হোম / আহতদের তালিকা / নুরুল আলম
নুরুল আলম

নুরুল আলম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাসের ড্রাইভার ,ফেনী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে অধিকাংশ মানুষ বেছে নেন শান্তির অবসর, সেখানে দাঁড়িয়ে এক পুরুষ দেখিয়েছেন কীভাবে বয়স শুধু একটি সংখ্যা-অটুট মনোবল আর ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। তিনি নুরুল আলম-জুলাই আন্দোলনের এক নিঃস্বার্থ, নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা, যিনি বয়সের সীমাকে অগ্রাহ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ইতিহাস রচনার সংগ্রামে।

নুরুল আলম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৭ সালের ৫ই জানুয়ারি, ফেনী জেলার ফেনী উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শিবপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা, মরহুম মোহাম্মদ ইলিয়াছ, ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সংগ্রামের ভিতর দিয়েই কেটেছে তাঁর। তবে সেই সংগ্রামই হয়তো ছেলের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল ন্যায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতিশীলতা। মা সামছুন নাহার, একজন সহজ-সরল গৃহিণী, যিনি মাতৃত্বের কোমল ছায়ায় সন্তানদের লালন করেছেন পরম মমতায়, দায়িত্ববোধে, ও আত্মত্যাগে।
পেশাগত জীবনে নুরুল আলম একজন গাড়িচালক। সংসারের ভার একাই বহন করে চলেছেন অবিচলভাবে। তাঁর রয়েছে দুই সন্তান মেয়ে সাদিয়া সুলতানা, এসএসসি পরীক্ষার্থী; এবং ছেলে সাইদুল ইসলাম, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি নিয়োজিত ছিলেন নিরলস পরিশ্রমে। কিন্তু ব্যক্তি জীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁকে কেবল পরিবারপরায়ণ এক মানুষে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তিনি দাঁড়িয়েছেন সময়ের ডাকে, ন্যায়ের কণ্ঠে, দেশের মাটির আহ্বানে।
জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে, যখন যুবকেরাও থমকে দাঁড়ায় সন্ত্রাসের মুখে, তখন এই ৫৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ মানুষটি দাঁড়িয়ে যান রাজপথে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র ও অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর সাহস ছিল অনন্য। রাজপথে তাঁর উপস্থিতি ছিল যেন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত পাঠ-যেখানে বোঝা যায়, বয়স নয়, আদর্শই মানুষের প্রকৃত শক্তি।

নুরুল আলম শুধুমাত্র একজন আন্দোলনকারী নন; তিনি এই যুগের এক জীবন্ত ইতিহাস, যিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন- আদর্শের পক্ষে দাঁড়াতে কোনো বয়স লাগে না, লাগে কেবল হৃদয়ের সাহস ও সত্যের প্রতি অবিচলতা।
ফ্যাসিবাদের নির্মম ছোবলে রক্তাক্ত নুরুল আলম: এক প্রবীণের সাহসগাথা
“বয়স যতই হোক, আমি আন্দোলন করবই” এই ছিল নুরুল আলমের দৃপ্ত উচ্চারণ, যা শুধু একটি বাক্য নয়, বরং একটি চেতনার নাম। ৫৮ বছর বয়সেও যিনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব থাকার শপথ ভাঙেননি। বরং জীবনের এই পরিণত বেলায় এসেও তিনি নেমে এসেছিলেন রাজপথে, বুক ভরা সাহস নিয়ে, বুক ভরা দেশপ্রেম নিয়ে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দুপুর ২টা ৩০ মিনিট। নুরুল আলম দাঁড়িয়েছিলেন মহিপাল মোড়ে, হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, চোখে ছিল শুধু এক নির্মল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ঠিক তখনই শুরু হয় ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগের কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী লগি-বৈঠা হাতে আক্রমণ চালায়। তারা বৃষ্টির মতো বর্ষণ করে নির্মম আঘাত। নুরুল আলম, যিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে এসেছিলেন, তাকেও রেহাই দেয়নি এই বর্বরতা। ট্রাংক রোড থেকে গুলি করতে করতে আগত সন্ত্রাসীরা মহিপাল পৌঁছে যায়, যেখানে নুরুল আলমকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় গুলি। তিনি গুলিবিদ্ধ হন-রক্তে ভিজে যায় পথ, কেঁপে ওঠে জনতা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। গুলির আঘাতেও তৃপ্ত হয়নি তারা। নিথর দেহে চলতে থাকে লাঠি ও ঘুষির বর্বর নৃত্য। এক বৃদ্ধ মানুষকে, যিনি নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন রাজপথে, তাকেই মাটিতে ফেলে পিটিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অবদমন ও ভয়ের রাষ্ট্রীয় যন্ত্র। এই দৃশ্য শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক, পৈশাচিক চেহারার নগ্ন উন্মোচন। নুরুল আলম হয়ে উঠলেন সেই জ্বলন্ত আলোকস্তম্ভ, যিনি প্রমাণ করে দিলেন- ফ্যাসিবাদের নির্মমতা যতই হোক, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কোনো বয়সেই মুছে ফেলা যায় না।

নুরুল আলম আজ শুধু একটি নাম নয়-তিনি এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি সেই সাহসের, যে সাহস যুগে যুগে অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানায়, রক্ত দিয়েও স্বপ্ন রক্ষা করে।

চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত শরীর, অটুট মনঃ এক প্রবীণের চিকিৎসার নিঃশব্দ কাহিনী।
রক্তাক্ত শরীরে যেদিন তিনি পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিলেন, সেদিন শুধু রক্ত নয়, ঝরছিলো একটি দেশের বিবেকও। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দুপুর ২টা ৩০ মিনিট-রাজপথে ফ্যাসিবাদের বর্বর থাবায় যখন গুলিবিদ্ধ ও নির্মমভাবে প্রহৃত হন ৫৮ বছরের নুরুল আলম, তখনও তাঁর চোখে ছিল না ভয়, ছিল না পরাজয়ের ছায়া-ছিল শুধুই অটল এক বিশ্বাস, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই জীবনকে সার্থক করে তোলা।

আহত হওয়ার পরে, যন্ত্রণাবিদ্ধ দেহ নিয়ে আশ্রয় নেন এলাকারই এক চিকিৎসক ডা. রফিক-এর কাছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর, অতি সতর্কভাবে, ফার্মেসি থেকে সংগ্রহ করেন প্রয়োজনীয় ওষুধ। কিন্তু এই পথও ছিল না সহজ। কারণ, যাঁদের হাতে তিনি আহত হয়েছেন-সেই আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসীরা চিকিৎসার পথেও ছড়িয়েছিলো ভয় আর নির্যাতনের কাঁটা। বাধা এসেছিল প্রতিটি ধাপে। তাই তাঁকে নিতে হয়েছিল এক গোপন পথ-চোখ রাঙানি আর শঙ্কার ছায়া এড়িয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে হয়েছিল ফেনী সদর হাসপাতালে।
ফেনী সদর হাসপাতালে তাঁর শরীরের ক্ষতগুলো যতটা না সেলাই করা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল বেদনাবিধূর চিত্র- এক প্রবীণের পিঠে, কোমরে এবং মেরুদণ্ডে জেগে থাকা নিপীড়নের চিহ্ন। এখনও সেই আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি, প্রতিটি পা ফেলেন ব্যথার ভার নিয়ে, কিন্তু মাথা থাকে অটলভাবে উঁচু।নুরুল আলমের চিকিৎসার এই পথ কেবল একজন আহত মানুষের চিকিৎসা নয়; এটি এক নীরব ইতিহাস-যেখানে প্রতিটি ব্যথা সাক্ষ্য দেয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের, প্রতিটি যন্ত্রণার রেখা সাক্ষ্য দেয় সাহসী অবস্থানের। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, শরীর ক্ষতবিক্ষত হতে পারে, কিন্তু আদর্শ ও সাহস কখনও থেমে থাকে না। একজন প্রবীণ হয়েও যিনি লড়েছেন, সহ্য করেছেন, বেঁচে আছেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হয়ে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
কোমর ও মেরুদণ্ডে প্রচুর ব্যথা চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে পেশায় নিয়োজিত ছিলেন : বাসের ড্রাইভার ছিলেন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা, ব্যবসা করারও ইচ্ছা আছে।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : নুরুল আলম
জন্ম তারিখ : ০৫/০১/১৯৭৭
জন্মস্থান : শিবপুর, ফেনী
পেশা : বাসের ড্রাইভার
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ শিবপুর, ইউনিয়ন: ফাজিলপুর, থানা: ফেনী, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মৃত মোহাম্মদ ইলিয়াছ
মায়ের নাম : সামছুন নাহার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৭
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫০০০/=
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
বাড়ি : টিনের বেড়া ও টিনের চাল
সম্পদ : ৬ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
আহত হওয়ার স্থান : ফেনী মহিপাল মোড়ে
আহত হওয়ার সময় : ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দুপুর ২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ-এর সন্ত্রাসীরা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍