হোম / আহতদের তালিকা / মোহাম্মদ মুক্তার হোসাইন
মোহাম্মদ মুক্তার হোসাইন

মোহাম্মদ মুক্তার হোসাইন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : কর্মহীন

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। জনগণের মনে ছিল একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা, যেখানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং সমাজে ন্যায়ের জোরে শান্তি স্থাপন হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় একচ্ছত্র ক্ষমতার লোভ, দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন। এক এক করে সংবিধান ও আইনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
এই ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপ নেয় ভীতির রাজনীতিতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পায়, বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এবং অনৈতিক চাপ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা হয়। নির্বাচন হয়ে ওঠে একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো ভোটবিহীন ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের মনে হতাশা বাড়ে, কারণ তারা দেখল যে, আইন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার যন্ত্র তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসময় আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিতভাবে জনগণের ওপর এমন এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে, সাধারণ মানুষও প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাস্তাঘাট, জনসভা প্রতিটি স্থানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলাই বিপজ্জনক।
কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় ২০২৪ সালে। কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই দীর্ঘ নীরবতার শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। তরুণ শিক্ষার্থী, যুব সমাজ, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি ছিল চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু সেই লড়াই দ্রুত পরিণত হয় একটি বৃহৎ জনজাগরণের মধ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দমন-পীড়ন, অবিচার, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানত, তাদের পথে থাকবে গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, ভয় ও মিথ্যা মামলা। তবুও তারা দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল - স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে হলে ভয় ভেঙে নামতেই হবে। ২৪ এর জুলাই-আগস্টে বহু রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলন রূপ নিল এক ঐতিহাসিক জনআন্দোলনে। রাজপথে নেমে হাজারো তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই আন্দোলন শুধু চাকরির সুযোগের জন্য ছিল না; এটি ছিল দেশের ন্যায়ের জন্য, দেশের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি ক্ষত ও ক্ষয় আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত অঙ্গন তৈরি করেছে। এভাবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ে ওঠে কেবল এক সামাজিক দাবি নয়, বরং এটি রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়, যেখানে রক্ত, দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাহসের গল্প একত্রে লেখা হয়েছে। তরুণরা দেখিয়ে দেয়, যে ভয়কে ভেঙে নামলেই সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিচিতি
ফেনীর দাগনভূঁঞা উপজেলার উত্তর আলীপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ মুক্তার হোসাইন। জন্ম ১৯৯৪ সালের ১৪ মে। গ্রামের ধুলো-বালির সরল জীবনেই বড় হয়েছেন তিনি। জীবনের প্রতিটি দিনে সংগ্রামই যেন তার সঙ্গী। স্বপ্ন দেখতেন নিজের পরিবারকে ভালোভাবে গড়ে তোলার।
তার পিতা মজিবুল হক, একজন পরিশ্রমী কৃষক। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও এখনো মাঠেই জীবিকার সন্ধান করেন। মা ফেরদৌস আরা, গৃহিণী, সংসারের খুঁটিনাটি সামলিয়ে রাখেন নীরবে। পরিবারের মাসিক স্বল্প আয় দিয়েই চলছে ছয় সদস্যের সংসার। ভাইবোনদের মধ্যে আছেন বড় ভাই ফখরুল ইসলাম এবং বোন নাহিদা জান্নাতুল ফেরদৌস।
অভাবের বেড়াজালে জর্জরিত হলেও মুক্তার ছিলেন প্রাণবন্ত ও দৃঢ়চেতা। পরিবারের হাসি-খুশিই ছিল তার অনুপ্রেরণা। কিন্তু সেই অনুপ্রেরণার তরুণ একদিন নেমেছিলেন দেশের বৃহত্তর আন্দোলনে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে দাঁড়ানো এই তরুণ ২৪ এর আন্দোলনে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসী হামলায়।
মহিপালের রাজপথে
৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা। ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক জুড়ে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়েছিল। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, শুধু ন্যায়ের দাবি আর বুকভরা সাহস। সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি। মুক্তার হোসাইনও ছিলেন সেই মিছিলের সঙ্গী। সারাদেশে নিরাপরাধ ভাইদের হত্যা ও গণগ্রেফতারের ঘটনায় হাজারো জনতার ন্যায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনিও। রাজপথে নামেন ঘাতক হাসিনা বাহিনীর নির্মমতার বিরুদ্ধে।
দুপুর ২টা
হঠাৎই আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী আক্রমণ চালায়। মুহূর্তেই শান্তিপূর্ণ মিছিল রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। গুলির শব্দ, ধোঁয়া আর আর্তনাদে ভরে ওঠে মহাসড়ক। কিছু ছাত্রজনতার সঙ্গে ছুটে আশ্রয় নেন সার্কিট হাউজ রোডে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ চলতেই থাকে। মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচ থেকে ক্রমাগত গুলি ছুড়তে থাকে সন্ত্রাসীরা। সেই দিনের বিভীষিকায় ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনজন।
গুলিবিদ্ধ মুক্তার হোসাইন
সেই নির্মম আক্রমনের মুখে পড়েন মুক্তার হোসাইনও। তার পিঠ ও পায়ে বিঁধে যায় ছয়টি গুলি। রক্তে ভিজে যায় শরীর। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি রিকশায় ওঠেন তিনি। কিন্তু তখনও শেষ হয়নি হামলা। পথে একদল সন্ত্রাসী আবারও তার ওপর লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে তিনি আশ্রয় নেন সার্কিট হাউজ মসজিদে।
চিকিৎসা সংগ্রাম
চিকিৎসার জন্য ফেনী শহর যাওয়া সম্ভব না হওয়ায়, সহপাঠীরা জীবন বাজি রেখে তাকে গ্রাম-অঞ্চল পেরিয়ে দাগনভূঁঞা উপজেলায় নিয়ে আসে। হাজী ক্লিনিকে অপারেশন করে তার পিঠ ও পায়ের গুলিগুলো বের করা হয়। কিন্তু গুলির ক্ষত মুছে যায়নি; কোমর আর কাঁধের অসহ্য ব্যথা হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। ব্যথা উপশমের জন্য নিতে হয় বারবার চিকিৎসা। সেখানে চিকিৎসার দীর্ঘ ভ্রমণ শুরু হয়। দাগনভূঁঞা হাজী ক্লিনিক, মা ও শিশু হাসপাতাল, ভাইটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিভিল সার্জন মেডিকেল ক্যাম্প, ফেনী বক্ষব্যাধী হাসপাতাল ু এসব জায়গায় চিকিৎসা নেন মুক্তার হোসাইন।
পরবর্তী চিকিৎসা
সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার জন্য ডাক্তার তাকে নিয়মিত ফিজিও থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়াও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে (নিটোর) পাঠান।
আজও মোশারফ সেই যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। তার গায়ে বহন করছেন গুলির দাগ, আর মনে বহন করছেন সেই কালো দুপুরের স্মৃতি। মোশারফ শুধু একজন আহত নয়, তিনি জুলাই আন্দোলনের এক জীবন্ত সাক্ষ্য, যার রক্তাক্ত শরীর আমাদেরকে খুনী হাসিনার স্মরণ করায় বারবার।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ নন। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তিনি একজন কর্মহীন। তার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

নাম : মোহাম্মদ মুক্তার হোসাইন
জন্ম তারিখ : ১৪-০৫-১৯৯৪
পেশা : কর্মহীন
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: উত্তর আলীপুর, ডাকঘর: বেকের বাজার, ইউনিয়ন: ৭ নং মাতুভূঁঞা, থানা: দাগনভূঁঞা, জেলা: ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: উত্তর আলীপুর, ডাকঘর: বেকের বাজার, ইউনিয়ন: ৭ নং মাতুভূঁঞা, থানা: দাগনভূঁঞা, জেলা: ফেনী

পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মজিবুল হক
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৯
মায়ের নাম : ফেরদৌস আরা
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৭
পারিবারিক অবস্থা
মাসিক আয় ১২,০০০
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ:
১. নাহিদা জান্নাতুল ফেরদৌস, বয়স- ২৪, সম্পর্ক- বোন
২. ফখরুল ইসলাম, বয়স- ৩২, সম্পর্ক- ভাই
ঘটনার স্থান: ফেনীর মহিপাল, সার্কিট হাউজ রোড
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ (জিয়া উদ্দীন বাবলু)
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪ আগস্ট ২০২৪ , দুপুর ২.৩০ টা
আঘাতের ধরণ: পিঠে ও পায়ে গুলি লাগে
চিকিৎসা: গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍