হোম / আহতদের তালিকা / হুমায়ন কবির বাবুল
হুমায়ন কবির বাবুল

হুমায়ন কবির বাবুল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : কর্মজীবী, দর্জি কারিগর

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
০২ মে ১৯৯৬ সালে ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ন কবির বাবুল, যিনি পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালীর করিহাট থানার নতুন সাহাজীর হাট ইউনিয়নের দক্ষিণ আলীপুর গ্রামে। পিতা মৃত আবুল কাশেমের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি সংসারের দায়-দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং পরিবারের হাল ধরেন। মাতা বিবি আয়েশা একজন গৃহিণী, যিনি ছয় সদস্যের পরিবারে সন্তানদের মানুষ করতে পরম মমতায় জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে হুমায়ন গ্রামের মেঠো পথে বড় হয়েছেন এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নিজেকে গড়েছেন একজন দর্জি কারিগর হিসেবে। অভাব-অনটনের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের ব্যয়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও এলাকায় অবস্থান করছেন এবং পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামী মানসিকতার অধিকারী হুমায়ন একজন দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী ও ন্যায়বোধসম্পন্ন মানুষ, যিনি জীবনযুদ্ধে অবিচল থেকে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন নীরবে, নিঃস্বার্থে।
আন্দোলনে অংশগ্রহন ও অবদান
২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট, যোহরের নামাজ শেষ করে হুমায়ুন কবির বাবুল রাজপথে বের হন, গন্তব্য ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভার। সেদিন দেশের প্রতিটি প্রান্তের মতো ফেনীর আকাশেও ধ্বনিত হচ্ছিল স্বৈরাচারবিরোধী শ্লোগান—এক দফা, এক দাবি: প্রধানমন্ত্রী তিনার ক্ষমা ও পদত্যাগ। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে ফেনীর ছাত্র-জনতা মহিপালের রাজপথে অবস্থান নেয়, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছিল। হুমায়ুন ছিলেন তাদেরই একজন—একজন শ্রমজীবী, অথচ সাহসী মানুষ, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে পিছপা হননি। ব্যানার আর স্লোগানের মাঝখানে তিনিও ছিলেন, মাথা উঁচু করে।
কিন্তু আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে আচমকাই নেমে আসে এক ভয়াল আঁধার। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ছত্রছায়ায় গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই রাজপথ রূপ নেয় এক রক্তাক্ত ময়দানে। হুমায়ুন বাবুলর ডান পায়ে একটি গুলি এসে লাগে—তিনি ব্যথায় কাতর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে হাহাকার, ধোঁয়া আর রক্ত। কোনো সহায়তা না পেয়ে আহত অবস্থায় তিনি নিজে কোনোভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। এই আক্রমণ শুধু একজন হুমায়ুনকে আহত করেনি, আঘাত করেছে দেশের হাজারো নিষ্পাপ প্রতিবাদী কণ্ঠকে। হুমায়ুনের অংশগ্রহণ ছিল নিঃশব্দ অথচ দৃপ্ত, তার রক্ত ঝরেছে কিন্তু তার আদর্শ ভাঙেনি—তিনি প্রমাণ করে গেছেন, শ্রমজীবী বলেই তার চেতনাও শ্রমের মতো নির্মল, এবং প্রতিবাদের ভাষাও স্পষ্ট।
চিকিৎসা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় হুমায়ুন কবির বাবুল কোনোভাবে নিজেকে টেনে নিয়ে যান বাড়িতে, যেখানে পরিবারের আতঙ্কিত চোখ আর কাঁপা হাতে তার জন্য তৈরি হয় একটি অস্থায়ী চিকিৎসার পরিবেশ। কয়েকদিন তিনি বাড়িতেই ব্যথা, জ্বর আর অজানা আশঙ্কা নিয়ে কাটান—কোনো বড় হাসপাতাল তখনও দূরের স্বপ্ন, কারণ গুলির শব্দ তখনো যেন পিছু ছাড়েনি। অবশেষে অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে তিনি যান ফেনীর আল কেমী হাসপাতালে, যেখানে ডা. মেহেদী হাসান-এর তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার অস্ত্রোপচারের প্রক্রিয়া। গুলি বের করার সেই যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তেও বাবুলর চোখে ছিল সাহস আর মুখে ছিল ধৈর্য। কয়েকদিনের নিবিড় চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর, আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই গুলির দাগ আজো তার শরীরে নয়, মনে ক্ষত হয়ে বেঁচে আছে—প্রমাণ করে যে, প্রতিবাদের মূল্য সে নিজে রক্ত দিয়ে চুকিয়েছে।
প্রস্তাবনা
হুমায়ুন কবির বাবুলর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শ্রম, আর বড় বাধা তার দারিদ্র‍্য। পরিবারের ছয় সদস্যের দায়িত্ব তার কাঁধে, অথচ আয়ের উৎস সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একজন দর্জি কারিগর হিসেবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন—হাতে নিপুণতা, চোখে মাপজোখের সূক্ষ্মতা, আর মনে রয়েছে আত্মসম্মানবোধ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো ভয়ানক অভিজ্ঞতার পরও তিনি ফিরে এসেছেন সেলাই মেশিনের কাছে, জীবনের সুতো ধরে আবার বেঁধে নিতে চান ভবিষ্যতের পথ। যদি তাকে একটি সেলাই মেশিন ও একটি ছোট টেইলরিং দোকান করে দেওয়া হয়, তবে সে নিজেকে শুধু টিকিয়ে রাখতে পারবে না—বরং নিজের পরিবারের পাশাপাশি সমাজের জন্যও এক আত্মনির্ভরশীল উদাহরণ হয়ে উঠবে।

নাম : হুমায়ন কবির বাবুল
জন্মতারিখ : ০২-০৫-১৯৯৬
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : কর্মজীবী, দর্জি কারিগর
স্থায়ী ঠিকানা
গ্রাম: দক্ষিণ আলীপুর
ইউনিয়ন: নতুন সাহাজীর হাট
থানা: করিহাট
জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা
এলাকা: বালিগাও
থানা ও জেলা: ফেনী সদর, ফেনী
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম: মৃত আবুল কাশেম
মাতার নাম: বিবি আয়েশা, পেশা: গৃহিণী
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬ জন
ঘটনার স্থান: মহিপাল পাসপোর্ট অফিসের সামনে, ফেনী
ঘটনার তারিখ ও সময়: ০৪/০৮/২০২৪, দুপুর আনুমানিক ১:৫০ মিনিট
আক্রমণকারীঃ আওয়ামীলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍