হোম / আহতদের তালিকা / তাজিম উদ্দিন
তাজিম উদ্দিন

তাজিম উদ্দিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শিক্ষার্থী, পাশাপাশি জব করতেন

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়: তাজিম উদ্দিন: গ্রামীণ মাটির সন্তান, রাজপথের কণ্ঠস্বর
ফেনীর দাগনভূয়াঁ উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম পূর্ব চন্দ্রপুর। সেখানেই ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জন্ম হয় তাজিম উদ্দিন নামের এক সংগ্রামী শিশুর, যিনি পরবর্তীতে তরুণদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেন। পরিবারে আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না পিতা বাহার উদ্দিন, একজন পান বিক্রেতা; জীবনভর পরিশ্রমে খোঁজেন একমুঠো অন্ন, আর মা খোদেজা বেগম একটি ছায়ার মতো সংসারের বাতিঘর। এই পরিবারে স্বপ্ন দেখাও ছিল একধরনের বিদ্রোহ।

তাজিম ছোট থেকেই মেধাবী, কিন্তু তার বড় সম্পদ ছিল স্পষ্টভাষীতা এবং ন্যায়ের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতে তিনি কাজ করতেন আলোর খোঁজে নিজেই প্রদীপ জ্বালাতেন। তার জীবনের দগদগে বাস্তবতা ছিল যে, তিনি কোনো দিনও স্বাচ্ছন্দ্যকে চিনেননি। অথচ তাজিমের ভেতরে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ার এক বিস্ময়কর সাহস।
২০২৪ সালের জুলাই যখন বাংলাদেশ জেগে ওঠে “এক দফা, এক দাবি হাসিনা তুই চলে যাবি” স্লোগানে, তখন তাজিমও ঘরে বসে থাকেননি। চট্টগ্রামের রাজপথ হয়ে উঠেছিল তার কুরুক্ষেত্র। রাজনীতি, আন্দোলন কিংবা জুলুমের সংজ্ঞা তিনি বই থেকে শেখেননি তিনি দেখেছেন চোখের সামনে, টের পেয়েছেন নিজের জীবনে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি পথে নেমেছেন।
তিনি জানতেন, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে কখনো চাকরি হারাতে হয়, কখনো শরীর রক্তাক্ত হয় তবু দমে যাননি। ছাত্র-জনতার কণ্ঠে যখন প্রতিবাদের আগুন জ্বলছিল, তখন তাজিম ছিলেন সেই আগুনের একটি নির্ভীক শিখা।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, একটি রবিবার। সূর্যের তাপে নয়, রাজপথ তখন উত্তাল ছিল ছাত্র-জনতার কণ্ঠে ”এক দফা, এক দাবি হাসিনা তুই কবে যাবি”। দেশজুড়ে আন্দোলনের ঢেউ ফুঁপিয়ে উঠছিল ফেনীতেও। সেইদিন, মহিপাল সার্কিট হাউজ এরিয়ায় যখন ছাত্ররা জমায়েত হয়েছিল, তখন তামিজ উদ্দিন ছিলেন তাদের একজন প্রথম সারির সাহসী মুখ। আন্দোলনের পূর্বে, তারা যোহরের সালাত আদায় করেছিলেন, আল্লাহর কাছে ইনসাফ ও মুক্তির প্রার্থনায়। কিন্তু নামাজ শেষ হতেই আকাশ ছিঁড়ে নামে গুলির ঝড়।
আনুমানিক দুপুর ২টা ৩০ মিনিট সেই মুহূর্তটি ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ক্ষণ হয়ে ওঠে। সাবেক সংসদ সদস্য ও কুখ্যাত আওয়ামী সন্ত্রাসী নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ছাত্র-জনতার ওপরে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। লক্ষ্য ছিল সোজা বুকে, প্রতিবাদের কণ্ঠরোধে। আর এই গুলির শিকার হন তামিজ উদ্দিন তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় ১২টি গুলি।
একজন তরুণের শরীরে ১২ বার গুলি পায়ে লাগা মানে শুধু মাংসপেশি ছিন্নভিন্ন হওয়া নয় এটি ছিল একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবাদের শরীরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা। কিন্তু রক্তপাতেও তামিজের প্রতিজ্ঞা রক্তাক্ত হয়নি তিনি লুটিয়ে পড়লেও পরাজিত হননি।
এই বর্বর হামলা ঘটেছিল তখন, যখন গোটা ফেনী জেগে উঠেছিল এক নতুন বাংলাদেশ দেখার প্রত্যয়ে। তামিজ উদ্দিন ছিলেন সেই প্রত্যয়ের প্রতীক, সেই অগ্রনায়ক, যে জানত গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই রাজপথে দাঁড়াতে হয়। তিনি গুলি খেয়েছিলেন, কিন্তু মাথা নোয়াননি।
চিকিৎসা
তামিজ উদ্দিন: শরীরে গুলির ক্ষত, প্রার্থনায় জীবন চারপাশে যখন আন্দোলনের উত্তাল স্লোগান বয়ে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ফেনীর আকাশ। ৪ আগস্ট, রোববার, গুলির শব্দ ছিন্ন করেছিল ছাত্র-জনতার স্বপ্ন। আর সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন তামিজ উদ্দিন যার শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল ১২টি বুলেট।
প্রথমে আলকেমি এবং সদর হাসপাতাল দুটো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু তা ছিল শুধুই অন্তরের রক্তপাত বন্ধ করার ক্ষণিকের প্রয়াস। সেই গুলির ক্ষত যেন প্রত্যহ চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছিল এই চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। অবশেষে তাকে ঢাকা আনা হয়, ভর্তি করা হয় ইবনে সিনা হাসপাতালে।
সেখানেই শুরু হয় তার জীবনের আরেক যুদ্ধ জীবন বাঁচানোর লড়াই, আর্থিক সংকটের সাথে সংগ্রাম। চিকিৎসা খরচ দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষ টাকা যার প্রতিটি পয়সা জোগাড় করতে হয় নিজের পরিবার থেকেই। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় বাহু একটিবারও পিছনে দাঁড়িয়ে বলেনি “তুমি একা নও”।
আরও নির্মম বাস্তবতা হলো, তামিজ উদ্দিনের শরীরে আজও গুলি রয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন এই ধাতব টুকরাগুলো শুধু ব্যথার নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই চিকিৎসা তার কাছে শুধুই কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কারণ পরিবারের পক্ষে আর্থিকভাবে তা সম্ভব নয়।
আজ তামিজ উদ্দিন বেঁচে আছেন, কিন্তু প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির ধ্বংসাবশেষ। নিঃশব্দ যন্ত্রণার ভারে নুয়ে যাওয়া এ তরুণের হৃদয়ে একটাই আকুতি “সহযোগিতা চাই, চিকিৎসার জন্য নয় শুধু, বাঁচার জন্য।”

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : তাজিম উদ্দিন-চট্টগ্রাম
জন্মতারিখ : ০৬-০২-২০০৬
জন্মস্থান : পূর্ব চন্দ্রপুর, ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী, পাশাপাশি জব করতেন
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : পূর্ব চন্দ্রপুর, ফেনী, গ্রাম: পূর্ব চন্দ্রপুর, ইউনিয়ন: ৩নং পূর্ব চন্দ্রপুর
থানা: দাগনভূয়াঁ, জেলা: ফেনী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍