হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবু নাছের
মো: আবু নাছের

মো: আবু নাছের

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চাকরি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
২০০১ সালের ১ জানুয়ারি ফেনী জেলায় জন্ম নেন মো: আবু নাছের। বাবা মো: আবু তাহের একজন চাকুরিজীবী, বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। মা লায়লা বেগম একজন সাধারণ গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক অবস্থাটা মধ্যবিত্ত হলেও বাবা মায়ের স্নেহ-ভালোবাসায় নাছেরের শৈশবটা কেটেছিল তুলনামূলক আনন্দময়। পাঁচজনের ছোট সংসারে ভাইবোনদের মধ্যে বড় ভাই আবু মনসুর ছিলেন নাছেরের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। শৈশব থেকেই নাছের ছিলেন পরিশ্রমী ও সৎ। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজেও আগ্রহ দেখাতেন। তার গ্রামের বাড়ি ছিল ফেনীর সোনাগাজী থানার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামে। গ্রামীণ পরিবেশের সরলতা, গ্রামের মাঠ-ঘাট, খেলা আর পড়াশোনার মাঝে দিনগুলো কেটেছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি ধীরে ধীরে পরিবারের দায়িত্ব নিতে শুরু করেন।
পরিবারের সীমিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ত প্রায়ই। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি স্থানীয়ভাবে চাকরি করেন এবং পরবর্তীতে ধলিয়া বাজারের "এছাক এন্ড সন" নামক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হন। সেখানেই তিনি চাকুরীজীবী হিসেবে পরিচিতি পান। একদিকে জীবিকার সংগ্রাম, অন্যদিকে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল নাছেরের চরিত্র।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে যখন সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝড় ওঠে, তখন তরুণ প্রজন্মের মত আমরাও আশা করেছিলাম দেশে সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি হবে, দুর্নীতি ও অবিচারের শৃঙ্খল ভাঙবে। মোঃ আবু নাছের তখন আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু সাধারণ কর্মী ছিলেন না; বরং আন্দোলনের প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। তরুণদের সাহস যোগাতেন, নানা রকম পরামর্শ দিতেন। ফেনীতে অবস্থানরত ছাত্রদের সংগঠিত করতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে অন্যরা ভয় পেত, সেখানে নাছের নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়ে যেতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অটল। তাই অনেকেই তাকে নেতৃত্বশীল কর্মী হিসেবে চিনতে শুরু করে। কিন্তু এর সাথে সাথে আওয়ামী লীগপন্থী সন্ত্রাসীদের চোখেও তিনি ‘বড় হুমকি’ হয়ে ওঠেন। তারা গোপনে তাকে নজরদারিতে রাখছিল।

আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ২৭ জুলাই, রাত প্রায় আটটা। সেদিন সন্ধ্যায় নাছের এশার নামাজ শেষে ধলিয়া বাজারের তার কর্মস্থল দোকানে বসে ছিলেন। অল্প কিছুক্ষণ আগেও তিনি সাধারণ ক্রেতাদের সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ করে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের একটি দল দোকানের বাইরে অবস্থান নেয়।
তারা আগে থেকেই নাছেরকে নজরে রেখেছিল। সুযোগ বুঝে হঠাৎ আক্রমণ চালায়। দোকান থেকে তাকে টেনে বের করে একটি অন্ধকার সরু গলিতে নিয়ে যায়। সেখানেই শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। লাঠি, রডসহ ভারী অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়। আঘাতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কানের পর্দা ফেটে যায়, শরীরজুড়ে ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়। বারবার আঘাত করতে করতে তারা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। সেই রাতের আতঙ্ক, অন্ধকার গলি, নির্যাতনের অসহ্য ব্যথা আজও নাছের ভুলতে পারেননি।
চিকিৎসা ও বর্তমান পরিস্থিতি
আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ফেনী লাইফ কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই প্রাথমিক চিকিৎসা পান তিনি। কিন্তু টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি। ডাক্তাররা বলেছিলেন কানের পর্দা ফেটে গেছে, নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। কিছু দিন ওষুধ সেবন করা হলেও চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখনো মাঝেমধ্যে তিনি তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন। স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে গেলেই কানের যন্ত্রণা মাথার ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি।
তবে চিকিৎসার পাশাপাশি তার দরকার পুনর্বাসন। তিনি চান আবার ছোটখাটো দোকান দাঁড় করাতে, যাতে পরিবার চালানো যায়। মূলধন ও সামান্য সহযোগিতা পেলে তিনি নিজের জীবনকে আবার নতুন করে দাঁড় করাতে পারবেন। একইসাথে পড়াশোনা ও স্কলারশিপের সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে পরিবারের হাল ধরতে সক্ষম হবেন।
আবু নাছের কেবল একজন আহত তরুণ নয়, তিনি একজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সংগ্রামী তরুণ। নতুন বীজয়ের ইতিহাস। শারীরিক যন্ত্রণা, আর্থিক অনটন কোন কিছু তাকে দমাতে পারেনি। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, ন্যায়ের লড়াই একদিন সফল হবেই।

একনজরে সংক্ষিপ্তসার
নাম : মো: আবু নাছের
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ২০০১, জন্মস্থান : ফেনী, নিজ জেলা : ফেনী
পেশা : চাকরি, প্রতিষ্ঠান: এছাক এন্ড সন, ধলিয়া বাজার, ফেনী সদর, ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম : লক্ষীপুর, ইউনিয়ন : মঙ্গলকান্দি (৩নং), থানা : সোনাগাজী, জেলা : ফেনী
পিতা : মো: আবু তাহের, পেশা ও বয়স : চাকরি, বয়স ৫০ বছর
মাতা : লায়লা বেগম, পেশা ও বয়স : গৃহিণী, বয়স ৪০ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন, বাবা, মা, ভাই-২ জন (১. আবু মনসুর (২৯), ছাত্র ২. আবু নাছের)
ঘটনার স্থান : ধলিয়া বাজার, ফেনী সদর, ফেনী
আহত হওয়ার সময়কাল : ২৭ জুলাই ২০২৪, রাত ৮:০০ টা
আক্রমণকারী : ফেনি জেলার ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাস বাহিনী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍