হোম / আহতদের তালিকা / দাউদুল ইসলাম
দাউদুল ইসলাম

দাউদুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, ড্যাফডিল ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


জন্মপরিচয়
১৯৯৮ সালের ৮ মে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের বাথানিয়া গ্রামে জন্ম নেন দাউদুল ইসলাম। প্রবাসী পিতা আবুল কালাম ও গৃহিণী মা সাহেনা আক্তারের ছয় সদস্যের পরিবারে বড় হয়ে উঠেন তিনি। পড়াশোনার প্রতি অদম্য ভালোবাসা নিয়ে ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-তে, সেখানে তিনি ই.ঝপ রহ ঊহমরহববৎরহম অধ্যয়ন করছিলেন। একজন সাধারণ ছাত্র, যাঁর স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া, দেশের জন্য কিছু করা।

কিন্তু ২০২৪ সালের ভয়াল জুলাই আন্দোলন তাঁর সেই স্বপ্নগুলোকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
১৯ জুলাই, শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষ করে দাউদুল ইসলাম ঢাকার পথে রওনা দেন। কারণ, দেশের অমানবিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গড়ে তোলা আন্দোলনে তিনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারছিলেন না। রাজধানীর উত্তপ্ত রাজপথে হাজারো তরুণ তখন এক হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যায়বিচারের দাবিতে।
দুপুর আনুমানিক আড়াইটা নাগাদ তিনি পৌঁছান মিরপুর বেনারসি পল্লীর কাছাকাছি এলাকায়। চারপাশে তখন স্লোগান, ব্যানার, মিছিল—ন্যায়ের দাবিতে গর্জে উঠেছে জনতার কণ্ঠস্বর। দাউদুলও মিশে যান সেই ঢেউয়ে।
বিকেল পাঁচটার দিকে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। **মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের সামনে** শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানরত দাউদুলসহ অন্যান্য ছাত্রদের ওপর হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডাররা। শুরু হয় নির্বিচারে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, আর গুলি বর্ষণ।
চারপাশে তখন কেবল রক্ত, চিৎকার আর আতঙ্ক। নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর এমন নৃশংস আক্রমণ যেন পূর্বপরিকল্পিত।
সেই মুহূর্তে দাউদুল ইসলামও ঘাতক পুলিশ কতৃক গুলিবিদ্ধ হন। গুলি লাগে তাঁর কপালে ও বাম চোখের পাশে। ব্যথায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে সহপাঠীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও কয়েকজন সাহসী ছাত্র এগিয়ে আসেন। তাঁরা রক্তে ভেজা দাউদুলকে দ্রুত পাশের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যান।
আহত হওয়ার পর
দাউদুল ইসলামের জীবন যেন মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি যখন রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন, তখন চারপাশে শুধু আতঙ্ক, গুলির শব্দ আর আহত মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল। কয়েকজন সাহসী ছাত্র এগিয়ে এসে তাকে দ্রুত একটি স্থানীয় ফার্মেসিতে নিয়ে যান। সেখানে সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে পান। চোখে ঝাপসা দেখা যাচ্ছিল, মাথায় তীব্র ব্যথা, শরীর ভেঙে আসছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন—গুলির আঘাতে তার অবস্থা মারাত্মক, হয়তো বেঁচে থাকাটাই ভাগ্যের ব্যাপার।
ঠিক এমন সময় দুইজন সাধারণ মানুষ মানবিকতার দায়ে তাকে উদ্ধার করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে কিছুক্ষণ নিরাপদে রাখার পর তারা তার সহধর্মিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্ত্রীর হাত ধরে তিনি রিকশায় করে পৌঁছান ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে। রিকশার প্রতিটি ধাক্কায় তার শরীর কেঁপে উঠছিল, রক্তক্ষরণে তিনি অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থায় চলে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু ইবনে সিনা হাসপাতালেও পরিস্থিতি সহজ ছিল না। সেসময় আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা দেওয়াই হয়ে উঠেছিল সাহসের পরীক্ষা। পুলিশের চাপ,সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের হুমকি—সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল আতঙ্কের ছায়া। অনেক ডাক্তার প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসা করতে ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ, আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানো মানেই ছিল নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলা। তবুও কিছু সাহসী চিকিৎসক মানবিকতার খাতিরে দাউদুলের পাশে দাঁড়ান।
অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। মাথায় এখনও গুলি থেকে যাওয়ায় তার চোখে অস্পষ্টতা ও শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। সেদিনকার অভিজ্ঞতা আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়—গণতন্ত্রের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তাণ্ডব তার জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দিল।
চিকিৎসা
প্রথমে তিনি চিকিৎসা নেন মিরপুর ডেল্টা হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডাক্তাররা দ্রুত মাথায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। কিন্তু বাইরে তখন রাজপথে চলছে রক্তের স্রোত, হাসপাতালগুলোতেও ভর করেছে ভয়—তাই সেই মুহূর্তে অপারেশন সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। প্রতিটি জায়গায় ডাক্তাররা একই পরামর্শ দেন—“অতি দ্রুত মাথায় অস্ত্রোপচার দরকার।” কিন্তু দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, ভয় আর অনিশ্চয়তার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই শুরু হয় ইনফেকশন, মাথা ঘোরা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা।
পরে তিনি আরও চিকিৎসা নেন মিরপুর আলোক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে। কিন্তু এখনও তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নৃশংসতা
দাউদুল ইসলামের গল্প কেবল একটি দুর্ঘটনার কাহিনি নয়—এটি বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নৃশংসতার এক জ্বলন্ত সাক্ষী।
একজন সাধারণ ছাত্র, যার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, যার অপরাধ কেবল ন্যায়ের দাবিতে কণ্ঠ মেলানো—তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হন আরও ১৫-২০ জন ছাত্র। মাটিতে লুটিয়ে পড়া তরুণদের কাতর আর্তনাদও দমাতে পারেনি শাসক দলের বর্বরতা। পুলিশের গুলি, ছাত্রলীগের কুপিয়ে ফেলার হুমকি—সব মিলিয়ে এক রক্তাক্ত দুপুর।
পরিবারের অবস্থা
প্রবাসী পিতার সামান্য আয়ে চলত ছয় সদস্যের পরিবার। মা সাহেনা আক্তার একজন গৃহিণী। দাউদুলের ছোট বোন ছাইমা সুলতানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, ছোট ভাই মোফাচ্ছের হোসেনও ছাত্র। সবার স্বপ্ন ছিল দাউদুল একদিন প্রকৌশলী হয়ে পরিবারের ভরসা হবেন। কিন্তু এখন পরিবারের সেই স্বপ্ন থমকে গেছে।
প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার প্রবাসী আয় দিয়ে কোনো রকমে চলছে সংসার, অথচ দাউদুলের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনেক বেশি অর্থ।
পুনর্বাসন ও স্বপ্ন
আজ দাউদুল ইসলাম বলেন—
“আমার পড়াশোনা শেষ করার স্বপ্ন এখনও আছে। বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে চাই, আবার দাঁড়াতে চাই নিজের পায়ে।”
তাঁর শরীর এখনও গুলির ক্ষত নিয়ে সংগ্রাম করছে, কিন্তু তাঁর মনোবল ভেঙে যায়নি। তিনি জানেন, তাঁর রক্ত বৃথা যাবে না।

নাম : দাউদুল ইসলাম
জন্ম : ০৮/০৫/১৯৯৮
জন্মস্থান : বাথানিয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী
পেশা : ছাত্র, ড্যাফডিল ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)
পিতা : আবুল কালাম (প্রবাসী)
মাতা : সাহেনা আক্তার (গৃহিণী, ৪৫ বছর)
পরিবার : ৬ সদস্য
ঘটনার স্থান : মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍