হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ একরামুল হক ফাহিম
মোঃ একরামুল হক ফাহিম

মোঃ একরামুল হক ফাহিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, রামদুর কলেজ, ফেনী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
ফেনীর শান্ত গ্রাম গুনকের বুকে, বগাদানা ইউনিয়নের বুকে, ১৩ মার্চ ২০০২ সালে সূর্যের প্রথম কিরণ নেমেছিল বাগান বাড়ির একটি মেঠো পথের ধারে। সেদিন জন্ম হয়েছিল এক সম্ভাবনাময় জীবন—আকরামুল হক ফাহিমের, যিনি পরবর্তীতে এই প্রান্তরের শান-সজ্জা হয়ে উঠবেন। পাঁচ সদস্যের স্নেহময় পরিবারে তার জন্ম, যেখানে ছিল পিতা মাহবুবুল হক, যিনি বিদেশ প্রবাসে থেকে পরিবারের সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রার অঙ্গীকার নিয়ে কাঁধে দায়িত্ব বহন করতেন, আর মায়াময় মায়ের মমতা—আনোয়ারা বেগমের কোমল ছায়া। ছোট্ট ফাহিমের গর্ব ছিল তার বাগান বাড়ির ঐতিহ্যবাহী মাটি, গুনকের প্রকৃতি, আর সোনাগাজীর শান্তিপূর্ণ আকাশ।

শৈশব থেকেই ফাহিম ছিল পড়াশোনায় মনোযোগী, রামদুর কলেজের একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী। তার চোখে ছিল জীবনের অগাধ আকাঙ্ক্ষা, হৃদয়ে ছিল আদর্শের উন্মাদনা। ফেনীর সেই গ্রামীণ বাতাস তাকে শিখিয়েছিল সংগ্রামের মূল্য, মানবতার মহত্ত্ব এবং সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার তীব্র চেতনা।
তার এই বেড়ে ওঠা গুনক গ্রামের সাদাসিধে পথগুলো দিয়ে হেঁটে হেঁটে, সে পরিণত হয়েছিল এক জননেত্রীর মতো, যিনি সকল প্রতিকূলতার মাঝেও থামেননি, থামতে পারেননি। মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ৪ঠা আগস্ট ২০২৪ তারিখে সেই অদম্য তরুণ যেভাবে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছিলেন, তা ছিল তার জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়, যেখানে আদর্শ ও সাহসের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল।
আকরামুল হক ফাহিম—এক নাম যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাগান বাড়ির মাটি, গুনকের বাতাস, ফেনীর বুকে ছড়িয়ে পড়া মানুষের স্বপ্ন আর এক অসাধারণ শিক্ষার্থীর প্রাণস্পন্দন। তার জন্ম ছিল শুধুমাত্র এক জীবনের শুরু নয়, বরং এক সংগ্রামী যাত্রার সূচনা, যা তাকে তৈরি করেছিল আন্দোলনের এক সাহসী যোদ্ধা হিসেবে।
আন্দোলনে অংশগ্রহন ও অবদান
৪ আগস্ট ২০২৪: ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে গণজমায়েত ও রক্তাক্ত প্রতিবাদ
দিনটা ছিল গরম ও চাপা, দুপুরের সময় যখন জনজীবন কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট বরাবর ছাত্র জনতা এক দফা আন্দোলনের জন্য সংগঠিত হয়েছিল। সময় ছিল দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নামাজের আয়োজন করা হয়, এবং সবাই যোহরের নামাজ আদায় করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
কিন্তু সেই শান্তি ছিল অতিমাত্রায় ভ্রান্তিময়। দুপুর ২টার সময় হঠাৎ করেই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। তাদের হাতে ছিল অস্ত্র, আর মুখে ছিল ক্ষমতা প্রমাণের ঘৃণ্য লোভ। অপরদিকে, আন্দোলনকারী ছাত্ররা ছিল নিরস্ত্র, হাতে বাঁশের লাঠি। শুরু হয় উত্তেজনাপূর্ণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
এই সংঘর্ষে আকরামুল হক ফাহিম তার জীবনের এক ভয়াবহ পরীক্ষা দেয়। তার মাথা ও হাতে ছয়টি ছররা গুলি লাগে। গুলির আঘাত সে পরেও প্রতিরোধের সাহস হারায়নি। ব্যথা ও রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও, সে আন্দোলন থেকে সরে যায়নি। বিকেল চারটা পর্যন্ত আহত অবস্থায় তিনি এবং তার সঙ্গীরা রাজপথ দখল করে রেখেছিল। তাদের অবিচল সংকল্প ছিল—ন্যায়ের পথে কখনো পিছু হটবে না।
এই দিনটি ফেনীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই নির্ভীক তরুণদের নাম ও বীরত্বের জন্য, যাদের মধ্যে ছিলেন আকরামুল হক ফাহিম—এক যোদ্ধা যার রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়।
চিকিৎসা
৪ আগস্ট ২০২৪ সালের রক্তাক্ত মহিপাল থেকে ফিরে আসার পরও আকরামুল হক ফাহিমের যাত্রা শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছিল আরেক সংগ্রাম—এবার জীবনের সঙ্গে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর, প্রাথমিকভাবে তার শরীরে থাকা ছররা গুলিগুলো দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়নি। শরীরে অসহ্য ব্যথা আর ক্ষতের জ্বালা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কারণে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়।
অবশেষে ৮ আগস্ট ২০২৪, ফাহিম ও তার ভাই একসঙ্গে ফেনী সদর হাসপাতালে যান চিকিৎসার আশায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা যখন তার কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শোনেন, তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে ঘটনাটিকে "পুলিশ কেস" হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। ডাক্তাররা জানান, মাথায় ছররা গুলি থাকতে পারে এবং এক্স-রে করতে হবে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা, অনিয়ম এবং যন্ত্রপাতির জটিলতার কারণে সেখানে এক্স-রে করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতি বাধ্য করে দুই ভাইকে বেসরকারি আলকেমী হাসপাতালে যেতে। সেখানে মাথার এক্স-রে করানো হয়, আর সেই রিপোর্টে নিশ্চিত হয় যে, শরীরে গুলি এখনও রয়ে গেছে। এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হয় তারা।
এই রিপোর্ট হাতে নিয়ে ফাহিম ফিরে যায় সদর হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তাররা আংশিক অপারেশনের মাধ্যমে শরীর থেকে কিছু গুলি বের করতে সক্ষম হন। তবে হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা ও দক্ষ অপারেশন ব্যবস্থার অভাবে বাকিগুলো অপসারণ করতে তারা অক্ষমতা প্রকাশ করেন। তখন বাধ্য হয়ে ফাহিম আবার আলকেমী হাসপাতালে ফিরে যান, যেখানে তার শরীরের বাকি ছররা গুলি অপারেশনের মাধ্যমে বের করা হয়।
এই পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়াই ছিল এক দীর্ঘ যন্ত্রণা, মানসিক চাপ ও অবহেলার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ। একজন আন্দোলনকারী হিসেবে শুধু রাজপথেই নয়, হাসপাতালের কক্ষেও ফাহিম লড়াই করেছেন—প্রাণ, সম্মান ও মানবিক অধিকারের জন্য।
নাম : আকরামুল হক ফাহিম
জন্মতারিখ : ১৩-০৩-২০০২
জন্মস্থান : বাগান বাড়ি
পেশা : শিক্ষার্থী, রামদুর কলেজ, ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম : গুনক
ইউনিয়ন : বগাদানা
থানা : সোনাগাজী
জেলা : ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মাহবুবুল হক
পিতার পেশাঃ প্রবাসী, ৫৫
মায়ের নাম : আনোয়ারা বেগম, গৃহীনি, ৪৪
পরিবারের সদস্য সংখ্যাঃ ০৫
ঘটনার স্থান : মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে
আহত হওয়ার সময়কাল :০৪/০৮/২০২৪
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍