মো: আরিফ হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ইন্দ্রকুল গ্রামে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম মো: আরিফ হোসেনের। এক শ্রমজীবী মানুষের সরল আশা নিয়ে ঢাকায় একটি ডেভলপার কোম্পানিতে দারোয়ান হিসেবে সততা ও দায়িত্ববোধেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকা। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দিনে ঝিগাতলার রাস্তায় কর্তব্যরত অবস্থায় ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিতে মাথা ও হাতে বিদ্ধ হয়ে তাঁর জীবন এক মুহূর্তে থমকে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার আর অসহ্য ব্যথা সত্ত্বেও তিনি আজও সংগ্রাম করে চলেছেন নিজের মায়ের ও তিন বোনের ভবিষ্যতের জন্য। নিরীহ একজন শ্রমিক থেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার রক্তাক্ত সাক্ষী হয়ে ওঠা আরিফ বাংলাদেশের অসংখ্য নিঃশব্দ মানুষের একটি প্রতীক, যাদের ব্যথা প্রমাণ করে অন্যায়ের গুলিও মানুষের আশা থামাতে পারে না।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিতে মাথা ও হাতে গুলিবিদ্ধ
মো: আরিফ হোসেন
ক্রমিক: ০৪৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৬
পরিচিতি
মো: আরিফ হোসেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ইন্দ্রকুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপকূলীয় এই অঞ্চলের কৃষিপ্রধান এক গ্রামে তার শৈশব কাটে। পিতা হালিম প্যাদা ছিলেন একজন খেটে খাওয়া মানুষ, যিনি আরিফের ছোটবেলায় মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। মা রেখা বেগম একাই সন্তানদের বড় করে তোলেন। তিনি বর্তমানে বয়সের ভারে ক্লান্ত এবং গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলান। আরিফের পরিবারে রয়েছে তিন বোন। বড় বোন নাসরিন বেগম এসএসসি পাস করে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছেন। দ্বিতীয় বোন মিথিলা আক্তার ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা। তৃতীয় বোন শেফালী আক্তার বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
পেশা ও কর্মজীবনের প্রেক্ষাপট
দারিদ্র্য আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছেন মো: আরিফ হোসেন। গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়ালেখা করলেও পারিবারিক সঙ্কট ও পিতার অনুপস্থিতির কারণে তা আর বেশি দূর এগোয়নি। কৈশোরেই জীবিকার সন্ধানে তাকে নামতে হয়। প্রথমে স্থানীয়ভাবে নানা কাজ করে সংসার চালাতে চেষ্টা করেন, পরে জীবনের প্রয়োজনে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় এসেই আরিফ যোগ দেন একটি ডেভলপার কোম্পানিতে দারোয়ান হিসেবে। প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনা করত, যেখানে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল কর্মচারিদের দরকার ছিল। আরিফের কর্তব্য ছিল গেট পাহারা দেওয়া, প্রকল্প এলাকায় বহিরাগতদের চলাচল তদারকি করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ হলেও এই চাকরিটিই ছিল তার পরিবারে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। এখান থেকে পাওয়া সামান্য বেতন দিয়েই তিনি বাসা ভাড়া, খাবার, মায়ের ওষুধ, ছোট বোনদের লেখাপড়া ও জীবনের সব প্রয়োজন মেটাতেন। তার জীবন ছিল নিরীহ, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এক শ্রমজীবী মানুষের জীবন। কাজই ছিল তার ধর্ম, আর পরিবারই ছিল তার পৃথিবী। কিন্তু সেই শ্রমিক জীবনের ওপর নেমে আসে ভয়াল এক ঝড়। যে কাজ তার বেঁচে থাকার উপায় ছিল, সেটাই হয়ে ওঠে তার সর্বনাশের কারণ। দায়িত্ব পালনের সময় রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সহিংসতার মাঝে তিনি পড়েন গুলির মুখে।
আন্দোলনের সময় আহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে চলছিল নিয়োগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নামে। এই আন্দোলনকে দমন করতে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশ যৌথভাবে নামে ময়দানে। রাজধানীর ধানমন্ডি-ঝিগাতলা এলাকা ছিল সহিংসতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ২০ জুলাই ২০২৪, সেদিন ছিল আরিফের জন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতো। সকালবেলা কাজের জন্য কোম্পানির নিযুক্ত এলাকায় যান তিনি। ঝিগাতলা সড়কে কর্তব্যরত ছিলেন তিনি, যেমন ছিলেন প্রতিদিন। তবে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। ছাত্রলীগ ও পুলিশ সেই এলাকায় হামলা শুরু করে। তারা আন্দোলনকারী, পথচারী, দোকানদার, এমনকি নিরীহ শ্রমজীবীদের দিকেও নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে থাকে। আরিফ কাজ করছিলেন মাত্র। হঠাৎ তার মাথা ও হাতে গুলি এসে বিদ্ধ হয়। তিনি সাথে সাথেই লুটিয়ে পড়েন, রক্তে ভেসে যায় রাস্তা। স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যান। এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা যখন নির্বিচারে প্রয়োগ হয়, তখন তার শিকার হয় নিরীহ সাধারণ মানুষও। মোঃ আরিফ হোসেন সে সহিংসতার এক নীরব, অথচ করুণ চিত্র।
চিকিৎসা প্রক্রিয়া, বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা
গুলিবিদ্ধ হবার পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধানমন্ডি ইবনে সীনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাশেষে তাকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে তার মাথার গুলি অপারেশন করে অপসারণ করা হয়। তবে এই অপারেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কেননা মস্তিষ্কে গুলি লেগে রক্তক্ষরণ ও স্নায়ুবিক সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। হাতের গুলির ক্ষত আরও জটিল ছিল। প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকরা সফলভাবে অস্ত্রোপচার করতে পারেননি। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার হাতের চিকিৎসা করা হয়। তবে আজও তিনি সুস্থ নন। তার হাতের কার্যক্ষমতা সীমিত এবং তিনি তা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। মাথায় এখনও মাঝে মধ্যে প্রবল ব্যথা হয়, স্মৃতিশক্তি ক্ষয় ও মনঃসংযোগে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন মাথায় গুলির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে, যার জন্য বিশেষজ্ঞ নিউরো-সার্জনের ফলোআপ এবং থেরাপি প্রয়োজন। শারীরিক যন্ত্রণা ছাড়াও আরিফের জীবন এখন মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। তিনি ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন দেখেন, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভোগেন।
অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবারে প্রভাব
আহত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৮ মাস আরিফ হোসেন কোনো কাজ করতে পারেননি। তার চিকিৎসা, ওষুধ, হাসপাতাল যাতায়াত সব কিছুতেই লাগছে হাজার হাজার টাকা। অথচ এখন তার আয়ের কোনো উৎস নেই। পরিবারটিকে তিনি চালিয়ে নিচ্ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে। এখন সেই সংসার যেন ধ্বংসের মুখে। বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না, দিনে দু'বেলা খাবার যোগাড় করতেও সমস্যা হচ্ছে। মা বয়সের ভারে অসুস্থ, আর তিন বোনের একজন বিবাহিত, আর বাকি দুইজন এখনও পড়াশোনায়। মিথিলা ও শেফালীর পড়াশোনাও এখন ঝুঁকির মুখে। বই, খাতা, পরীক্ষার ফি সবকিছুই অনিশ্চিত। কোনো আত্মীয়-স্বজন থেকেও তেমন সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ কিছু অর্থ সাহায্য করছেন, তবে তা অপ্রতুল। পরিবারের অবস্থা এখন 'দিন এনে দিন খাওয়া' পরিস্থিতির থেকেও খারাপ। একটি গুলির আঘাত শুধু আরিফের দেহে নয়, তার পরিবারের প্রতিটি অংশে আঘাত করেছে। তাদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা সব কিছু আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত।
লেখক কথন
মো: আরিফ হোসেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক করুণ শিকার। একজন দিনমজুর, যিনি জীবনের চাকা চালাতে গিয়ে এক গুলির আঘাতে সব হারিয়েছেন। রাষ্ট্র যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে আরেকটি অন্যায়ের স্বীকৃতি। তার পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার এখন সময়ের দাবি।
সহায়তা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তাবনা
১. সরকারি চাকরি বা কোনো সংস্থায় দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ: তার আংশিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে হালকা দায়িত্বে নিয়োজিত করলে তিনি সম্মানজনক জীবনে ফিরতে পারেন।
২. ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু করার পুঁজি প্রদান: একটি মুদী দোকান বা সিকিউরিটি সার্ভিসের মাধ্যমে নিজের উপার্জন ফিরিয়ে আনতে পারেন, যদি প্রাথমিকভাবে ২-৩ লক্ষ টাকা পুঁজি দেওয়া হয়।
৩. চিকিৎসার জন্য এককালীন অনুদান বা ভাতা: মাথা ও হাতের চিকিৎসা এখনও বাকি। উন্নত চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য সরকারি সহায়তা আবশ্যক।
৪. পুনর্বাসন সেবা ও কাউন্সেলিং: মানসিক পুনরুদ্ধার, স্মৃতিশক্তি সমস্যা ও আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার জন্য চিকিৎসা সহযোগিতা জরুরি।
এক নজরে মো: আরিফ হোসেন
নাম: মো: আরিফ হোসেন
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৯৮
জন্মস্থান: পটুয়াখালী
পেশা: দারোয়ান, প্রতিষ্ঠান: ডেভলপার কোম্পানি
নিজ জেলা: পটুয়াখালী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: ইন্দ্রকুল, ইউনিয়ন: ইন্দ্রকুল, থানা: বাউফল, জেলা: পটুয়াখালী
পিতার নাম: হালিম প্যাদা (মৃত)
মায়ের নাম: রেখা বেগম
মায়ের পেশা: গৃহিনি
বোনদের বিবরণ
১. নাসরিন বেগম, গৃহিণী, যোগ্যতা: এসএসসি পাস
২. মিথিলা আক্তার, এসএসসি
৩. শেফালী আক্তার, শ্রেণি: নবম
আহত হওয়ার স্থান: ধানমন্ডি ঝিগাতলা
আহত হওয়ার সময়।: ২০ জুলাই ২০২৪, মাথায় ও হাতে গুলিবিদ্ধ
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ও পুলিশ
মো: আরিফ হোসেন
ক্রমিক: ০৪৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৬
পরিচিতি
মো: আরিফ হোসেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ইন্দ্রকুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপকূলীয় এই অঞ্চলের কৃষিপ্রধান এক গ্রামে তার শৈশব কাটে। পিতা হালিম প্যাদা ছিলেন একজন খেটে খাওয়া মানুষ, যিনি আরিফের ছোটবেলায় মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। মা রেখা বেগম একাই সন্তানদের বড় করে তোলেন। তিনি বর্তমানে বয়সের ভারে ক্লান্ত এবং গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলান। আরিফের পরিবারে রয়েছে তিন বোন। বড় বোন নাসরিন বেগম এসএসসি পাস করে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছেন। দ্বিতীয় বোন মিথিলা আক্তার ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা। তৃতীয় বোন শেফালী আক্তার বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
পেশা ও কর্মজীবনের প্রেক্ষাপট
দারিদ্র্য আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছেন মো: আরিফ হোসেন। গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়ালেখা করলেও পারিবারিক সঙ্কট ও পিতার অনুপস্থিতির কারণে তা আর বেশি দূর এগোয়নি। কৈশোরেই জীবিকার সন্ধানে তাকে নামতে হয়। প্রথমে স্থানীয়ভাবে নানা কাজ করে সংসার চালাতে চেষ্টা করেন, পরে জীবনের প্রয়োজনে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় এসেই আরিফ যোগ দেন একটি ডেভলপার কোম্পানিতে দারোয়ান হিসেবে। প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনা করত, যেখানে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল কর্মচারিদের দরকার ছিল। আরিফের কর্তব্য ছিল গেট পাহারা দেওয়া, প্রকল্প এলাকায় বহিরাগতদের চলাচল তদারকি করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ হলেও এই চাকরিটিই ছিল তার পরিবারে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। এখান থেকে পাওয়া সামান্য বেতন দিয়েই তিনি বাসা ভাড়া, খাবার, মায়ের ওষুধ, ছোট বোনদের লেখাপড়া ও জীবনের সব প্রয়োজন মেটাতেন। তার জীবন ছিল নিরীহ, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এক শ্রমজীবী মানুষের জীবন। কাজই ছিল তার ধর্ম, আর পরিবারই ছিল তার পৃথিবী। কিন্তু সেই শ্রমিক জীবনের ওপর নেমে আসে ভয়াল এক ঝড়। যে কাজ তার বেঁচে থাকার উপায় ছিল, সেটাই হয়ে ওঠে তার সর্বনাশের কারণ। দায়িত্ব পালনের সময় রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সহিংসতার মাঝে তিনি পড়েন গুলির মুখে।
আন্দোলনের সময় আহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে চলছিল নিয়োগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নামে। এই আন্দোলনকে দমন করতে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশ যৌথভাবে নামে ময়দানে। রাজধানীর ধানমন্ডি-ঝিগাতলা এলাকা ছিল সহিংসতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ২০ জুলাই ২০২৪, সেদিন ছিল আরিফের জন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতো। সকালবেলা কাজের জন্য কোম্পানির নিযুক্ত এলাকায় যান তিনি। ঝিগাতলা সড়কে কর্তব্যরত ছিলেন তিনি, যেমন ছিলেন প্রতিদিন। তবে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। ছাত্রলীগ ও পুলিশ সেই এলাকায় হামলা শুরু করে। তারা আন্দোলনকারী, পথচারী, দোকানদার, এমনকি নিরীহ শ্রমজীবীদের দিকেও নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে থাকে। আরিফ কাজ করছিলেন মাত্র। হঠাৎ তার মাথা ও হাতে গুলি এসে বিদ্ধ হয়। তিনি সাথে সাথেই লুটিয়ে পড়েন, রক্তে ভেসে যায় রাস্তা। স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যান। এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা যখন নির্বিচারে প্রয়োগ হয়, তখন তার শিকার হয় নিরীহ সাধারণ মানুষও। মোঃ আরিফ হোসেন সে সহিংসতার এক নীরব, অথচ করুণ চিত্র।
চিকিৎসা প্রক্রিয়া, বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা
গুলিবিদ্ধ হবার পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধানমন্ডি ইবনে সীনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাশেষে তাকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে তার মাথার গুলি অপারেশন করে অপসারণ করা হয়। তবে এই অপারেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কেননা মস্তিষ্কে গুলি লেগে রক্তক্ষরণ ও স্নায়ুবিক সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। হাতের গুলির ক্ষত আরও জটিল ছিল। প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকরা সফলভাবে অস্ত্রোপচার করতে পারেননি। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার হাতের চিকিৎসা করা হয়। তবে আজও তিনি সুস্থ নন। তার হাতের কার্যক্ষমতা সীমিত এবং তিনি তা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। মাথায় এখনও মাঝে মধ্যে প্রবল ব্যথা হয়, স্মৃতিশক্তি ক্ষয় ও মনঃসংযোগে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন মাথায় গুলির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে, যার জন্য বিশেষজ্ঞ নিউরো-সার্জনের ফলোআপ এবং থেরাপি প্রয়োজন। শারীরিক যন্ত্রণা ছাড়াও আরিফের জীবন এখন মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। তিনি ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন দেখেন, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভোগেন।
অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবারে প্রভাব
আহত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৮ মাস আরিফ হোসেন কোনো কাজ করতে পারেননি। তার চিকিৎসা, ওষুধ, হাসপাতাল যাতায়াত সব কিছুতেই লাগছে হাজার হাজার টাকা। অথচ এখন তার আয়ের কোনো উৎস নেই। পরিবারটিকে তিনি চালিয়ে নিচ্ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে। এখন সেই সংসার যেন ধ্বংসের মুখে। বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না, দিনে দু'বেলা খাবার যোগাড় করতেও সমস্যা হচ্ছে। মা বয়সের ভারে অসুস্থ, আর তিন বোনের একজন বিবাহিত, আর বাকি দুইজন এখনও পড়াশোনায়। মিথিলা ও শেফালীর পড়াশোনাও এখন ঝুঁকির মুখে। বই, খাতা, পরীক্ষার ফি সবকিছুই অনিশ্চিত। কোনো আত্মীয়-স্বজন থেকেও তেমন সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ কিছু অর্থ সাহায্য করছেন, তবে তা অপ্রতুল। পরিবারের অবস্থা এখন 'দিন এনে দিন খাওয়া' পরিস্থিতির থেকেও খারাপ। একটি গুলির আঘাত শুধু আরিফের দেহে নয়, তার পরিবারের প্রতিটি অংশে আঘাত করেছে। তাদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা সব কিছু আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত।
লেখক কথন
মো: আরিফ হোসেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক করুণ শিকার। একজন দিনমজুর, যিনি জীবনের চাকা চালাতে গিয়ে এক গুলির আঘাতে সব হারিয়েছেন। রাষ্ট্র যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে আরেকটি অন্যায়ের স্বীকৃতি। তার পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার এখন সময়ের দাবি।
সহায়তা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তাবনা
১. সরকারি চাকরি বা কোনো সংস্থায় দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ: তার আংশিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে হালকা দায়িত্বে নিয়োজিত করলে তিনি সম্মানজনক জীবনে ফিরতে পারেন।
২. ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু করার পুঁজি প্রদান: একটি মুদী দোকান বা সিকিউরিটি সার্ভিসের মাধ্যমে নিজের উপার্জন ফিরিয়ে আনতে পারেন, যদি প্রাথমিকভাবে ২-৩ লক্ষ টাকা পুঁজি দেওয়া হয়।
৩. চিকিৎসার জন্য এককালীন অনুদান বা ভাতা: মাথা ও হাতের চিকিৎসা এখনও বাকি। উন্নত চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য সরকারি সহায়তা আবশ্যক।
৪. পুনর্বাসন সেবা ও কাউন্সেলিং: মানসিক পুনরুদ্ধার, স্মৃতিশক্তি সমস্যা ও আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার জন্য চিকিৎসা সহযোগিতা জরুরি।
এক নজরে মো: আরিফ হোসেন
নাম: মো: আরিফ হোসেন
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৯৮
জন্মস্থান: পটুয়াখালী
পেশা: দারোয়ান, প্রতিষ্ঠান: ডেভলপার কোম্পানি
নিজ জেলা: পটুয়াখালী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: ইন্দ্রকুল, ইউনিয়ন: ইন্দ্রকুল, থানা: বাউফল, জেলা: পটুয়াখালী
পিতার নাম: হালিম প্যাদা (মৃত)
মায়ের নাম: রেখা বেগম
মায়ের পেশা: গৃহিনি
বোনদের বিবরণ
১. নাসরিন বেগম, গৃহিণী, যোগ্যতা: এসএসসি পাস
২. মিথিলা আক্তার, এসএসসি
৩. শেফালী আক্তার, শ্রেণি: নবম
আহত হওয়ার স্থান: ধানমন্ডি ঝিগাতলা
আহত হওয়ার সময়।: ২০ জুলাই ২০২৪, মাথায় ও হাতে গুলিবিদ্ধ
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ও পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍