হোম / আহতদের তালিকা / ইয়াকুব নবী
ইয়াকুব নবী

ইয়াকুব নবী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ড্রাইভার

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
ইয়াকুব নবী একজন সাহসী, পরিশ্রমী এবং ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ, যিনি ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। শৈশবকাল থেকেই তাঁর চরিত্রে ছিল সাহস, দৃঢ়তা এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার অদম্য চেষ্টা। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও তিনি অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং সাহসের সঙ্গে গণমানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
ইয়াকুব নবীর জন্ম ১৯৯৬ সালের ৫ আগস্ট ফেনী জেলার আনন্দপুর গ্রামে। জন্মস্থান ফেনীর মাটিতেই তিনি বেড়ে ওঠেন এবং শিক্ষাজীবন ও কৈশোরকাল অতিবাহিত করেন। বর্তমানে তাঁর স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা একই, যা ফেনী জেলার অন্তর্গত। তাঁর গ্রামের নাম আনন্দপুর, ইউনিয়ন কালিরহাট, থানা ফুলগাজী এবং জেলা ফেনী। পারিবারিকভাবে তিনি একজন সৎ, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতার নাম ইয়াসিন ভূইয়া এবং মাতার নাম খোদেজা আক্তার। পিতামাতার আদর্শ, নৈতিক শিক্ষা এবং পারিবারিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই ইয়াকুব নবী জীবনের মূল্যবোধ শিখেছেন এবং আজও তা লালন করে চলেছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একজন ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত। কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন এবং পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়েছে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং সংগ্রামী চেতনা। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মমতা এবং সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
শৈশবকাল থেকেই তাঁর মাঝে ছিল অসাধারণ সাহস ও নেতৃত্বের গুণাবলি। তিনি সবসময় দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। বিদ্যালয়জীবন থেকেই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে শেখেন যে সমাজে বৈষম্য, স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা একান্ত জরুরি। এভাবেই তিনি ক্রমশ হয়ে ওঠেন এক প্রতিবাদী তরুণ, যিনি নিজের জীবনকে সমাজের মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
পেশাগত জীবনে ইয়াকুব নবী ছিলেন একজন ড্রাইভার। পরিশ্রমী ও কর্মঠ স্বভাবের কারণে তিনি জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। তাঁর পরিচিত সবাই তাঁকে একজন সাহসী, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে জানতেন। কিন্তু শুধু ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ থেকে তিনি থেমে যাননি; বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ন্যায় ও সমতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করাই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলন যখন নতুন মাত্রায় পৌঁছায় এবং ‘স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের এক দফা’ দাবিতে তীব্র হয়, তখন ইয়াকুব নবী রাজপথে নিজেকে সমর্পণ করেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগান তুলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং গণমানুষের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। তাঁর সাহসিকতা ও নেতৃত্ব ছাত্রসমাজের কাছে তাঁকে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু এই নির্ভীক অবস্থানই তাঁকে শাসকগোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীদের চোখে শত্রুতে পরিণত করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ফেনী সদর হাসপাতালের সামনে অবস্থানকালে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাঁকে টার্গেট করে। পরিকল্পিতভাবে তাঁকে একটি সিএনজি যোগে জোরপূর্বক অপহরণ করে হাজারী পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে তাঁর ওপর চালানো হয় ইতিহাসের এক নৃশংসতম সশস্ত্র হামলা। তাঁর কপালে তিনটি গুলি করা হয়, হাত ও কানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় এবং নির্মমভাবে হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়। তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এই ভয়াবহ হামলা শুধু ইয়াকুব নবীর ওপর আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল গোটা আন্দোলনের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও ইয়াকুব নবী তাঁর সাহসিকতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না। তিনি রক্ত দিয়ে আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও বেগবান করেছেন। তাঁর আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং আন্দোলনকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়।
আজ ইয়াকুব নবী শুধুমাত্র একজন তরুণের নাম নয়, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন সাধারণ ড্রাইভার হয়েও দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে, নিজের রক্ত ঢেলে তিনি স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। তাঁর জীবন কাহিনী নতুন প্রজন্মের কাছে সাহস, ন্যায়পরায়ণতা এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
চিকিৎসা
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলা ও ছাত্রলীগের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইয়াকুব নবীর শরীরের একাধিক স্থানে গুলি লাগে এবং তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ ও ব্যথার কারণে তিনি মুহূর্তেই অচেতন হয়ে যান। স্থানীয় লোকজন ও সহযোদ্ধারা জীবন ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে জরুরি বিভাগে তাঁকে ভর্তি করা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর আঘাতের মাত্রা ও শরীরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে আশঙ্কাজনক অবস্থা ঘোষণা করেন। রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তাঁকে ফেনী সদর হাসপাতালে রাখা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। গুলিবিদ্ধ স্থান থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি অপসারণ এবং ক্ষতস্থানে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর আঘাতের কারণে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
চট্টগ্রামে জরুরি চিকিৎসা শেষে কিছুটা স্থিতিশীল হলে তাঁকে পুনরায় ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানেও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চলতে থাকে। শারীরিকভাবে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন কপালে গুলির ক্ষত, হাত ও কানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং হাত-পা ভেঙে যাওয়ার কারণে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তীব্র যন্ত্রণা ও শারীরিক দুর্দশার মাঝেও তিনি দৃঢ় মনোবল নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যান।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলায় গুরুতরভাবে আহত হওয়ার পর ইয়াকুব নবীর জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। গুলিবিদ্ধ হওয়া ও শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তিনি আর আগের মতো পেশাগত কাজে ফিরতে সক্ষম হননি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাঁর ড্রাইভারের পেশা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ অবস্থায় তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পরিবার পরিচালনার স্বার্থে একটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান ছাড়া তাঁর জীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। তাই তাঁর সুস্থ জীবনধারণ ও আর্থিক স্বনির্ভরতার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন।

নাম : ইয়াকুব নবী
জন্মতারিখ : ০৫-০৮-১৯৯৬
জন্মস্থান : আনন্দপুর, ফেনী
পেশা : ড্রাইভার
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : ফেনী, গ্রাম: আনন্দপুর, ইউনিয়ন: কালিরহাট, থানা: ফুলগাজী, জেলা: ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : ইয়াসিন ভূইয়া
পিতার পেশা ও বয়স : বেকার, ৫৫
মায়ের নাম : খোদেজা আক্তার
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১৫,০০০ টাকা
ঘটনার স্থান : হাজারী পাড়া
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট, বেলা ১:৩০
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসী সুশেন, নিজাম হাজারী, বাবলু

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍