হোম / আহতদের তালিকা / আরাফাত রহমান
আরাফাত রহমান

আরাফাত রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, শাহীন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয় ও শৈশব
২০০৯ সালের ৩১ অক্টোবর, ফেনী জেলার কচুয়া উপজেলার একটি শান্তপল্লী ভূঁইয়ার হাটে এক আশাবাদী সকালের আলোয় জন্ম নেন আরাফাত রহমান। গ্রামের ধুলোভেজা পথ, কাঁচা বাড়ির উঠোন, আর বাতাসে দোল খাওয়া বেলী ফুলের সুবাসের মাঝে বড় হতে থাকে এক দুরন্তপনা। একটি স্বপ্নবান শিশুর নাম ছিল আরাফাত।
ছোট থেকেই ছিল অত্যন্ত মেধাবী, নিরীহ এবং শান্ত স্বভাবেরখেলাধুলা আর পাঠ্যপুস্তকের মাঝখানে যেই শিশুটির দিন কেটে যেত, সে-ই একদিন হয়ে ওঠে পরিবারের সকল ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। বাবা আব্দুল কাদের, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক সময়ের কর্মজীবী মানুষ, বর্তমানে বেকার; আর মা লুৎফুর নাহার, একজন গৃহিণী, যিনি ছেলের চোখের স্বপ্নকে ঘিরেই তার প্রতিটি দিনের প্রার্থনা বুনতেন।
আরাফাতের শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, পরে ভর্তি হন শাহীন একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে তাঁর প্রতিভা আরও বিকশিত হতে থাকে। শিক্ষকদের প্রিয়, সহপাঠীদের ভালোবাসার একজন তাঁর পরিচয় কেবল একজন ছাত্র নয়, একজন স্বপ্নচারী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
পারিবারিক প্রেক্ষাপট
ছয় সদস্যের একটি সাধারণ, কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল পরিবারে বড় হয়ে উঠছে আরাফাত। ভাই রায়হান উদ্দিন, ফেনী টেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী; আর বোন আরজিনা আক্তার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত যেন এক শিক্ষাপ্রেমী পরিবারের আত্মনিবেদিত প্রতিচ্ছবি। পরিবারের একমাত্র স্থায়ী আয় আসে ভাড়া থেকে মাসে প্রায় ১৮,০০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে শিক্ষাবান্ধব স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখাই তাদের প্রতিদিনের সংগ্রাম।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নির্মম শিকারঃ আরাফাত রহমান
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। দিনটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন। সেদিন দুপুর বেলা, প্রায় বেলা ২টা নাগাদ, আরাফাত রহমান মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ছিলেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, ছিলেন না মিছিলে বা কোনো সংঘর্ষে জড়িত। বরং তিনি ছিলেন একজন স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। শুধু ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত হওয়াই ছিল তার "অপরাধ"।
কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ সে বুঝতে পারে, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। জনতার মধ্যে শুরু হয়েছে ছুটোছুটি। কেউ বলছে পুলিশ আসছে, কেউ বলছে সন্ত্রাসীরা ব্রাশফায়ার শুরু করেছে। ভয় আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের কিছু কর্মী ধারালো অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে জনতার দিকে ছুটে আসে। আতঙ্কিত আরাফাত তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে।
তবে যা ঘটলো, তা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
একটি বুলেট এসে সোজা আঘাত করে তার মুখের ওপর। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় সে, কপাল থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। এই সময় তার সহপাঠীরা এগিয়ে এসে তাকে দ্রুত প্রথমিক চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। যদিও অনেকে ভেবেছিল, তার মুখে গুলি লাগেনি, কিন্তু ঘটনার প্রায় ৭০ দিন পর তার কপাল থেকে সেই বুলেট বের করা হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।
সেই সময় সে প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল, কথা বলতে পারছিল না, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তার স্কুলড্রেস যেটি কোনো রাজনীতির প্রতীক নয়, বরং একটি নিরীহ শিক্ষার্থীর পরিচয়পত্র।
বিরোধিতার ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও হামলার শিকার
আরাফাত রহমান কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য নন। সে তো এখনো রাজনীতির অর্থটুকুও পুরোপুরি বোঝে না। তার পরিচয় কেবল একজন শিক্ষার্থী, যে পরিবারের আদরের সন্তান, বন্ধুদের মাঝে প্রাণবন্ত সহপাঠী, আর স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার। তবুও, এই শিশুকিশোরের শরীরেও পড়েছে হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির নিষ্ঠুর থাবা।
এই হামলা প্রমাণ করে, আজকের বাংলাদেশে কেউ নিরাপদ নয়। নিরীহ স্কুলছাত্র পর্যন্ত নয়।
যে সরকার নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য খুনি ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীদের দিয়ে শিশু-কিশোরদের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করে না, সে সরকার আর গণতান্ত্রিক থাকে না। সে হয়ে ওঠে নির্মম, একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী।
চিকিৎসা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, মহিপাল এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর সন্ত্রাসী হামলার সময় গুলিবিদ্ধ হন স্কুলশিক্ষার্থী আরাফাত রহমান। বুলেটটি তার কপালের ভেতরে ঢুকে প্রায় ৭০ দিন পর্যন্ত রয়ে যায়। প্রথমে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন তার মুখে ও কপালে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে বুলেটের অবস্থান স্পষ্ট বোঝা যায়নি। পরবর্তীতে, ছাত্র আন্দোলনের কিছু কর্মীর সহায়তায় তাকে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা স্ক্যান করে নিশ্চিত হন বুলেটটি এখনো তার কপালের ভেতরে রয়ে গেছে। এরপর সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কপাল থেকে বুলেট অপসারণ করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, ধীরে ধীরে তিনি সুস্থতার পথে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন, তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্রাম প্রয়োজন।

একনজরে
নাম : আরাফাত রহমান
জন্মতারিখ : ৩১-১০-২০০৯
জন্মস্থান : কচুয়া, ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী, শাহীন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা: ভূইয়ার হাট, কচুয়া, ফেনী সদর, ফেনী
পিতা : আব্দুল কাদের, বয়োবৃদ্ধ, বয়স: ৬৫ বছর
মাতা : লুৎফুর নাহার, গৃহিণী, বয়স: ৪৪ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই : রায়হান উদ্দিন, শিক্ষার্থী, ফেনী টেকনিক্যাল কলেজ
বোন : আরজিনা আক্তার, শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ঘটনার স্থান : মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে, ফেনী
আক্রমণকারী: আওয়ামী সন্ত্রাসী বাবলু, শাজাহান সাধু ও নেতাকর্মীরা
আহত হওয়ার সময়: ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ২:৩০ মিনিটে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍