মো: মোশারফ হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। জনগণের মনে ছিল একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা, যেখানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং সমাজে ন্যায়ের জোরে শান্তি স্থাপন হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় একচ্ছত্র ক্ষমতার লোভ, দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন। এক এক করে সংবিধান ও আইনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
এই ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপ নেয় ভীতির রাজনীতিতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পায়, বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এবং অনৈতিক চাপ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা হয়। নির্বাচন হয়ে ওঠে একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো ভোটবিহীন ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের মনে হতাশা বাড়ে, কারণ তারা দেখল যে, আইন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার যন্ত্র তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসময় আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিতভাবে জনগণের ওপর এমন এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে, সাধারণ মানুষও প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাস্তাঘাট, জনসভা প্রতিটি স্থানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলাই বিপজ্জনক।
তবুও ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই দীর্ঘ নীরবতার শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। তরুণ শিক্ষার্থী, যুব সমাজ, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি ছিল চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু সেই লড়াই দ্রুত পরিণত হয় একটি বৃহৎ জনজাগরণের মধ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দমন-পীড়ন, অবিচার, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানত, তাদের পথে থাকবে গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, ভয় ও মিথ্যা মামলা। তবুও তারা দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল - স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে হলে ভয় ভেঙে নামতেই হবে। ২৪ এর জুলাই-আগস্টে বহু রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলন রূপ নিল এক ঐতিহাসিক জনআন্দোলনে। রাজপথে নেমে হাজারো তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই আন্দোলন শুধু চাকরির সুযোগের জন্য ছিল না; এটি ছিল দেশের ন্যায়ের জন্য, দেশের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি ক্ষত ও ক্ষয় আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত অঙ্গন তৈরি করেছে। এভাবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ে ওঠে কেবল এক সামাজিক দাবি নয়, বরং এটি রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়, যেখানে রক্ত, দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাহসের গল্প একত্রে লেখা হয়েছে। তরুণরা দেখিয়ে দেয়, যে ভয়কে ভেঙে নামলেই সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিচিতি
মো: মোশারফ হোসেন - একটি নাম, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে সংগ্রামী জীবনের স্বপ্ন ও তরুণ বয়সের নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস। ২০০৫ সালের ২১ আগস্ট ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার দক্ষিণ হরিপুর গ্রামে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এক সাধারণ পরিবারে, যেখানে সুখ-দুঃখের মিশেলে গড়ে উঠেছে পারিবারিক বন্ধন।
মোশারফ হোসেনের শিকড় জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের মাটির গন্ধে। তার বসবাস মোল্লাবাড়ি, দক্ষিণ হরিপুরে। চারপাশের সহজ-সরল মানুষ, গ্রামীণ পরিবেশের নির্মলতা এবং মমতার আবহ তাকে করে তুলেছে দৃঢ়চেতা ও সংবেদনশীল। তিনি পেশায় একজন শিক্ষার্থী; পড়াশোনার পাশাপাশি তার হৃদয়ে লালিত স্বপ্ন একদিন নিজের পরিবারকে আরও নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া।
তার পরিবারে রয়েছে পাঁচজন সদস্য। পিতা মো. ইকবাল হোসেন; যিনি প্রবাসে ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তুলছেন পরিবারের স্বপ্নের ভিত। বয়স মাত্র ৪২, অথচ জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে বুকে নিয়ে তিনি প্রবাসজীবনে লড়াই করছেন প্রতিনিয়ত। মা হাছিনা বেগম, বয়স ৩৫, একজন গৃহিণী। ভাইবোনদের মধ্যে বড় ভাই মেহরাব হোসেন (২৫) পরিবারের সহায়ক। ছোট বোন সানজিদা আক্তার (১১) এখনও স্কুলে পড়ে, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবার মূলত নির্ভরশীল পিতার প্রবাসের কঠোর পরিশ্রমের উপর। প্রবাসীর কষ্টের ঘামে গড়ে ওঠা এই সামান্য উপার্জনেই চলে পাঁচজনের জীবনযাত্রা, চলতে থাকে মোশারফের পড়াশোনা।
মহিপালের রাজপথে যোহরের সালাত
২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট। ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার তখন উত্তাল জনসমুদ্র। সেদিন আন্দোলনরত জনতার মাঝেই ছিলেন মোশারফ হোসেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ছিল রাজপথ। সকাল গড়িয়ে দুপুর এলো। যোহরের নামাজের সময় হলে, মোশারফ হোসেন রাস্তার মাঝেই অনেকের সাথে নামাজ আদায় করেন।
হায়েনারূপী আওয়ামী বাহিনী
দুপুর গড়াতেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশে বিক্ষোভকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যোহরের নামাজ শেষ হওয়ার মাত্র বিশ-পঁচিশ মিনিট পরেই হঠাৎ নেমে আসে আগ্রাসনের ঝড়। ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী ছুটে আসে, শুরু হয় টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ। শান্তিপূর্ণ স্লোগান মুহূর্তেই ডুবে যায় গুলির শব্দে, লাঠির আঘাতে, আর মানুষের আর্তনাদে। মুহূর্তেই চারদিক অস্থির হয়ে যায়। ঘাতকদের ছোড়া সেই রাবার বুলেটের আঘাতে মোশারফ হোসেনের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারাত্নক জখম।
প্রাথমিক চিকিৎসা
সেই মুহূর্তে তাঁর সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসে। কেউ তাঁকে ধরে রাখে, কেউ দ্রুত টেনে নিয়ে যায় নিরাপদে। প্রথমে তাঁকে ফেনী পাঁছগাছিয়া রোডের মাথায় একটি ফার্মেসিতে নেওয়া হয় এবং সেখানে সাময়িক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে বন্ধুর বাড়িতে কিছুক্ষণ আশ্রয় নেওয়ার পর তাঁকে ছাগলনাইয়া সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
সুস্থ হওয়ার লড়াই
তার দেহে থাকা গুলি বের করা হয়েছে হাসপাতালে। তবে দীর্ঘদিন তাকে ঔষধ খেয়ে যেতে হয়। ক্ষতস্থানের যন্ত্রণা, শরীরে রয়ে যাওয়া গুলির গভীর দাগ আর মানসিক আঘাত তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। হয়তো তার শরীরের এ গুলির দাগ মুছে যাবে একদিন, তবে মনের গভীরে রয়ে যাবে খুনী-স্বৈরাচারের প্রতি তীব্র ঘৃণা। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত দুঃসহ অভিজ্ঞতা নয়; বরং পুরো প্রজন্মের ত্যাগ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
বর্তমানে তিনি সুস্থ রয়েছেন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তিনি একজন শিক্ষার্থী। পড়ালেখা শেষে তার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
নাম : মো: মোশারফ হোসেন
জন্ম তারিখ : ২১-০৮-২০০৫
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ হারিপুর, ইউনিয়ন: ৬ নং পাঠান নগর, থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মোল্লাবাড়ি-দক্ষিণ হরিপুর, ডাকঘর: হরিপুর বাজার, ইউনিয়ন: ৬ নং পাঠান নগর,
থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: ইকবাল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : প্রবাসী, ৪২
মায়ের নাম : হাছিনা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ৩০,০০০
আয়ের উৎস : পিতার প্রবাসে কাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ
১. সানজিদা আক্তার, বয়স- ১১, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি-৫ম, সম্পর্ক- বোন
২. মেহরাব হোসেন, বয়স- ২৫, সম্পর্ক- ভাই
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪ আগস্ট ২০২৪ , দুপুর ২ টা
আঘাতের ধরণ: শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রাবার বুলেট লাগে
চিকিৎসা: গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে সুস্থ
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। জনগণের মনে ছিল একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা, যেখানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং সমাজে ন্যায়ের জোরে শান্তি স্থাপন হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় একচ্ছত্র ক্ষমতার লোভ, দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন। এক এক করে সংবিধান ও আইনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
এই ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপ নেয় ভীতির রাজনীতিতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পায়, বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এবং অনৈতিক চাপ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা হয়। নির্বাচন হয়ে ওঠে একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো ভোটবিহীন ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের মনে হতাশা বাড়ে, কারণ তারা দেখল যে, আইন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার যন্ত্র তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসময় আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিতভাবে জনগণের ওপর এমন এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে, সাধারণ মানুষও প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাস্তাঘাট, জনসভা প্রতিটি স্থানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলাই বিপজ্জনক।
তবুও ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই দীর্ঘ নীরবতার শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। তরুণ শিক্ষার্থী, যুব সমাজ, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি ছিল চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু সেই লড়াই দ্রুত পরিণত হয় একটি বৃহৎ জনজাগরণের মধ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দমন-পীড়ন, অবিচার, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানত, তাদের পথে থাকবে গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, ভয় ও মিথ্যা মামলা। তবুও তারা দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল - স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে হলে ভয় ভেঙে নামতেই হবে। ২৪ এর জুলাই-আগস্টে বহু রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলন রূপ নিল এক ঐতিহাসিক জনআন্দোলনে। রাজপথে নেমে হাজারো তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই আন্দোলন শুধু চাকরির সুযোগের জন্য ছিল না; এটি ছিল দেশের ন্যায়ের জন্য, দেশের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি ক্ষত ও ক্ষয় আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত অঙ্গন তৈরি করেছে। এভাবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ে ওঠে কেবল এক সামাজিক দাবি নয়, বরং এটি রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়, যেখানে রক্ত, দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাহসের গল্প একত্রে লেখা হয়েছে। তরুণরা দেখিয়ে দেয়, যে ভয়কে ভেঙে নামলেই সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিচিতি
মো: মোশারফ হোসেন - একটি নাম, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে সংগ্রামী জীবনের স্বপ্ন ও তরুণ বয়সের নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস। ২০০৫ সালের ২১ আগস্ট ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার দক্ষিণ হরিপুর গ্রামে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এক সাধারণ পরিবারে, যেখানে সুখ-দুঃখের মিশেলে গড়ে উঠেছে পারিবারিক বন্ধন।
মোশারফ হোসেনের শিকড় জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের মাটির গন্ধে। তার বসবাস মোল্লাবাড়ি, দক্ষিণ হরিপুরে। চারপাশের সহজ-সরল মানুষ, গ্রামীণ পরিবেশের নির্মলতা এবং মমতার আবহ তাকে করে তুলেছে দৃঢ়চেতা ও সংবেদনশীল। তিনি পেশায় একজন শিক্ষার্থী; পড়াশোনার পাশাপাশি তার হৃদয়ে লালিত স্বপ্ন একদিন নিজের পরিবারকে আরও নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া।
তার পরিবারে রয়েছে পাঁচজন সদস্য। পিতা মো. ইকবাল হোসেন; যিনি প্রবাসে ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তুলছেন পরিবারের স্বপ্নের ভিত। বয়স মাত্র ৪২, অথচ জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে বুকে নিয়ে তিনি প্রবাসজীবনে লড়াই করছেন প্রতিনিয়ত। মা হাছিনা বেগম, বয়স ৩৫, একজন গৃহিণী। ভাইবোনদের মধ্যে বড় ভাই মেহরাব হোসেন (২৫) পরিবারের সহায়ক। ছোট বোন সানজিদা আক্তার (১১) এখনও স্কুলে পড়ে, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবার মূলত নির্ভরশীল পিতার প্রবাসের কঠোর পরিশ্রমের উপর। প্রবাসীর কষ্টের ঘামে গড়ে ওঠা এই সামান্য উপার্জনেই চলে পাঁচজনের জীবনযাত্রা, চলতে থাকে মোশারফের পড়াশোনা।
মহিপালের রাজপথে যোহরের সালাত
২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট। ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার তখন উত্তাল জনসমুদ্র। সেদিন আন্দোলনরত জনতার মাঝেই ছিলেন মোশারফ হোসেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ছিল রাজপথ। সকাল গড়িয়ে দুপুর এলো। যোহরের নামাজের সময় হলে, মোশারফ হোসেন রাস্তার মাঝেই অনেকের সাথে নামাজ আদায় করেন।
হায়েনারূপী আওয়ামী বাহিনী
দুপুর গড়াতেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশে বিক্ষোভকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যোহরের নামাজ শেষ হওয়ার মাত্র বিশ-পঁচিশ মিনিট পরেই হঠাৎ নেমে আসে আগ্রাসনের ঝড়। ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী ছুটে আসে, শুরু হয় টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ। শান্তিপূর্ণ স্লোগান মুহূর্তেই ডুবে যায় গুলির শব্দে, লাঠির আঘাতে, আর মানুষের আর্তনাদে। মুহূর্তেই চারদিক অস্থির হয়ে যায়। ঘাতকদের ছোড়া সেই রাবার বুলেটের আঘাতে মোশারফ হোসেনের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারাত্নক জখম।
প্রাথমিক চিকিৎসা
সেই মুহূর্তে তাঁর সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসে। কেউ তাঁকে ধরে রাখে, কেউ দ্রুত টেনে নিয়ে যায় নিরাপদে। প্রথমে তাঁকে ফেনী পাঁছগাছিয়া রোডের মাথায় একটি ফার্মেসিতে নেওয়া হয় এবং সেখানে সাময়িক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে বন্ধুর বাড়িতে কিছুক্ষণ আশ্রয় নেওয়ার পর তাঁকে ছাগলনাইয়া সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
সুস্থ হওয়ার লড়াই
তার দেহে থাকা গুলি বের করা হয়েছে হাসপাতালে। তবে দীর্ঘদিন তাকে ঔষধ খেয়ে যেতে হয়। ক্ষতস্থানের যন্ত্রণা, শরীরে রয়ে যাওয়া গুলির গভীর দাগ আর মানসিক আঘাত তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। হয়তো তার শরীরের এ গুলির দাগ মুছে যাবে একদিন, তবে মনের গভীরে রয়ে যাবে খুনী-স্বৈরাচারের প্রতি তীব্র ঘৃণা। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত দুঃসহ অভিজ্ঞতা নয়; বরং পুরো প্রজন্মের ত্যাগ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
বর্তমানে তিনি সুস্থ রয়েছেন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তিনি একজন শিক্ষার্থী। পড়ালেখা শেষে তার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
নাম : মো: মোশারফ হোসেন
জন্ম তারিখ : ২১-০৮-২০০৫
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ হারিপুর, ইউনিয়ন: ৬ নং পাঠান নগর, থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মোল্লাবাড়ি-দক্ষিণ হরিপুর, ডাকঘর: হরিপুর বাজার, ইউনিয়ন: ৬ নং পাঠান নগর,
থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: ইকবাল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : প্রবাসী, ৪২
মায়ের নাম : হাছিনা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ৩০,০০০
আয়ের উৎস : পিতার প্রবাসে কাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ
১. সানজিদা আক্তার, বয়স- ১১, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি-৫ম, সম্পর্ক- বোন
২. মেহরাব হোসেন, বয়স- ২৫, সম্পর্ক- ভাই
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪ আগস্ট ২০২৪ , দুপুর ২ টা
আঘাতের ধরণ: শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রাবার বুলেট লাগে
চিকিৎসা: গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে সুস্থ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍