হোম / আহতদের তালিকা / নুর আহাদ পাটোয়ারী
নুর আহাদ পাটোয়ারী

নুর আহাদ পাটোয়ারী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
২০০০ সালের ৪ নভেম্বর ফেনী জেলার ফুলগাজী থানার জি এম হাট ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামে জন্ম নেয় নুর আহাদ পাটোয়ারী। জন্ম থেকেই তিনি ছিলেন এক স্নিগ্ধ গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছেলে। বাবা আবু তৈয়ব পাটোয়ারী সরকারি চাকুরিজীবী, মা দিল আরা বেগম একজন স্নেহময়ী গৃহিণী। সংসারের মোটামুটি ভালো অবস্থাতেই তিনি বড় হয়েছেন। বাবার মাসিক আয় ছিল প্রায় ৩০,০০০ টাকা, যা দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার চলে যেত। চার ভাইবোনের মধ্যে নুর আহাদ ছিলেন ছোট। বড় বোন তহুরা জাহান ও মেঝ বোন তানিয়া আক্তার সংসারী, ভাই নূর মোহাম্মদ তানভীর হয়ে নিজ পরিবারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে ছোট ছেলে হিসেবে বাবা-মায়ের সব আশা-ভরসা ছিল নুর আহাদের ওপর।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন পড়াশোনায় মনোযোগী। গ্রামের মাঠে খেলাধুলা, স্কুলে মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবার প্রিয় হয়ে উঠা এসব ছিল তার শৈশবের সঙ্গী। পরবর্তীতে ভর্তি হন ফেনী সরকারি কলেজে। তিনি একজন পরিশ্রমী ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত হন।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আহত হওয়ার ঘটনা
২০২৪ সালে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে আবারও শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। পূর্বে ২০১৮ সালে এ আন্দোলনের সাক্ষী ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম। এবারও শিক্ষার্থীরা নেমে আসে ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। ফেনী সরকারি কলেজের ছাত্র হিসেবে নুর আহাদও তার বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে কোটা সংস্কার অপরিহার্য। প্রতিদিন মিছিল, স্লোগান আর সভায় তার উপস্থিতি তাকে স্থানীয়ভাবে এক পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল। ৪ আগস্ট ২০২৪, সেই দিনটিও ছিল আন্দোলনের আরেকটি কর্মসূচির দিন। সকালে মিছিল শেষে তিনি ফেনীর মহিপাল এলাকায় ছিলেন। বিকেলে নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে, ইসলামপুর রোডের মাথায় তার জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ মুহূর্ত। আছরের নামাজ শেষে জহিরিয়া মসজিদ থেকে বের হয়ে যখন নুর আহাদ ইসলামপুর রোডের মাথা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ স্থানীয় আওয়ামীলীগের সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনী তার ওপর হামলা চালায়।
কালা মোহনের নেতৃত্বে গুলি ছোড়া হয়, আর শর্টগানের ৫৪টি স্প্লিন্টার ছিন্নভিন্ন করে দেয় নুর আহাদের শরীর। তার বুক, হাত, পা ও মুখ রক্তে ভেসে যায়। এক মুহূর্তে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে পড়ে যান তিনি। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশের মানুষ দৌড়ে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত নুর আহাদকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে জি এম হাটে ডাঃ এসকান্দারের ফার্মেসিতে নেওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসা
কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা যথেষ্ট ছিল না। শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্প্লিন্টারগুলো তার অবস্থাকে জটিল করে তুলছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা সিএমএইচ-এ পাঠানো হয় ১৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে। সেখানে কিছু অস্ত্রোপচার হয়, তবে সব স্প্লিন্টার বের করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৯ অক্টোবর ২০২৪-এ তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখনো তার শরীরে প্রায় ২০টির মতো স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে। নুর আহাদের চিকিৎসার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরে থাকা স্প্লিন্টার বের করা জরুরি।
পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। কর্মসংস্থানের জন্য তাকে সহায়তা প্রয়োজন, কারণ তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ বর্তমানে সংকটে রয়েছে। এই গল্প শুধু নুর আহাদের নয়—এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ত্যাগ ও সংগ্রামের এক প্রতিচ্ছবি, যেখানে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জীবনের মূল্য দিতে হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে।

একনজর বিবরণী
নাম : নুর আহাদ পাটোয়ারী
জন্ম তারিখ : ৪ নভেম্বর ২০০০
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : ফেনী সরকারী কলেজ
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম : লক্ষীপুর, ইউনিয়ন : জি এম হাট, থানা : ফুলগাজী, জেলা : ফেনী
পিতার নাম : আবু তৈয়ব পাটোয়ারী
মায়ের নাম : দিল আরা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : সরকারি চাকরি, বয়স ৫৫ বছর
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, বয়স ৪৮ বছর
মাসিক আয় : ৩০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : চাকরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. তহুরা জাহান, বয়স: ৩৬, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. তানিয়া আক্তার, বয়স: ৩৩, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
৩. নুর মোহাম্মদ তানভীর, ছাত্র
ঘটনার স্থান : ইসলামপুর রোডের মাথা-পাচগাছিয়া রোড
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাস কালা মোহন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍