হোম / আহতদের তালিকা / মো. আবদুল মালেক
মো. আবদুল মালেক

মো. আবদুল মালেক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো. আবদুল মালেক নোয়াখালীর চাটখিলের এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া সিকিউরিটি গার্ড, যিনি পরিবার-সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালাতেন। ২১ জুলাই ২০২৪ সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশি গুলিতে তার বাম হাত চূর্ণ হয়ে যায়, আর কখনো স্বাভাবিকভাবে কাজ করার মতো অবস্থায় নেই। এই আঘাতে তার আয় বন্ধ হয়ে পরিবারটিও চরম সংকটে পড়ে। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আজ তিনি পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং ন্যায্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

একটা গুলি শুধু আমার হাত নয় পুরো জীবনটা থামিয়ে দিয়েছে
বাম হাতে গুলিবিদ্ধ
মো: আবদুল মালেক
পেশা: সিকিউরিটি গার্ড
ক্রমিক: ০০৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০০৫
যেখান থেকে শুরু
মো: আবদুল মালেক, বয়স ঘাট। নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার সাহাপুর গ্রামের মানুষ তিনি। একটি গরিব ঘরে জন্ম, জীবনের শুরু থেকেই অভাবকে সহচর করে বড় হয়েছেন। বাবা খায়েজ আহম্মদ ছিলেন দিনমজুর, অনেক আগেই মারা গেছেন। সংসারের বড় সন্তান হিসেবে ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মালেক। ঢাকায় এসে তিনি যে কাজটি পেয়েছিলেন, তা হলো একটি বহুতল ভবনের নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে নিযুক্তি।
সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে প্রতিদিন সকালে তিনি গেটের সামনে দাঁড়াতেন, ভবনের মানুষদের সালাম দিতেন, দায়িত্ব পালন করতেন।
নিঃশব্দ, নিরলস, পরিশ্রমী এই মানুষটি কখনো উচ্চৈস্বরে কিছু বলেননি, কিন্তু পরিবারের জন্য তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসই যেন ছিল সংগ্রাম। দুই সন্তানের স্কুলের খরচ, বৃদ্ধা মায়ের ওষুধ, সংসারের চাল-ডাল সবকিছু চলে সেই সামান্য বেতনের ওপর ভর করে। তিনি ছিলেন পরিবারের খুঁটি। ঘরটা ছোট হলেও কষ্ট করে দাঁড় করিয়েছিলেন টিন-কাঠে। নিজস্ব জমি বলতে শুধু ভিটেমাটি, কিন্তু বুকভরা আশার আলো ছিল সন্তানদের ঘিরে।
যে দিনটা সব কিছু পাস্টে দিল
২০২৪ সালের ২১ জুলাই। ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মো: আবদুল মালেক কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে। হঠাৎই শুরু হয় পুলিশী গুলিবর্ষণ। একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তাঁর বাম হাতে। কোনো পূর্ব সতর্কতা, কোনো কারণ ছাড়াই এই পরিণতি। হাতের হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। তিনি মাটিতে পড়ে যান, চারপাশে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু তখন চারপাশে আতঙ্কের এমন পরিবেশ, কেউই সহজে এগিয়ে আসতে পারেননি। তাঁকে স্থানীয় এক হাসপাতালে নেয়া হয়, পরে বড় হাসপাতালে রেফার করা হয়। চিকিৎসকরা জানালেন, হাতের অভ্যন্তরীণ হাড় এতটাই চূর্ণ হয়ে গেছে যে, স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অপারেশন করে প্লেট বসানো হয়, ব্যথা কিছুটা কমে, কিন্তু সে হাত দিয়ে আর কিছুই করা যায় না।
একটি হাতের অপারগতা
যে হাত দিয়ে তিনি প্রতিদিন গেট খুলতেন, ছেলেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, বাজারের ব্যাগ ধরে আনতেন সে হাত এখন নিথর। শুধু হাত থেমে যায়নি, থেমে গেছে পুরো জীবন। যে মানুষটি ঘাট বছর বয়সেও সকালের সূর্য ওঠার আগে কাজে বের হতেন, তিনি এখন সারা দিন বিছানায় কিংবা চেয়ারে বসে থাকেন। কাজ করতে পারেন না। আয় বলতে কিছু নেই। অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকেন পরিবারের দিকে, কীভাবে চলবে ঘর, কীভাবে চলবে ভবিষ্যৎ? ছেলে আইমান। বয়স মাত্র ১১। পড়ে ৫ম শ্রেণিতে। ছোট মেয়ে মাইদা আল উমামা। বয়স ৬। পড়াশোনা করছে ১ম শ্রেণিতে। তারা বোঝে না বাবার হাত কেন এমন হয়ে গেছে। বাবার মুখে কেন হাসি নেই। মাঝে মাঝে মেয়ে এসে হাতটা ধরে বলে, "বাবা, এখনও ব্যথা করে?" মালেক চুপ করে থাকেন মেয়ে যেন না বোঝে এই হাতটা আর কখনোই আগের মতো হবে না।
প্রতিদিনের লড়াই, প্রতিটি নিঃশ্বাসেই বেদনা
আবদুল মালেকের ঘর এখনও সেই কাঠ-টিনের, ঝড় উঠলে কাঁপে। মা মনোয়ারা বেগম এখনও বেঁচে আছেন, চোখে ছানি পড়েছে। হাঁটতে পারেন না ভালোভাবে। সংসারে এখন তিনিই সবচেয়ে শক্তিহীন, অথচ একসময় তিনিই ছিলেন ছায়া। মালেকের ছোট দুই ভাইয়ের একজন প্রবাসে। একজন চাকরি করেন।
নতুন বাংলাদেশের কাছে মালেকের আশা
মো: আবদুল মালেক এখন নতুন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি চান না সহানুভূতি, তিনি চান ন্যায্য অধিকার। তিনি চান একটি মাসিক পুনর্বাসন ভাতা। যাতে অন্তত ঘর চালাতে পারেন। তিনি আশা করেন, সরকারি কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে, যাতে তাঁর চিকিৎসা ও ঘর সংস্কারে সহায়তা পাওয়া যায়। তিনি বিশ্বাস, করেন রাষ্ট্র একদিন বুঝবে এই ধরনের মানুষদের ফেলে রাখা মানে পুরো সমাজকেই পিছিয়ে রাখা।
নীরবতাও একধরনের চিৎকার
মো: আবদুল মালেক কোনোদিন মাইক্রোফোনে কিছু বলেননি। কোনো আন্দোলনের মিছিলে তাঁর ছবি নেই। কিন্তু তাঁর নিঃশব্দতা আজ রাষ্ট্রের সামনে এক চিৎকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি হয়তো চিৎকার করে কিছু চান না কিন্তু তাঁর ভেঙে যাওয়া হাত, থেমে যাওয়া আয়, অঝোর কান্না সব মিলিয়ে তাঁর অস্তিত্বটাই এখন এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হে বাংলাদেশ, তুমি কি আমাকে দেখো না। তাঁর মতো হাজারো মানুষ আজ নীরবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছে। আবার কেউ দাঁড়াচ্ছে না। কেউ খোঁজ নিচ্ছে, আবার নিচ্ছে না।
সন্তানদের চোখে এক অসমাপ্ত যুদ্ধ
আইমান আর মাইদা এই দুই শিশুর চোখে বাবার ছবিটা কেমন? একজন ভাঙা মানুষ, নাকি এক নায়ক? হয়তো তারা জানে না, তাদের বাবা একদিন দায়িত্বের পাহাড় কাঁধে নিয়ে চলেছেন কিন্তু তারা দেখে এখন বাবা আর কিছু করতে পারেন না। রাতে ঘুমাতে পারেন না, শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই দুই শিশু একদিন বড় হবে। তারা কি জানবে, নতুন বাংলাদেশ তাদের বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল? নাকি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় চাপা পড়ে যাবে খুনী হাসিনার এ নৃশংস হত্যা চেষ্টা?
একটা গুলি আমার জীবনটাই পাল্টে দিল আবদুল মালেকের প্রত্যাশা, ইতিহাস যেন তাঁকে মনে রাখে।
মো: আবদুল মালেক এখন আর কিছু করতে পারেন না। তিনি মানুষের সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান। তাঁর চোখে এখনো জীবনের আশা আছে যদিও সেটা আর হাতে নেই। তিনি চান তাঁর সন্তানরা যেন দেখে, "আমার বাবা একটা হাত হারালেও মাথা নোয়াননি।" আব্দুল মালেক আজ নিঃস্ব। কিন্তু তিনি ইতিহাসের অংশ। একজন শ্রমজীবী মানুষের হাত থামিয়ে দেয়া মানে কেবল তার নিজের জীবন নয়, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন থামিয়ে দেয়া।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. সন্তানদের মাসিক হারে শিক্ষা ভাতা প্রদান
৩. কোনো ব্যবস্যার ব্যবস্থা করে দেয়া (কাপড়ের/মুদী দোকান হতে পারে)
৪. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান
৫. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৬. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৭. ঘর নির্মাণ বা সংস্কারে সরকারি সহায়তা

এক নজরে মো: আবদুল মালেক
নাম: মো: আবদুল মালেক
জন্ম তারিখ: ২৫-১১-১৯৬৫
জন্মস্থান: সাহাপুর, চাটখিল
নিজজেলা: নোয়াখালী
পেশা: সিকিউরিটি গার্ড
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: ১ নং সাহাপুর, হোল্ডিং নং ১-০০৩৩৮, ইউনিয়ন: সাহাপুর, থানা: চাটখিল, জেলা: নোয়াখালী
পিতা : মৃত মো: খায়েজ আহম্মদ
মাতা : মনোয়ারা বেগম
বাড়ি: কাঠ ও টিন
ভাইবোন: ৪ ভাই ও ২ বোন (২ ভাই প্রবাসী, ১ ভাই চাকরীজীবী, ২ বোন গৃহিণী)
সন্তানদের পরিচয়
১. আইমান, বয়স: ১১ বছর, ৫ম শ্রেণি
২. মাইদা আল উমামা, বয়স: ৬ বছর, ১ম শ্রেণি
আক্রমণকারী: পুলিশ
আক্রমণস্থান : সাইনবোর্ড
আহত হওয়ার তারিখ: ২১ জুলাই, ২০২৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍