হোম / আহতদের তালিকা / মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ মাসুম
মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ মাসুম

মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ মাসুম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পটভূমি
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল ছিল এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের ইতিহাস। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত এই শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপর চালানো হয় গুম, খুন, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার ধারাবাহিক হামলা। সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এমনকি সাধারণ জনগণও পরিণত হয় নজরদারির শিকার।এই ভয়ের রাজনীতি ধীরে ধীরে দেশকে পরিণত করে একটি নতজানু করদরাজ্যে, যেখানে জনগণ আর রাষ্ট্রের মালিক নয় বরং একটি দমনযন্ত্রের নিঃশব্দ ভুক্তভোগী মাত্র। মানুষ তখন কথা বলা ভুলে যায়,প্রতিবাদ করা শিখে নেয় চাপা কান্নার ভিতর দিয়ে।

জুলাই বিপ্লবের সৈনিক: খালেদ সাইফুল্লাহ
খালেদ সাইফুল্লাহ একজন সংগ্রামী ও বিপ্লবী তরুণ,সাহসী কর্মী এবং সচেতন ছাত্রসেনা,যিনি জুলাই বিপ্লবের এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি।তিনি ২০০৬ সালের ১০ই নভেম্বর ফেনী জেলার পরশুরাম থানাধীন ৩নং চিথলিয়া ইউনিয়ন-এর ছোট্ট একটি গ্রাম পশ্চিম অলকা-য় জন্মগ্রহণ করেন।শৈশবের দুরন্ত ও চঞ্চল প্রকৃতির খালেদ আজ এক বৈপ্লবীক ইতিহাসের সাক্ষী।
খালেদের বাবা মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক(৪৫) একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংসার পরিচালনা করছেন,স্বপ্ন দেখছেন সন্তানরা মানুষের মতো মানুষ হবে। তাঁর মা আছিয়া সুলতানা(৩৯) একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও অসাধারণ একজন মা-যিনি সীমাহীন ভালোবাসা,মমতা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিজের সন্তানদের বড় করে তুলেছেন নানা প্রতিকূলতা,অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।খালেদ বর্তমানে ফেনী সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের একজন ছাত্র।
শুধু ছাত্র নয়,খালেদ একজন আন্দোলনকামী তরুণ,যিনি সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন।জুলাই বিপ্লবে তাঁর সাহসিক অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অনুকরণীয় প্রতীকে পরিণত করেছে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
খালেদ সাইফুল্লাহ-র জবনিতে-
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল শুরু থেকেই। প্রতিদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে মনে হতো আমরা ন্যায়ের জন্য লড়ছি, দেশের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছি। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৪ঠা আগস্ট ২০২৪ তারিখে খুনি হাসিনা পতনের আন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে অংশ নিই।
সেদিন ভোর থেকেই আমরা রাজপথে সমবেত হই। সকাল থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত অবিরাম স্লোগান, মিছিল আর কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের উত্তাপ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজপথ কাঁপছিল আমাদের কণ্ঠে, অথচ বুকের ভেতরেও ছিল এক অদম্য প্রত্যয়। দুপুরে কিছুটা বিরতি নিয়ে আমরা যোহরের নামাজ আদায় করতে যাই।
কিন্তু নামাজ শেষ করে যখন আবার মিছিলে যোগ দিলাম, তখন পরিস্থিতি পাল্টে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খবর পাই জিয়া উদ্দিন বাবলু ও স্বপন মিঞাঁজির নেতৃত্বে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের একটি বিশাল অস্ত্রধারী বাহিনী আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা তাণ্ডব শুরু করে। প্রথমে ট্রিয়ারশেল, এরপর ছোঁড়া গুলি, আর তারপর একের পর এক বুলেট বর্ষণ। রাজপথ মুহূর্তেই রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রায় ২টা ৩০ মিনিটের সময় হঠাৎ দেখি আমার মাথায়, হাতে ও পায়ে গুলি বিদ্ধ হলো। শরীর অবশ হয়ে গেল, তীব্র যন্ত্রণায় আমি মাটিতে পড়ে যাই। চারদিকে ধোঁয়া, গুলির শব্দ আর মানুষের আতঙ্কিত আর্তনাদ। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি শেষ হয়ে গেল সবকিছু।
তবে সহযোদ্ধারা সাহস হারায়নি। জীবন বাজি রেখে তারা আমাকে দ্রুত এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানেই রক্ত থামানোর জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, আমার হাত-পা ড্রেসিং করা হয়। যদিও শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, তবুও মনে হচ্ছিল আমি কেবল একজন আহত নই আমি এক আন্দোলনের সৈনিক, যে রক্ত দিয়ে তার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি।
সেদিনের সেই ভয়াবহ বিকেল আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তবুও আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই আত্মত্যাগ একদিন বৃথা যাবে না, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে আমরা ন্যায়ের জন্যই লড়েছিলাম।
ঘটনার স্থান এবং এলাকা
মহিপাল, ফেনী
আক্রমণকারী ও আঘাতকারীর সুনির্দিষ্ট নাম
আওয়ামী সন্ত্রাসী-জিয়া উদ্দীন বাবলু ও তার পালিত ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময়কাল
৪ আগস্ট,২০২৪ বেলা ২.৩০ মিনিটের দিকে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
৪ঠা আগস্ট ২০২৪ তারিখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর আমাকে দ্রুত একজন পরিচিত ডাক্তারের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছেই তিনি আমার ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং হাত-পায়ের ড্রেসিং করে দেন। একই সঙ্গে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন এবং নিয়মিত সেগুলো খেতে পরামর্শ দেন।
প্রথম দিকে শারীরিক অবস্থা অস্বাভাবিক থাকলেও জীবনহানির মতো পরিস্থিতি ছিল না। তবে মাথা, হাত ও পায়ের ক্ষত এবং শরীরজুড়ে যন্ত্রণা আমাকে অস্বস্তিতে রাখছিল। তাই পরবর্তীতে আন-অফিশিয়ালি আরও কয়েকবার (প্রায় তিন-চারবার) বিভিন্ন ডাক্তারকে দেখাই। তারা ক্ষতস্থানের দিকে নজর দেন, ওষুধ পরিবর্তন করেন, তবে বড় কোনো চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
সময়ের সঙ্গে ক্ষত কিছুটা শুকালেও শরীরের ভেতরের ব্যথা ও অস্বস্তি থেকে যায়। ১ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে এক পর্যায়ে ডাক্তাররা আমাকে এক্স-রে করার পরামর্শ দেন। কিন্তু মাথায় কাচের টুকরা থাকার কারণে এক্স-রে রিপোর্টে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যায়নি। ফলে সমস্যার সঠিক অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
এরপরও কিছুদিন ধরে আমি অস্বস্তি নিয়ে চলাফেরা করি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমি সিভিল সার্জন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে আমাকে আরও সুসংগঠিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ সময় তারা আমার পুরনো ক্ষত, মাথার সমস্যার দিকগুলো নতুন করে পর্যবেক্ষণ করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পরামর্শ দেন।
সব মিলিয়ে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে এক্স-রে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সিভিল সার্জন অফিসে চিকিৎসা গ্রহণ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ ও ধীর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিটি ধাপেই কষ্ট ছিল, তবে চিকিৎসা অব্যাহত রাখার কারণেই শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আরো উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র, ফেনী সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তি

নাম : মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ মাসুম
জন্ম তারিখ : ১০-১১-২০০৬
জন্মস্থান : পরশুরাম, ফেনী
পেশা : ছাত্র
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম অলকা, ইউনিয়ন: ৩নং চিথলিয়া, থানা: পরশুরাম, জেলা: ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : এলাকা: পাঠানবাড়ি, থানা: ফেনী সদর, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
পিতার পেশা ও বয়স : বেসরকারি চাকরি (৪৫)
মায়ের নাম : আছিয়া সুলতানা
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী (৩৯)
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ৩০০০০/=
আয়ের উৎস : বাবার চাকরী
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭জন

ভাই-বোনদের নাম
১.ভাইয়ের নাম : তারেক নাসরুল্লাহ (১২), ৭ম শ্রেণী, আল জামিয়া ফালাহিয়া মাদরাসা
২.ভাইয়ের নাম : আব্দুল্লাহ মাবরুর (৭), ২য় শ্রেণী, মাদিনাতুল ইলম মাদরাসা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍