হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ সাকিব উদ্দিন
মোঃ সাকিব উদ্দিন

মোঃ সাকিব উদ্দিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : রিকশাচালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মোঃ সাকিব উদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন ২০০৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর থানার দক্ষিণ চর পাগলা গ্রামের কিল্লার বাড়িতে। শৈশব থেকেই তার জীবন ছিল কষ্টসাধ্য। বাবা আবদুল খালেক বয়সের ভারে আজ অচল, কিন্তু একসময় কাজ করে সংসার চালাতেন। মা সাফিয়া বেগম সংসার সামলাতেন গৃহিণী হিসেবে।

সাকিবের শৈশবের পড়াশোনা খুব বেশি দূর এগোয়নি। পারিবারিক আর্থিক সংকট তাকে ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী করে তুলেছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে বুঝতে শিখল, সংসার চালানোর দায়িত্বও একদিন তার কাঁধে এসে পড়বে। ভাই কামাল ব্যবসা করলেও সংসারের পুরোটা দায়িত্ব নিতে পারেনি। তাই সাকিব ড্রাইভিং শুরু করে। চট্টগ্রামের ঈদগাহ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে চলে তার নিত্যদিনের জীবিকা। তার স্বপ্ন ছিল একদিন কিছু টাকা জমিয়ে পরিবারকে ভালোভাবে দেখাশোনা করা।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু করে, তখন সাকিব ছিল কিশোর। তার মনের ভেতরও প্রশ্ন জেগেছিল“মেধা যদি স্বীকৃতি না পায়, তাহলে এই দেশের ভবিষ্যৎ কী? ২০২৪ সালে যখন আন্দোলন নতুন করে শুরু হলো, তখন শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও এতে শরিক হয়। কারণ, সবার মনে একই ক্ষোভ—রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে কিছু গোষ্ঠীকে সুযোগ দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করছে।
৪ আগস্ট ২০২৪-এ দেশব্যাপী ছাত্র জনতা এক দফা আন্দোলনের ডাক দেয়। এই আন্দোলনের দাবী ছিল শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগ। কারণ, জনগণের রক্তের বিনিময়ে টিকে থাকা সরকারের আর জায়গা নেই। সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে, মিছিল-সমাবেশে ভরে যায় শহর-বন্দর-গ্রাম।
সাকিব রিকশাচালক হলেও আন্দোলনের ডাকে সাড়া দেয়। তার মনে হয়েছিল, এই লড়াই শুধু ছাত্রদের নয়, শ্রমজীবী মানুষেরও। তাই অবসরে সে আনন্দ মিছিলে অংশ নেয়। তার ভাষায়, “আমরা তো দেশের মানুষ, দেশের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদেরও কিছু বলার আছে।”
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল প্রায় ৫টা। সেদিন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার দেশ থেকে পলায়ন করলে সাকিব আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়ে ফেরার পথে ছিল। স্থানটি ছিল মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন। চারদিক উত্তেজনায় ভরা। ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছিল, শ্রমিকরাও যোগ দিয়েছিল। হঠাৎ করে পরিস্থিতি বদলে যায়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে মিছিলকারীদের উপর গুপ্ত হামলা চালায়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই গুলি শুরু হয়। গুলির শব্দে মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছুটোছুটি করে প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু সাকিব তখন রাস্তায় আটকা পড়ে যায়। হঠাৎ এক গুলি তার পায়ে এসে লাগে। প্রচণ্ড ব্যথায় সে মাটিতে পড়ে যায়। রক্তে ভিজে যায় জামা-কাপড়। সে চিৎকার করে ওঠে—“আমারে বাঁচাও!”
সহযাত্রীরা দ্রুত এগিয়ে আসে। কয়েকজন তাকে কাঁধে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ পায়ে তখনও রক্ত ঝরছিল।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
হাসপাতালে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকরা তড়িঘড়ি করে অপারেশন থিয়েটারে নেন। গুলিটি তার পায়ের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি বের করা হয়, তবে চিকিৎসকরা জানান তার পা কিছুদিনের জন্য অচল থাকবে, এবং দীর্ঘ সময়ের পুনর্বাসন ছাড়া পুরোপুরি সুস্থ হওয়া কঠিন হবে। সাকিব এখনো পায়ে ব্যথা অনুভব করেন। কাজের অক্ষমতা তাকে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে দিয়েছে। রিকশা চালানোই ছিল তার জীবিকার একমাত্র উপায়। এখন সেই জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তার পরিবারও গভীর দুশ্চিন্তায় আছে। মা প্রতিদিন প্রার্থনা করেন, ছেলে যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরতে পারে। ভাই কামাল যতটুকু পারে সাহায্য করছে, কিন্তু সংসারের বোঝা দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। তবুও সাকিবের আশা—একদিন সে আবার সুস্থ হবে। তার স্বপ্ন, একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই লড়াই সফল হবে, আর সাধারণ মানুষের রক্ত আর না ঝরবে।

নাম : মোঃ সাকিব উদ্দিন
জন্ম তারিখ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৪
জন্মস্থান : লক্ষ্মীপুর
পেশা : রিকশাচালক
নিজ জেলা : লক্ষ্মীপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা :
গ্রাম: কিল্লার বাড়ি, দক্ষিণ চর পাগলা
ইউনিয়ন : চর পাগলা ইউনিয়ন
থানা : কমলনগর
জেলা : লক্ষ্মীপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আবদুল খালেক
মায়ের নাম : সাফিয়া বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : বয়স ৮০, বর্তমানে বেকার
মায়ের পেশা ও বয়স : ৭০ বছর, গৃহিণী
মাসিক আয় : আনুমানিক ২০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস: ড্রাইভিং
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. কামাল, বয়স: ৩০, পেশা: ব্যবসায়ী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন
আহত হওয়ার সময়কাল : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫:৩০ মিনিটে
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍