মিনহাজ ইবনে আমীর সজীব
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র, ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সাইন্স, ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশন
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম ও পরিচয়
জুলাই ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল ও সংগ্রামী সময়। সেদিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়া তরুণদের একজন হলেন ফেনীর মিনহাজ ইবনে আমীর সজীব। জীবন ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকলেও ন্যায়বোধ ও সাহসিকতায় তিনি এগিয়ে এসেছিলেন অবিচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। সজীব জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ৯ জুন, চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলার ফরহাদ নগর ইউনিয়নের চর কালিদাস গ্রামে। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ বর্তমানে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার সায়েন্সে ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত। স্বপ্ন ছিল নিজের দক্ষতা দিয়ে সমাজে কিছু অবদান রাখার, প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে পরিবারকে একটু সচ্ছলতা দেওয়া। কিন্তু দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে একটি কঠিন পথের দিকে নিয়ে যায়।
সজীবের বাবা জনাব মোঃ আমীর হোসেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। বয়স ৪৯ হলেও জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ব্যয় করেন মাঠে, ঘামে ভিজিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য। মা জনাবা খালেদা আক্তার, বয়স ৪৭, একজন গৃহিণী। তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ আর পরিশ্রমেই গড়ে উঠেছে সজীব ও তার বড় ভাই সাব্বির হোসেন সিয়ামের শৈশব-কৈশোর। সিয়ামের বয়স ২৩, সে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। অল্প কৃষিকাজের আয় দিয়েই এই পরিবারটি দুই ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে আসছিল। অভাব-অনটনের মাঝেও তাদের সংসারে ছিল শান্তি, ছিল স্বপ্ন দেখার সাহস।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উত্থান: গণতন্ত্রের লাশের ওপর দাঁড়ানো এক দুঃস্বপ্ন
একদা গণতন্ত্রের অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম নেয়া একটি রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জনে এর ভূমিকা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, সময়ের প্রবাহে সেই একই রাজনৈতিক শক্তি আজ হয়ে উঠেছে এক ফ্যাসিবাদী দানব, যে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে টিকে থেকেছে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর। ভয়, নিপীড়ন আর প্রোপাগান্ডার ওপর ভর করে উন্নয়নের গল্প শুনিয়েছে দিনের পর দিন।
এই ফ্যাসিবাদী রূপ একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি এসেছে ধাপে ধাপে, পরিকল্পিতভাবে প্রথমে বিচার ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, তারপর বাকস্বাধীনতা হরণ, সংবাদ মাধ্যমে সেন্সর আর শেষে রাজপথে ছাত্র-তরুণদের রক্ত ঝরিয়ে এক দুঃশাসনের কঙ্কাল দাঁড় করানো হয়েছে। ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোট ডাকাতির নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করে তারা গণতন্ত্রের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে।
যেখানে একসময় দলটি ছিল “জনগণের প্রতিনিধি”, আজ সেখানে জনগণ হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। রাজপথে যারা প্রতিবাদ করে, তাদের গুলি করে থামিয়ে দিচ্ছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগীরা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি, গ্রেফতার, গুম এসব ছিল ৫ই আগস্ট ২০২৪ পূর্ববর্তী স্বাভাবিক ঘটনা। এই বাস্তবতা থেকে কেউ বলেন ‘গণতন্ত্রের হত্যাকারী’, কেউ বলেন ‘একনায়কতন্ত্রের উত্থান’ তবে বাস্তব ভাষা ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
ফ্যাসিবাদ কীভাবে চেহারা বদলায়
আওয়ামী শাসনকালীন ফ্যাসিবাদ ক্ল্যাসিক ফ্যাসিবাদ নয়; এটি আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর, মুখে গণতন্ত্রের বুলি আর ভিতরে জবরদস্তি ও কর্পোরেট স্বার্থের রমরমা রক্ষাকবচ। তারা একটি ‘চরিত্রহীন উন্নয়ন’ প্রচার করে, যেখানে মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভারের নিচে মরে পড়ে থাকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন। “উন্নয়নের গণতন্ত্র” নামে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু এই উন্নয়ন কাদের জন্য তা এখন আর গোপন নেই। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিপরীতে দাঁড়ানো মানে কেবল রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করা নয়, এটি এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, একটি সাংস্কৃতিক জাগরণও বটে। এই ফ্যাসিবাদ কেবল গুলি চালায় না, এটি মগজ ধোলাই করে, ইতিহাস বিকৃতি ঘটায় এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে দরকার গণচেতনার পুনর্জাগরণ, দরকার সাহসী নেতৃত্ব এবং দরকার রাজপথে নতুন প্রজন্মের ঝড়।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কেবল একটি সরকারের কথা বলে না, এটি একটি ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে গোষ্ঠীগত স্বার্থ, নিপীড়ন আর নিষ্ঠুরতা দিয়ে একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চক্রান্ত চলে। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে কেবল দলবদল নয় এটি নৈতিকতার, আদর্শের এবং সাহসের সংগ্রাম। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হলেও অদম্য ছিল না কারণ ইতিহাস কখনো অন্যায়ের পক্ষে থাকে না। শোষিতের আর্তনাদ, রক্তাক্ত যুবকের মুখ, রাস্তায় গুলি খাওয়া শিক্ষার্থীর দৃষ্টি সব কিছুর সাক্ষ্য বহন করে এই সত্য যে, অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, একদিন পতন হবেই।
জুলাইয়ের রক্তিম দিনে সজীবের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে থাকে ওভারব্রিজে
২০২৪ সালের জুলাই মাস বদলে দেয় সবকিছু। যখন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, তখন সজীবও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি। ন্যায় ও অধিকার রক্ষার জন্য নিজের জীবনকেও বাজি রাখে সে। ফেনীর সাহসী যুবক সজীব ০৪ আগস্ট, ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে ফেনীর মহিপালে আসে। সকাল থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগের ক্যাডাররা অস্ত্রসহ শিক্ষার্থীদের সাথে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। যোহরের নামাজের পর হঠাৎ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ট্রাংক রোডের দিক থেকে গুলি করতে করতে মহিপালের দিকে এগিয়ে আসে। সেখানে ছাত্রলীগের ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জুয়েল, ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন জিকু, ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ৩নং ওয়ার্ড সভাপতি শেখ আব্দুল হক বিজয়সহ তাদের অনুসারীরা অস্ত্র উচিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর গুলি ছুড়তে শুরু করে।
গোপনে ফার্মেসী থেকে গুলি বের করা
গুলির সামনের সজীব তখন মহিপাল ওভার ব্রিজের নিচে অবস্থান নেয়। ইতোমধ্যে অনেকেই গুলি খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে তুমুল গুলিবর্ষণের এক পর্যায়ে সজীব গুলিবিদ্ধ হয়। তার রক্তে ভিজতে থাকে ওভারব্রিজের রাস্তা। সাথে থাকা সহযোদ্ধারা কোনো মতে তাকে ধরাধরি করে প্রথমে কাছের এক ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। ফার্মেসি কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ সর্বত্র ছাত্রলীগের হানাদারদের উপস্থিতি। গোপনে ফার্মেসি থেকে কোনোমতে গুলি বের করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার পরিস্থিতি তখনও ছিল না। পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আহত সজীবকে। ডাক্তার দেখানোর পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করে সেখানেই। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা পালিয়ে যায় ভারতে। সারা বাংলাদেশে নেমে আসে এক বেদনাহত উৎসব।
এ শুধু গল্প নয় এটি জুলাইয়ের ইতিহাস
এই সাক্ষ্য কেবল একটি আহত শরীরের গল্প নয়, এটি একটি প্রতিরোধের ইতিহাস, যেখানে সাহসিকতা, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বোধ এক সুতোয় গাঁথা। সজীবদের মতো বাংলার দামাল ছেলে বুক উঁচু করে রাস্তায় নেমে না আসলে বাংলার আকাশ আজও হয়তো অন্ধকার মেঘে আচ্ছন্ন থাকতো। আজ সজীবের পরিবার এক অজানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। চিকিৎসা ব্যয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। একটি স্থায়ী বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ, এই দুটি জিনিস সজীবের জীবনকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিতে পারে। এই সাহসী তরুণের কাহিনী কেবল তার একার নয়; এটি একটি প্রজন্মের গল্প, যারা ভয়কে জয় করে সত্যের পথে এগিয়ে যায়।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মিনহাজ ইবনে আমীর সজীব
জন্ম : ০৯/০৬/২০০৭
জন্মস্থান : চরকালিদাস, ফরহাদনগর, ফেনী সদর, ফেনী
নিজ জেলা : ফেনী
পেশা : ছাত্র, ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সাইন্স, ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশন
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম-চরকালিদাস, ইউনিয়ন-ফরহাদনগর, থানা-ফেনী সদর, জেলা-ফেনী
পিতা : মোঃ আমীর হোসেন, পেশা-কৃষি কাজ, বয়স-৪৭
মাতা : খালেদা আক্তার, পেশা-গৃহিণী, বয়স-৪৯
মাসিক আয় : ১০ হাজার টাকা
বাড়ি : চর এলাকায় বাড়ি হওয়ায় নদী ভাঙনের শিকার
পরিবারের সদস্য : ০৪ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. সাব্বির হোসেন সিয়াম, সম্পর্ক-বড় ভাই, বয়স-২৩, পেশা- স্নাতক শিক্ষার্থী
আক্রমণকারী
৪ই আগস্ট ২০২৪ সালে দুপুর ৩টায় ফেনীতে মহিপাল ওভার ব্রিজের নিচে ট্রাংক রোড থেকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসা ছাত্রলীগের বন্দুকধারী সন্ত্রাসীদের সরাসরি গুলিতে আহত। সেখানে ছিল ফরহাদ নগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জুয়েল, ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন জিকু, ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ৩নং ওয়ার্ড সভাপতি শেখ আব্দুল হক বিজয়সহ তাদের অনুসারীরা।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
জুলাই ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল ও সংগ্রামী সময়। সেদিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়া তরুণদের একজন হলেন ফেনীর মিনহাজ ইবনে আমীর সজীব। জীবন ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকলেও ন্যায়বোধ ও সাহসিকতায় তিনি এগিয়ে এসেছিলেন অবিচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। সজীব জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ৯ জুন, চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলার ফরহাদ নগর ইউনিয়নের চর কালিদাস গ্রামে। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ বর্তমানে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার সায়েন্সে ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত। স্বপ্ন ছিল নিজের দক্ষতা দিয়ে সমাজে কিছু অবদান রাখার, প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে পরিবারকে একটু সচ্ছলতা দেওয়া। কিন্তু দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে একটি কঠিন পথের দিকে নিয়ে যায়।
সজীবের বাবা জনাব মোঃ আমীর হোসেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। বয়স ৪৯ হলেও জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ব্যয় করেন মাঠে, ঘামে ভিজিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য। মা জনাবা খালেদা আক্তার, বয়স ৪৭, একজন গৃহিণী। তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ আর পরিশ্রমেই গড়ে উঠেছে সজীব ও তার বড় ভাই সাব্বির হোসেন সিয়ামের শৈশব-কৈশোর। সিয়ামের বয়স ২৩, সে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। অল্প কৃষিকাজের আয় দিয়েই এই পরিবারটি দুই ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে আসছিল। অভাব-অনটনের মাঝেও তাদের সংসারে ছিল শান্তি, ছিল স্বপ্ন দেখার সাহস।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উত্থান: গণতন্ত্রের লাশের ওপর দাঁড়ানো এক দুঃস্বপ্ন
একদা গণতন্ত্রের অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম নেয়া একটি রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জনে এর ভূমিকা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, সময়ের প্রবাহে সেই একই রাজনৈতিক শক্তি আজ হয়ে উঠেছে এক ফ্যাসিবাদী দানব, যে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে টিকে থেকেছে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর। ভয়, নিপীড়ন আর প্রোপাগান্ডার ওপর ভর করে উন্নয়নের গল্প শুনিয়েছে দিনের পর দিন।
এই ফ্যাসিবাদী রূপ একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি এসেছে ধাপে ধাপে, পরিকল্পিতভাবে প্রথমে বিচার ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, তারপর বাকস্বাধীনতা হরণ, সংবাদ মাধ্যমে সেন্সর আর শেষে রাজপথে ছাত্র-তরুণদের রক্ত ঝরিয়ে এক দুঃশাসনের কঙ্কাল দাঁড় করানো হয়েছে। ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোট ডাকাতির নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করে তারা গণতন্ত্রের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে।
যেখানে একসময় দলটি ছিল “জনগণের প্রতিনিধি”, আজ সেখানে জনগণ হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। রাজপথে যারা প্রতিবাদ করে, তাদের গুলি করে থামিয়ে দিচ্ছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগীরা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি, গ্রেফতার, গুম এসব ছিল ৫ই আগস্ট ২০২৪ পূর্ববর্তী স্বাভাবিক ঘটনা। এই বাস্তবতা থেকে কেউ বলেন ‘গণতন্ত্রের হত্যাকারী’, কেউ বলেন ‘একনায়কতন্ত্রের উত্থান’ তবে বাস্তব ভাষা ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
ফ্যাসিবাদ কীভাবে চেহারা বদলায়
আওয়ামী শাসনকালীন ফ্যাসিবাদ ক্ল্যাসিক ফ্যাসিবাদ নয়; এটি আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর, মুখে গণতন্ত্রের বুলি আর ভিতরে জবরদস্তি ও কর্পোরেট স্বার্থের রমরমা রক্ষাকবচ। তারা একটি ‘চরিত্রহীন উন্নয়ন’ প্রচার করে, যেখানে মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভারের নিচে মরে পড়ে থাকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন। “উন্নয়নের গণতন্ত্র” নামে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু এই উন্নয়ন কাদের জন্য তা এখন আর গোপন নেই। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিপরীতে দাঁড়ানো মানে কেবল রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করা নয়, এটি এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, একটি সাংস্কৃতিক জাগরণও বটে। এই ফ্যাসিবাদ কেবল গুলি চালায় না, এটি মগজ ধোলাই করে, ইতিহাস বিকৃতি ঘটায় এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে দরকার গণচেতনার পুনর্জাগরণ, দরকার সাহসী নেতৃত্ব এবং দরকার রাজপথে নতুন প্রজন্মের ঝড়।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কেবল একটি সরকারের কথা বলে না, এটি একটি ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে গোষ্ঠীগত স্বার্থ, নিপীড়ন আর নিষ্ঠুরতা দিয়ে একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চক্রান্ত চলে। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে কেবল দলবদল নয় এটি নৈতিকতার, আদর্শের এবং সাহসের সংগ্রাম। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হলেও অদম্য ছিল না কারণ ইতিহাস কখনো অন্যায়ের পক্ষে থাকে না। শোষিতের আর্তনাদ, রক্তাক্ত যুবকের মুখ, রাস্তায় গুলি খাওয়া শিক্ষার্থীর দৃষ্টি সব কিছুর সাক্ষ্য বহন করে এই সত্য যে, অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, একদিন পতন হবেই।
জুলাইয়ের রক্তিম দিনে সজীবের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে থাকে ওভারব্রিজে
২০২৪ সালের জুলাই মাস বদলে দেয় সবকিছু। যখন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, তখন সজীবও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি। ন্যায় ও অধিকার রক্ষার জন্য নিজের জীবনকেও বাজি রাখে সে। ফেনীর সাহসী যুবক সজীব ০৪ আগস্ট, ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে ফেনীর মহিপালে আসে। সকাল থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগের ক্যাডাররা অস্ত্রসহ শিক্ষার্থীদের সাথে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। যোহরের নামাজের পর হঠাৎ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ট্রাংক রোডের দিক থেকে গুলি করতে করতে মহিপালের দিকে এগিয়ে আসে। সেখানে ছাত্রলীগের ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জুয়েল, ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন জিকু, ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ৩নং ওয়ার্ড সভাপতি শেখ আব্দুল হক বিজয়সহ তাদের অনুসারীরা অস্ত্র উচিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর গুলি ছুড়তে শুরু করে।
গোপনে ফার্মেসী থেকে গুলি বের করা
গুলির সামনের সজীব তখন মহিপাল ওভার ব্রিজের নিচে অবস্থান নেয়। ইতোমধ্যে অনেকেই গুলি খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে তুমুল গুলিবর্ষণের এক পর্যায়ে সজীব গুলিবিদ্ধ হয়। তার রক্তে ভিজতে থাকে ওভারব্রিজের রাস্তা। সাথে থাকা সহযোদ্ধারা কোনো মতে তাকে ধরাধরি করে প্রথমে কাছের এক ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। ফার্মেসি কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ সর্বত্র ছাত্রলীগের হানাদারদের উপস্থিতি। গোপনে ফার্মেসি থেকে কোনোমতে গুলি বের করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার পরিস্থিতি তখনও ছিল না। পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আহত সজীবকে। ডাক্তার দেখানোর পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করে সেখানেই। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা পালিয়ে যায় ভারতে। সারা বাংলাদেশে নেমে আসে এক বেদনাহত উৎসব।
এ শুধু গল্প নয় এটি জুলাইয়ের ইতিহাস
এই সাক্ষ্য কেবল একটি আহত শরীরের গল্প নয়, এটি একটি প্রতিরোধের ইতিহাস, যেখানে সাহসিকতা, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বোধ এক সুতোয় গাঁথা। সজীবদের মতো বাংলার দামাল ছেলে বুক উঁচু করে রাস্তায় নেমে না আসলে বাংলার আকাশ আজও হয়তো অন্ধকার মেঘে আচ্ছন্ন থাকতো। আজ সজীবের পরিবার এক অজানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। চিকিৎসা ব্যয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। একটি স্থায়ী বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ, এই দুটি জিনিস সজীবের জীবনকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিতে পারে। এই সাহসী তরুণের কাহিনী কেবল তার একার নয়; এটি একটি প্রজন্মের গল্প, যারা ভয়কে জয় করে সত্যের পথে এগিয়ে যায়।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মিনহাজ ইবনে আমীর সজীব
জন্ম : ০৯/০৬/২০০৭
জন্মস্থান : চরকালিদাস, ফরহাদনগর, ফেনী সদর, ফেনী
নিজ জেলা : ফেনী
পেশা : ছাত্র, ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সাইন্স, ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশন
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম-চরকালিদাস, ইউনিয়ন-ফরহাদনগর, থানা-ফেনী সদর, জেলা-ফেনী
পিতা : মোঃ আমীর হোসেন, পেশা-কৃষি কাজ, বয়স-৪৭
মাতা : খালেদা আক্তার, পেশা-গৃহিণী, বয়স-৪৯
মাসিক আয় : ১০ হাজার টাকা
বাড়ি : চর এলাকায় বাড়ি হওয়ায় নদী ভাঙনের শিকার
পরিবারের সদস্য : ০৪ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. সাব্বির হোসেন সিয়াম, সম্পর্ক-বড় ভাই, বয়স-২৩, পেশা- স্নাতক শিক্ষার্থী
আক্রমণকারী
৪ই আগস্ট ২০২৪ সালে দুপুর ৩টায় ফেনীতে মহিপাল ওভার ব্রিজের নিচে ট্রাংক রোড থেকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসা ছাত্রলীগের বন্দুকধারী সন্ত্রাসীদের সরাসরি গুলিতে আহত। সেখানে ছিল ফরহাদ নগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জুয়েল, ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন জিকু, ফরহাদনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ৩নং ওয়ার্ড সভাপতি শেখ আব্দুল হক বিজয়সহ তাদের অনুসারীরা।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍