হোম / আহতদের তালিকা / মোহাম্মদ বাবলু
মোহাম্মদ বাবলু

মোহাম্মদ বাবলু

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : রাজমিস্ত্রী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
মোহাম্মদ বাবলু, জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি ফেনী জেলার মতিগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই বাবলু ছিলেন পরিশ্রমী আর সংগ্রামী এক তরুণ। কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র‍্যরে সঙ্গে তার লড়াই শুরু হয়। পরিবারে বাবা ওলি আহম্মেদ একজন কৃষক, আর মা ফাতেমা খাতুন একজন গৃহিণী। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র আট হাজার টাকা, যা দিয়ে সংসার চালানোই অনেক কঠিন। চার সদস্যের ছোট এই পরিবারে বাবলুই ছিলেন ভরসার অন্যতম জায়গা। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজ শিখে জীবিকার পথে পা বাড়ান।

স্থায়ী ঠিকানা ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার ভাদাদিয়া গ্রামে হলেও, বাবলুর জীবনের স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্যের শিকল ভেঙে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করতেন। ছোট ভাই রিদয় ইসলামও রাজমিস্ত্রীর কাজ শেখে পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন শুধু রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এর ঢেউ পৌঁছেছিল দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। সেই উত্তাল আন্দোলনের প্রভাব থেকে ফেনীও বাদ যায়নি। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও যখন অন্যায়, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের কবলে মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষ আর চুপ করে বসে থাকতে পারেনি। কৃষক, শ্রমজীবী, দিনমজুর, ছাত্র, শিক্ষক—সব শ্রেণির মানুষ একক কণ্ঠে রাজপথে নেমে এসেছিল ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে।
এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রাজমিস্ত্রীর পেশায় যুক্ত সাধারণ তরুণ মোহাম্মদ বাবলুও ছিলেন রাজপথের লড়াকু মানুষের অংশ। রাজনীতি বা আন্দোলনের সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না, তবু দেশের প্রতি ভালোবাসা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তাড়না তাকে আন্দোলনের মিছিলে দাঁড় করায়। তার চোখে দেশের ভবিষ্যৎ মানেই ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, যেখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা হবে না।
৪ আগস্ট দুপুরে বাবলু মহিপাল এলাকায় অবস্থান করছিলেন। গ্রীষ্মের দাবদাহে রাস্তাঘাট গরম হয়ে উঠলেও মানুষের উচ্ছ্বাসে সেখানে তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন আবহ। চারপাশে স্লোগান ধ্বনিতে মুখরিত-“গণতন্ত্র চাই”, “অন্যায়ের বিচার চাই।” বাবলুর পাশে ছিলেন আরও অনেক সাধারণ মানুষ, যারা শান্তিপূর্ণভাবে হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আওয়াজ তুলছিল। সেদিনের জনতার চোখেমুখে ছিল আশার দীপ্তি, হৃদয়ে ছিল ভয়ের চেয়ে অধিক সাহস।
আক্রমণ/ঘটনার বিবরণ
সেদিন বিকেল সাড়ে দুইটার দিকে হঠাৎ করেই মহিপাল এলাকার পরিবেশ পাল্টে যায়। এখনো সূর্যের তেজে চারদিক ঝলসে উঠছিল, আর সেই উত্তাপের ভেতরে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলছিল ধীরস্থিরভাবে। হঠাৎ করেই ট্রাংক রোড দিক থেকে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ঢুকে পড়ে। তারা কোনো সতর্কতা ছাড়াই গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই যে জনসভা ছিল স্লোগান আর আশার দীপ্তিতে ভরপুর, সেটি পরিণত হয় রক্তাক্ত আতঙ্কে।
চারদিকে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো মহিপাল। মানুষের দম ফেলার সময় নেই- কে কোথায় পালাবে, কার জীবন কোথায় থেমে যাবে কেউ বুঝে উঠতে পারছিল না। আতঙ্কিত ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবলু। রাজমিস্ত্রীর পোশাকেই তিনি সেদিন এসেছিলেন- কোনো রাজনৈতিক ব্যানার হাতে নয়, কেবল দেশের ভবিষ্যতের প্রতি ভালোবাসা আর ন্যায়বিচারের দাবিতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
কিন্তু গুলি ছোড়া শুরু হতেই তিনি আর দিক-বিদিক বুঝতে পারেননি। পালাতে যাবেন- এর আগেই এক ঝটকায় গুলির শব্দ কানে বাজল, আর মুহূর্তেই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠেন তিনি। একটি গুলি এসে সরাসরি তার পায়ে আঘাত করে। চোখের সামনে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে, আর শরীর ভারী হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বাবলু।
ভিড়ের মধ্যে তখন এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল যে কেউ কাউকে সাহায্য করার মতো অবস্থায় ছিল না। মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে, লুটিয়ে পড়ছে, আবার কেউ আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। বাবলুও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছিলেন। তার পায়ের ভেতরে গুলি ঢুকে আটকে যায়, যা আজও বের করা সম্ভব হয়নি।
বাবলুর কাছে সেদিনের মুহূর্ত ছিল জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার, গুলির অবিরাম শব্দ, আর মৃত্যু যেন চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তবুও অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান- যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে, রক্তে ভিজে যেতে যেতে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জীবনের সাথে মৃত্যুর ব্যবধান আসলে কতটুকু ক্ষীণ।
চিকিৎসা
আঘাতের পর স্থানীয়ভাবে তাকে এক্সরে করানো হয়, কিন্তু টাকার অভাবে বড় ধরনের চিকিৎসা আর সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন- তার কোমরের নিচে গুলি আটকে আছে, যা বের করা জরুরি। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাবলু এখনো কোনো বড় হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন করাতে পারেননি।
আজও তিনি পায়ের ভেতরে সেই গুলির যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। চলাফেরা সীমিত হয়ে গেছে, আগের মতো রাজমিস্ত্রীর কাজে ফিরতে পারছেন না। তার একটাই আক্ষেপ- যদি যথাসময়ে চিকিৎসা নিতে পারতেন, হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন।
পরিবার ও আর্থিক অবস্থা
মোহাম্মদ বাবলুর পরিবার ছোট হলেও তাদের সংগ্রাম বিশাল। বাবা একজন কৃষক, অল্প কিছু জমি চাষ করে সংসার চালান। মা গৃহিণী, সংসার সামলান পরম ধৈর্যে। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র আট হাজার টাকা, যা চিকিৎসার খরচের তুলনায় নগণ্য। ছোট ভাই রিদয়ও রাজমিস্ত্রীর কাজ করে, কিন্তু বাবলুর আহত হওয়ার পর সেই চাপ আরও বেড়ে গেছে।
আজ বাবলু নিজেকে শুধু একজন আহত মানুষ হিসেবেই দেখেন না, বরং পরিবারে আর্থিক বোঝা হিসেবেও অনুভব করেন। তিনি চান ছোটখাটো একটি ব্যবসা শুরু করতে, যাতে অন্তত সংসারের ভার সামলাতে পারেন এবং চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারেন।

নাম : মোহাম্মদ বাবলু
জন্ম : ১ জানুয়ারি ২০০১, মতিগঞ্জ, ফেনী
পেশা : রাজমিস্ত্রী
স্থায়ী ঠিকানা : ভাদাদিয়া, সোনাগাজী, ফেনী
পরিবার : বাবা-মা, ছোট ভাইসহ ৪ সদস্য
পারিবারিক আয় : মাসিক ৮,০০০ টাকা (কৃষিকাজ)
ঘটনার তারিখ : ৪ আগস্ট ২০২৪, সময় বিকাল ২:৩০ মিনিট
ঘটনার স্থান : মহিপাল, ফেনী
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী (জিয়া উদ্দিন বাবলু ও সহযোগীরা)
আঘাত : পায়ে গুলি, গুলি এখনও শরীরের ভেতরে রয়েছে
চিকিৎসা : শুধু এক্সরে করা হয়েছে, অপারেশন হয়নি
পুনর্বাসন প্রস্তাবনা : ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ, যাতে স্বনির্ভর হতে পারেন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍