হোম / আহতদের তালিকা / মো. একরামুল হক রাজিব
মো. একরামুল হক রাজিব

মো. একরামুল হক রাজিব

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ইলেট্রিক্যাল মিস্ত্রি,

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
বাংলার ফেনীর এক প্রত্যন্ত গ্রাম তেতৈয়, ছনুয়ো ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ জন্ম নিয়েছিলেন মো. একরামুল হক রাজিব। তাঁর জন্মস্থলটি যেন বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ ইতিহাসের অংশ। যেখানে মাঠে ফসল গজায়, অথচ জীবন গজায় কষ্টে, সংগ্রামে, সাধনায়।
তাঁর পিতা সামছুল হক ভূঞা, বয়সের ভারে ন্যুব্জ (৯০), আর মাতা হালিমা খাতুন (৮০), আজও গ্রামের সেই পুরনো টিনের ঘরে ছেলেকে মনে করে আশীর্বাদ ছড়ান। একরামুলের জীবন শুরু থেকেই ছিল লড়াইয়ের নামান্তর। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তাঁর শিক্ষাজীবন থেমে গেল অকালেই, কিন্তু থেমে যায়নি জীবন সংগ্রাম। অল্প বয়সেই পরিবারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি, হয়ে ওঠেন একজন ইলেকট্রিক্যাল মিস্ত্রি হাতে হাতুড়ি, পকেটে সিধে তার, আর চোখে এক অনড় স্বপ্ন।
বর্তমানে তিনি তাঁর স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় ফেনী সদরের ছনুয়ো ইউনিয়নের তেতৈয় গ্রামেই বসবাস করেন। কৃষিভিত্তিক আয় মাসিক প্রায় ১০,০০০ টাকা। তেতৈয় গ্রামের কাঁচা পথ, ধুলোমাখা সন্ধ্যা, আর মাথার ঘামে রাঙানো প্রতিটি সকাল তাঁর শৈশবকে রচনা করেছে। কিন্তু এই মাটির সন্তান শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষই নন তিনি প্রতিবাদের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরও। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্পষ্ট ও সাহসিকতাপূর্ণ।
আন্দোলনে অংশগ্রহন ও অবদান
হাসিনা সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ
২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার সরকার ধাপে ধাপে গণতন্ত্রকে দমন করে একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটতে থাকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ, বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের গুম-খুন-হামলা সবই প্রমাণ করে, এই সরকার জনগণের নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে কোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত একটি শাসনব্যবস্থা।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের চূড়ান্ত রুখে দাঁড়ানো। এটিকে ‘কোটা আন্দোলন’ বললেও, বাস্তবে এটি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক বিপ্লব যেখানে ছাত্ররা আর চুপ থাকেনি, মা-বোনেরা পথে নেমেছে, আর গ্রামের মজদুর, ইলেকট্রিক্যাল মিস্ত্রি একরামুলরাও এই সংগ্রামে হয়েছেন যোদ্ধা।

লড়াইয়ের মাটিতে সাহসের মুখচ্ছবি
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল না কেবল একটি দাবির গর্জন, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি বাঁকবদলের প্রত্যাশা। যেখানে ছাত্র-জনতার কণ্ঠ এক হয়ে বলেছিল, "এক দফা, এক দাবি, হাসিনা, তুই কবে যাবি!" এই স্লোগান শুধু শব্দ ছিল না, ছিল বুকে জমে থাকা ক্ষোভ, চোখে জ্বলে থাকা আলো, আর পথে থাকা হাজারো পায়ের সাহসিক গর্জন।
এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট, ফেনীর মহিপাল জিরো পয়েন্টে ছাত্র ও জনতা যখন শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায় থাকা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশপ্রেমিক জনতার উপর শুরু হয় নিষ্ঠুর হামলা, লাঠি-গুলির তাণ্ডব, মোটরসাইকেল লুটপাট ও রক্তাক্ত সহিংসতা। এই রক্তাক্ত চিত্রের মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. একরামুল হক রাজিব একজন মেঠো পথে বড় হওয়া, স্বল্পশিক্ষিত, কিন্তু প্রবল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সংগ্রামী মানুষ।
যখন চারদিকে আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি, যখন ছাত্রেরা ছত্রভঙ্গ, তখন রাজিব পিছু হটেননি। হাতের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু ছিল সাহস। তিনিই ছিলেন সেই কণ্ঠস্বর, যিনি বলেছিলেন: "ভাইরা, ভয় নেই। এই দেশ আমাদের, লড়াইও আমাদের!" সন্ত্রাসীদের দমন-পীড়ন আর পুলিশের গুলির মধ্যেও তিনি জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। আহতদের কাঁধে তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌছাতে সাহায্য করেন। কেউ যখন দিকভ্রান্ত, তখন তিনি ছিলেন তাদের দিকনির্দেশক। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও রাজিবের মতো মানুষদের কারণে এই আন্দোলনের আগুন নিভে যায়নি।
এই দৃশ্যপট শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়, বরং এটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির একটি প্রতীকচিত্র যেখানে হাসিনার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, মহিপাল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর সন্ত্রাসী হামলার সময় মো. একরামুল হক রাজিব গুলিবিদ্ধ হন। গুলির আঘাতে তিনি ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখান থেকেই গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিনই তার প্রথম অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে এতেই শেষ হয়নি তার যন্ত্রণা। গুলির আঘাতে তার শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তলপেট ও গোপন অঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত জখম। পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে, পরদিন আবার অস্ত্রোপচার করতে হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন
এখনো শরীরের কিছু অংশে চলাচলে জটিলতা রয়ে গেছেএ নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ, ও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন, আরও একটি বড় অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে রাজিব শয্যাশায়ী। তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা বা কাজকর্ম করতে পারছেন না। পরিবারিকভাবে কৃষিনির্ভর সীমিত আয়ের এই মানুষটির পক্ষে চিকিৎসার খরচ বহন করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থায় একরামুল হক রাজিব শুধু একজন আহত ব্যক্তি নন, তিনি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রমাণ, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন সময় এসেছে জনগণ যেন তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

নাম : মো. একরামুল হক রাজিব
জন্মতারিখ : ১ মার্চ ১৯৮৫
জন্মস্থান : তেতৈয়, ছনুয়ো, ফেনী
পেশা : ইলেট্রিক্যাল মিস্ত্রি,
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : তেতৈয়, ১০নং ছনুয়ো ইউনিয়ন, ফেনী সদর, ফেনী
পিতা : সামছুল হক ভূঞা, বয়স ৯০ বছর
মাতা : হালিমা খাতুন, বয়স ৮০ বছর
আয় : প্রায় ১০,০০০ টাকা (কৃষি)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ঘটনার স্থান: মহিপাল জিরো পয়েন্ট, ফেনী
আক্রমণকারী: আওয়ামী সন্ত্রাসী করিমুল্লাহ ও তার বাহীনি
আহত হওয়ার সময়: ৪ আগস্ট বিকাল ২:৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍