মো: হাদিউজ্জামান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মো: হাদিউজ্জামান ছিলেন একজন শিক্ষক, পরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে গড়া এক নীরব আলোকবর্তিকা। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ মিছিলে দাঁড়াতেই পুলিশি গুলিতে বিদ্ধ হয় তাঁর ডান পা। ভেঙে যায় হাড়, কিন্তু ভাঙতে পারে না তাঁর বিবেকের দৃঢ়তা। এলিজারো ফ্রেম, দীর্ঘ চিকিৎসা ও স্থায়ী ব্যাথার সাথে লড়ে আজও তিনি সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জীবনের দেয়ালে যতই অন্ধকার জমুক, হাদিউজ্জামান রয়ে গেছেন সেই মানুষের প্রতীক যিনি আহত হন ঠিকই, কিন্তু অন্যায়ের কাছে কখনো পরাজিত হন না।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
ওরা মানুষ নামের নরপশু
মো: হাদিউজ্জামান
ক্রমিক: ০৪৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৮
পরিচিতি
মো: হাদিউজ্জামান একজন বিবেকবান নাগরিক, যিনি নিজের শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষক এবং পরবর্তীতে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে সমাজে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তিনি বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা হলেও তাঁর শিকড় রয়েছে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জেলা বগুড়ায়। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা মালতীনগর মাটির মসজিদের পাশে, মোল্লাপাড়া ভাটকান্দি রোড, বগুড়া সদর, একটি ঐতিহ্যবাহী ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে তাঁর শৈশব কেটেছে পারিবারিক মমতা ও নৈতিকতার আলোয়। হাদিউজ্জামানের পিতা মো: সরোয়ার জাহান একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর বয়স বর্তমানে ৭২ বছর। তাঁর মা মোসা: হালিমা খাতুন একজন গৃহিণী, যাঁর বয়স ৬২ বছর। একটি মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং সাংগঠনিকভাবে সুসংবদ্ধ পরিবারে হাদিউজ্জামান বড় হয়েছেন। যেখানে মূল্যবোধ, শালীনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল প্রতিটি সদস্যের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরিবারে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা চারজন। তাঁর ভাই মো: হাসানুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। একজন মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা পরিবারটির দেশপ্রেম এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনের পরিচায়ক। বোন জিনাত সুরাইয়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত, একজন উচ্চশিক্ষিত নারী হিসেবে পরিবারকে গর্বিত করছেন। হাদিউজ্জামান নিজে বিবাহিত ও একজন স্নেহপরায়ণ পিতা। তাঁর মেয়ে ফারিহা আফরিন ভিকারুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছেলে আহনাফ আব্দুল্লাহ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে নিবরাস মাদ্রাসায়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নেই তিনি প্রতিদিন সংগ্রাম করেন।
পেশাগত জীবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
হাদিউজ্জামান শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি সমাজ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর পাঠদান ও আচরণে শিক্ষার্থীরা যেমন অনুপ্রাণিত হতো, তেমনি সহকর্মীরাও পেয়েছেন নৈতিক নেতৃত্বের উদাহরণ। শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি পরবর্তীতে ব্যবসার দিকে মনোযোগ দেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছেন। ব্যবসার বিষয়বস্তু বা ক্ষেত্র বিস্তারিত জানা না গেলেও এটি সম্ভবতঃ পোশাক, বই, বা প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহ সম্পর্কিত। একজন সাবেক শিক্ষক হয়ে ব্যবসা শুরু করা সহজ নয়, তবে পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি সাহসিকতার সঙ্গে পথ খুঁজেছেন। তাঁর মাসিক আয় ৪০,০০০ টাকা, যা ঢাকার মতো উচ্চব্যয়সম্পন্ন শহরে সংসার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়, বিশেষত আহত হওয়ার পর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়। একজন বিবেচক নাগরিক হিসেবে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও কাজ করতে চেয়েছেন। তাই যখন রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তখন তিনি শুধু একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবেই নয় বরং একজন সক্রিয় নাগরিক হিসেবে মাঠে নামেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহতা
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এই দিনটি হাদিউজ্জামানের জীবনে চরম বেদনার স্মৃতি বহন করে। ওই দিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের পর তিনি বনশ্রী বি-ব্লক এলাকায় অনুষ্ঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রের প্রতি বার্তা দেয়া, তবে পুলিশ ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা সেটিকে সহ্য করতে পারেনি। রামপুরা ব্রিজসংলগ্ন গোলচত্বর এলাকায় পুলিশের অবস্থান ছিল আগেই। হাদিউজ্জামান এবং তাঁর সহযোদ্ধারা যখন মিছিল নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন, তখন পুলিশ হঠাৎ টিয়ারশেল এবং ছররা গুলির মাধ্যমে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। বেলা আনুমানিক ২.৩০ মিনিটে আবারও গুলি ছোড়া হয়, যার একটির নিশানা হয় হাদিউজ্জামানের ডান পা। হাঁটুর নিচে গুলিটি ঢুকে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। হাড় চারটি ভেঙে চৌচির হয়ে যায় এবং তিনি রাস্তায় পড়ে যান। তখনই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাঁকে ঘিরে ধরে হামলা চালায়। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে তিন/চারজন সহকর্মী তাঁকে রিকশাযোগে বনশ্রীর 'ফরাজী' হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল হয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয় জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে।
চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও বর্তমান শারীরিক অবস্থা
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের পর হাদিউজ্জামানের গুলিবিদ্ধ পায়ে প্রথমে ড্রেসিং ও স্কিন গ্রাফটিং করা হয়। কিন্তু এই চিকিৎসা পর্যাপ্ত ছিল না। পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে 'এলিজারো' ফ্রেম পরানো হয়, যা হাড় জোড়া লাগানোর একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং কষ্টকর চিকিৎসা পদ্ধতি। এই ফ্রেমের অবস্থায় প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে ড্রেসিং করতে হতো। এভাবে টানা তিন মাস পার করেন তিনি। অবশেষে ৫ মে ২০২৫ তারিখে এলিজারো সরানো হয়। তবে তার পরও চলাফেরা স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমানে তিনি ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও এটি নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। হাঁটার সময় ব্যথা হয়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন প্রায়ই। চিকিৎসার ব্যয়ে ইতোমধ্যে ৭৫,০০০ টাকা খরচ হয়েছে, যা একজন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিশাল বোঝা।
পরিবারের উপর প্রভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে যে আয় দিয়ে সংসার চলত, তা এখন অনিশ্চিত। ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার মতো শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য নেই। চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা, পিতা-মাতার চিকিৎসা, দৈনন্দিন ব্যয় সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে। সন্তানরা ভালো স্কুলে পড়ছে, কিন্তু নিয়মিত ফি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্ত্রী প্রতিদিন স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানের দেখাশোনা এবং বাড়ির যাবতীয় কাজ সামলাচ্ছেন। পরিবারটি এখন অনেকটাই বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী নির্ভর হয়ে পড়েছে। ব্যবসার আয় ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কারণ তিনি নিজের মতো করে মাঠে নামতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবারটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান সব কিছুই অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।
প্রস্তাবনা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা
মো: হাদিউজ্জামান এখন শারীরিকভাবে আংশিক পঙ্গু। তাঁর পক্ষে আর আগের মতো শারীরিক শ্রম দিয়ে ব্যবসা বা অন্য কোনো পেশা চালানো সম্ভব নয়। তবে তিনি মনোবলে ভেঙে পড়েননি। তিনি অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং এটিকে প্রসারিত করতে চান। তাঁর প্রস্তাব হলো, এককালীন আর্থিক সহায়তা বা সুদবিহীন ঋণ দেয়া হলে তিনি ব্যবসাকে আরও পেশাদারভাবে গড়ে তুলতে পারবেন। এর মাধ্যমে শুধু নিজেই নয়, তাঁর পরিবারও স্বনির্ভরতা অর্জন করবে। রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আবেদন, তিনি এই দেশের নাগরিক, যিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবনবাজি রেখেছিলেন। আজ যখন তাঁর জীবন সংকটে, তখন রাষ্ট্র যদি পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে ন্যায়ের পরাজয়। তাই দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা, ব্যবসায়িক অনুদান এবং সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (আহত ব্যক্তির নিজস্ব মতামত)
শুরুতে এলিজারো অবস্থায় প্রতি সপ্তাহে ২ বার ড্রেসিং করা হয় এভাবে ৩ মাস অতিবাহিত হলে পরবর্তীতে এলিজারো অবস্থায় বিগত ০৫/০৫/২০২৫ তারিখ পর্যন্ত আমি চিকিৎসা নেই। বর্তমানে আমার এলিজারো অপসারণ করা হয়েছে এবং আমি ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ভবিষ্যতেও ফিজিওথেরাপি নিতে হবে।
প্রস্তাবনা
আমার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আমি অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যবসা পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। এবং ভবিষ্যতে আমি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা করতে চাই। ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করার জন্য এককালীন আর্থিক সহযোগিতা অথবা সুদবিহীন ঋণ পেলে আমার ও পরিবারের জন্য কল্যাণকর হবে বলে আশা করি।
এক নজরে মো: হাদিউজ্জামান
নাম: মো: হাদিউজ্জামান
জন্ম তারিখ: ০২-০৯-১৯৮৩
পিতা: মো: সরোয়ার জাহান, বয়স: ৭২ বছর, পেশা: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
মাতা: মোসা: হালিমা খাতুন, বয়স: ৬২ বছর, পরিবারের সদস্য: ৪ জন
মাসিক আয়: ৪০,০০০
বর্তমান পেশা: ব্যবসা, পূর্বের পেশা: শিক্ষকতা
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ৪২, রোডঃ ০৭, ব্লক: সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: মালতী নগর মাটির মসজিদ, মোল্লা পাড়া ভাটকান্দি রোড, বগুড়া সদর, বগুড়া
পরিবারের বিবরণ
ভাই: মো: হাসানুল ইসলাম, সেনাবাহিনীতে কর্মরত (মেজর)
বোন: জিনাত সুরাইয়া, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, মাস্টার্স
মেয়ে: ফারিহা আফরিন, শ্রেণি: অষ্টম, ভিকারুন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজ
ছেলে: আহনাফ আব্দুল্লাহ, শ্রেণি: তৃতীয়, নিবরাস মাদ্রাসা
আহত হওয়ার স্থান: শান্তা টাওয়ারের সামনে, বি-ব্লক, বনশ্রী, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯/০৭/২০২৪, সময়: দুপুর ২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী: পুলিশ
মো: হাদিউজ্জামান
ক্রমিক: ০৪৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০৪৮
পরিচিতি
মো: হাদিউজ্জামান একজন বিবেকবান নাগরিক, যিনি নিজের শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষক এবং পরবর্তীতে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে সমাজে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তিনি বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা হলেও তাঁর শিকড় রয়েছে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জেলা বগুড়ায়। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা মালতীনগর মাটির মসজিদের পাশে, মোল্লাপাড়া ভাটকান্দি রোড, বগুড়া সদর, একটি ঐতিহ্যবাহী ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে তাঁর শৈশব কেটেছে পারিবারিক মমতা ও নৈতিকতার আলোয়। হাদিউজ্জামানের পিতা মো: সরোয়ার জাহান একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর বয়স বর্তমানে ৭২ বছর। তাঁর মা মোসা: হালিমা খাতুন একজন গৃহিণী, যাঁর বয়স ৬২ বছর। একটি মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং সাংগঠনিকভাবে সুসংবদ্ধ পরিবারে হাদিউজ্জামান বড় হয়েছেন। যেখানে মূল্যবোধ, শালীনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল প্রতিটি সদস্যের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরিবারে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা চারজন। তাঁর ভাই মো: হাসানুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। একজন মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা পরিবারটির দেশপ্রেম এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনের পরিচায়ক। বোন জিনাত সুরাইয়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত, একজন উচ্চশিক্ষিত নারী হিসেবে পরিবারকে গর্বিত করছেন। হাদিউজ্জামান নিজে বিবাহিত ও একজন স্নেহপরায়ণ পিতা। তাঁর মেয়ে ফারিহা আফরিন ভিকারুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছেলে আহনাফ আব্দুল্লাহ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে নিবরাস মাদ্রাসায়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নেই তিনি প্রতিদিন সংগ্রাম করেন।
পেশাগত জীবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
হাদিউজ্জামান শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি সমাজ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর পাঠদান ও আচরণে শিক্ষার্থীরা যেমন অনুপ্রাণিত হতো, তেমনি সহকর্মীরাও পেয়েছেন নৈতিক নেতৃত্বের উদাহরণ। শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি পরবর্তীতে ব্যবসার দিকে মনোযোগ দেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছেন। ব্যবসার বিষয়বস্তু বা ক্ষেত্র বিস্তারিত জানা না গেলেও এটি সম্ভবতঃ পোশাক, বই, বা প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহ সম্পর্কিত। একজন সাবেক শিক্ষক হয়ে ব্যবসা শুরু করা সহজ নয়, তবে পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি সাহসিকতার সঙ্গে পথ খুঁজেছেন। তাঁর মাসিক আয় ৪০,০০০ টাকা, যা ঢাকার মতো উচ্চব্যয়সম্পন্ন শহরে সংসার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়, বিশেষত আহত হওয়ার পর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়। একজন বিবেচক নাগরিক হিসেবে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও কাজ করতে চেয়েছেন। তাই যখন রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তখন তিনি শুধু একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবেই নয় বরং একজন সক্রিয় নাগরিক হিসেবে মাঠে নামেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহতা
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এই দিনটি হাদিউজ্জামানের জীবনে চরম বেদনার স্মৃতি বহন করে। ওই দিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের পর তিনি বনশ্রী বি-ব্লক এলাকায় অনুষ্ঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রের প্রতি বার্তা দেয়া, তবে পুলিশ ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা সেটিকে সহ্য করতে পারেনি। রামপুরা ব্রিজসংলগ্ন গোলচত্বর এলাকায় পুলিশের অবস্থান ছিল আগেই। হাদিউজ্জামান এবং তাঁর সহযোদ্ধারা যখন মিছিল নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন, তখন পুলিশ হঠাৎ টিয়ারশেল এবং ছররা গুলির মাধ্যমে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। বেলা আনুমানিক ২.৩০ মিনিটে আবারও গুলি ছোড়া হয়, যার একটির নিশানা হয় হাদিউজ্জামানের ডান পা। হাঁটুর নিচে গুলিটি ঢুকে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। হাড় চারটি ভেঙে চৌচির হয়ে যায় এবং তিনি রাস্তায় পড়ে যান। তখনই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাঁকে ঘিরে ধরে হামলা চালায়। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে তিন/চারজন সহকর্মী তাঁকে রিকশাযোগে বনশ্রীর 'ফরাজী' হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল হয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয় জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে।
চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও বর্তমান শারীরিক অবস্থা
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের পর হাদিউজ্জামানের গুলিবিদ্ধ পায়ে প্রথমে ড্রেসিং ও স্কিন গ্রাফটিং করা হয়। কিন্তু এই চিকিৎসা পর্যাপ্ত ছিল না। পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে 'এলিজারো' ফ্রেম পরানো হয়, যা হাড় জোড়া লাগানোর একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং কষ্টকর চিকিৎসা পদ্ধতি। এই ফ্রেমের অবস্থায় প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে ড্রেসিং করতে হতো। এভাবে টানা তিন মাস পার করেন তিনি। অবশেষে ৫ মে ২০২৫ তারিখে এলিজারো সরানো হয়। তবে তার পরও চলাফেরা স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমানে তিনি ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও এটি নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। হাঁটার সময় ব্যথা হয়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন প্রায়ই। চিকিৎসার ব্যয়ে ইতোমধ্যে ৭৫,০০০ টাকা খরচ হয়েছে, যা একজন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিশাল বোঝা।
পরিবারের উপর প্রভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে যে আয় দিয়ে সংসার চলত, তা এখন অনিশ্চিত। ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার মতো শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য নেই। চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা, পিতা-মাতার চিকিৎসা, দৈনন্দিন ব্যয় সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে। সন্তানরা ভালো স্কুলে পড়ছে, কিন্তু নিয়মিত ফি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্ত্রী প্রতিদিন স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানের দেখাশোনা এবং বাড়ির যাবতীয় কাজ সামলাচ্ছেন। পরিবারটি এখন অনেকটাই বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী নির্ভর হয়ে পড়েছে। ব্যবসার আয় ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কারণ তিনি নিজের মতো করে মাঠে নামতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবারটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান সব কিছুই অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।
প্রস্তাবনা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা
মো: হাদিউজ্জামান এখন শারীরিকভাবে আংশিক পঙ্গু। তাঁর পক্ষে আর আগের মতো শারীরিক শ্রম দিয়ে ব্যবসা বা অন্য কোনো পেশা চালানো সম্ভব নয়। তবে তিনি মনোবলে ভেঙে পড়েননি। তিনি অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং এটিকে প্রসারিত করতে চান। তাঁর প্রস্তাব হলো, এককালীন আর্থিক সহায়তা বা সুদবিহীন ঋণ দেয়া হলে তিনি ব্যবসাকে আরও পেশাদারভাবে গড়ে তুলতে পারবেন। এর মাধ্যমে শুধু নিজেই নয়, তাঁর পরিবারও স্বনির্ভরতা অর্জন করবে। রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আবেদন, তিনি এই দেশের নাগরিক, যিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবনবাজি রেখেছিলেন। আজ যখন তাঁর জীবন সংকটে, তখন রাষ্ট্র যদি পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে ন্যায়ের পরাজয়। তাই দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা, ব্যবসায়িক অনুদান এবং সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (আহত ব্যক্তির নিজস্ব মতামত)
শুরুতে এলিজারো অবস্থায় প্রতি সপ্তাহে ২ বার ড্রেসিং করা হয় এভাবে ৩ মাস অতিবাহিত হলে পরবর্তীতে এলিজারো অবস্থায় বিগত ০৫/০৫/২০২৫ তারিখ পর্যন্ত আমি চিকিৎসা নেই। বর্তমানে আমার এলিজারো অপসারণ করা হয়েছে এবং আমি ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ভবিষ্যতেও ফিজিওথেরাপি নিতে হবে।
প্রস্তাবনা
আমার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আমি অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যবসা পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। এবং ভবিষ্যতে আমি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা করতে চাই। ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করার জন্য এককালীন আর্থিক সহযোগিতা অথবা সুদবিহীন ঋণ পেলে আমার ও পরিবারের জন্য কল্যাণকর হবে বলে আশা করি।
এক নজরে মো: হাদিউজ্জামান
নাম: মো: হাদিউজ্জামান
জন্ম তারিখ: ০২-০৯-১৯৮৩
পিতা: মো: সরোয়ার জাহান, বয়স: ৭২ বছর, পেশা: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
মাতা: মোসা: হালিমা খাতুন, বয়স: ৬২ বছর, পরিবারের সদস্য: ৪ জন
মাসিক আয়: ৪০,০০০
বর্তমান পেশা: ব্যবসা, পূর্বের পেশা: শিক্ষকতা
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ৪২, রোডঃ ০৭, ব্লক: সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: মালতী নগর মাটির মসজিদ, মোল্লা পাড়া ভাটকান্দি রোড, বগুড়া সদর, বগুড়া
পরিবারের বিবরণ
ভাই: মো: হাসানুল ইসলাম, সেনাবাহিনীতে কর্মরত (মেজর)
বোন: জিনাত সুরাইয়া, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, মাস্টার্স
মেয়ে: ফারিহা আফরিন, শ্রেণি: অষ্টম, ভিকারুন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজ
ছেলে: আহনাফ আব্দুল্লাহ, শ্রেণি: তৃতীয়, নিবরাস মাদ্রাসা
আহত হওয়ার স্থান: শান্তা টাওয়ারের সামনে, বি-ব্লক, বনশ্রী, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯/০৭/২০২৪, সময়: দুপুর ২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী: পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍