। সে এখনো বুঝে না বাবার চোখে কেন অশ্রু নামে, শরীরের কোথায় এত যন্ত্রণা জমে থাকে। হয়তো সে বড় হয়ে জানবে, তার বাবা ছিল একটি জাতির বাঁচার লড়াইয়ের এক নিঃশব্দ প্রতীক।
পারিবারিক দৃশ্যপট
মিজানুরের পিতা নেই। বাইপাস সার্জারির পর ধুকে ধুঁকে বেঁচে থাকা এক অসুস্থ শরীর। বড় ভাই নজরুল ইসলাম, একজন গেস্ট টিচার। নিজের সীমিত আয়ে ভাইয়ের জন্য কিছু করতে চান, কিন্তু সামর্থ্য বাধ্য হয়ে দাঁড়ায় প্রতিনিয়ত।
আজকের চিত্র
আজ মিজানুরের শরীরে এখনো কিছু রাবার বুলেট রয়ে গেছে। বের করতে প্রয়োজন অস্ত্রোপচার, যা খরচসাপেক্ষ। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা ও ওষুধে ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সামনে আরও দীর্ঘ পথ; দীর্ঘ চিকিৎসা, অর্থসংকট আর পরিবার বাঁচানোর লড়াই। তার চাকরি এখনো আছে। প্রতিবাদীদের তালিকায় নাম থাকা মানুষটির জন্য কোনোদিন চাকরি চলে যাওয়া কিংবা হুমকির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এক আর্তি, এক অনুরোধ
"আর্থিক সহযোগিতা পেলে উপকৃত হবো” এই কথাটুকু যেন শুধুই শব্দ নয়, এটি এক সংগ্রামী প্রাণের হাহাকার, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি।
মিজানুর রহমান। তিনি কেবল একজন আহত সৈনিক নন। তিনি এক চলমান ইতিহাস, তিনি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সাক্ষ্য প্রমাণ। তার শরীরের প্রতিটি ক্ষত যেন বলে, "আমি এখনও থামিনি।"

এক নজরে মিজানুর রহমান
নাম: মো: মিজানুর রহমান
জন্ম তারিখ: ০৯-০৬-১৯৯৯
জন্যস্থান: শরিয়তপুর
পেশা হবে: হাসপাতাল কর্মচারী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: তেলীপাড়া, ইউনিয়ন: চামটা, থানা: নড়িয়া, জেলা: শরিয়তপুর
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: পাবনা হাউজ মসজিদের সাথের বাড়ি, ওয়ার্ড নং: রায়ের বাজার, জেলা/সিটি: ঢাকা সিটি দক্ষিণ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: লোকমান হোসেন
মায়ের নাম: নাজমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স: মৃত
মায়ের পেশা ও বয়স: বাইপাস সার্জারি করা (অসুস্থ)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬
স্ত্রী-সন্তানের তথ্য
১. স্ত্রী: লামিয়া আক্তার, পেশা: গৃহিণী
২. লাবীদ আল রাইয়ান, বয়স ১৬ মাস, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান: ধানমন্ডি ২৭, সাইন্স ল্যাব
আহত হওয়ার সময় : ১৭ জুলাই ও ৪ আগস্ট ২০২৪, সন্ধ্যার পর
আক্রমণকারী: পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍