নেছার উদ্দিন (নাঈম)
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মাদারিপুরের দক্ষিণ রমজানপুরে ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া শিক্ষক নেছার উদ্দিন (নাঈম) ছিলেন এক নীরব স্বপ্নবান মানুষ, যিনি বনশ্রীর প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠই নয় মানুষ হওয়ার পথ শেখাতেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তপ্ত বিকেলে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন নিরস্ত্র নাগরিকের পাশে, আর সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্রীয় গুলি তাঁর বাম পায়ের হাঁটুর নিচে ভেঙে দেয় হাড়, ভেঙে দেয় জীবনের স্বাভাবিক চলন। দীর্ঘ চিকিৎসা, চারটি অস্ত্রোপচার ও এক বছরের যন্ত্রণার মাঝেও তিনি হারাননি মনের আলো এখনো চান সমাজের কাজে যুক্ত থাকতে, দাঁড়িয়ে থাকতে নীতির পাশে। নিরীহ শিক্ষক থেকে গুলিবিদ্ধ প্রতিবাদী হয়ে উঠা নেছার উদ্দিন আজ রক্তাক্ত সময়ের এক প্রতীক যেখানে সাহসের প্রদীপ জ্বলে ওঠে অক্ষমতার অন্ধকারেও।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
এক গুলিবিদ্ধ শিক্ষকের ভাঙা পায়ের আর্তনাদ
নেছার উদ্দিন (নাঈম)
ক্রমিক: ০৪৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৫
পরিচিতি
মানুষের জীবনে কিছু ক্ষণ থাকে, যা সময়ের ক্যানভাসে রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আঁকা থাকে। সেই ক্ষণে যে বুক ভেঙে যায়, তার ব্যথা কেবল সে-ই জানে; আর যাদের হৃদয়ে সে বেঁচে থাকে, তারাও ছুঁয়ে থাকে সেই ব্যথার কাঁপন। নেছার উদ্দিন; একজন শিক্ষক, এক নিরীহ নাগরিক, এক সামান্য স্বপ্নের মানুষ, যার জীবনকে রক্তাক্ত করে দিল রাষ্ট্রের নিপীড়নের লৌহদণ্ড।
শৈশব ও সংগ্রামের শুরু
নেছার উদ্দিন জন্মেছিলেন ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি, মাদারিপুর জেলার দক্ষিণ রমজানপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মজিবুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত ইমাম, যিনি সৎ পথে পরিবার চালিয়েছেন ধর্মীয় নীতিতে অটল থেকে। মা সুফিয়া বেগম। যিনি আর বেঁচে নেই; ছিলেন সংসারের নিঃশব্দ ছায়া। ছেলেবেলাটা কেটেছে অভাব আর অনুশাসনের মধ্যে, যেখানে স্বপ্ন বলতে ছিল শুধুই বাঁচা। পরিবারের সাত সদস্যের মাঝে তিনি ছিলেন আলোর মতো, যিনি চেষ্টা করেছিলেন অন্ধকার ঘরের জানালায় একটু আলো ঢুকিয়ে দিতে।
তিনি মাদারিপুরের নিজ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন জীবিকার তাগিদে। বনশ্রীর এক প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু এই শিক্ষকতা শুধু পেশা ছিল না; ছিল এক স্বপ্নের চর্চা: যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মানুষ হওয়ার শিক্ষায় গড়তে চেয়েছিলেন।
আন্দোলনের মাঠে শিক্ষক আর গুলির নিশানায় নাগরিক
২০২৪ সালের জুলাই: বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় জ্বলন্ত
অক্ষরে লেখা এক মাস, যেদিন বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল ছাত্রদের কন্ঠস্বর, আর রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল এক অনাগত বিপ্লবের শিহরণ। সেদিন হাজারো তরুণ-তরুণীর চোখে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু এই লড়াইয়ে শুধু ছাত্র ছিল না, ছিল শিক্ষকরাও। যাঁদের হৃদয়ে শিক্ষা শুধু পুঁথির পাঠ নয়, বরং নৈতিকতার পাঠ।
সেসব শিক্ষকের একজন ছিলেন নেছার উদ্দিন, এক নিঃস্ব অথচ নীতিবান শিক্ষক। যিনি চক দিয়ে পাঠ্যবই বোঝাতেন না শুধু, শিখাতেন ন্যায়, সৎ থাকা আর মানুষ হয়ে বাঁচার দর্শন। তাঁর কাছে এ আন্দোলন কেবল ছাত্রদের অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না; এ ছিল মানবতার এক অনিবার্য জাগরণ। কারণ তিনি জানতেন, আজ যদি ছাত্ররাই মাথা নত করে, তবে কাল কেউ থাকবে না মাথা তুলে দাঁড়াবার।
১৯ জুলাই, শুক্রবার। বিকাল তখন ৫টা দুই ছুই। ঢাকার বনশ্রীর আইডিয়াল স্কুল আর পাশের মসজিদের মধ্যবর্তী এলাকা; সি ও ডি ব্লকের এভিনিউ রোডে জমে উঠেছিল আন্দোলন। গরম রোদে ঝলসে যাওয়া শহরের বুকজুড়ে তখনও রয়ে গেছে আশার উত্তাপ। সেই জনতার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলেন নেছার উদ্দিনও। নিরস্ত্র, নিরাভরণ। তাঁর হাতে ছিল না লাঠি, মুখে ছিল না কোনো ধ্বংসের ভাষা। তাঁর অস্ত্র ছিল বিবেক, প্রতিবাদ ছিল তাঁর প্রার্থনার মতো পবিত্র।
তখন হঠাৎ করেই, যেন আকাশ নামিয়ে আনা হলো মাটিতে: রাষ্ট্র তার সাজানো বাহিনী নামিয়ে দিলো, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু নিধনে রওনা দিয়েছে কোনো সেনাদল। পুলিশের সাঁজোয়াযান আর বিজিবি'র ইউনিফর্মপরা মানুষগুলো রক্তচক্ষু নিয়ে ছুটে এলো; কানে বাজল কাঁদানে গ্যাসের বিস্ফোরণ, আর তারই ফাঁকে ফাঁকে গুলির ঠাস ঠাস শব্দ। যেন চারপাশ থেমে গেল, আর সময় এক রক্তাক্ত মুহূর্তে জমে উঠলো।
একটি গুলি ছুটে এলো বাতাস চিরে; তা কোনো লক্ষ্যভ্রষ্ট ছিটা সীসা ছিল না। সেটি যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খুঁজে নিয়েছিল এক শিক্ষককে। নেছার উদ্দিনের শরীর কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কাঁপেনি। গুলিটি বিদ্ধ হয় তাঁর বাম পায়ের হাঁটুর নিচে। মুহূর্তেই চুয়ে পড়ে গরম রক্ত, হাড় ভেঙে চুরমার; তার সাথে যেন ভেঙে যায় একজন শিক্ষকের চলার পথ, তাঁর সমস্ত স্বপ্ন, তাঁর সারা জীবনের অর্জন।
পথের ধারে পড়ে ছিলেন তিনি, পেছনে পড়ে ছিল একজোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেল, সামনে গড়িয়ে যাচ্ছিল তাঁর রক্ত লাল, উজ্জ্বল, রাষ্ট্রের অনাচারের সাক্ষী হয়ে। এই শিক্ষক যিনি বই দিয়ে মানুষ গড়তেন, তাকেই আজ রাষ্ট্র সীসার গুলি ভেঙে ফেললো। কে বলে রাষ্ট্র অন্ধ? না, সে খুব সচেতনভাবেই বেছে নেয় তার নিশানা। আর সেই নিশানায় নেছার উদ্দিন ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন বিবেকের প্রতীক। সেই প্রতীককে নিঃস্ব করে দিয়ে রাষ্ট্র যেন ঘোষণা করল 'যে প্রশ্ন করবে, তার জন্য আমাদের কাছে সীসা মজুত আছে'।
ব্যথার চিকিৎসা, যন্ত্রণার ইতিহাস
প্রাথমিকভাবে তিনি ভর্তি হন বনশ্রীর ফরাজি হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেলে। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, তাঁকে স্থানান্তর করা হয় পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে যন্ত্রণার ঘরে তিনি কাটান এক মাস চার দিন। পায়ের মধ্যে এখনও রয়ে গেছে ৬ ইঞ্চির মতো একটি গুলি, যা অপসারণ করা সম্ভব নয়। জীবনের গতি আর ফিরবে না পুরোনো রূপে। তার চারটি অপারেশনের মধ্যে তিনটি সম্পন্ন করেছেন, আরেকটি এখনও বাকি। ১০ মাস ধরে রিং বসানো ছিল তাঁর পায়ে। ফিজিওথেরাপি, ব্যয়বহুল ওষুধ আর শারীরিক অক্ষমতা মিলিয়ে চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা।
আজ তিনি আর আগের মতো হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারে বসে নিজেই চোখের জলে ধুয়ে ফেলেন অতীতের পাঠদান। তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা, ঘরে রয়েছে বাবা ও শাশুড়ি। এই পরিবার নিয়ে। তিনি এখন ঢাকায় রয়েছেন এক বেদনাদায়ক দিনযাপনে।
ভবিষ্যতের প্রতি আকুল আবেদন
নেছার উদ্দিন নিজেকে এখন পুরোপুরি কর্মক্ষম ভাবেন না, কিন্তু তার মনের মধ্যে জ্বলছে আলো। তিনি চান প্রশাসনিক বা অফিসিয়াল কোনো দায়িত্বে থেকে কাজ করতে। চান, কিছুটা স্থিরতা ফিরে আসুক জীবনে। অর্থনৈতিক সহযোগিতাই এখন তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সেই সহযোগিতা যদি না আসে, তবে হয়তো তাঁকে আর দাঁড়াতেই হবে না; জীবন হবে নিঃস্ব আর রক্তাক্ত স্মৃতি।
প্রস্তাবনা
১। নিয়মিত থেরাপি ও ওষুধ সরবরাহ এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
২। বসে থেকে করা যায় এমন কাজের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া।
৩। পরিবারকে নিয়মিত ভাতা প্রদান।
এক নজরে নেছার উদ্দিন (নাঈম)
নাম: নেছার উদ্দিন (নাঈম)
জন্ম তারিখ: ৫-০১-১৯৮৫
জন্মন্মস্থান: মাদারিপুর
পেশা: শিক্ষক
প্রতিষ্ঠান: বেসরকারি স্কুল
নিজ জেলা: মাদারিপুর
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ৩৭, রোড নং: ০৮, ব্লকঃ সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: দক্ষিণ রমজান পুর, পো: রমজানপুর হাট, থানা: কালকিনি, জেলা: মাদারীপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মজিবুর রহমান
পিতার পেশা: অবসরপ্রাপ্ত ইমাম
মাতার নাম: মৃত সুফিয়া বেগম
আয়ের উৎস: ড্রাইভিং
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
তিন ভাই এবং তিন বোন
১. শাহনাজ বেগম, গৃহিণী, ২. মোঃ মিজানুর রহমান, চাকরিজীবী,
৩. মোহসেনাত বেগম, গৃহিণী
৪.নিজ (প্রাইভেট শিক্ষক) ৫. মাসুদা বেগম, গৃহিণী, ৬. মোঃ আমিনুল ইসলাম, প্রাইভেট চাকরি
ঘটনার স্থান: বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল ও মসজিদ সংলগ্ন সি ও ডি ব্লকের এভিনিউ রোডে
আহত হওয়ার সময়: ১৯ জুলাই ২০২৪ (শুক্রবার) আনুমানিক বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী: পুলিশ ও বিজিবি
আঘাতের ধরন: বাম পায়ের হাটুর নিচে গুলিবিদ্ধ এবং হাড় গুঁড়ো হয়ে গেছে
নেছার উদ্দিন (নাঈম)
ক্রমিক: ০৪৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৫
পরিচিতি
মানুষের জীবনে কিছু ক্ষণ থাকে, যা সময়ের ক্যানভাসে রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আঁকা থাকে। সেই ক্ষণে যে বুক ভেঙে যায়, তার ব্যথা কেবল সে-ই জানে; আর যাদের হৃদয়ে সে বেঁচে থাকে, তারাও ছুঁয়ে থাকে সেই ব্যথার কাঁপন। নেছার উদ্দিন; একজন শিক্ষক, এক নিরীহ নাগরিক, এক সামান্য স্বপ্নের মানুষ, যার জীবনকে রক্তাক্ত করে দিল রাষ্ট্রের নিপীড়নের লৌহদণ্ড।
শৈশব ও সংগ্রামের শুরু
নেছার উদ্দিন জন্মেছিলেন ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি, মাদারিপুর জেলার দক্ষিণ রমজানপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মজিবুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত ইমাম, যিনি সৎ পথে পরিবার চালিয়েছেন ধর্মীয় নীতিতে অটল থেকে। মা সুফিয়া বেগম। যিনি আর বেঁচে নেই; ছিলেন সংসারের নিঃশব্দ ছায়া। ছেলেবেলাটা কেটেছে অভাব আর অনুশাসনের মধ্যে, যেখানে স্বপ্ন বলতে ছিল শুধুই বাঁচা। পরিবারের সাত সদস্যের মাঝে তিনি ছিলেন আলোর মতো, যিনি চেষ্টা করেছিলেন অন্ধকার ঘরের জানালায় একটু আলো ঢুকিয়ে দিতে।
তিনি মাদারিপুরের নিজ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন জীবিকার তাগিদে। বনশ্রীর এক প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু এই শিক্ষকতা শুধু পেশা ছিল না; ছিল এক স্বপ্নের চর্চা: যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মানুষ হওয়ার শিক্ষায় গড়তে চেয়েছিলেন।
আন্দোলনের মাঠে শিক্ষক আর গুলির নিশানায় নাগরিক
২০২৪ সালের জুলাই: বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় জ্বলন্ত
অক্ষরে লেখা এক মাস, যেদিন বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল ছাত্রদের কন্ঠস্বর, আর রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল এক অনাগত বিপ্লবের শিহরণ। সেদিন হাজারো তরুণ-তরুণীর চোখে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু এই লড়াইয়ে শুধু ছাত্র ছিল না, ছিল শিক্ষকরাও। যাঁদের হৃদয়ে শিক্ষা শুধু পুঁথির পাঠ নয়, বরং নৈতিকতার পাঠ।
সেসব শিক্ষকের একজন ছিলেন নেছার উদ্দিন, এক নিঃস্ব অথচ নীতিবান শিক্ষক। যিনি চক দিয়ে পাঠ্যবই বোঝাতেন না শুধু, শিখাতেন ন্যায়, সৎ থাকা আর মানুষ হয়ে বাঁচার দর্শন। তাঁর কাছে এ আন্দোলন কেবল ছাত্রদের অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল না; এ ছিল মানবতার এক অনিবার্য জাগরণ। কারণ তিনি জানতেন, আজ যদি ছাত্ররাই মাথা নত করে, তবে কাল কেউ থাকবে না মাথা তুলে দাঁড়াবার।
১৯ জুলাই, শুক্রবার। বিকাল তখন ৫টা দুই ছুই। ঢাকার বনশ্রীর আইডিয়াল স্কুল আর পাশের মসজিদের মধ্যবর্তী এলাকা; সি ও ডি ব্লকের এভিনিউ রোডে জমে উঠেছিল আন্দোলন। গরম রোদে ঝলসে যাওয়া শহরের বুকজুড়ে তখনও রয়ে গেছে আশার উত্তাপ। সেই জনতার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলেন নেছার উদ্দিনও। নিরস্ত্র, নিরাভরণ। তাঁর হাতে ছিল না লাঠি, মুখে ছিল না কোনো ধ্বংসের ভাষা। তাঁর অস্ত্র ছিল বিবেক, প্রতিবাদ ছিল তাঁর প্রার্থনার মতো পবিত্র।
তখন হঠাৎ করেই, যেন আকাশ নামিয়ে আনা হলো মাটিতে: রাষ্ট্র তার সাজানো বাহিনী নামিয়ে দিলো, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু নিধনে রওনা দিয়েছে কোনো সেনাদল। পুলিশের সাঁজোয়াযান আর বিজিবি'র ইউনিফর্মপরা মানুষগুলো রক্তচক্ষু নিয়ে ছুটে এলো; কানে বাজল কাঁদানে গ্যাসের বিস্ফোরণ, আর তারই ফাঁকে ফাঁকে গুলির ঠাস ঠাস শব্দ। যেন চারপাশ থেমে গেল, আর সময় এক রক্তাক্ত মুহূর্তে জমে উঠলো।
একটি গুলি ছুটে এলো বাতাস চিরে; তা কোনো লক্ষ্যভ্রষ্ট ছিটা সীসা ছিল না। সেটি যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খুঁজে নিয়েছিল এক শিক্ষককে। নেছার উদ্দিনের শরীর কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কাঁপেনি। গুলিটি বিদ্ধ হয় তাঁর বাম পায়ের হাঁটুর নিচে। মুহূর্তেই চুয়ে পড়ে গরম রক্ত, হাড় ভেঙে চুরমার; তার সাথে যেন ভেঙে যায় একজন শিক্ষকের চলার পথ, তাঁর সমস্ত স্বপ্ন, তাঁর সারা জীবনের অর্জন।
পথের ধারে পড়ে ছিলেন তিনি, পেছনে পড়ে ছিল একজোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেল, সামনে গড়িয়ে যাচ্ছিল তাঁর রক্ত লাল, উজ্জ্বল, রাষ্ট্রের অনাচারের সাক্ষী হয়ে। এই শিক্ষক যিনি বই দিয়ে মানুষ গড়তেন, তাকেই আজ রাষ্ট্র সীসার গুলি ভেঙে ফেললো। কে বলে রাষ্ট্র অন্ধ? না, সে খুব সচেতনভাবেই বেছে নেয় তার নিশানা। আর সেই নিশানায় নেছার উদ্দিন ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন বিবেকের প্রতীক। সেই প্রতীককে নিঃস্ব করে দিয়ে রাষ্ট্র যেন ঘোষণা করল 'যে প্রশ্ন করবে, তার জন্য আমাদের কাছে সীসা মজুত আছে'।
ব্যথার চিকিৎসা, যন্ত্রণার ইতিহাস
প্রাথমিকভাবে তিনি ভর্তি হন বনশ্রীর ফরাজি হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেলে। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, তাঁকে স্থানান্তর করা হয় পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে যন্ত্রণার ঘরে তিনি কাটান এক মাস চার দিন। পায়ের মধ্যে এখনও রয়ে গেছে ৬ ইঞ্চির মতো একটি গুলি, যা অপসারণ করা সম্ভব নয়। জীবনের গতি আর ফিরবে না পুরোনো রূপে। তার চারটি অপারেশনের মধ্যে তিনটি সম্পন্ন করেছেন, আরেকটি এখনও বাকি। ১০ মাস ধরে রিং বসানো ছিল তাঁর পায়ে। ফিজিওথেরাপি, ব্যয়বহুল ওষুধ আর শারীরিক অক্ষমতা মিলিয়ে চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা।
আজ তিনি আর আগের মতো হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারে বসে নিজেই চোখের জলে ধুয়ে ফেলেন অতীতের পাঠদান। তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা, ঘরে রয়েছে বাবা ও শাশুড়ি। এই পরিবার নিয়ে। তিনি এখন ঢাকায় রয়েছেন এক বেদনাদায়ক দিনযাপনে।
ভবিষ্যতের প্রতি আকুল আবেদন
নেছার উদ্দিন নিজেকে এখন পুরোপুরি কর্মক্ষম ভাবেন না, কিন্তু তার মনের মধ্যে জ্বলছে আলো। তিনি চান প্রশাসনিক বা অফিসিয়াল কোনো দায়িত্বে থেকে কাজ করতে। চান, কিছুটা স্থিরতা ফিরে আসুক জীবনে। অর্থনৈতিক সহযোগিতাই এখন তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সেই সহযোগিতা যদি না আসে, তবে হয়তো তাঁকে আর দাঁড়াতেই হবে না; জীবন হবে নিঃস্ব আর রক্তাক্ত স্মৃতি।
প্রস্তাবনা
১। নিয়মিত থেরাপি ও ওষুধ সরবরাহ এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
২। বসে থেকে করা যায় এমন কাজের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া।
৩। পরিবারকে নিয়মিত ভাতা প্রদান।
এক নজরে নেছার উদ্দিন (নাঈম)
নাম: নেছার উদ্দিন (নাঈম)
জন্ম তারিখ: ৫-০১-১৯৮৫
জন্মন্মস্থান: মাদারিপুর
পেশা: শিক্ষক
প্রতিষ্ঠান: বেসরকারি স্কুল
নিজ জেলা: মাদারিপুর
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ৩৭, রোড নং: ০৮, ব্লকঃ সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: দক্ষিণ রমজান পুর, পো: রমজানপুর হাট, থানা: কালকিনি, জেলা: মাদারীপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মজিবুর রহমান
পিতার পেশা: অবসরপ্রাপ্ত ইমাম
মাতার নাম: মৃত সুফিয়া বেগম
আয়ের উৎস: ড্রাইভিং
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
তিন ভাই এবং তিন বোন
১. শাহনাজ বেগম, গৃহিণী, ২. মোঃ মিজানুর রহমান, চাকরিজীবী,
৩. মোহসেনাত বেগম, গৃহিণী
৪.নিজ (প্রাইভেট শিক্ষক) ৫. মাসুদা বেগম, গৃহিণী, ৬. মোঃ আমিনুল ইসলাম, প্রাইভেট চাকরি
ঘটনার স্থান: বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল ও মসজিদ সংলগ্ন সি ও ডি ব্লকের এভিনিউ রোডে
আহত হওয়ার সময়: ১৯ জুলাই ২০২৪ (শুক্রবার) আনুমানিক বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী: পুলিশ ও বিজিবি
আঘাতের ধরন: বাম পায়ের হাটুর নিচে গুলিবিদ্ধ এবং হাড় গুঁড়ো হয়ে গেছে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍