মো. শামীম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : বেকার
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্মপরিচয়
মো. শামীম, জন্ম ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ফেনী জেলার মাটিতে। তাঁর জন্ম যেন এক সাধারণ পরিবারের কোলাহলময় দিনের মাঝেই ঘটে, কিন্তু এই সাধারণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ভিন্নতর কাহিনি। ছোট্টবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন ফেনীর বনানী পাড়ার প্রকৃতির স্নিগ্ধতায়। কাশবন, পাখির ডাক আর মাটির ঘ্রাণে মিশে থাকা এই শৈশব তাঁকে দিয়েছে সহজ-সরল জীবনের রসদ। বর্তমানে তিনি ফেনী সদর থানার হাজী মোহাম্মদ বাড়িতে বসবাস করলেও তাঁর শেকড় এখনো প্রোথিত রয়েছে জন্মগ্রামের মাটিতে।
তাঁর পিতা মো: আলমগীর, পেশায় একজন ড্রাইভার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম আর ঘামে ভিজে যাওয়া জীবনই তাঁর অস্তিত্বের পরিচয়। পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবিরাম সংগ্রামই ছিল তাঁর নিয়তি। পরিশ্রমী এই মানুষটির কাছে শামীম শিখেছেন, সততাই মানুষকে মহৎ করে তোলে, আর শ্রমই জীবনের আসল সম্পদ।
কিন্তু শামীমের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর মা শাহেনা আক্তার। তিনি কেবল গৃহিণী নন, ছিলেন সমাজে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। অন্যের দুর্দশা দেখলে চুপ করে থাকতে পারতেন না, নিজের পরিবারে কিংবা সমাজে যখনই অনিয়ম দেখেছেন, তিনি সাহস করে তার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদের ভাষা। এই দৃঢ়চেতা নারী শামীমের কাছে ছিলেন আলোর প্রদীপ, যিনি তাঁকে শিখিয়েছেন সত্যের পথে চলতে, প্রতিকূলতার মুখেও ভয় না পেতে, অন্যায়কে না বলতে। মায়ের সেই প্রতিবাদী মনোভাব আজও শামীমের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে দিকনির্দেশনা দেয়।
বর্তমানে শামীম কর্মহীন, জীবনের পথে তিনি এখনো নিজের জন্য স্থায়ী অবস্থান খুঁজে পাননি। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর চোখে আছে স্বপ্ন—পরিবারকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজের জীবনকে সমাজের জন্য মূল্যবান করে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষ তার নিজের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পায়। আর তাঁর জন্য সেই সংগ্রামের পাঠ এসেছে বাবার কঠোর পরিশ্রম থেকে আর মায়ের অবিচল প্রতিবাদী মনোভাব থেকে।
শামীমের জীবনকাহিনি কেবল একজন যুবকের ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি আসলে এক সাধারণ পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। একদিকে পিতার শ্রম, অন্যদিকে মায়ের প্রতিবাদী শক্তি—এই দুই মেরুর সমন্বয়ে তিনি শিখেছেন জীবনের আসল শিক্ষা। দুঃখ-কষ্ট থাকলেও তিনি জানেন, এ জীবন কখনো ব্যর্থ হতে পারে না, যদি সত্য ও সততার পথে অটল থাকা যায়। তাই তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, প্রতিকূলতার অন্ধকার ভেদ করে একদিন তিনি নিজের জন্য আলোর পথ তৈরি করবেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ:
২০২৪ সালের আগস্ট মাস, স্বৈরাচারী হাসিনার একদফা পতনের আন্দোলনে সমগ্র দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের অবিচার, স্বেচ্ছাচারিতা ও জনগণের অধিকার হরণের প্রতিবাদে যখন রাস্তাঘাট ভরে উঠেছিল স্বাধীনতার দাবিতে, আমি তখন সেই আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম। আমাদের হাতে ছিল শুধু দেশপ্রেম আর গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা, অথচ শাসকগোষ্ঠীর হাতে ছিল রক্তঝরা অস্ত্র।
৪ আগস্ট দুপুর প্রায় ২টার দিকে আমরা মহিপালে অবস্থান করছিলাম। সেদিনের বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা—চারদিক থেকে মানুষের স্লোগান ভেসে আসছিল, “এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচারীর পতন চাই।” ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাংক রোডের দিক থেকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী পুলিশের সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, আর মুখে ছিল ভয়ঙ্কর হিংস্রতার হাসি। তারা হঠাৎ করেই নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মিছিলটি রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়।
আমিও তখন মিছিলের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বুকভরা সাহস নিয়ে। গুলি বর্ষণের সেই ভয়াবহ মুহূর্তে আমি পিছু হটিনি। চোখের সামনে সাথীদের পড়ে যেতে দেখেছি, তবুও শ্লোগানের শক্তি আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। হঠাৎ এক ঝলকেই অনুভব করলাম অগ্নিশিখার মতো ব্যথা আমার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে—সন্ত্রাসী বাহিনীর ছোড়া গুলি থেকে ছিটকে আসা ১৭টি স্প্লিন্টার গুলি আমার শরীরে বিঁধে যায়। রক্তে ভিজে যায় জামাকাপড়, চারপাশ যেন লাল হয়ে ওঠে।
তবুও আমি জানি, এই রক্ত বৃথা যাবে না। কারণ এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত ক্ষত নয়, এটি জনগণের আন্দোলনের ক্ষত, যা একদিন নতুন সূর্যের আলোকে জন্ম দেবে। আমার দেহে বিঁধে থাকা প্রতিটি স্প্লিন্টারই যেন স্বাধীনতার অঙ্গীকার বহন করছে, যেন বলছে—স্বৈরাচারের অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী নয়।
আজও সেই দিনের কথা মনে হলে বুক কেঁপে ওঠে, তবে ভয়ের জন্য নয়—গর্বের জন্য। আমি বিশ্বাস করি, আমার রক্তের ফোঁটা আন্দোলনের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে, আর একদিন এই আত্মত্যাগই বয়ে আনবে স্বৈরাচারের অবসান ও গণমানুষের মুক্তি।
চিকিৎসা:
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমি যখন রক্তাক্ত শরীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, তখন চারপাশে সৃষ্টি হয় এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক। কিন্তু সেই ভয়ের মাঝেও স্থানীয় মানুষ আমাকে এক মুহূর্ত দেরি না করে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁদের সহানুভূতি আর সাহসিকতাই আমার জীবনের প্রথম রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। দ্রুত আমাকে তুলে নেওয়া হয় ফেনীর লালপোলের একটি সাধারণ ডাক্তারখানায়। সেখানে চিকিৎসকদের সামান্য যন্ত্রপাতি ও সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তারা জীবন বাঁচানোর প্রয়াসে অস্ত্রোপচার করেন। ব্যথার যন্ত্রণা উপেক্ষা করে তারা আমার শরীর থেকে গুলি বের করার চেষ্টা চালান, আর সেই মুহূর্তে প্রতিটি শ্বাস যেন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিল।
কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমাকে পরবর্তীতে ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমরা ভেবেছিলাম সেখানে হয়তো আধুনিক চিকিৎসার ছোঁয়া পাবো, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে আমাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলো না। আহত শরীর নিয়ে হাসপাতালের করিডরে বসে থাকতে হলো, অথচ ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল নিরন্তর। তখন আমার মনে হচ্ছিল, এই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু একজন রোগীর নয়, পুরো জাতির জন্যই এক নির্মম ব্যথার কারণ।
অবশেষে সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করি—আমার জীবন রক্ষার জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন অপরিহার্য। স্থানীয়দের মানবিক সহযোগিতা আর সীমিত চিকিৎসা আমাকে সাময়িকভাবে বাঁচালেও, প্রকৃত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য আরও বড় ও উন্নত হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার গায়ে বিঁধে থাকা প্রতিটি গুলি শুধু শারীরিক ক্ষত নয়, বরং এক নির্মম সত্যের সাক্ষী—এই দেশের মানুষ এখনো ন্যায্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
আমি বর্তমানে আমার পড়াশোনা শেষ করার পর বেকার জীবনযাপন করছি। তবে আমার মন এখনো জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে চায়, আমি আবারও পড়াশোনায় ফিরে যেতে চাই। আর্থিক সংকটের কারণে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও, যদি আমি একটি স্কলারশিপের সুযোগ পাই তবে পুনরায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং সমাজ ও দেশের কল্যাণের জন্যও অপরিহার্য। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, আমাকে একটি স্কলারশিপ প্রদানের মাধ্যমে আবারও পড়াশোনা শুরু করার সুযোগ করে দিন, যাতে আমি নিজের যোগ্যতাকে বিকশিত করে সমাজের জন্য কার্যকর অবদান রাখতে পারি।
নাম : মো: শামীম
জন্মতারিখ : ১-২-২০০২
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : বেকার
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : বনানী পাড়া, ইউনিয়ন : ফেনী, থানা : ফেনী, জেলা : ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম :হাজী মোহাম্মদ বাড়ি, এলাকা:বনানী পাড়া, থানা: ফেনী সদর, জেলা : ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আলমগীর
পিতার পেশা : ড্রাইভার
মায়ের নাম : শাহেনা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১২০০০ টাকা
ভাইয়ের নাম : শাহ আলম
ঘটনার স্থান : ফেনী মহিপাল
আক্রমণকারী : সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪ ,বেলা ২টা
মো. শামীম, জন্ম ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ফেনী জেলার মাটিতে। তাঁর জন্ম যেন এক সাধারণ পরিবারের কোলাহলময় দিনের মাঝেই ঘটে, কিন্তু এই সাধারণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ভিন্নতর কাহিনি। ছোট্টবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন ফেনীর বনানী পাড়ার প্রকৃতির স্নিগ্ধতায়। কাশবন, পাখির ডাক আর মাটির ঘ্রাণে মিশে থাকা এই শৈশব তাঁকে দিয়েছে সহজ-সরল জীবনের রসদ। বর্তমানে তিনি ফেনী সদর থানার হাজী মোহাম্মদ বাড়িতে বসবাস করলেও তাঁর শেকড় এখনো প্রোথিত রয়েছে জন্মগ্রামের মাটিতে।
তাঁর পিতা মো: আলমগীর, পেশায় একজন ড্রাইভার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম আর ঘামে ভিজে যাওয়া জীবনই তাঁর অস্তিত্বের পরিচয়। পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবিরাম সংগ্রামই ছিল তাঁর নিয়তি। পরিশ্রমী এই মানুষটির কাছে শামীম শিখেছেন, সততাই মানুষকে মহৎ করে তোলে, আর শ্রমই জীবনের আসল সম্পদ।
কিন্তু শামীমের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর মা শাহেনা আক্তার। তিনি কেবল গৃহিণী নন, ছিলেন সমাজে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। অন্যের দুর্দশা দেখলে চুপ করে থাকতে পারতেন না, নিজের পরিবারে কিংবা সমাজে যখনই অনিয়ম দেখেছেন, তিনি সাহস করে তার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদের ভাষা। এই দৃঢ়চেতা নারী শামীমের কাছে ছিলেন আলোর প্রদীপ, যিনি তাঁকে শিখিয়েছেন সত্যের পথে চলতে, প্রতিকূলতার মুখেও ভয় না পেতে, অন্যায়কে না বলতে। মায়ের সেই প্রতিবাদী মনোভাব আজও শামীমের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে দিকনির্দেশনা দেয়।
বর্তমানে শামীম কর্মহীন, জীবনের পথে তিনি এখনো নিজের জন্য স্থায়ী অবস্থান খুঁজে পাননি। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর চোখে আছে স্বপ্ন—পরিবারকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজের জীবনকে সমাজের জন্য মূল্যবান করে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষ তার নিজের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পায়। আর তাঁর জন্য সেই সংগ্রামের পাঠ এসেছে বাবার কঠোর পরিশ্রম থেকে আর মায়ের অবিচল প্রতিবাদী মনোভাব থেকে।
শামীমের জীবনকাহিনি কেবল একজন যুবকের ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি আসলে এক সাধারণ পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। একদিকে পিতার শ্রম, অন্যদিকে মায়ের প্রতিবাদী শক্তি—এই দুই মেরুর সমন্বয়ে তিনি শিখেছেন জীবনের আসল শিক্ষা। দুঃখ-কষ্ট থাকলেও তিনি জানেন, এ জীবন কখনো ব্যর্থ হতে পারে না, যদি সত্য ও সততার পথে অটল থাকা যায়। তাই তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, প্রতিকূলতার অন্ধকার ভেদ করে একদিন তিনি নিজের জন্য আলোর পথ তৈরি করবেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ:
২০২৪ সালের আগস্ট মাস, স্বৈরাচারী হাসিনার একদফা পতনের আন্দোলনে সমগ্র দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের অবিচার, স্বেচ্ছাচারিতা ও জনগণের অধিকার হরণের প্রতিবাদে যখন রাস্তাঘাট ভরে উঠেছিল স্বাধীনতার দাবিতে, আমি তখন সেই আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম। আমাদের হাতে ছিল শুধু দেশপ্রেম আর গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা, অথচ শাসকগোষ্ঠীর হাতে ছিল রক্তঝরা অস্ত্র।
৪ আগস্ট দুপুর প্রায় ২টার দিকে আমরা মহিপালে অবস্থান করছিলাম। সেদিনের বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা—চারদিক থেকে মানুষের স্লোগান ভেসে আসছিল, “এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচারীর পতন চাই।” ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাংক রোডের দিক থেকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী পুলিশের সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, আর মুখে ছিল ভয়ঙ্কর হিংস্রতার হাসি। তারা হঠাৎ করেই নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মিছিলটি রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়।
আমিও তখন মিছিলের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বুকভরা সাহস নিয়ে। গুলি বর্ষণের সেই ভয়াবহ মুহূর্তে আমি পিছু হটিনি। চোখের সামনে সাথীদের পড়ে যেতে দেখেছি, তবুও শ্লোগানের শক্তি আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। হঠাৎ এক ঝলকেই অনুভব করলাম অগ্নিশিখার মতো ব্যথা আমার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে—সন্ত্রাসী বাহিনীর ছোড়া গুলি থেকে ছিটকে আসা ১৭টি স্প্লিন্টার গুলি আমার শরীরে বিঁধে যায়। রক্তে ভিজে যায় জামাকাপড়, চারপাশ যেন লাল হয়ে ওঠে।
তবুও আমি জানি, এই রক্ত বৃথা যাবে না। কারণ এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত ক্ষত নয়, এটি জনগণের আন্দোলনের ক্ষত, যা একদিন নতুন সূর্যের আলোকে জন্ম দেবে। আমার দেহে বিঁধে থাকা প্রতিটি স্প্লিন্টারই যেন স্বাধীনতার অঙ্গীকার বহন করছে, যেন বলছে—স্বৈরাচারের অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী নয়।
আজও সেই দিনের কথা মনে হলে বুক কেঁপে ওঠে, তবে ভয়ের জন্য নয়—গর্বের জন্য। আমি বিশ্বাস করি, আমার রক্তের ফোঁটা আন্দোলনের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে, আর একদিন এই আত্মত্যাগই বয়ে আনবে স্বৈরাচারের অবসান ও গণমানুষের মুক্তি।
চিকিৎসা:
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমি যখন রক্তাক্ত শরীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, তখন চারপাশে সৃষ্টি হয় এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক। কিন্তু সেই ভয়ের মাঝেও স্থানীয় মানুষ আমাকে এক মুহূর্ত দেরি না করে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁদের সহানুভূতি আর সাহসিকতাই আমার জীবনের প্রথম রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। দ্রুত আমাকে তুলে নেওয়া হয় ফেনীর লালপোলের একটি সাধারণ ডাক্তারখানায়। সেখানে চিকিৎসকদের সামান্য যন্ত্রপাতি ও সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তারা জীবন বাঁচানোর প্রয়াসে অস্ত্রোপচার করেন। ব্যথার যন্ত্রণা উপেক্ষা করে তারা আমার শরীর থেকে গুলি বের করার চেষ্টা চালান, আর সেই মুহূর্তে প্রতিটি শ্বাস যেন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিল।
কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমাকে পরবর্তীতে ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমরা ভেবেছিলাম সেখানে হয়তো আধুনিক চিকিৎসার ছোঁয়া পাবো, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে আমাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলো না। আহত শরীর নিয়ে হাসপাতালের করিডরে বসে থাকতে হলো, অথচ ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল নিরন্তর। তখন আমার মনে হচ্ছিল, এই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু একজন রোগীর নয়, পুরো জাতির জন্যই এক নির্মম ব্যথার কারণ।
অবশেষে সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করি—আমার জীবন রক্ষার জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন অপরিহার্য। স্থানীয়দের মানবিক সহযোগিতা আর সীমিত চিকিৎসা আমাকে সাময়িকভাবে বাঁচালেও, প্রকৃত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য আরও বড় ও উন্নত হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার গায়ে বিঁধে থাকা প্রতিটি গুলি শুধু শারীরিক ক্ষত নয়, বরং এক নির্মম সত্যের সাক্ষী—এই দেশের মানুষ এখনো ন্যায্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
আমি বর্তমানে আমার পড়াশোনা শেষ করার পর বেকার জীবনযাপন করছি। তবে আমার মন এখনো জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে চায়, আমি আবারও পড়াশোনায় ফিরে যেতে চাই। আর্থিক সংকটের কারণে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও, যদি আমি একটি স্কলারশিপের সুযোগ পাই তবে পুনরায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং সমাজ ও দেশের কল্যাণের জন্যও অপরিহার্য। তাই বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, আমাকে একটি স্কলারশিপ প্রদানের মাধ্যমে আবারও পড়াশোনা শুরু করার সুযোগ করে দিন, যাতে আমি নিজের যোগ্যতাকে বিকশিত করে সমাজের জন্য কার্যকর অবদান রাখতে পারি।
নাম : মো: শামীম
জন্মতারিখ : ১-২-২০০২
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : বেকার
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : বনানী পাড়া, ইউনিয়ন : ফেনী, থানা : ফেনী, জেলা : ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম :হাজী মোহাম্মদ বাড়ি, এলাকা:বনানী পাড়া, থানা: ফেনী সদর, জেলা : ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আলমগীর
পিতার পেশা : ড্রাইভার
মায়ের নাম : শাহেনা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১২০০০ টাকা
ভাইয়ের নাম : শাহ আলম
ঘটনার স্থান : ফেনী মহিপাল
আক্রমণকারী : সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪ ,বেলা ২টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍