হোম / আহতদের তালিকা / সাইফ উদ্দিন জুবায়ের
সাইফ উদ্দিন জুবায়ের

সাইফ উদ্দিন জুবায়ের

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
সাইফ উদ্দিন জুবায়েরের জন্ম ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর ফেনী জেলার সোনাগাজীতে। তিনি বর্তমানে আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত একজন ছাত্র। তার স্থায়ী ঠিকানা ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের পালগীরি গ্রামে হলেও বর্তমানে তিনি ফেনী সদর উপজেলার শান্তি রোড এলাকায় বসবাস করেন। তার পিতা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন একজন শিক্ষক, বয়স ৪৬ বছর এবং মাতা বিবি হাজেরা গৃহিণী, বয়স ৪০ বছর। পরিবারের মাসিক আয় ২১,০০০ টাকা, যার উৎস শিক্ষকতা। জুবায়েরের পরিবারে মোট সাতজন সদস্য রয়েছেন। ভাই মনজুর মাওলা হাসনাত বর্তমানে আলিম ২য় বর্ষের ছাত্র এবং বোন সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই জুবায়ের সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হন, তবুও কখনো পিছিয়ে যাননি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে দুপুরে যোহরের নামাজের পর যখন আন্দোলনকারীরা একত্রিত হন, তখন হঠাৎ গুণ্ডাবাহিনী গুলি চালায়। এসময় জুবায়েরকে লক্ষ্য করে ছররা গুলি নিক্ষেপ করা হয়, যার আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন।
আন্দলনে অংশগ্রহণ
৪ আগস্ট, ২০২৪ তারিখটা ইতিহাসে রক্তলেখা হয়ে থাকবে। সারা দেশ উত্তাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। শহরের প্রতিটি গলিতে শোনা যাচ্ছিল প্রতিবাদের স্লোগান, অন্যায়ের শিকল ভাঙার ডাক। সেই ডাক এড়িয়ে থাকতে পারেনি সোনাগাজীর এক কিশোর, সাইফ উদ্দিন জুবায়ের। বয়স তার মাত্র ষোল, কিন্তু বুকের ভেতর ছিল সাহসের অগ্নি।
সাধারণ এক পরিবারের সাধারণ ছেলে হয়েও তার স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ। জুবায়ের শুরু থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সে জানত, এই লড়াই শুধু অধিকার ফেরানোর জন্য নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য, সবার জন্য। পোস্টার লাগানো থেকে শুরু করে মিছিলের সামনের সারি সব জায়গাতেই ছিল তার দৃপ্ত পদচারণা। কিন্তু আন্দোলনের পথ মসৃণ ছিল না। হুমকি, ভয়ভীতি, অপমান এসবের মাঝেও ছেলেটা হার মানেনি। বারবার বলত, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকা মানে অন্যায়কে শক্তি দেওয়া।” আর সেই বিশ্বাস নিয়েই সে হাজির হয়েছিল মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে, ৪ আগস্ট দুপুরে। যোহরের নামাজ শেষে স্লোগানের তালে তালে গর্জে উঠছিল সমবেত কণ্ঠ। হঠাৎই গর্জে উঠল গুলির শব্দ। মুহূর্তে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ রক্তমাখা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। গুণ্ডাবাহিনী ছররা গুলি ছুড়তে লাগল বৃষ্টির ফোঁটার মতো। সেই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে জুবায়ের ভয় পায়নি, দৌড়ায়নি। বরং অন্যদের সরানোর চেষ্টা করছিল।
কিন্তু আওয়ামী হায়েনাদের নির্মম আঘাত এড়াতে পারেনি। একটার পর একটা ছররা গুলি বিদ্ধ হয় তার শরীরে। রক্তে ভিজে যায় জামা, তবুও চোখে অদম্য দৃঢ়তা। ছেলেটা প্রমাণ করেছে, বয়স নয়, বিশ্বাসই আসল শক্তি। ফেনীর রক্তমাখা দুপুর সাক্ষী রইল এক কিশোরের সাহসিকতার। তার ক্ষতচিহ্ন শুধু ব্যথার গল্প নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য ত্যাগের গর্বিত সাক্ষ্য।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বিবরণ
গুলির আঘাতে যখন রক্ত ঝরছিল, চারপাশে তখন ছিল বিশৃঙ্খলা ও আতঙ্ক। সহযোদ্ধারা প্রাণপণ চেষ্টা করছিল তাকে বাঁচানোর। প্রথমে তাকে দেওয়া হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, ব্যথা সহনীয় করার জন্য সহজ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। গুলির আঘাত ছিল গভীর, তীব্র যন্ত্রণায় শরীর কাঁপছিল, চোখে ছলছল পানি। তবুও মুখে ভয় নয়, ছিল দৃঢ় সংকল্প।
এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ফেনী সদর হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তার এক্স-রে করে ভয়াবহ সত্যটি জানান। শরীরে শুধু ছররা গুলিই নয়, একটি বুলেট হাড়ের গভীরে ঢুকে গেছে। বুলেটের আঘাতে হাড়ের চারপাশ ফুলে উঠেছিল, এবং সেই ফুলে ওঠা জায়গা জুবায়েরের ব্যথা আরও তীব্র করছিল।
চিকিৎসকরা তখন তাকে ওষুধ দেন, দীর্ঘ চিকিৎসা শুরু হয়। ব্যথা কমানোর ইনজেকশন, স্যালাইন আর প্রচুর পরিমাণে ওষুধের মাধ্যমে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলতে থাকে। দিন গড়ায়, প্রতিদিন নতুন চেকআপ, নতুন রিপোর্ট, নতুন নির্দেশ। তবুও জুবায়েরের চোখে একটাই বিশ্বাস “আমি ভালো হব, কারণ আমার লড়াই থামবে না।”
বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ। অনেক ঔষধ সেবন এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা কিছুটা কমেছে। কিন্তু শরীরে বুলেটের ক্ষতচিহ্ন আজও তার ত্যাগের স্মৃতি বহন করছে।

সংক্ষেপসার
নাম : সাইফ উদ্দিন জুবায়ের
জন্মতারিখ : ০৩-১০-২০০৮, জন্মস্থান : সোনাগাজী, ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : পালগীরি, ইউনিয়ন : মতিগঞ্জ, থানা : সোনাগাজী, জেলা : ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : এলাকা : শান্তি রোড, থানা ও জেলা : ফেনী সদর, ফেনী
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম : মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন (পেশা: শিক্ষক, বয়স: ৪৬ বছর)
মাতার নাম : বিবি হাজেরা (পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৪০ বছর)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
ভাই : মনজুর মাওলা হাসনাত (আলিম ২য় বর্ষ)
বোন : ৭ম শ্রেণি
ঘটনার স্থান : ফেনী, মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে
ঘটনার তারিখ ও সময় : ০৪/০৮/২০২৪, দুপুর আনুমানিক ১:৫০ মিনিট
আহতের ধরন : একাধিক ছররা গুলি ও একটি বুলেট হাড়ে বিদ্ধ
চিকিৎসা : সদর হাসপাতাল, ফেনী
চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা: বর্তমানে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন নেই

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍