হোম / আহতদের তালিকা / শেখ মোহাম্মদ শাহাদত উল্যাহ
শেখ মোহাম্মদ শাহাদত উল্যাহ

শেখ মোহাম্মদ শাহাদত উল্যাহ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা (লাইটিং)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৯৮৬ সালের ২০ মার্চ ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামে জন্ম নেন শেখ মোঃ শাহাদাত উল্লাহ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও কৌতূহলী। তাঁর বাবা শেখ আহমেদ ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ, যিনি পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গেছেন আজীবন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাবার অকাল মৃত্যু শাহাদাত উল্লাহকে ছোট বয়স থেকেই দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে। মা করিমন নেছা এখনো জীবিত আছেন, বয়স ৭৩ বছর। তিনি একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও সাহস ও ধৈর্যের প্রতীক। সংসারের প্রতিটি সংকটে তিনি ছিলেন দৃঢ়, আর তাঁর সন্তানদের বড় করে তুলতে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন। গ্রামীণ পরিবেশেই শাহাদাত উল্লাহর বেড়ে ওঠা। পশ্চিম ছাগলনাইয়ার সরল জীবন, নদী-খাল, মাঠ আর স্কুলের দিনগুলো তাঁকে গড়ে তোলে পরিশ্রমী ও সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। বড় হয়ে তিনি ব্যবসার পথে হাঁটেন এবং ফেনী শহরে লাইটিং ব্যবসা শুরু করেন। সততা ও পরিশ্রমের কারণে তাঁর ব্যবসা ধীরে ধীরে জমে ওঠে। পরিবার, মা এবং নিজের সন্তানদের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্নই ছিল তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন। তরুণ-যুবক, ছাত্র-ছাত্রী, এমনকি শ্রমজীবী মানুষও এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘদিনের অবিচার আর বৈষম্যের প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নামে। শাহাদাত উল্লাহ ব্যবসায়ী হলেও, সমাজ সচেতন এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় কণ্ঠস্বর ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ আন্দোলন কেবল ছাত্রদের নয়, বরং দেশের সবার আন্দোলন। কারণ, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে এর প্রভাব পড়বে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। তাই তিনি নিয়মিত আন্দোলনে অংশ নিতেন। ১৭ জুলাই, ১৯ জুলাই, ২২ জুলাই এবং ২৩ জুলাই এই চার দিনে আন্দোলনকে ঘিরে ফেনীতে ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হয়। ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা চালায়। পুলিশও হামলাকারীদের সহযোগিতা করে। শাহাদাত উল্লাহ প্রতিদিনের মতো সেদিনও শহীদ মিনারের সামনে গিয়েছিলেন। মনে হয়েছিল, হয়তো শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায় করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেদিন তাঁর জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকার অধ্যায়।
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
১৭ জুলাই দুপুরে ফেনী শহীদ মিনারের সামনে আন্দোলনে যোগ দেন শাহাদাত উল্লাহ। হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সমাবেশে হামলে পড়ে। দৌড়ে পালানোর সুযোগ না পেয়ে শাহাদাত উল্লাহও তাদের টার্গেটে পরিণত হন। তাকে লাঠি, রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে বেদম মারধর করা হয়। তাঁর মাথায় এবং পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত তৈরি হয়। অসহায় অবস্থায় পড়ে গেলে স্থানীয় কিছু মানুষ এগিয়ে আসে এবং মোহাম্মদ হামিদ নামের এক শুভানুধ্যায়ী তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে এখানেই তাঁর দুর্ভোগ শেষ হয়নি। ২২ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় নিজ এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। সিভিল ড্রেসে আসা পুলিশ সদস্যরা তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করে থানায় নিয়ে যায় এবং চারটি মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে প্রেরণ করে। রিমান্ডে নিয়েও তাঁকে নির্যাতন করা হয়। ফলে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি।
চিকিৎসা ও পরবর্তী সংগ্রাম
আঘাত পাওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হন শাহাদাত উল্লাহ। সেখানে মাথা, পা ও পিঠের চিকিৎসা চলে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসেন এবং স্কয়ার হাসপাতালে আরও চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
কিন্তু নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ খুব একটা পাননি। কারণ, হামলার পরপরই তাঁকে জেলে পাঠানো হয়। জেলে ২২ দিন ছিলেন তিনি। ৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পরও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে। ততদিনে পরিবার আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন পরিবার। আজও সেই আঘাতের দাগ বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। মাথার ব্যথা, পায়ের যন্ত্রণা এবং মানসিক চাপ তাঁকে কাবু করে রাখে। তবু তিনি মনে করেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানেই জীবনের মর্যাদা রক্ষা করা।

আহত ব্যক্তির একনজর বিবরণী
নাম : শেখ মোহাম্মদ শাহাদত উল্যাহ
জন্ম তারিখ : ২০ মার্চ ১৯৮৬, জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : ব্যবসা (লাইটিং)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম ছাগলনাইয়া, ইউনিয়ন : ছাগলনাইয়া পৌরসভা, থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা : ফেনী

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : শেখ আহমেদ (মৃত)
মায়ের নাম : করিমের নেছা, পেশা ও বয়স : গৃহিণী, বয়স ৭৩ বছর
মাসিক আয় : ২০ হাজার, আয়ের উৎস: ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৩ জন
সন্তানের বিবরণ
১. শেখ মো: আয়াত উল্লাহ, বয়স : ৩, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে

ঘটনার স্থান : ফেনী, শহীদ মিনার সংলগ্ন
আহত হওয়ার সময়কাল : ১৭, ১৯, ২২, ২৩ জুলাই ২০২৪ (আন্দোলনের শুরু থেকেই ছিলেন সরব)
আক্রমণকারী : ফেনী জেলার আওয়ামী ও যুবলীগের সন্ত্রাস কর্মী বাহিনী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍