হোম / আহতদের তালিকা / মো: ইউসুফ
মো: ইউসুফ

মো: ইউসুফ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: শিক্ষক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
মো: ইউসুফের জন্ম ১৯৯৮ সালের ২৫ জানুয়ারি, ফেনী জেলার এক সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী ও পরিশ্রমী ছিলেন। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ আর স্বপ্ন তাকে শিক্ষকতার পথে এগিয়ে দেয়। বর্তমানে তিনি ফেনী সদর উপজেলার শাহিন একাডেমি স্কুলে খন্দকালীন সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতা শুধু তার পেশা নয়, বরং এটি তার জীবনের স্বপ্ন ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
তার শিকড় গ্রোথিত ফেনী সদর উপজেলার ৮নং বলিয়া ইউনিয়নের উল্টর ধলিয়া গ্রামে, তবে কাজের সুবাদে বর্তমানে তিনি ফেনী শহরের নাজির রোডের পাঠান বাড়ি রোড এলাকায় বসবাস করেন। পারিবারিক জীবনে ইউসুফ অনেকটা সংগ্রামী। তার পিতা ছায়েদুল হক ইন্তেকাল করেছেন বহু আগেই। মা ফেরদৌস আরা বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৪৮ বছর। সংসারের প্রধান দায়িত্ব এখন ইউসুফের কাঁধে।চার সদস্যের ছোট্ট এই পরিবারে ভাই মো: ইসমাইল আলিয়া মাদরাসায় ফাজিল শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন, বয়স ২৪ বছর। আর বোন আয়েশা আক্তারও একই শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, বয়স ২০ বছর। মা, ভাই-বোনের স্বপ্ন পূরণের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন ইউসুফ। মাসিক নির্দিষ্ট কোনো আয় না থাকলেও শিক্ষকতার সামান্য উপার্জন দিয়েই তিনি সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংসারের অভাব-অনটন, পিতৃহারা জীবনের কষ্ট, আর ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদই ইউসুফকে প্রতিদিন নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য আর শিক্ষার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা তাকে শুধু একজন শিক্ষক নয়, বরং পরিবারের জন্য আশ্রয়স্থল করে তুলেছে.
আন্দলনে অংশগ্রহণ
৪ আগস্টের দিনটি আমার জীবনে দুঃস্বপ্নের মতো অমলিন হয়ে আছে। সকাল ১১টা থেকেই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী হাজার হাজার ছাত্র-জনতা মহিপাল মূল চত্বরে সমবেত হয়েছিল। চারদিক জুড়ে ছিলো স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত মানুষের ঢল। আমরা সবাই একসাথে নিরস্ত্রভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম, কোনো ভাঙচুর নয়, কোনো সহিংসতা নয়। আমাদের হাতে ছিল কেবল মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা আর অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার। দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে আমাদের একাংশ যোহরের নামাজ আদায় করতে যায়, বাকিরা ময়দানে থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যায়। আমরা যখন নামাজ শেষে বের হলাম, হঠাৎ চারদিক থেকে বজ্রপাতের মতো মহামুহ গুলির শব্দ কানে এলো। মুহূর্তেই বাতাস কেঁপে উঠলো, চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল।
আমরা তাকবীরের স্লোগান দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, কারণ আমরা নিরস্ত্র ছিলাম, আমাদের বিশ্বাস ছিল সত্যের জয়ে। কিন্তু ঘাতক বাহিনী সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো গুলি চালিয়ে। ওপেন ফায়ারে অসংখ্য ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমি নিজেও হাটুতে প্রচণ্ড গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যাই, পা থেতলে যায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ, আহতদের আর্তচিৎকারে আকাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। আমরা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ, অথচ ঘাতকরা আমাদের ওপর যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করলো।
অতঃপর অনেক কষ্টে প্রাণ বাঁচিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাই, যেখানে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসাই নিতে পারি। আজও হাঁটুর সেই ক্ষত বহন করছি, মাঝে মাঝে অসহ্য ব্যথা মনে করিয়ে দেয় সেই নৃশংস দিনটির কথা। আমি জানি, আমি দারিদ্র পরিবারের সন্তান। এই দারিদ্র‍্যরে সংসারে আমার প্রতিটি দিনই সংগ্রামের। তবুও দেশের জন্য, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আমি জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। আমাদের রক্তে ভিজে গেছে মহিপালের মূল চত্বর। অথচ আমরা কিছু চাইনি। চেয়েছিলাম ন্যায়, চেয়েছিলাম সমান অধিকার। কিন্তু ঘাতক শাসকরা আমাদের কণ্ঠরোধ করতে গুলি চালিয়েছে, আমাদের স্বপ্নকে রক্তে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছে। আমাদের এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। আজও যখন হাঁটুর ব্যথা আমাকে কুঁড়ে খায়, তখন মনে হয়, এ কষ্ট আমার নিজের নয়, এ কষ্ট সমগ্র বঞ্চিত মানুষের। আমরা প্রমাণ করেছি, স্বল্প আয়ে জীবন চালালেও, দেশের জন্য রক্ত দিতে পিছপা নই। আমাদের এই রক্তের হিসাব একদিন অবশ্যই ঘাতকদের দিতে হবে।

চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বিবরণ
৪ আগস্টের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর আমি গুরুতরভাবে আহত হই। সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে আমার বাম হাঁটুতে। হাঁটু ফুলে যায় এবং থেতলে যায়, প্রচণ্ড ব্যথা আমাকে অচল করে ফেলে। পাশাপাশি ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলের পাশ দিয়ে গভীরভাবে কেটে যায়, যা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর সেখানে মোট ৬টি সেলাই দেওয়া হয় এবং পুরো অংশটি প্লাস্টার করা হয়। সেই অবস্থায় প্রায় এক মাস আমাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়, চলাফেরা তো দূরের কথা, সামান্য নড়াচড়াও সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, যেখানে একদিকে সেলাই ও প্লাস্টারের ব্যথা, অন্যদিকে হাঁটুর ফোলা ও থেতলানোর যন্ত্রণা আমাকে একপ্রকার অসহায় করে তোলে।
চিকিৎসার শুরুতে শুধু প্রাথমিক সেবা পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সেলাই, প্লাস্টার এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চলে। কিন্তু আজও হাঁটুর সেই ক্ষত পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি, যা আমাকে সেই নৃশংস ঘটনার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বলতে গেলে এই আঘাত শুধু আমার শরীরকে নয়, আমার জীবনযাত্রাকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল।
একনজরে ব্যক্তির পরিচয়
নাম : মো: ইউসুফ
জন্ম তারিখ : ২৫-০১-১৯৯৮,
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : শিক্ষক,
প্রতিষ্ঠান : শাহিন একাডেমি স্কুল, ফেনী (খণ্ডকালীন সহকারী শিক্ষক)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: উল্টর ধলিয়া, ইউনিয়ন: ৮ নং বলিয়া, থানা : ফেনী সদর, জেলা : ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা : পাঠান বাড়ি, নাজির রোড, থানা: ফেনী সদর, জেলা : ফেনী
পিতা : মো: ছায়েদুল হক, (মৃত),
মাতা: ফেরদৌস আরা বেগম
পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৪৮ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪ জন (মা, ভাই, বোন ও ইউসুফ)
ভাই : মো: ইসমাইল, বয়স: ২৪, পেশা : ছাত্র, আলিয়া মাদরাসা, শ্রেণি: ফাজিল
বোন : আয়েশা আক্তার, বয়স: ২০, পেশা : ছাত্রী, আলিয়া মাদরাসা, শ্রেণি: ফাজিল

ঘটনার স্থান : মহিপাল, ফেনী, ফ্লাইওভারের নিচে
ঘটনার তারিখ ও সময়: ০৪-০৮-২০২৪, দুপুর ২:১৫ মিনিট
আহতের ধরণ: বাম হাঁটু থেঁতলে যায় ফলে এখনও তীব্র ব্যথা রয়েছে। ডান পায়ে গভীর ক্ষত, ৬টি সেলাই ও প্লাস্টার
আহতের কারণ: বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ
বর্তমান অবস্থা : মাঝে মাঝে তীব্র ব্যাথা অনুভূত হয়
চিকিৎসা প্রস্তাবনা: দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍