হোম / আহতদের তালিকা / শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম

শহীদুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ড্রাইভার (সিএনজি চালক)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
১ জানুয়ারি ১৯৮৬, ফেনীর মধুয়াই গ্রামে জন্ম নেন শহীদুল ইসলাম। পিতা আবুল কাশেম ও গৃহিণী মা নুরের নেছারের সাত সদস্যের পরিবারে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। পরিবারের প্রধান আহারসূত্র হিসেবে সিএনজি চালকের কাজ করতেন শহীদুল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটা আন্দোলন সেই রুটিনকে হঠাৎ বদলে দেয়। দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষার্থীরা ন্যায়ের জন্য রাস্তায় নামে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি এবং আওয়ামী সরকারের অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা তাঁকে আন্দোলনের অংশ হতে বাধ্য করে।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নৃশংসতা ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ
শহীদুল ইসলামের ঘটনাটি কেবল একজন নিরস্ত্র মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা নয়; এটি খুনি আওয়ামি দলের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। একজন সাধারণ সিএনজি চালক, যার প্রতিদিনের সংগ্রাম শুধু সংসারের সাতজন সদস্যের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য, তার অপরাধ ছিল কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন, কোনো সংগঠনের কর্মী নন, কেবল একজন সাধারণ মানুষ। তবুও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন ‘শত্রু’, কেবল এই কারণে যে তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর দুইটা। ফেনীর মহীপাল এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছিল। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, সাধারণ মানুষ মিলেই মিছিলের সারি লম্বা হচ্ছিল। শহীদুলের হাতে ছিল কেবল কয়েক বোতল পানি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্ত বা ক্লান্তদের সাহায্য করা। এক সাধারণ কর্মজীবী হয়েও তিনি অনুভব করেছিলেন দেশের ভবিষ্যৎ, মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও একজন সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব।
কিন্তু হঠাৎই সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভেঙে পড়ে। চারদিক থেকে ছুটে আসে সন্ত্রাসীরা। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের উগ্র নেতৃত্বে পরিচালিত অস্ত্রধারী আওয়ামী বাহিনী হঠাৎই লাঠি ও গুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মানুষের উপর। মুহূর্তেই মিছিলের স্লোগান চাপা পড়ে যায় চিৎকার, আতঙ্ক, আর রক্তের স্রোতে। শহীদুল বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক গুলি ছুটে আসে তাঁর দিকে। তাঁর মাথা ও হাতে লাগে চারটি গুলি। রক্তাক্ত শরীর মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়।
প্রতিটি গুলির আঘাত কেবল তাঁর দেহকেই বিদীর্ণ করেনি, বরং ভেঙে দিয়েছে মানবিক নিরাপত্তার মিথ। একজন নিরীহ মানুষ, যে কেবল পানি দিতে এসেছিল, তাকেই লক্ষ্য করে গুলি চালানো, এটাই প্রমাণ করে কতটা ভয়ঙ্কর ও অমানবিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করা করেছিল খুনি হাসিনা ও তার দোসররা। শহীদুলের চোখের সামনে তখন ঝাপসা হয়ে আসছিল দৃশ্য। চারপাশে অসংখ্য আহত, ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ মাটিতে লুটিয়ে আছে, কেউ আবার রক্তে ভিজে কাঁপছে। তবুও, এই অমানবিকতার ভেতরেও মানবতার আলো জ্বলে ওঠে। কয়েকজন সাধারণ মানুষ সাহস করে এগিয়ে আসেন। তাঁরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই শহীদুলকে মাটির উপর থেকে তুলে নেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে পাসপোর্ট অফিসের পাশের একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর আঘাত ছিল এতটাই গুরুতর যে সেখানেই থেমে থাকলে হয়তো জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো না। তাই তাঁকে দ্রুত সিএনজি করে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিন্তু হাসপাতালের পরিবেশও তখন ছিল ভয়ের। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবের ছায়া তখনও ঘিরে রেখেছিল চারদিক। ডাক্তার ও নার্সরা আতঙ্কের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেন, শহীদুলকে জরুরি চিকিৎসা দেন। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই আঘাত মারাত্মক, উন্নত চিকিৎসা ছাড়া বাঁচা কঠিন।
আজও শহীদুলের শরীরে সেই গুলির দাগ বহন করছে তার সংগ্রামের সাক্ষ্য। তাঁর বাম হাত পুরোপুরি কাজ করে না, তবে তাঁর সংগ্রাম ও ধৈর্য্য যেন এক অদম্য প্রতীক। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন নিরীহ মানুষও ন্যায়ের পথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাঁর প্রতিটি ক্ষত কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি সাধারণ মানুষের রক্তাক্ত ইতিহাসের অংশ।

আহত হওয়ার পর
এরপর তাকে সিএনজি যোগে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছেও শান্তি আসে না। কারণ তখন পুরো শহর দাপটে ছিল পুলিশের হুমকি এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলার ছায়া। সাধারণ মানুষের সাহস না থাকলে এমন সময়ে চিকিৎসা পাওয়া এক ধরনের অসম্ভব ব্যাপার হয়ে যেত। হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা সতর্ক করে জানান, দ্রুত উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন না হলে আরও জটিল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
শহীদুল তখন বুঝতে পারেন, এই আহত অবস্থাতেও তার জীবন, স্বপ্ন, এবং পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে। কিন্তু হৃদয়ে এক অদম্য দৃঢ়তা যদিও চারপাশে আতঙ্ক আর অন্ধকার, তিনি জানতেন যে ক্ষুদ্রতম সাহসও প্রতিবাদ ও ন্যায়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি, সমবেদনা এবং সহমর্মিতা যেন এক শক্তির রূপ ধারণ করে শহীদুলের মধ্যে নতুন উদ্যম জাগায়।

চিকিৎসা ও পরবর্তী অবস্থা
শহীদুল ইসলাম প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে কিছু ব্যান্ডেজ ও সাধারণ ওষুধ দেওয়া হলেও তার দেহের ক্ষত এখনও গভীর এবং যন্ত্রণাপূর্ণ ছিল। দেহের আঘাত, মাথার আঘাত এবং হাতের রক্তাক্ত ক্ষত সবই প্রমাণ দিচ্ছিল যে উন্নত চিকিৎসা ছাড়া তিনি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন না। তাই দ্রুত তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তাররা ধৈর্য্য সহকারে অস্ত্রোপচার শুরু করেন। তিনি এতটা আহত যে, প্রাথমিকভাবে শরীর থেকে ৩৪টি গুলি বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাম হাতের একটি গুলি তখনও শরীরে থেকে যায়। অস্ত্রোপচারের পর শহীদুল অনুভব করেন হাতের কার্যকারিতা পুরোপুরি নেই, চলাফেরা সীমিত। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, বাম হাতের অবশিষ্ট গুলিটি বের করা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, পূর্ণ চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
এরপর শহীদুলকে “পিজি হাসপাতালে” নেওয়া হয়, যেখানে আরও একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার অবশিষ্ট ক্ষত নিরাময় করার চেষ্টা করা হয়। তবে বাম হাতের সম্পূর্ণ কার্যকারিতা এখনও ফিরেনি। প্রতিটি দিন ছিল যন্ত্রণার আর শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সংগ্রামের। সাধারণ কাজ, সিএনজি চালানো, ঘরের কাজ সবই সীমিত। কিন্তু তাঁর মনোবল অটুট।

পুনর্বাসন ও স্বপ্ন
শহীদুল ইসলাম এখন ফেনীতে নিজের বাড়িতেই জীবনযাপন করছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, বাম হাতের পূর্ণ চিকিৎসা শেষে আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন। পেশাগত নিরাপত্তা ও একটি স্থায়ী বাড়ির প্রয়োজন। তাঁর কষ্ট ও সাহসের গল্প প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। প্রতিটি গুলির আঘাত কেবল দেহকেই নয়, স্বপ্ন, জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তাকেও ক্ষতবিক্ষত করেছে।




একনজর বিবরণী
নাম : শহীদুল ইসলাম
জন্ম : ০১-০১-১৯৮৬
জন্মস্থান : মধুয়াই, ফেনী
পেশা : ড্রাইভার (সিএনজি চালক)
পিতা : আবুল কাশেম, বয়োবৃদ্ধ
মাতা : নূরের নেছা, গৃহিণী
পরিবার : ৭ সদস্য
ঘটনার স্থান : মহীপাল, ফেনী
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪, দুপুর ২.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍